তালেবান নেতা মোল্লা বেরাদার কি আফগান যুদ্ধের যবানিকা টানতে পারবেন?


মোল্লা ওমরের ঘনিষ্ঠ সহচর আফগান তালেবান নেতা মোল্লা আব্দুল গনি বেরাদর কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনায় বসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রভাবশালী এই তালেবান নেতার মাঠে নামার ফলে আফগানিস্তান, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই শান্তি আলোচনায় সাফল্যের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। এ বিষয়ে ২৮ জানুয়ারি প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন:


আহমেদ রাশিদ, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
আফগান সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মার্কিন সেনাবাহিনী, ২০১৬।
আফগান সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মার্কিন সেনাবাহিনী, ২০১৬। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস


জানুয়ারির চব্বিশ তারিখ মোল্লা আব্দুল গনি বেরাদর কাতারে চলমান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শান্তি আলোচনায় তালেবানের তরফ থেকে প্রধান আলোচক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে মোল্লা ওমরের সাথে তালেবান আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন।

মোল্লা বেরাদর এর আগে তালেবান প্রধান মৌলভী হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার সহকারি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি মার্কিন শান্তি দূত জামালি খালিলজাদের সাথে শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে শিগগিরই দোহার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন  বলে আশা করা হচ্ছে।

একজন ক্যারিশমাটিক সামরিক নেতা হিসেবে মোল্লা বেরাদার তালেবানদের নিকট খুবই শ্রদ্ধেয়। তিনিই প্রথম জ্যেষ্ঠ তালেবান নেতা, যিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নিষ্ফলতা লক্ষ্য করে ২০০৯ সালে হামিদ কারজাই নেতৃত্বাধীন আফগান সরকারের  সাথে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর সাথে গোপন শান্তি আলোচনা শুরু করেছিলেন।

তালেবানের তৎকালীন প্রধান পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তান ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোল্লা বেরাদরকে করাচি থেকে গ্রেপ্তার করে এবং গোপন আলোচনার বিষয়টি ফাঁস করে সে সময় পরীক্ষামূলক এই উদ্যোগ ভেস্তে দিয়েছিলো। পাকিস্তান সরকার এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তালেবান ও আফগান সরকারকে পাকিস্তানের আফগান নীতির সাথে সাংঘর্ষিক কোন রাজনৈতিক পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়েছিলো। মোল্লা বেরাদরের গ্রেপ্তারের ফলে কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে তুমুল বিরোধিতা তৈরি হয়েছিলো, তালেবানও বিষয়টিকে নিজেদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর মনে করেছিলো। কারণ মোল্লা বেরাদার তালেবানের অন্যতম শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠাতা নেতা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকেন।

প্রায় সাড়ে আট বছর পর গত অক্টোবরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের চাপের মুখে পাকিস্তান মোল্লা বেরাদরকে মুক্তি দেয়। মোল্লা বেরাদারের মুক্তি এবং এরপর প্রধান আলোচক হিসেবে তার নিযুক্তির বিষয়টি দেখে মনে হচ্ছে, আফগান শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি পাকিস্তানের মনোভাব এবং শান্তিকামী তালিবান নেতাদের প্রতি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিদ্বেষ স্পষ্টতই পরিবর্তিত হয়েছে।

আফগান যুদ্ধ সমাপ্ত করতে অনিচ্ছার কারণে পাকিস্তান আসলে রাজনৈতিকভাবে এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আর তাছাড়া পাকিস্তান তালেবান কর্তৃক সংগঠিত ক্ষয়-ক্ষতি ইসলামাবাদের হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে। পাকিস্তান তালেবান পাকিস্তানের অভ্যন্তরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে, এর পিছু হটে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেয়। মার্কিন-তালেবান চলমান শান্তি আলোচনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে তালেবান এখন আর আফগানিস্তানের বাইরের কোন জঙ্গী গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেবে না।

খলিলজাদের মিশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার বদলে সহযোগিতা করার জন্য পশ্চিমা কূটনীতিকরা এখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রশংসা করছেন।

শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সমর্থন তাদের কৌশলগত অবস্থানের পরিবর্তন। এই পরিবর্তন এ অঞ্চলে বৃহত্তর প্রভাব বিস্তানর করে কি না, তা এখনো দেখার বিষয়। তবে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কাশমিরের বিতর্কিত অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্বের সাথে আবার আলোচনা শুরু করতে চাচ্ছে।

খলিলজাদের মিশনে পাকিস্তানের সমর্থন ছাড়াও তালেবানদের মধ্যে মোল্লা বেরাদারের সম্মানজনক অবস্থানের কারণে শান্তিস প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা অনেক জোরদার হয়েছে। নব্বুইয়ের দশকে তালেবান কাবুল দখল করার পর আমি মোল্লা বেরাদারের সাথে দেখা করেছিলাম। তিনি হিরাত প্রদেশের গভর্নর ছিলেন, এবং ২০০১ সালে যখন তালেবানের পতন হয়, তখন তিনি ছিলেন তালেবান সরকারের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী।

সামাজিক বিষয়ে মোল্লা বেরাদার ছিলেন মধ্যপন্থী, তিনি পশ্চিমা বিশ্ব এবং আফগানিস্তানের প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক রাখতে চাইতেন। ওসামা বিন লাদেন দ্বারা প্রভাবিত কট্টরপন্থী নেতারা পশ্চিমা সাহায্য সংস্থাসমূহকে আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে চাপ দেন, ফলে দেশটি তীব্র দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। মোল্লা বেরাদার আফগানিস্তানে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার এবং সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। পশ্চিমা অর্থনৈতিক সহায়তার উপর দেশটির নির্ভরতার বিষয়ে তিনি সতর্ক ছিলেন।

যদিও মোল্লা বেরাদর ১৯৯৬ সালে বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে মোল্লা ওমরের বিরোধিতা করেছিলেন, তবে তালেবান সরকারের পতনের পর তিনি কান্দাহারে মোল্লা ওমরের সাথেই ছিলেন।

তালেবান আন্দোলনে তার অনবদ্য অবদানের কারণে তিনি যদি, এবং যখন শান্তির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তখন কোন তালেবান নেতাই তার বিরোধিতা করতে সক্ষম হবে না। তাছাড়া যেসকল তালেবান সামরিক কমান্ডাররা এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এবং চুড়ান্ত বিজয় অর্জনের মাধ্যমে নব্বুইয়ের দশকের মতো আবারো শরীয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে ইচ্ছুক, তাদেরকেও শান্তি প্রক্রিয়া মানিয়ে নেওয়ার জন্য তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।

তার উপস্থিতি যু্ক্তরাষ্ট্রের জন্য সুবিধাজনক, কারণ খলিলজাদ ও তার অন্যান্য সহকর্মীরা এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সাথে আলোচনা করার সুযোগ পাবেন, ‍যিনি নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সক্ষম।

খলিলজাদের দল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। মার্কিন ও তালেবান কর্মকর্তারা শান্তিচুক্তির “মৌলিক কাঠামোর বিষয়ে একমত” হয়েছেন, যাতে তালেবান অঙ্গীকার করেছে ভবিষ্যতে আর কোন সন্ত্রাসী দলকে তারা আশ্রয় দেবে না এবং আল কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের অবশিষ্ট অংশকে নির্মূল করতে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা সহযোগিতা করবে। চুক্তিটি পুরোপুরি মার্কিন যুদ্ধ বিরতি এবং আফগান সরকারের সাথে তালেবানের আলোচনার পথ সুগম করতে পারে।

তবে একটা বড় প্রশ্নের উত্তর এখনো মিলে নি। তালেবান প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে চাচ্ছে অবিলম্বে পুরোপুরি মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার এবং আফগানিস্তানের বিভিন্ন জেল তাদের কারাবন্দীদের মুক্তি। মার্কিনরা তালেবানদের নিকট থেকে এই অঙ্গীকার পেয়েছে যে আফগানিস্তানের মাটি আর কখনোই কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যবহার করার সুযোগ পাবে না।  যুক্তরাষ্ট্র এর বাইরেও মার্কিন ও আফগান সরকারের সাথে তালেবানদের যুদ্ধবিরতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি ও কাবুল সরকারের সাথে আলোচনা শুরু করার চুক্তি আদায় করে নিতে চাচ্ছে।

তালেবান এখন পর্যন্ত ঘানি সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি নয়। তাদের ভাষায় আশরাফ ঘানির সরকার নিছক আজ্ঞাবহ সরকার বৈ কিছু নয়। তালেবান যদি সত্যিই যুদ্ধ সমাপ্ত করতে চায়, তাহলে এরকম রাজনৈতিক পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয়। মোল্লা বেরাদার ইতোপূর্বে সকল আফগান নেতার সাথে আলোচনা করেছিলেন, সম্ভবত এ বিষয়ে তিনি তালেবানের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে অনুপ্রাণিত করতে পারবেন।

তাছাড়া চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো দেশসমূহের সহযোগিতা অব্যহত রাখার প্রতিশ্রুতি তালেবানের শান্তি চুক্তির বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ব্যাপরে নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।

আঞ্চলিক শক্তিসমূহের  ইরান ও উপসাগরীয় দেশসমূহ, ভারত ও পাকিস্তান, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান – এসকল ভিন্নতা সত্ত্বেও আফগানিস্তান যুদ্ধ সমাপ্ত করা ব্যাপারের সকলের মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। দীর্ঘ যুদ্ধ প্রতিবেশী দেশসমূহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, কারণ প্রতিবেশী দেশের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো কার্যত আইনবিহীন আফগানিস্তানে আশ্রয় গ্রহণ করছে, এবং এসকল দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

খলিলজাদের নিজের জন্মভূমিতে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে সহযোগিতা করবে। রিগ্যান প্রশাসনের আমলে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের সময় থেকেই তিনি কাজ করে আসছেন। হয়তো চল্লিশ বছর মেয়াদী যুদ্ধ সমাপ্ত হতে যাচ্ছে। ফলে আফগান জনগণ এখন আশার আলো দেখছে।



এই লেখাটি মূলত নিউ ইয়র্ক টাইমসের অনলাইন সংস্করণে ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত আহমেদ রাশিদ রচিত “This Man Is Revered Amongthe Taliban. Can He End the Afghan War? শীর্ষক প্রতিবেদনের অনুবাদ। ভাষান্তর ডেস্ক কর্তৃক অনূদিত।
[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.