আরব লীগ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল : তুর্কি দৃষ্টিকোণ থেকে

জাকারিয়া কুরসুন, ইয়েনি সাফাক:



গত ১৯ ও ২০ জানুয়ারিতে বায়রুতে অনুষ্ঠিত আরব লীগের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলন আরব নেতাদের অনুপস্থিতিতেই শুরু হয়েছে। এই সামিটে মাত্র তিন জন আরব নেতা উপস্থিত ছিলেন মেজবান রাষ্ট্র লেবাননের রাষ্ট্রপতি, কাতারি আমির শেখ তামিম এবং মৌরিতানিয়ার রাষ্ট্রপতি মোহাম্মেদ ওলদ আব্দেল আজিজ। যদিও লেবাননের সরকার গঠনে ব্যর্থতা এবং নিরাপত্তার অভাব আরব নেতাদের অংশগ্রহণের উপর প্রভাব ফেলেছে, তবে শুধু এসকল কারণে তারা অনুপস্থিত ছিলেন একথাও বলা যায় না।

শীর্ষ সম্মেলনে আরব নেতাদের অনুপস্থিতির সিদ্ধান্ত কিংবা শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলের পিছনে রয়েছে নানা হিসাব-নিকাশ। লেবাননে ইরান-সমর্থিত হেযবুল্লাহ এবং আমালের উপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পোর মধ্যপ্রাচ্য সফরকালে ইরান বিরোধী বিবৃতির কথা মাথায় রাখলে বলা যায় যে শীর্ষ সম্মেলন নিষ্ফল হওয়ার পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনাও ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া আরব লীগের কাঠামোগত সমস্যা এবং আগের শীর্ষ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত না হওয়া-ও শীর্ষ সম্মেলন নিষ্ফল হওয়ার কারণ বটে। যদিও শীর্ষ সম্মেলনের আলোচ্য বিষয় ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, তবু আরব নেতারা উপস্থিত হলে নিঃসন্দেহে এই সম্মেলনও রাজনৈতিক মোড় নিতে পারতো। সেক্ষেত্রে আরব লীগে সিরিয়ার প্রত্যাবর্তন এবং লেবাননের রাষ্ট্রপতি মিশেল আউনের বিষয় সম্মেলনের প্রধান ইস্যু হয়ে পড়তো।

এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আরব লীগ কেউই লীগে সিরিয়ার প্রত্যাবর্তন চায় না। এরকম হলে সেটা তাদের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে যেমন ক্ষতিগ্রস্থ করবে, তেমনি ২০১৭ থেকে প্রতিষ্ঠিত হতে চলা ইসরায়েলের সাথে মিসর ও উপসাগরীয় দেশসমূহের সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অন্যদিকে সিরিয়া ইস্যুতে আরব লীগের মাধ্যমে আঞ্চলিক উদ্যোগের বাস্তবায়ন যুক্তরাষ্ট্রের নিকট অপ্রত্যাশিত। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া ও ইরাকে তাদের নড়বড়ে অবস্থান পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত কোন আঞ্চলিক উদ্যোগকে সমর্থন করতে যাবে না।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেম ইস্যুতে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তবু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে দুই দলের মধ্যে এখন বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আরব মিত্ররা তাদের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় তথা ফিলিস্তিন এবং জেরুজালেম ইস্যুতে স্বস্তি অনুভব করছে না। আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আরবদের উপর চাপ সৃষ্টি করে যদিও তাদের কাজ-কারবার এখনো চলছে, কিন্তু এটা কোন চিরস্থায়ী উপায় নয়। এই পরিস্থিতিতে তাই ইরান-ভীতির অজুহাতে ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশসমূহ ও মিসরের সমন্বয়ে গঠিত জোটের মাধ্যমে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষার কাজ চালিয়ে যাওয়াটাই তাদের জন্য সর্বোত্তম সমাধান। আমার মতে, বর্তমানে আলোচনার টেবিলে এটিই একমাত্র ফর্মুলা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর গঠিত আরব লীগের সদস্যদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচিতিগত সাদৃশ্য সত্ত্বেও সংগঠনটি টিকে থাকার অন্যতম কারণ তাদের ইসরায়েল বিরোধী অবস্থান। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধই দীর্ঘ কাল যাবৎ লীগকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এমনকি ১৯৬৭ সালের পরাজয়ে এবং তার পরের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পরও অবস্থার পরিবর্তন হয় নি।

ঐতিহাসিকভাবে আরব-ইসরায়েলের মধ্যে এর আগে কখনোই এই পর্যায়ের সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয় নি। যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ইসরায়েলের সাথে উপসাগরীয় দেশসমূহের বর্তমান সম্পর্কের উন্নয়ন বিভিন্ন ক্ষেত্রে  পারস্পরিক সহযোগিতার দিকে মোড় নিয়েছে। বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যে কোন সমস্যায় উভয় পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিময় চলছে। বিশেষত ইয়েমেন যুদ্ধে এবং সিনাইতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মিসরের আকাশ অভিযানে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সামরিক, প্রযৌক্তিক এমনকি শিক্ষাগত সহযোগিতার কথা সর্বজন বিদিত। যে সকল দেশ মনে করে যে তাদের শাসন ক্ষমতা নানা সমস্যার কারণে ঝুঁকিতে আছে, তারা কখনোই চাইবে না তাদের সম্পর্কের উভয়পাক্ষিক অবনমন ঘটুক, যাতে তাদের ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে। এখানে আর কোন ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নাই যখন খোদ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস পর্যন্ত শীর্ষ সম্মেলনে অনুপস্থিত থেকেছেন।

এটা জানা কথা যে আরব দেশসমূহের মধ্যে এই সামিটের কারণে পারস্পরিক সহযোগিতার বদলে উল্টো আরো নানা সমস্যা তৈরি হতো, তাদের মধ্যে আরো বিভক্তির সৃষ্টি হতো। যেহেতু তৃতীয় পক্ষসমূহ দ্বারা প্রভাবিত পূর্ববর্তী শীর্ষ সম্মেলনসমূহের কথা এখনো আরব নেতাদের মনে আছে, তাই তারা আর ঝুঁকি নিতে চান নি।

তাহলে তুরস্ক এসব নিয়ে ভাবছে কেন?

তুরস্ক সরাসরি সকল আঞ্চলিক উন্নয়নের অংশ। কাজেই এটা খুব স্বাভাবিক যে যে কোন উন্নয়নই তুরস্কের ভাববার বিষয় হবে। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল ও আরব লীগের পক্ষে তুরস্ককে বিবেচনায় না রেখে এ অঞ্চলে কোন কিছু করা সম্ভব না। তাছাড়া আমি এখানে আরেকটি দিক তুলে ধরতে চাই। আরব লীগকে এতোদিন বাঁচিয়ে রেখেছিলো যে ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব, সেটা শেষ হয়ে যাওয়াতে এবং বর্তমানে ইরানের সাথে শান্তি স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার কারণে আবারো তুরস্ক আলোচনায় চলে আসছে। এবার ইসরায়েলকে সাথে নিয়েই আরব লীগের নতুন ঐক্য স্থাপিত হতে পারে তুলনামূলক কম বাস্তবসম্মত কারণে, আর তা হচ্ছে তুরস্ক বিরোধী মনোভাব, যেহেতু এখন আর আরবদের মধ্যে আগের মতো ইসরায়েল বিরোধী মনোভাব নেই। অবশ্য আরব লীগ এখনো এই রাস্তা থেকে অনেক দূরে আছে। কারণ তুরস্কের সাথে শত্রুতা এখনো আরব জনগণ চায় না। কিন্তু কিছু কিছু আরব ক্ষমতাসীন নিঃসন্দেহে এই কর্মপন্থাকে সমর্থন করবেন। 

[ইয়েনি সাফাক একটি তুর্কি দৈনিক পত্রিকা। পত্রিকাটি বর্তমান তুরস্ক সরকারের ঘনিষ্ঠ এবং এরদোয়ানের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। লেখক এই পত্রিকার কলামিস্ট। নিবন্ধটি ইয়েনি সাফাকের ‍ওয়েবসাইটে ২১শে জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত হয় “The Arab league, the US, and Israel” শিরোনামে।]
[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.