ব্রেক্সিটে ইউরোপের কী লোকসান?


সিগমার গ্যাব্রিয়েল, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রেক্সিট, ব্রিটেন ও ইউরোপের ভূরাজনীতি
শেষ পর্যন্ত ব্রেক্সিটের কেমন প্রভাব পড়বে ইউরোপ জুড়ে, এটিই এখন দেখার বিষয়


ঘড়ির কাটা ক্রমেই ২৯ মার্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের সময়ও ঘনিয়ে আসছে। ব্রেক্সিট “কোমল”ই হোক, আর “কঠোর”ই হোক, যুক্তরাজ্যকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা সহ্য করতে হবে। তবে ব্রিটেন ইতোপূর্বে এর চেয়েও বড় সংকট কাটিয়ে উঠেছে, যে কোন উপায়ে এই সংকটও কাটিয়ে উঠবে। আমার মতে, মূল বিষয় হলো ভবিষ্যৎ ইউরোপের জন্য ব্রেক্সিটের প্রভাব কেমন হবে?

“ইউরোপীয় ধারণা” মোটামোটি টিকে যাবে। ব্রেক্সিটের উত্তেজনায় ইইউ ভেঙে পড়বে না, যুক্তরাষ্ট্রের ইইউ ত্যাগের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও কাটিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু ব্রেক্সিট বিশ্বে ইউরোপের বর্তমান ভূমিকাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে, যা এখনো ইউরোপীয়রা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কর্তৃক ওয়াশিংটনে ইইউ মিশনের কূটনৈতিক মর্যাদার অবনমনের মতো আরো অনেক পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে।

 যে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিপরীতে ব্রেক্সিট সংগঠিত হচ্ছে, সেটিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নাই। সম্ভবত এই প্রেক্ষাপটই ইইউর উপর ব্রেক্সিটের প্রভাবের অন্যতম নিরূপক হয়ে দাঁড়াবে। নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হলো, বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য আটলান্টিক থেকে প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলের দিকে চলে আসছে, এই ট্রেন্ডের জন্য শুধুমাত্র ট্রাম্পের মতো লোকরঞ্জনবাদীদের দায়ি করা যায় না। সর্বোপরি, বারাক ওবামা যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে আটলান্টিকের বদলে প্রশান্তমহাসাগরীয় দেশ হিসেবে তুলে ধরতেন, সেখানে তার উত্তরসূরী যুক্তরাষ্ট্রকে “ট্রান্স আটলান্টিক শক্তি” হিসেবেই তুলে ধরেন। বর্তমানে যদিও আমরা “জি-জিরো” পৃথিবীতে বসবাস করতে পারবো, যেখানে কোন একক বিশ্ব শক্তি থাকবে না, তবে ভবিষ্যতে হয়তো “জি-২” পৃথিবীই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আর চীন বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকবে।

ইউরোপীয়দেরকে আমি এখানে ব্রিটিশদেরকেও সাথে রাখবো যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তা হলো, আমরা কি এই দুই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির মধ্যে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব রক্ষা করতে পারবো (এবং পারলে কীভাবে পারবো?)। সম্ভবত একমাত্র জলবায়ু নীতি ছাড়া, বেশির ভাগ বৈশ্বিক ইস্যুতেই ইউরোপ এখনই দর্শক মাত্র। এর মধ্যে রয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র পুনর্দখলে ট্রাম্প-পুতিনের দৌড়, মধ্যপ্রাচ্যে সহিংস অস্থিরতা। বরং সিরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহেরর বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণা ও আসাদের সাথে বিদ্রোহী গোষ্ঠীসমূহের চলমান যুদ্ধের বিষয়েও ইউরোপ তুরস্ক এবং রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

ব্রেক্সিটের পর আমাদের অবস্থা আরো খারাপ হবে সম্ভবত, কারণ বিশ্ববাসী তখন ইউরোপীয়দেরকে আরো দূর্বল মনে করবে। এছাড়াও ব্রেক্সিটের ফলে ইইউ হারাবে শতবর্ষের কূটনৈতিক সম্পর্কের সাথীকে, বড় অর্থনৈতিক শক্তিকে, এবং প্রথম শ্রেণির সামরিক বাহিনীর অধিকারী একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশকে।

এসকল কারণে ২৯ মার্চ পর্যন্ত (এবং সম্ভবত তারপরেও) যথাসম্ভব ছাড় দেওয়া উচিত, যাতে ব্রেক্সিটের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়। স্পষ্টতই, সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক কম। বেশির ভাগ বিরোধী দলীয়র নিকট প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেকে হোচট খাওয়ানোটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সে তুলনায় তাদের নিকট অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। বেশির ভাগ রক্ষণশীল নেতা (দুঃখজনকভাবে কিছু লেবার দলীয়ও)  কোন কিছু না করেই তাদের ব্রেক্সিট লক্ষ্যে পৌছে যেতে চান। আলোচনা সাপেক্ষে একটি “কোমল” ব্রেক্সিটের পক্ষে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অসম্ভব বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে, কেননা তখন যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ পুরোটাই ইইউর হাতে থাকছে, একক বাজার টিকিয়ে রাখার বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে।

তাহলে ইউরোপীয়দের কী করা উচিত? যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক হর্তাকর্তাদের নিষ্প্রভ আচরণের দরুণ যুক্তরাজ্য নিজেই নিজেকে এই পরিস্থিতিতে ফেলেছে, উদাসীনভাবে এই যুক্তি দেওয়াটা হয়তো ভুল নয়, কিন্তু এই অবস্থান কোন পক্ষের জন্যই কল্যাণকর হবে না। যুক্তরাজ্যকে যথাসম্ভব ইইউর কাছাকাছি রাখা যায় এমন একটি সমাধান বের করার জন্য সকল ইউরোপীয়কে প্রথমে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে ২৯ মার্চ যা হবে, তা আমাদের সকলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সকল ইউরোপীয় সামাজিক গণতান্ত্রিক দলগুলোর উচিত লেবার পার্টি এবং তাদের ইউরোস্কেপ্টিক (ইইউর সমালোচক) নেতা জেরেমি কর্বিনের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে হবে।  জার্মানির রক্ষণশীল এবং উদারপন্থী, উভয়পক্ষের উচিত ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে সাথে নিয়ে কঠোর ব্রেক্সিটের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে আইরিশ সরকারের সাথে আলোচনা করা। বিশেষত আয়ারল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কঠিন সীমান্ত, এবং দ্বীপটিতে পুনরায় সহিংসতা শুরু হওয়ার সম্ভাবনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। থেরেসা মে’র প্রস্থান চুক্তিতে “ব্যাকস্টপ” ছিল মূলত এই সমস্যার সমাধান করার জন্য, যে চুক্তিটি গত ১৫ জানুয়ারি ব্রিটিশ সংসদে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।

ইউরোপীয়দেরকে অবশ্যিই নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে হবে, ইইউ এবং ইউকের মধ্যে আরো ভালো চুক্তি করা সম্ভব কি না। সম্ভবত আরো অনেক পথ আছে, যাতে ব্রিটেনকে উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য চুক্তির বিষয়ে পুনরায় নিশ্চয়তা প্রদান করা যায়, যে চুক্তিতে কোন পক্ষই অপর পক্ষের নিকট স্থায়ীভাবে জিম্মি হয়ে থাকবে না। এতে সম্ভবত ইইউর অভ্যন্তরে চলাফেরার স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে। সর্বোপরি শুধু ব্রিটিশ সরকারই নয়, জার্মান মেয়র ও শহর কাউন্সিলও আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর অভিবাসনের প্রভাব কমাতে চায়। চলাফেরার স্বাধীনতার নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা এই স্বাধীনতা বহির্ভূত কোন কিছু নয়।

২৯ মার্চের সময়সীমা যেহেতু ঘনিয়ে আসছে, ইইউর উচিত এই বিষয়টি স্পষ্ট করা যে, যুক্তরাজ্যের দরকার হলে এই সময়সীমা স্থগিত করা হবে। আন্তর্জাতিক আলোচনা-সমোঝতায় এটি নতুন কিছু নয়। এমনকি এবছরের ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনও কোন অনিবার্য বাধা হতে পারে না। এখনই রাজনৈতিক সৃজনশীলতা দেখাতে হবে। সাফল্যের যে কোন সুযোগ, সম্ভাবনা যত কমই হোক না কেন, কাজে লাগাতে হবে। ইউরোপের যে কারো নিকট ব্রেক্সিটের মূল্য অনেক বেশি, এটাকে সহজভাবে নেওয়ার কোন সুযোগ নাই।



মূল নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “Why BrexitWill Damage Europe শিরোনামে প্রকাশিত। লেখকসিগমার গ্যাব্রিয়েল। সিগমার গ্যাব্রিয়েল জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী এবং বর্তমানে জার্মান সংসদের নিম্নকক্ষের সদস্য। লেখাটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনলাইনে প্রকাশিত হয় জানুয়ারির তিরিশ তারিখ। সংযুক্ত ছবি: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে।
[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.