সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ: ফিলিস্তিন, হেজাজ রেলওয়ে আর প্যান ইসলামিজম



আনাদুলু এজেন্সি:
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে ওসমানি (অটোমান) সাম্রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির পর তাঁকে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। সে হিসেবে তুরস্ক এবার তার ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছে।
আবদুল হামিদ চতুর্ত্রিংশ ওসমানি খলিফা, তিনিই সাম্রাজ্যে সর্বশেষ শক্তিশালী খলিফা। তিনি এমন অনেক কাজে সফল হয়েছিলেন, যেগুলো আরব ও মুসলিম উম্মাহকে একত্রিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
তেত্রিশ বছরব্যাপী সুদীর্ঘ শাসনামলে তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার মাঝে অন্যতম হলো: ইহুদিবাদী শক্তির প্রতিরোধ; যারা কিনা ফিলিস্তিন দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তাঁর আরো দুটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো হেজাজ রেলওয়ে এবং প্যান ইসলামিজম প্রতিষ্ঠা; এর মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আরব ও মুসলিম জাতিকে একীভূতকরণ এবং পশ্চিমা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। উল্লেখ্য সেসময়েই পশ্চিমারা আরব ও মুসলিম বিশ্বের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে শুরু করেছিলো।
বায়তুল মাকদিস:
যে সকল ওসমানি সুলতান ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবদান রেখেছিলেন, সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। তিনি ইহুদিবাদী শক্তির মোকাবেলা করেছিলেন, যারা সে সময় ফিলিস্তিন দখলের অপচেষ্টা করছিলো।
সুলতান আবদুল হামিদ ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসী হওয়া ও জেরুজালেমে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করে প্রথম আইন প্রণয়ন করেন।
সে সময়, সেই আঠারো শতকে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে তাদের বসতি স্থাপনের বিনিময়ে ওসমানি সাম্রাজ্যের সকল ঋণ পরিশোধ করার প্রস্তাব পেশ করেছিলো। আবদুল হামিদ তাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
আনাদুলের ওসমানি ইতিহাসের অধ্যাপক মুহাম্মাদ হরব বলেন:  “সুলতান আবদুল হামিদ ১৮৯০ সালের ২৮ জুন ওসমানি ভূখণ্ডে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করতে নিষেধ করে এবং তাদেরকে তারা যে দেশ থেকে এসেছে সেখানে ফেরত পাঠাতে নির্দেশ দিয়ে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন।
তিনি আরো যোগ করেন: “ইহুদিরা এই প্রস্তাব (সাম্রাজ্যের ঋণ পরিশোধের প্রস্তাব) পেশ করলে সুলতান আবদুল হামিদ নিজেকে সংবরণ করতে পারেন নি, ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তাঁর দরবার হতে থিওডর হেরযল এবং প্রধান ইহুদি রাব্বিকে বহিষ্কার করেন (ইহুদিদের পক্ষ থেকে এরা দুজনেই প্রস্তাবটি পেশ করেছিলো)”
 এরপর তিনি লিখেন: “ওয়াশিংটন, বার্লিন, ভিয়েনা, লন্ডন ও প্যারিসের ওসমানি রাষ্ট্রদূতদেরকে নির্দেশ প্রদান করা হয়, যেন তারা জায়নবাদী আন্দোলনের গতিবিধি ও তাদের সম্পর্কে প্রতিবেদন যথাশিঘ্রই সুলতান আবদুল হামিদের নিকট প্রেরণ করেন।”
ইহুদিদের অভিবাসন থেকে রক্ষা করতে আবদুল হামিদ ১৮৭৬ সালে “ওসমানি ভূমি স্মারক” (مذكرة الأراضي العثمانية) শীর্ষক একটি আইনি স্মারক প্রকাশ করেন।
এই স্মারক অনুসারে, সুলতান ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমি, বিশেষত ফিলিস্তিনি ভূমি ইহুদিদের নিকট বিক্রি করতে নিষেধ করেন। এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট প্রস্তুত করেন। এছাড়া ফিলিস্তিন ভ্রমণে আগ্রহী ইহুদিদের জন্য সংক্ষিপ্ত সময় নির্দিষ্ট করে দেন।
হেরযল যখন বুঝতে পারলেন, ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী লক্ষ্যপূরণে সবচেয়ে বড় বাধা সুলতান আবদুল হামিদ, তখন তাকে সন্তুষ্ট করতে এবং ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করতে তিনি কূটনৈতিক উপায়ের আশ্রয় নিতে শুরু করেন।
পুরনো স্বপ্ন:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘণ্টা যখন বেজে ওঠে, তারও আগে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলকে ভালোভাবে ইস্তাম্বুলের সাথে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষা খাত এবং যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেলিগ্রাফ এবং রেললাইন। এই সংযুক্তি স্থাপনের ফলে রেল লাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হজযাত্রীদের চলাচল সহজ হয়।
সেসময় হজযাত্রীরা ইস্তাম্বুল থেকে গজে যেতে হলে দুই মাসের কষ্টকর ভ্রমণের মাধ্যমে যেতে হতো, বিভিন্ন কাফেলার সঙ্গী হয়ে। এর মধ্যে আবার বেদুইনদের দ্বারা ডাকাতির শিকার হওয়ার ভয়ও ছিল।
শুরুতে ”হেজাজ রেলওয়ে” প্রকল্পের খরচ ধরা হয়ছিলো চার মিলিয়ন ওসমানি লিরা, ওসমানি সাম্রাজ্যের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিলো না, আবার ইউরোপীয় ঋণ পাওয়াও সম্ভব ছিলো না। ফলে দান-খয়রাতের মাধ্যমে অর্থ জমানো শুরু হয়, সুলতান নিজেই দান করা শুরু করেন। এরপর শাসক পরিবার, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে জনসাধারণও বড় অংকের দান করেন এই প্রকল্পের জন্য।
প্রকিল্পটি শেষ করতে মোট খরচ হয় সাড়ে তিন মিলিয়ন লিরা। ইউরোপীয় কোম্পানীগুলো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যে পরিমাণ টাকা চেয়েছিলো, তার চেয়ে অনেক কম খরচ হয়।
“হেজাজ রেলওয়ে” ইস্তাম্বুলকে দামেশক হয়ে মক্কা শরিফ, মদিনা শরিফ ও ইয়েমেনের সাথে সংযুক্ত করে। ১৯০০ সালে দামেশক থেকে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। চার বছর পর ৪৬০ কি.মি রেল লাইন তৈরি হয়। তখন জর্দানের মআন শহর পর্যন্ত রেললাইন পৌছে। একইভাবে ফিলিস্তিনের হিফা শহরও সংযুক্ত হয় ইস্তাম্বুলের সাথে। ১৯০৮ সালে রেললাইন মদিনা শরিফ পৌছে, সে বছরই রেললাইনের উদ্বোধন হয়, রেললাইনটির দৈর্ঘ হয় মোট ১৪৬৪ কি.মি।
১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট প্রথম রেল যাত্রা শুরু করে। সে রেলগাড়িতে ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও অতিথিবৃন্দ ছিলেন। ট্রেন যাত্রা শুরু করে ইস্তাম্বুল থেকে, দামেশক হয়ে মদিনা শরিফ পৌছে। ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কি.মি গতিতে ট্রেন চলে, সেসময়ের জন্য এটা অনেক ভালো গতিবেগ ছিলো। নামাজ আদায় কিংবা পাথেয় সংগ্রহ করা ছাড়া ট্রেন থামে নি। মদিনা শরিফ পৌছতে সেবার তিন দিন সময় লেগেছিলো।
এই প্রকল্পের আওতায় ২৬৬৬টি সেতু, সাতটি লোহার সেতু, ৯৬টি রেলস্টেশন, ৩৭টি পানির ট্যাংক, ২টি হাসপাতাল এবং ৩টি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করা হয়।
রেললাইন উদ্বোধনের পর থেকে হিফা ও দামেশকের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান ও যাত্রীদের আসা-যাওয়া হতে লাগলো দৈনিক, আর দামেশক ও মদিনার মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান ও যাত্রীদের যাতায়তে সময় লাগতো তিন দিন। হজের মৌসুমে সফর মাসের শেষ অবধি মদিনা ও দামেশকের মধ্যে তিনটি বিশেষ ট্রেন দেওয়া হতো। অধ্যাপক হরব তার বইয়ে লিখেন, সুলতান বলেছিলেন “নিশ্চয় হেজাজ রেলওয়ে আমার পুরনো স্বপ্ন।
মুসলমানদের একীভূতকরণ:
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন অংশকে “প্যান-ইসলামিজম” এর মাধ্যমে একীভূত করতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যেমে তিনি ইহুদিবাদী ও ফ্রিম্যাসনরি আন্দোলনকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন।
আন্তরর্জাতিক রাজনীতিতে প্যান ইসলামিজমের আবির্ভাব হয় আবদুল হামিদ ক্ষমতায় আসার পর। এর উদ্দেশ্য ছিল চিন, ভারত, মধ্য আফ্রিকা থেকে শুরু করে সব জায়গার মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা।
অধ্যাপক মুহাম্মাদ হরব বলেন, “প্যান ইসলামিজমের চিন্তা ছিল মূলত অনেকগুলো লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলা করা, যারা ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রশাসন ও রাজনীতির গভীরে প্রবেশ করে ফেলেছিলো, এছাড়া আকেটি উদ্দেশ্য ছিল রুশ ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের সম্মুখে মুসলিম বিশ্বকে একত্রিত করা।
সুলতান আবদুল হামিদের আমলে প্যান ইসলামিজমের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনসমূহের মধ্যে ছিল হেজাজ রেলওয়ে প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার প্রসার, উলামাদের সহযোগিতা, আলেম-উলামা ও সুফি-সাধকদের গুরুত্ব প্রদান, পাশ্চাত্য চাল-চলন ও চিন্তা-চেতনার প্রতিরোধ, ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমিতে পাশ্চাত্য পরিকল্পনার (মূলত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আবাসন স্থাপন) প্রতিরোধ।
দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৮৪২ সালে ইস্তাম্বুলে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর ইন্তেকাল হয় ১৯১৮ সালে। তিনি ৩৪ তম ওসমানি খলিফা, সালতানাত ও খেলাফতকে একীভূতকারী ওসমানিদের মধ্যে তিনি ২৬ তম, আর সমগ্র ইসলামের ইতিহাসে তিনি ১১৩তম খলিফা।
আবদুল হামিদ সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুদক্ষ ওসমানি সুলতান হিসেবে পরিচিত, তার সময়ে শিল্প খাতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন হয়েছে, এর বাইরে অনেক রাষ্ট্রীয় ঝামেলার মুখোমুখি তো হতেই হয়েছে। তাকে ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমির ব্যাপারে আগ্রহী শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।
________________________________

এই প্রবন্ধটি সর্বশেষ প্রকৃত ওসমানি শাসক আবদুল হামিদের ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে টার্কপ্রেস, আনাদুল অ্যাজেন্সিসহ বিভিন্ন তুর্কি মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। ছবিসংগ্রহ ও ভাষান্তর করা হয়েছে টার্কপ্রেস থেকে।


[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.