উপসাগরীয়রা ওয়াসরাওতে তাদের শত্রুর খোঁজ পেয়েছে?!


আব্দুল্লাহ আল-আমাদি, আল জাজিরা:
যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পো এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা জন বল্টনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অ্যাজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নে যথাসম্ভব বেশি বৈশ্বিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়।
ওয়াশিংটন যেসকল অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তন্মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইরানকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের খনিসমূহের আশেপাশে তাদের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা দৃঢ়করণ, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত মিত্র ইসরায়েলের সাথে আরব বিশ্বের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে ইসরায়েলের নিরাপত্তা জোরদার করা ইত্যাদি।
ইরানের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা দেখে বিস্মিত হওয়ার কিংবা হচকচিয়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই, কারণ এটি তাদের অনেক পুরনো কৌশল বা স্ট্রাটেজি, যা কারো কাছেই গোপন নয়। অনুরূপভাবে আরবদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতিনিয়াহুর প্রচেষ্টাও বিস্ময়কর কোন কিছু নয়।
কিন্তু গত সপ্তাহে ওয়ারসাওতে অনুষ্ঠিত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিষয়ক সম্মেলনে যে বিষয়টি আসলেই বিস্ময়কর, সেটা হচ্ছে দখলদার ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের তাড়াহুড়া।
মিসর, সিরিয়া, জর্দান প্রভৃতি দেশ কেন এতো তাড়াহুড়ো করছে ইসরায়েলের নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে, সেটা উপলব্ধি করার জন্য অনেক চিন্তা-ভাবনা দরকার। কারণ প্রকাশ্যে এরকম আগ্রহসহকারে নৈকট্য অর্জনের পিছনে কোন যৌক্তিক কারণ খোঁজে পাওয়া যায় না, যেখানে দীর্ঘদিন তাদের সম্পর্ক ছিল একেবারে গোপনীয়।
ওয়াশিংটন ভালো করেই উপসাগরীয় অঞ্চলে তার স্বার্থ সম্পর্কে জানে, এমনকি সে উপসাগরের কাছাকাছি থাকতে চায়। যদিও পুরো বিশ্ব জুড়ে ওয়াশিংটনের স্বার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু উপসাগরে যে পদ্ধতিতে স্বার্থ আদায় করে, অন্য কোথাও সেভাবে করে না।
হ্যাঁ, ওয়াশিংটনের পক্ষে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই স্বার্থ হাসিল করা সম্ভব, এর জন্য এ অঞ্চলের দেশসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করা কিংবা এক দেশের বিরুদ্ধে আরেক দেশকে উসকিয়ে দেওয়ার দরকার হবে না।
কিন্তু ওয়ারসাওতে যা হয়ে গেলো, সেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পর্ক স্থাপনের মৌলিক নিয়ম-নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ এখানে ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অন্যান্য দেশসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছে, তার সাথে ছিল তার মিত্র ইসরায়েল। এমনকি ইরানকে এ অঞ্চলে শান্তি স্থাপনের পয়লা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেই সাথে ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যে সকল উদ্যোগ নেওয়া হবে, সেগুলোকেও বৈধতা দিতে চেয়েছে, চাই সেটা আমেরিকা কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ হোক, কিংবা নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ হোক।
কিন্তু মার্কিন পক্ষের তুলনায় ইউরোপীয় পক্ষ এক্ষেত্রে অধিক সতর্ক, বিচক্ষণ ও আগ্রহী ছিল। ইউরোপীয়দের লক্ষ্য অনেক গভীরে। তাদের কার্যক্রম মার্কিনদের দ্রুতগতির কার্যক্রমের তুলনায় অনেক বেশি শান্ত-শিষ্ট।
সম্মেলনটির দুর্বলতা হলো আমেরিকানরা তাদের প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি, পাশাপাশি নেতিনিয়াহুর উপস্থিতি সেখানে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে পড়েছিল। নেতিনিয়াহু সাহেব কেবল ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্যই উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি সম্মেলনের উপস্থিত কারো সাথে কিংবা সেখানে উপস্থি গণমাধ্যমের সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি।
আমরা যদি আরেক বার সম্মেলনের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী দৃশ্যে ফিরে যাই, অর্থাৎ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে উপসাগরীয়দের তাড়াহুড়োর বিষয়ে ফিরে যাই, তাহলে অবশ্যই বুঝতে পারি নেতিনিয়াহু এটা নিয়ে গর্ব করবেন এবং এটাকে নিজের সাফল্য হিসেবে গণ্য করবেন। প্রকাশ্যে উপসাগরীয় নেতাদের সাথে ঘোষণা করার মাধ্যমে এবং বাণিজ্যিক, আকাশ যোগাযোগ ও অন্যান্য বিষয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ঘোষণার মাধ্যমে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো ফিলিস্তিনিদের সাথে পরবর্তী ঝামেলাসমূহে ইসরায়েল আরো শক্তিশালী হবে, এবং মার্কিন শতাব্দির সেরা বন্দোবস্ত ঘোষণার পথ সুগম হবে, এটি ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার, সেটা খুব শিগগিরই সম্পন্ন হবে।
 এসকল অর্জনের ভিত্তিতে বলা যায় এ সম্মেলনে ফায়দা হাসিলকারী একমাত্র পক্ষ হচ্ছে ইসরায়েল। এটাকে শুধুমাত্র নেতিনিয়াহুর সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে, কারণ এই মুহূর্তে আমরা চিন্তা করছি ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য তাড়াহুড়োকারীরা আসলে ঠিক কী অর্জন করলেন, বা তাদের পক্ষে ঠিক কী অর্জন করা সম্ভব হবে। অথচ এই সময়টাতে উপসাগরীয়দর জন্য ওয়ারসাওয়ে হাজিরা দেওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি ছিল উপসাগরীয় কোন দেশের রাজধানীতে ইরানের সাথে বৈঠকে বসে পারস্পরিক সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা এ ধরনের কোন মধ্যস্থ বা পর্যবেক্ষকে উপস্থিতি ছাড়াই।
এ অঞ্চলে ইরানের ভৌগলিক গুরুত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, বরং যেটা পরিবর্তন করা সম্ভব এবং পরিবর্তন করা দরকারও, সেটা হলো ইরানের সাথে সম্পর্কের ধরন এব আচরণের পদ্ধতি পরিবর্তন করা।
ইরানকে আলোচনা-সংলাপের বিদ্যাপীঠ হিসেবে তুলনা করা যায়, কারণ ইরানের সাথে আলোচনা করে ধোঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই, যেমনটা উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার সাথে সম্ভাবনা আছে। আর গত তিন দশকে আরব সাগরে তারা যা কিছু্ অর্জন করেছে, সেটা এ অঞ্চলের মূল নিয়ন্তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের বিচক্ষণতা ও ধীরস্থিরতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। আর তারা প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে, চাই সেটা উপসাগরে হোক, কিংবা অন্য কোন অঞ্চলে হোক। যেখানে কিনা অনেকগুলো দেশ তাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো, কৌশলের অভাব আর বৈদেশিক শক্তিসমূহের উপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
কখন উপসাগরীয়দের নিজস্ব আঞ্চলিক নীতি তৈরি হবে, যাতে হাজার হাজার মাইল দূরের কারো স্বার্থের উপর উপসাগরীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে? উপসাগরীয়দের নিজেদের শত্রু চেনার সময় কী হয়েছে? তারা কি নিজেদের শত্রুকে নিজেরাই চিনতে পারছে, যাকে বাইরের কেউ চিনবে না?
উপরের প্রশ্নগুলো নিছক কোন প্রত্যাশা নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে এগুলোর প্রতি নজর দেওয়া খুবই জরুরি। বিদেশী মার্কিনদের দ্বারা আরো বেশি ভয়-ভীতির মুখোমুখি হওয়ার পূর্বেই এটা বেশি জরুরি, এবং মার্কিনিদের পাশাপাশি হয়তো আরো বেশি বিদেশি ইসরায়েলের ভয়-ভীতিরও মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে!
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা আরবির অনলাইন সংস্করণে هل اكتشف الخليجيون عدوهم في وارسو؟ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত।

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.