মার্চ 2019


আইজেমা ওলুও, দ্য গার্ডিয়ান:
ভেবেচিন্তে কীভাবে বর্ণ নিয়ে কথা বলতে হয় পুরো দিন ধরে সে বিষয়ে কর্মশালা পরিচালনা করে দিন শেষে আমি একটি বাণিজ্যিক কার্যালয় থেকে বের হচ্ছিলাম। এর আগে আমি অনেকগুলো কর্মশালায় যেরকমটা দেখেছি, এ দিনের সেশনসমূহের দর্শকরাও একই রকম ছিলেন। সেখানে অশ্বেতাঙ্গদেরকে বাড়িয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছিল, এবং সাদা কর্মীদের কম করে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। অশ্বেতাঙ্গ অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত আমার সাথে চোখে চোখে যোগাযোগ করছিলেন, আমিও সাড়া দিচ্ছিলাম তাদের মুখে আমি মাঝে-মধ্যে “তাই তো, তাই তো” জাতীয় শব্দ শুনছিলাম তবে কখনোই প্রশ্ন কিংবা কোন মন্তব্য করার জন্য প্রথমে হাত তুলছিলেন না। এদিকে শ্বেতাঙ্গরা সব সময় তাদের মতামত আমাদের সামনে পেশ করতে বেশ আগ্রহী ছিলেন। এধরনের সেশনে আমি শ্বেতাঙ্গদের জোর কণ্ঠস্বরকে সমন্বয় করার পাশাপাশি সাধারণত ঠিক পথে এগুচ্ছি কি না সেটা নিশ্চিত করার জন্য অশ্বেতাঙ্গদের নীরব প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করি।
সভাকক্ষে প্রবেশ পথে একজন এশীয় মহিলার সাথে আমার চোখাচোখি হলো, তিনি বললেন, “ধন্যবাদ।” একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ আমার কাঁধ চাপড়ে বললেন, “মেয়ে, তুমি যদি জানতে!” আরেক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা আমাকে থামিয়ে চারদিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে নিশ্চিত হলেন যে কেউ শুনতে পাচ্ছে কি না, তারপর বললেন, “তুমি সত্য কথা বলেছ। আমার ইচ্ছা হচ্ছে আমি যদি আমার গল্প তোমার সাথে আলোচনা করতে পারতাম, তাহলে তুমি বুঝতে পারতে যে তুমি কতখানি সত্য। কিন্তু এসব আলোচনার জন্য এটা সঠিক জায়গা নয়।”
সেটা সঠিক জায়গা ছিল না। এসব সেশনে অশ্বেতাঙ্গদের দিকে মনযোগ দেওয়ার জন্য এবং তাদেরকে নিরাপদ রাখার জন্য আমি যত্নশীল হওয়া সত্ত্বেও সেটা সঠিক জায়গা ছিল না। আবারো, অশ্বেতাঙ্গদের সত্যিকারের বিপদের আলোচনা শ্বেতাঙ্গদের অনুভূতি সম্পর্কে, তাদের প্রত্যাশ্যা সম্পর্কে, তাদের চাহিদা সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে চুপসে গেছে।
যেহেতু আমি সেখানে দাঁড়িয়ে বর্ণ সম্পর্কে শত শত কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া কথোপকথনের স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম, এক সাদা মহিলা আমার মনযোগ ফেরালেন। আশেপাশের কেউ তার কথা শুনে ফেলছে কি না, সেটা নিয়ে তিনি মোটেও চিন্তিত ছিলেন না। আমার হাতে তার সাথে কথা বলার সময় আছে কি না, সেটাও তিনি আমাকে জিজ্ঞাস করছিলেন না, যদিও আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
“তোমার আলোচনা আসলেই চমৎকার হয়েছে,” তিনি তার কথা শুরু করলেন। “তুমি অনেক ভালো ভালো কথা বলেছ, যেগুলো প্রচুর মানুষের জন্য উপকারী হবে।”
তিনি একটু থামলেন, এরপর আবার বললেন, “কিন্তু বিষয় হলো, তুমি আজ এমন কিছুই বলো নি, যে আরো বেশি কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধু বানাতে আমকে সহযোগিতা করবে।”
একেবারে শুরুর দিকে বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনায় আমি যোগদান করেছিলাম, এমন একটি প্যানেলের কথা মনে পড়লো। সিয়াটল শহরে (ওয়াশিংটন রাজ্যের একটি শহর) একজন কালো লোককে এক নিরাপত্তারক্ষী পিপার স্প্রে করেছে, তার অপরাধ শুধু এতোটুকু ছিল যে তিনি একটি শপিং সেন্টারের দিকে হাটছিলেন। ঘটনাক্রমে সেটা ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল। একদল কালো লেখক-অ্যাক্টিভিস্ট এদের মধ্যে আমিও ছিলাম সিয়াটলের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের সামনে সে ঘটনা নিয়ে কথা বলছিলাম। আমার সাথে থাকা প্যানেলিস্ট চার্লস মুডেড, যিনি একাধারে একাধারে একজন মেধাবী লেখক, ফিল্ম মেকার এবং অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক, কর্মক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পদ্ধতির কথা উল্লেখ করে বলছিলেন: এই নিরাপত্তারক্ষীকে বলে দেওয়া হয়েছে যে তার দায়িত্ব হলো তার নিয়োগকর্তার লাভ করার সক্ষমতাকে রক্ষা করা। তাকে বলা হয়েছে যে তার দায়িত্ব হলো শুধু সেসকল ক্রেতাদেরকে রাখা, যাদের সুখে স্বাচ্ছন্দে ও নিরাপদে ব্যয় করার মতো টাকা আছে। আর কার টাকা আছে কার টাকা নাই, কে সহিংস, কে সহিংস নয়, সে সম্পর্কে প্রতিদিন তাকে সাংস্কৃতিক বার্তা গেলানো হচ্ছে। চার্লস যুক্তি দেখান যে নিরাপত্তারক্ষী শুধুমাত্র তার দায়িত্ব পালন করেছিল। একটি শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, আপনার কাজটি ঠিক এরকমই দেখায়।
যাক, তিনি অন্তত এই অবস্থানে যুক্তি দাঁড় করার চেষ্টা করছিলেন। কারণ মাঝপথে এক সাদা মহিলা দাঁড়িয়ে তাকে আটকালেন।
 “দেখ, আমি নিশ্চিত যে তুমি এসকল স্টাফ সম্পর্কে প্রচুর জানো।” সে মহিলা কোমরের উপর হাত রেখে বলছিলেন, “কিন্তু আমি এখানে অর্থনীতির পাঠ শেখার জন্য আসি নি। আমি এসেছি কারণ এই লোকটির প্রতি যা ঘটেছে, সেটাতে আমার খারাপ লেগেছে এবং আমি জানতে চাই যে এখন কী করার আছে।”
হয়তো, সেই আলোচনা কক্ষও সঠিক জায়গা ছিল না। সেই মহিলার কথা অনুসারে, উপরের এলাচনা হওয়া উচিত হয় নি, পিপার স্প্রে দ্বারা যাকে আক্রমণ করা হয়েছে তার অনুভূতি অথবা আরো বৃহদাকারে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের অনুভূতি আলোচনা করাটা যথোপযুক্ত ছিল না। যদিও আমরা নিজেরা নিজেদের শহরে কতটা অনিরাপাদ, সে আলোচনা সেটারই প্রমাণ ছিল মাত্র। সেই মহিলার খারাপ লেগেছে এবং তিনি তার খারাপ লাগা বন্ধ করতে চান। আর তিনি আমাদের নিকট প্রত্যাশা করেন আমরা কার সেই খারাপ লাগা বন্ধ করে দেব।
গত মাসে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আলোচনা করছিলাম প্রকাশনার ‘শ্বেত ধোলাই’ সম্পর্কে, এবং অশ্বেতাঙ্গদের আরো বেশি ছাকনিবিহীন (অর্থাৎ কোন ধরনের কাট-ছাট ব্যাতিরেখে) আখ্যানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে, একজন সাদা ভদ্রলোক বেশ জোর গলায় বললেন, আমরা (কৃষ্ণাঙ্গরা) যদি নিজেদেরকে আরো সহজবোধ না করি, তাহলে শ্বেতাঙ্গদের পক্ষে আমাদেরকে বোঝার কোন উপায় নেই। আমি যখন তাকে জিজ্ঞাস করলাম, শুধুমাত্র নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য অশ্বেতাঙ্গরা শ্বেত সংস্কৃতির সকল উপাদানের সাথে নিজেদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে কি না, তখন তিনি মাথা ঝাঁকালেন এবং তার নোটবুকের দিকে তাকালেন। গত সপ্তাহে আমার পরিচালিত একটি কর্মশালায় এক সাদা মহিলা সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন আমেরিকার অশ্বেতাঙ্গরা বর্ণ সম্পর্কে সম্ভবত অতি মাত্রায় সংবেদনশীল। তিনি কীভাবে জানতে সক্ষম হবেন, যদি আমরা তার প্রশ্নে সব সময় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি।
অসংখ্য বার আমি এ রকমের বাধা এবং উত্তরের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এমনকি যখন পোস্টারে আমার নাম লেখা থাকে, তখনো সেসকল জায়গাকে আমি এবং আমার মতো অশ্বেতাঙ্গ লোকজন যেসকল বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন মনে করি সেকল কথার জন্য সঠিক জায়গা বলে মনে হয় না। সুতরাং প্রায়ই কোন বিষয়ে আলোচনা হবে, তারা কী শুনবে, কী জানবে, সেটা সম্পর্কে শ্বেতাঙ্গ উপস্থিতিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এবং এটা তাদের জায়গা, সব জায়গাই তো তাদের।
একদিন, হতাশা হয়ে, আমি সামাজিক মাধ্যমে এই স্ট্যাটাস পোস্ট করি:
 “যদি তোমার বর্ণবাদ বিরোধী কাজে শ্বেত আমেরিকার ‘প্রবৃদ্ধি’ এবং ‘আলোকোদ্ভাসিত দিক’ অশ্বেতাঙ্গদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মানবতার উপর প্রাধান্য পায়, তাহলে এটি বর্ণবাদ বিরোধী কাজ নয়। এটি বরং শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী কাজের অংশ।”
শ্বেতাঙ্গদের নিকট প্রাপ্ত একেবারে শুরুর দিকের মন্তব্যগুলোর একটি ছিল: “ঠিক আছে, কিন্তু কোন কিছু না হওয়ার চেয়ে এটা কি ভালো নয়?”
আসলই কি তাই? সামান্য মুছে ফেলা অনেক বেশি মুছে ফেলার চেয়ে ভালো নাকি? বর্ণবাদ বিরোধী কাজের ফাঁকে সামান্য শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদ কোন বর্ণবাদ বিরোধী কাজই না হওয়ার চেয়ে ভালো? আমেরিকায় জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমি যখনই দাঁড়াই, আমি জানি যে আমার সামনে প্রচুর শ্বেতাঙ্গ আছে, যারা এখানে এসেছে বর্ণবৈষম্য ও সহিংসতার খবর পড়ে একটু কম খারাপ লাগার জন্য, সবাইকে একথা জানানোর জন্য যে তারা অন্যদের মতো নয়, আরো কালো বন্ধু বানানোর জন্য। এসবই তাদের উপস্থিতির উদ্দেশ্য। আমি জানি আমি এমন প্রচুর শ্বেতাঙ্গের সামনে কথা বলছি, যারা মনে করে তারা সমস্যার অংশ নয়, যেহেতু তারা এখানে উপস্থিত হয়েছে।
শুধু একটি বার আমি এমন একদল শ্বেতাঙ্গের সামনে কথা বলতে চাই, যারা জানে যে তারা এখানে এসেছে কারণ তারা এই সমস্যার অংশ। যারা জানে যে তারা এখানে এসেছে, যাতে তারা কোন কোন জায়গায় ভুল করছে, ক্ষতিকর কাজ করছে সেটা জেনে আরো ভালো কাজ করতে শুরু করতে সক্ষম হয়। কারণ শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদ তাদেরই গড়া, এটি থেকে তারা উপকৃত হয়েছে, এবং এটি ধ্বংস করা তাদেরই দায়িত্ব।
আমি এবং আরো অনেক অশ্বেতাঙ্গ অংশগ্রহণকারী প্রায়ই ক্লান্ত এবং হতাশ হয়ে এসব আলোচনা বাদ দিয়ে দিই, তবে আমি এখনও সবাইকে স্পষ্ট করে বাস্তব অবস্থা দেখাই এবং কথা বলি। আমি বাস্তব অবস্থা দেখিয়ে দিতে থাকি এই আশায় যে, হয়তো এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত অচলায়তন ভাঙবে, অথবা আমাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যেটা আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের আরো কাছাকাছি। আমি সেসকল কৃষ্ণাঙ্গের জন্য কথা বলি, যারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারে না, যাতে করে তাদেরকে সবাই দেখতে পায়, শুনতে পায়। আমি কথা বলি, কারণ এই কক্ষে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যাদের শুনা দরকার যে বর্ণবাদী নিপীড়নের বোঁঝা তাদের বহন করা উচিত নয়, যেখানে এই নিপীড়ন থেকে যারা উপকৃত হয়, তারা প্রত্যাশা করে যে বর্ণবাদ বিরোধী প্রচেষ্টায় প্রথমে তাদের চাহিদা পূর্ণ করা হবে। আমার একেবারে সাম্প্রতিক আলোচনার পর, এক কালো মহিলা আমার নিকট একটি নোট পাঠান যেখানে তিনি লিখেছিলেন যে বর্ণবাদ তার জীবনে কী রকম প্রভাব ফেলছে তিনি কখনোই তার শ্বেত সহকর্মীদের নিকট থেকে প্রতিশোধের ঝুঁকি ছাড়া সেটা খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন না। “আমি বাড়িতে নীরব থেকেই আরোগ্য লাভ করি,” এভাবেই তিনি তার কথা শেষ করেন।
এটা কি কোন কিছু না হওয়া থেকে উত্তম? নাকি বাস্তবতা এই যে ২০১৯ সালেও প্রতিদিন নিজেকে সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রশ্নটি করতে হচ্ছে যে
________________________________

নিবন্ধটি দ্য গার্ডিয়ানে “Confronting racism is not about the needs and feelings of white people শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত, দ্য গার্ডিয়ান থেকে ছবি সংগৃহীত।



হিলাল কাপলান, ডেইলি সাবাহ:
তুর্কি দৈনিক সাবাহ পত্রিকায় ডিসেম্বরে লেখা আমার একটি কলামের শিরোনাম ছিল এরকমই। সে কলামের শুরুটা হয়েছিলো: “একেবারে ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে একটি নাৎসী আন্দোলন বেড়ে উঠছে। তারা শুধু সক্রিয়ই নয়, বরং কল্পনার চেয়েও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। যে কোন মুহূর্তে পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে তারা প্রস্তুত।”
দুর্ভাগ্যবশত মাত্র আমার এই নিবন্ধ লেখার মাত্র তিন মাস পর নিউজিল্যান্ড তার সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার সাক্ষী হলো, যেখানে একজন সন্ত্রাসী ৫০ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে এবং পুরো ঘটনাটি লাইভ করেছে।
ঘাতক তার “ম্যানিফেস্টো”তে নিজেকে ক্রুসেডার হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। এবং এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে ঘাতক তার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে মুসলমানদেরকে হত্যাকারী ক্রুসেডার কমান্ডারদেরকে।
যদিও নিউজিল্যান্ড সরকার এবং বিশেষত প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডের্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি চমৎকারভাবে তাদের সমালোচনা ব্যক্ত করেছেন, তবে এখন পর্যন্ত তারা ঘাতকের প্রেক্ষাপটের উপর আলোকপাত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এমনকি যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ধরে ঘাতক ইতোপূর্বে পরিভ্রমণ করেছে, সে সূত্রেও তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে, কিন্তু নিউজিল্যান্ডবাসী দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের বাঁচাতে এ ধরনের ঘটনায় “একাকী নেকড়ে” (অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন ঘটনা) তত্ত্বকে তাদের যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
যাই হোক, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর সেবাস্টাইন কুর্জ একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন, যা ইতোমধ্যেই জানা হয়ে গেছে, সেখানে তিনি বলেন: “এখন আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে নিউজিল্যান্ডের হামলাকারী এবঙ অস্ট্রেলিয়ার আইডেন্টিটেরিয়ান (ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী আন্দোলন) আন্দোলনের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং যোগাযোগ বিদ্যমান রয়েছে।”
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিবৃতি অনুসারে, গত নভেম্বরে হামলাকারী অস্ট্রিয়া সফর করে এবং অভিবাসন বিরোধী আইডেন্টিটেরিয়ান আন্দোলনে ১,৫০০ ইউরো দান করে।
 “নব্য ক্রুসেডার” শিরোনামে আমার নিবন্ধে আমি জেনারেশন আইডেন্টিটি আন্দোলন সম্পর্কে আমি বর্ণনা করেছিলাম: “এই গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রস্তাবনা হচ্ছে গ্রেট রিপ্লেসমেন্টর তথাকথিত তাত্ত্বিক ধারণা। এ মতবাদ অনুসারে যারা ইউরোপে অভিবাসী হয়েছে, কত প্রজন্ম ধরে তারা ইউরোপে বসবাস করেছেন তা বিবেচনা না করেই, তাদেরকে অবশ্যই তাদের আদি ভূমিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর কারণ তাদের মতে ইউরোপ শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিষ্টানদের জন্য। মুসলিম, ইহুদি, শিখ কিংবা অন্য কোন বিশ্বাস অথবা জাতির কোন জায়গা ইউরোপে নেই।”
নিউজিল্যান্ডের গণহত্যারি মেনিফেস্টোর দিকে তাকালে কাকতালীয়ভাবে দেখতে পাবেন, সেটার শিরোনাম হচ্ছে: “গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট”! জেনারেশন আইডেন্টিটি আন্দোলনটি মাত্র পাঁচ বছর আগে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্দোলনটি ইতোমধ্যে পুরো ইউরোপ জুড়ে নিজেদেরকে বড় আকারে সংগঠিত করেছে। ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়া থেকে শুরু করে জার্মানি পর্যন্ত এটি বিস্তার লাভ করেছে এবং ইতালিতেও এটি শিকড় প্রোথিত করেছে।
জরিপ অনুসারে, ফ্রান্সের প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন মারিন লে পেনকে সমর্থন করে। কট্টর ডানপন্থী ইউকেআইপির সাবেক নেতা নিগেল ফারাগ বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, “ইউকেআইপি ধর্মীয় ক্রুসেড লড়া দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।” ফলস্বরূপ তাকে তার অবস্থান থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।
কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান হচ্ছে দিন দিন। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা দেখতে পাচ্ছি কট্টর ডানপন্থা মূলধারার দলগুলোতে সমর্থন পাচ্ছে। কিন্তু আগামী দশ বছরে এমনটা ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন নয় যে এসকল ক্যাম্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাজারো তরুণ অনেকগুলো সংগঠিত দলের সাথে সমবেত হবে এবং রাস্তায় নেমে পড়বে।
একুশ শতকের মুসলিমরা তাদের নিজেদের এলাকায় সবচেয়ে কষ্টদায়ক সময়ের সাক্ষী হচ্ছে, এবং দুর্ভাগ্যবশত এ পরিস্থিতি কেবলই বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
________________________________

নিবন্ধটি তুর্কি দৈনিক ডেইলি সাবাহর ইংরেজি সংস্করণে “Neo-Crusaders of Europeশিরোনামে প্রকাশিত। 



জি ভেরফস্টাড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
বিনিয়োগ মূলধন এবং আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তি খোঁজার ক্ষেত্রে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবসময় ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের সার্বিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে না বিশেষত চীনের সাথে যেকোন বিষয়ে এটি আরো বেশি হয়ে থাকে যদিও একতরফাভাবে চীনের সাথে এরকম সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদেরকে এবং বাদবাকি পুরো ইউরোপকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়
একথা সত্যি যে চীনের বিষয়ে ইউরোপের সাধারণ অবস্থা এখনো একেবারেই সীমাবদ্ধ অনিঃশেষ ব্রেক্সিট নাটকের বিভ্রান্তি এবং বিগ টেকের কারণে আরোপিত বিপদসমূহের কারণে ইইউ নেতারা অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এখনো পাচ্ছেন না তা সত্ত্বেও, এপ্রিলের ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে এই মাসে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে চীনের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা তাদের একটি সাধারণ অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, সেখানে তারা চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (বিআরআই) সমর্থন করার বিষয়ে ইতালি সরকারের সিদ্ধান্তের ঝুঁকির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন
এই সতর্কতা আসলে কোন গুরুত্ব পায়নি তার পরের দিনই ইতালির লোকরঞ্জনবাদী জোট সরকার চীনা প্রেসিডেন্ট জিকে রোমে স্বাগত জানায় এবং চীনের সাথে একটি সমোঝতা স্মারক স্বাক্ষর করে কার্যত বাদবাকি ইইউর সাথে ভিন্নমত সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করেই দুঃথজনক বিষয় হলো, একতরফাভাবে ইতালি যে বিআরআইতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা চীনের বিপরীতে শুধু ইইউর সামষ্টিক প্রভাবকেই ক্ষুণ্ন করবে না, বরং এর ফলে ইতালির জনগণও ক্ষতিগ্রস্থ হবে
চীনের নেতৃত্বাধীন অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে স্বাক্ষরকারী প্রথম ইইউ সদস্য দেশ ইতালি নয়; তবে ইতালিই সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় অর্থনীতি প্রথম জি- সদস্য দেশ বিষয়ে খুব কম সন্দেহ আছে যে ইতালি সরকারের পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট জি অভ্যুত্থান এবং ইউরোপের বিপদের প্রতিনিধিত্ব করে সর্বোপরি বিআরআই মানবজাতির কল্যাণার্থে গৃহীত কোন দাতব্য উদ্যোগ নয় স্পষ্টতই এটি একটি বিদেশ-নীতি প্রকল্প, যা বিশ্বব্যাপী চীনের অর্থনৈতিক ভূকৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সতর্কবাণী অনুসারে বলা যায়, ইতালি সরকার ইতালির জনগণের কোন উপকার নিশ্চিত না করেই চীনেরপ্রতারণামূলক বিনিয়োগ পদ্ধতিকে বৈধতা প্রদানকরার পথে আছে
জি মার্চ ২২-২৪ তারিখের সফরের সময়টা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় সম্প্রতি ব্রেক্সিটের সময়সীমা বৃদ্ধি করার পূর্বে ২৯ মার্চে যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার কথা ছিল ব্রেক্সিট এবং মে মাসে আসন্ন ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ইউরোপীয় নেতার পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আছেন ইউরোপীয় সরকারগুলোর নিকট থেকে চীনা বিনিয়োগের (বলা যায়, যা মূলত উচ্চ শর্তসাপেক্ষ ঋণ) প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না
সৌভাগ্যবশত ইতালি সরকারের অজ্ঞতাসুলভ আচরণের বিপরীতে ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট জি সাথে তার বৈঠকে জার্মান চ্যান্সেলল অ্যাঙ্গেলা মার্কেল এবং ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট জিন-ক্লাউড জাংকারকে সংযুক্ত করেছিলেন অন্যান্য দূরদর্শী চিন্তাসম্পন্ন ইউরোপীয় নেতাদের মতোই তিনি স্বীকার করেছেন যে চীন, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে ইউরোপ সম্মানের সাথে টিকে থাকতে পারবে শুধুমাত্র যদি ইউরোপের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়
এখনো, ইইউ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট কৌশল না থাকলে, ইউরোপ পরাশক্তিদের ভাগ-করো-জয়-করো কৌশলের নিকট অরক্ষিতই থেকে যাবে, এবং ইউরোপীয়রা বঞ্চিত হবে একটি সামষ্টিক কণ্ঠস্বর থেকে, যেটি কিনা তাদের স্বার্থ দেখাশুনা করবে রাশিয়া যেমন নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যম্যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একের বিরুদ্ধে অপরকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে, চীনও তেমনি যত বেশি সম্ভব ইউরোপীয় দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার চেষ্টা করবে এরকম আলোচনার ক্ষেত্রে চীনই সবসময় ভালো অবস্থানে থাকবে
ইইউ কমিশনার গুন্থার ওটিঙ্গার প্রস্তাবিত একটি সম্ভাব্য সমাধান হচ্ছে ইইউতে যে কোন ধরনের চীনা বিনিয়োগের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কমিশনে ভেটো দেওয়া এই ধারণাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আলাদাভাবে ইইউ সদস্য দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তসমূহ বাকি ইউরোপকে নিরাপত্তা অর্থনীতিবিষয়ক জটিলতায় ফেলে দিতে পারে তাছাড়াও জাতীয় সরকারগুলোর নিজস্ব পদ্ধতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য ইইউর প্রচেষ্টাকে ব্যহত করতে পারে
একটি শক্তিশালী ইইউ-চীন সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্যই ভালো রকমের লাভজনক হতে পারে ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে একটি ইইউ-চীন বিনিয়োগ চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়াটা ইতিবাচকতার স্বাক্ষর হতে পারে। এরকম একটি সমোঝতা হয়তো ইউরোপীয় সংস্থাগুলোর জন্য চীনের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের বাঁধাসমূহ দূর করে এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগকারীদের বিপক্ষে বৈষম্য হ্রাস করে অনেক নতুন নতুন দরজা খোলে দেবে। কিন্তু একইভাবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে ইউরোপের একটি সাধারণ পদ্ধতি থাকা দরকার, যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়, বিশেষত ৫জি যন্ত্রপাতির (যেগুলোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হচ্ছে চীনের হুওয়াওয়ে) বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষী চীন কর্তৃক আরোপিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইইউ খুবই ধীর গতিতে সচেতন হচ্ছে কিন্তু আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে এখনো আমরা একটি ইউরো-চীন সম্পর্ক বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবো, যে সম্পর্কটি ভবিষ্যতে আমাদের সকলের স্বার্থ রক্ষা করবে
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “Europe MustUnite on China” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখক বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অ্যালায়েন্স অব লিবারেলস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস ফর ইউরোপ গ্রুপ (এএলডিই)’র প্রেসিডেন্ট এবং Europe’s Last Chance: Why the European States Must Form a More Perfect Union গ্রন্থের লেখক।

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.