ট্রাম্প হারলে কিংবা বরখাস্ত হলে হোয়াইট হাউস ছাড়বেন তো!



মেহদি হাসান, দ্য ইন্টারসেপ্ট:
একটা প্রশ্ন কয়েক মাস থেকে আমাকে ভাবাচ্ছে, ট্রাম্প ২০২০ সালের নভেম্বরে যদি পরাজিত হন, অথবা তার আগে অভিশংসনের মুখোমুখি হন, কিন্তু গদি ছাড়তে অস্বীকার করেন, তাহলে কী হবে?
গত সপ্তাহে আমরা আবিষ্কার করলাম যে এই প্রশ্নটি ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবীকেও ভাবাচ্ছে। মাইকেল কোহেন সাহেব হাউস অভারসাইট কমিটিতে তার সমাপনী মন্তব্যে অপ্রত্যাশিত এই বিষয়টি সামনে আনেন: “আমি আশঙ্কা করছি, যদি তিনি (ট্রাম্প) ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে যান, তাহলে কখনোই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হবে না। আর এ কারণেই আমি আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।”
একটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার, সেই ১৮০১ সালে প্রথম এক দল থেকে আরেক দলের হাতে ক্ষমতার হাতবদলের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে সবসময়ই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর বিপরীত কোন নজির নেই। এক্ষেত্রে ১৮৭৭ সালের বিষয়টি স্মরণ করা যেতে পারে, এবং অবশ্যই ২০০০ সালের জর্জ ডব্ল্যু বুশ বনাম আল গোরের বিষয়টিও স্মরণীয়, সবসময়ই নির্ধারিত প্রক্রিয়া ঠিকটাক মতো কাজ করেছে। এমনকি রিচার্ড নিক্সনের কথাও যদি বলা হয়, যার সাথে ট্রাম্পকে প্রায়ই তুলনা করা হয়, ডেমক্র্যাটদের তরফ থেকে ভোট কারচুপির অসংখ্য অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল, তা সত্ত্বেও পরাজিত হওয়ার পর তিনি জন এফ. কেনেডিকে মেনে নিয়েছিলেন। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে বলেছিলেন, “আমাদের ক্যাম্পেইন যত কঠিনই হোক না কেন, নির্বাচনের ফলাফল যত কাছাকাছিই হোক না কেন, যারা পরাজিতে হয়, তারা রায় মেনে নেয়, এবং যারা বিজয়ী হয়েছে তাদেরকে সহযোগিতা করে।১৯৮১ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের নিকট “নিয়মানুসারে কর্তৃত্ব হস্তান্তর” করা যুক্তরাষ্ট্রে একটি অলৌকিক বিষয়ই ছিল, বলা চলে।
যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ তম রাষ্ট্রপতি এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক, আইনী অথবা সাংবিধানিক কোন নিয়ম-কানুনের প্রতি তার কোন ভ্রুক্ষেপ নাই; তার এক মাত্র চিন্তা হলো সব কিছুর বিনিময়ে হলেও বিজয়ী হওয়া, জিতে আসা। ২০১৬ সালে যখন তিনি নির্বাচনী দৌড়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফলাফল যাই হোক সেটা মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করতে তিনি অস্বীকার করেন। বিজয়ের পরও তিনি ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেন, “যদি মিলিয়ন মিলিয়ন অবৈধ ভোটের হিসাব বাদ দেওয়া হয় তাহলে আমি কিন্তু পপুলার ভোটেও জিতেছি।”  ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি হাস্যকরভাবে দাবি করেন যে, রিবাপব্লিকানরা হেরেছে “সম্ভাব্য অবৈধ ভোটসমূহের” কারণে, অনেকেই তাদের পোশাক পরিবর্তন করে একাধিকবার ভোট দিয়েছে, এবং ফ্লোরিডার সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে ডেমক্র্যাটরা “চুরির” চেষ্টা করেছে বলে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করেন তিনি।
ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যে সূচনা করেছেন। একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আইন, প্রথা ও নিয়ম-কানুন লঙ্ঘন করেছেন, তিনি যে সংবিধানের আর্টিকেল ২, সেকশন ১ এর প্রতি একই আচরণ করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? (যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত বিধি-বিধান আছে-অনুবাদক)
এই দৃশ্যটি কল্পনা করুন: ৩ নভেম্বর, ২০২০ সালের সকালে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে ট্রাম্প ডেমক্র্যাটিক প্রার্থীর (সে যেই হোক) নিকট পপুলার এবং ইলেক্টরাল কলেজ ভোট, উভয়টিতে হেরে গেছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী প্রার্থীকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে বরং তার সমর্থকদের সমাবেশে অংশ নিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে বসলেন, এবং জনতার উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা যা দেখছ, এবং যা পড়ছ, বাস্তবে তা হয়নি,” জোর গলায় বলে উঠলেন “ফেক নিউজ”, এবং দাবি করলেন যে, “মিলিয়ন মিলিয়ন” মানুষ ডেমক্র্যাটদের জন্য অবৈধভাবে ভোট দিয়েছে। তিনি একটি “ডিপ স্টেট” অভ্যুত্থানকে দোষারোপ করলেন, এবং “সহিংসতার” জন্য সতর্কতা জারি করলেন।
আপনি কি আসলেই মনে করেন, এটা সম্ভব নয়? এই সম্ভাব্য দৃশ্যকল্পটি কি আমাদেরকে ভীত করে তুলে না?
সব কিছুর পর, ইনি এমন একজন মানুষ যিনি ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর কিন্তু পপুলার ভোটে পরাজিত হওয়াটাকে মেনে নেন নি। তাহলে আমরা কীভাবে ধারণা করবো যে তিনি যে নির্বাচনে পরাজিত হবেন, সে নির্বাচনের ফলাফল তিনি মেনে নেবেন? এমনকি মঙ্গলবারেও কেলিঘ মেকইনানি, ট্রাম্পের আগামী নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের প্রেস সচিব একটা বিবৃতি টুইট করেছেন, “হতাশ ডেমক্র্যাটরা জানে, তারা ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হারাতে পারবে না... বৈধভাবে তাদের জেতার সুযোগ একেবারে শূন্য।”

কেন এই দুশ্চিন্তা

মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে অন্যায় আপত্তি তুলতে পারেন এবং পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করতে পারেন, এবং এসব করেও পার পেয়ে যাবেন বলে ধারণা করতে পারেন, এ ধারণার পিছনে অনেকগুলো কারণ আছে।
প্রথমেই তার ব্যক্তিত্বের কথা চলে আসে। ট্রাম্প একজন মারাত্মক নার্সিসিস্ট (আত্মপ্রেমী), যিনি শুধু নিজেকে গুরুত্ব দেন, সবার এবং সবকিছুর উপর নিজেকে অগ্রাধিকার দেন। মর্যাদা ও অবস্থান রক্ষার স্বার্থে নিজের প্রেসিডেনশিয়াল ক্ষমতার ব্যবহার ও অপব্যবহার করা তার কাছে “খুবই লোভনীয়” মনে হতে পারে, ইয়ালে স্কুল অব মেডিসিনের ফরেন্সিক মনোবিজ্ঞানী ও ২০১৭ সালে প্রকাশিত The Dangerous Case of Donald Trump: 27 Psychiatrists and Mental Health Experts Assess a President.বইয়ের সম্পাদক অধ্যাপক ব্যান্ডি লির উদ্ধৃতি দিয়ে এমনটা বলা যায়।
অধ্যাপক লি গতমাসে আমার পডকাস্টে বলেন, “যখন আপনি চরম পর্যায়ের “আত্মপ্রেম” (নার্সিজম)-এ ভুগবেন, তখন এটার বিপদ হলো অপমানের সম্ভাবনা দেখা দিলে খুব দ্রুত সহিংসতার আশ্রয় নিতে পারেন, চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, এমনকি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগও করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, পদ থেকে সরে গেলে তার জেল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন অবধি তিনি বিচার বিভাগ দ্বারা সুরক্ষিত আছেন। বিচার বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে, দায়িত্বরত প্রেসিডেন্ট অভিযুক্ত হতে পারেন না। বুঝতে পেরেছেন? দায়িত্বরত প্রেসিডেন্টের কথা বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্টের কথা বলা হয়নি। ট্রাম্পের সমর্থক ক্রিস ক্রিস্টি গত সপ্তাহে সিএনএনকে যেমনটা বলেছেন, নিউ ইয়র্কের দক্ষিণাঞ্চলের প্রসিকিউটররা “প্রেসিডেন্ট যখন অফিস ছাড়বেন তখন তার বিরুদ্ধে” মামলা তৈরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাহলে তিনি কেন অফিস ছাড়তে রাজি হবেন?
তৃতীয়ত, ট্রাম্পের এমন অনেক বন্ধু-বান্ধব আছেন যারা তাকে পদে বহাল থাকতে এবং লড়াই চালিয়ে যেতে জোর গলায় উৎসাহ দিবেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অভিশংসনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে ট্রাম্পের বন্ধু রোগার স্টোন জবাব দিয়েছিলেন, “আপনি দেশে তীব্র সহিংসতা দেখতে পাবেন, এবং এমন বিদ্রোহ দেখতে পাবেন, যা ইতোপূর্বে কখনোই দেখেন নি।”
২০১৭ সালের ডিসম্বরে স্টোন এবং তার সহকর্মী কট্টর-ডান ষড়যন্ত্র-তাত্ত্বিক অ্যালেক্স জনস যার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশংসা করে বলেছিলেন “চমৎকার” নিজেদের একটি ভিডিও ধারণ করেন এবং সেটি জনের ইউটিউব চ্যানেলে সেটি পোস্ট করেন, যেটি শিরোনাম ছিল: “ট্রাম্প অফিস থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরের গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রোগার স্টোন: লাইভ অটো গানফায়ার।” (Roger Stone Prepares For Civil War After Trump Is Removed From Office: LIVE AUTO GUNFIRE.)
ফক্স নিউজের ব্যাপারে কী বলবেন? আমরা জানি, কট্টর ডান ক্যাবল নেটওয়ার্ক এই রাষ্ট্রপতির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ভক্সের একটি শিরোনাম উদ্ধৃত করা যেতে পারে “ফক্স নিইজ সরকার-বন্ধ (শাট ডাউন) দাবি করলো, এবং সেটা পেলোও।” ফক্স-এর উপস্থাপকরা অভিযোগ তুলেছেন যে “ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্ব ধ্বংস” করতে “ডিপ স্টেট”  ষড়যন্ত্র হচ্ছে; তারা বলছে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে; এবং বিচার বিভাগকে “হাতকড়া পরানোর” পরামর্শ দিচ্ছে। কেন তারা ট্রাম্পের নিকট নির্বাচনের ফলাফল গ্রাহ্য না করার দাবি তুলবে না এবং তাদের দর্শকদেরকে (পরাজিত) প্রেসিডেন্টকে ফিরিয়ে আনতে বলবে না?
আমরা কি রিপাব্লিকান কংগ্রেস সদস্যদের উপর এই আস্থা রাখতে পারি যে তারা তাদের মেরুদণ্ড পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন এবং ট্রাম্পকে জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করবেন? এতোটা হাস্যস্পদ হবেন না।
রিপাব্লিকান ভোটারদের হাল কী? ভালো কথা, তাদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ (৭৫ শতাংশ) মিডিয়ায় ট্রাম্পের উপর আস্থা রাখেন, যেখানে শতকরা ৫২ ভাগ ২০২০ সালের নির্বাচন স্থগিত করার পক্ষে।
জেনারেলরা কি পদক্ষেপ নিবেন? সম্ভবত। কিন্তু সিক্রেট সার্ভিসের প্রতিক্রিয়া আসলে কী হবে?
 আর ডেমক্র্যাটরাই বা কী করবে, যদি ট্রাম্প সাহেব নির্বাচনের পরের কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে তার রাষ্ট্রপতির পদ ব্যবহার করে প্রপাগান্ডা ছড়াতে থাকেন, এবং “ডিপ স্টেট” ও অবৈধ অভিবাসীদের অবৈধ ভোট সম্পর্কে মিথ্যার বেসতি ছড়িয়ে দিতে থাকেন?  শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াগুলো কী করবে, তারা কী উভয় কূল রাখার চেষ্টা করবে? অপেক্ষমান গপ (গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি, রিপাব্লিকান পার্টিকে এ নামে অভিহিত করা হয়, ট্রাম্প এই দল থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।-অনুবাদক) স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস কি তাদের আছে?
এই কয়েকটি প্রশ্ন অন্ততপক্ষে এখনই উত্থাপিত হওয়া দরকার এমনকি যদিও এসকল প্রশ্নের কোন সুস্পষ্ট উত্তর হয়তো এখনো পাওয়া যাবে না। আমাদের উচিত কোহেন সাহেবের কথা শুনা। এটা কোন চুক্তি নয়, আর এমনটা বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই যে ট্রাম্প পরাজিত হলে তিনি নীরবে প্রস্থান করবেন। বরং উল্টো একথা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে তিনি ও তার মিত্ররা মিলে হিস্টিরিয়ার সৃষ্টি, এমনকি সহিংসতাও করতে পারেন।যারা অন্য কোন কিছু কল্পনা করছেন, তারা আসলে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
________________________________

মেহদি হাসান বিখ্যাত সাংবাদিক ও করামিস্ট, সম্প্রতি আল জাজিরার হেড টু হেড অনুষ্ঠানের কারণে তিনি বাংলাদেশে বহুল পরিচিতি লাভ করেছেন। বর্তমান প্রবন্ধটি তিনি দ্য ইন্টারসেপ্ট-এ লিখেছেন। মূল নিবন্ধের শিরোনাম “Yes, Lets Defeat or Impeach Donald Trump. But What IfHe Refuses to Leave the White House?”। নিবন্ধটি দ্য ইন্টারসেপ্টের ওয়েবসাইটে চলতি মার্চ মাসের ৬ তারিখ প্রকাশিত হয়। ছবি: দ্য ইন্টারসেপ্ট থেকে সংগৃহীত। ছবিসূত্র: Dominick Reuter/AFP/Getty Images
লেখকের ইমেইল: mehdi.hasan@theintercept.com
টুইটার: @mehdirhasan

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.