চীনের বিষয়ে ইউরোপের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি



জি ভেরফস্টাড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
বিনিয়োগ মূলধন এবং আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তি খোঁজার ক্ষেত্রে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবসময় ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের সার্বিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে না বিশেষত চীনের সাথে যেকোন বিষয়ে এটি আরো বেশি হয়ে থাকে যদিও একতরফাভাবে চীনের সাথে এরকম সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদেরকে এবং বাদবাকি পুরো ইউরোপকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়
একথা সত্যি যে চীনের বিষয়ে ইউরোপের সাধারণ অবস্থা এখনো একেবারেই সীমাবদ্ধ অনিঃশেষ ব্রেক্সিট নাটকের বিভ্রান্তি এবং বিগ টেকের কারণে আরোপিত বিপদসমূহের কারণে ইইউ নেতারা অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এখনো পাচ্ছেন না তা সত্ত্বেও, এপ্রিলের ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে এই মাসে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে চীনের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা তাদের একটি সাধারণ অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, সেখানে তারা চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (বিআরআই) সমর্থন করার বিষয়ে ইতালি সরকারের সিদ্ধান্তের ঝুঁকির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন
এই সতর্কতা আসলে কোন গুরুত্ব পায়নি তার পরের দিনই ইতালির লোকরঞ্জনবাদী জোট সরকার চীনা প্রেসিডেন্ট জিকে রোমে স্বাগত জানায় এবং চীনের সাথে একটি সমোঝতা স্মারক স্বাক্ষর করে কার্যত বাদবাকি ইইউর সাথে ভিন্নমত সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করেই দুঃথজনক বিষয় হলো, একতরফাভাবে ইতালি যে বিআরআইতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা চীনের বিপরীতে শুধু ইইউর সামষ্টিক প্রভাবকেই ক্ষুণ্ন করবে না, বরং এর ফলে ইতালির জনগণও ক্ষতিগ্রস্থ হবে
চীনের নেতৃত্বাধীন অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে স্বাক্ষরকারী প্রথম ইইউ সদস্য দেশ ইতালি নয়; তবে ইতালিই সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় অর্থনীতি প্রথম জি- সদস্য দেশ বিষয়ে খুব কম সন্দেহ আছে যে ইতালি সরকারের পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট জি অভ্যুত্থান এবং ইউরোপের বিপদের প্রতিনিধিত্ব করে সর্বোপরি বিআরআই মানবজাতির কল্যাণার্থে গৃহীত কোন দাতব্য উদ্যোগ নয় স্পষ্টতই এটি একটি বিদেশ-নীতি প্রকল্প, যা বিশ্বব্যাপী চীনের অর্থনৈতিক ভূকৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সতর্কবাণী অনুসারে বলা যায়, ইতালি সরকার ইতালির জনগণের কোন উপকার নিশ্চিত না করেই চীনেরপ্রতারণামূলক বিনিয়োগ পদ্ধতিকে বৈধতা প্রদানকরার পথে আছে
জি মার্চ ২২-২৪ তারিখের সফরের সময়টা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় সম্প্রতি ব্রেক্সিটের সময়সীমা বৃদ্ধি করার পূর্বে ২৯ মার্চে যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার কথা ছিল ব্রেক্সিট এবং মে মাসে আসন্ন ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ইউরোপীয় নেতার পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আছেন ইউরোপীয় সরকারগুলোর নিকট থেকে চীনা বিনিয়োগের (বলা যায়, যা মূলত উচ্চ শর্তসাপেক্ষ ঋণ) প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না
সৌভাগ্যবশত ইতালি সরকারের অজ্ঞতাসুলভ আচরণের বিপরীতে ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট জি সাথে তার বৈঠকে জার্মান চ্যান্সেলল অ্যাঙ্গেলা মার্কেল এবং ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট জিন-ক্লাউড জাংকারকে সংযুক্ত করেছিলেন অন্যান্য দূরদর্শী চিন্তাসম্পন্ন ইউরোপীয় নেতাদের মতোই তিনি স্বীকার করেছেন যে চীন, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে ইউরোপ সম্মানের সাথে টিকে থাকতে পারবে শুধুমাত্র যদি ইউরোপের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়
এখনো, ইইউ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট কৌশল না থাকলে, ইউরোপ পরাশক্তিদের ভাগ-করো-জয়-করো কৌশলের নিকট অরক্ষিতই থেকে যাবে, এবং ইউরোপীয়রা বঞ্চিত হবে একটি সামষ্টিক কণ্ঠস্বর থেকে, যেটি কিনা তাদের স্বার্থ দেখাশুনা করবে রাশিয়া যেমন নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যম্যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একের বিরুদ্ধে অপরকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে, চীনও তেমনি যত বেশি সম্ভব ইউরোপীয় দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার চেষ্টা করবে এরকম আলোচনার ক্ষেত্রে চীনই সবসময় ভালো অবস্থানে থাকবে
ইইউ কমিশনার গুন্থার ওটিঙ্গার প্রস্তাবিত একটি সম্ভাব্য সমাধান হচ্ছে ইইউতে যে কোন ধরনের চীনা বিনিয়োগের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কমিশনে ভেটো দেওয়া এই ধারণাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আলাদাভাবে ইইউ সদস্য দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তসমূহ বাকি ইউরোপকে নিরাপত্তা অর্থনীতিবিষয়ক জটিলতায় ফেলে দিতে পারে তাছাড়াও জাতীয় সরকারগুলোর নিজস্ব পদ্ধতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য ইইউর প্রচেষ্টাকে ব্যহত করতে পারে
একটি শক্তিশালী ইইউ-চীন সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্যই ভালো রকমের লাভজনক হতে পারে ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে একটি ইইউ-চীন বিনিয়োগ চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়াটা ইতিবাচকতার স্বাক্ষর হতে পারে। এরকম একটি সমোঝতা হয়তো ইউরোপীয় সংস্থাগুলোর জন্য চীনের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের বাঁধাসমূহ দূর করে এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগকারীদের বিপক্ষে বৈষম্য হ্রাস করে অনেক নতুন নতুন দরজা খোলে দেবে। কিন্তু একইভাবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে ইউরোপের একটি সাধারণ পদ্ধতি থাকা দরকার, যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়, বিশেষত ৫জি যন্ত্রপাতির (যেগুলোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হচ্ছে চীনের হুওয়াওয়ে) বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষী চীন কর্তৃক আরোপিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইইউ খুবই ধীর গতিতে সচেতন হচ্ছে কিন্তু আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে এখনো আমরা একটি ইউরো-চীন সম্পর্ক বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবো, যে সম্পর্কটি ভবিষ্যতে আমাদের সকলের স্বার্থ রক্ষা করবে
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “Europe MustUnite on China” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখক বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অ্যালায়েন্স অব লিবারেলস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস ফর ইউরোপ গ্রুপ (এএলডিই)’র প্রেসিডেন্ট এবং Europe’s Last Chance: Why the European States Must Form a More Perfect Union গ্রন্থের লেখক।
[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.