ইউরোপের নব্য ক্রুসেডাররা...



হিলাল কাপলান, ডেইলি সাবাহ:
তুর্কি দৈনিক সাবাহ পত্রিকায় ডিসেম্বরে লেখা আমার একটি কলামের শিরোনাম ছিল এরকমই। সে কলামের শুরুটা হয়েছিলো: “একেবারে ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে একটি নাৎসী আন্দোলন বেড়ে উঠছে। তারা শুধু সক্রিয়ই নয়, বরং কল্পনার চেয়েও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। যে কোন মুহূর্তে পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে তারা প্রস্তুত।”
দুর্ভাগ্যবশত মাত্র আমার এই নিবন্ধ লেখার মাত্র তিন মাস পর নিউজিল্যান্ড তার সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার সাক্ষী হলো, যেখানে একজন সন্ত্রাসী ৫০ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে এবং পুরো ঘটনাটি লাইভ করেছে।
ঘাতক তার “ম্যানিফেস্টো”তে নিজেকে ক্রুসেডার হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। এবং এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে ঘাতক তার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে মুসলমানদেরকে হত্যাকারী ক্রুসেডার কমান্ডারদেরকে।
যদিও নিউজিল্যান্ড সরকার এবং বিশেষত প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডের্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি চমৎকারভাবে তাদের সমালোচনা ব্যক্ত করেছেন, তবে এখন পর্যন্ত তারা ঘাতকের প্রেক্ষাপটের উপর আলোকপাত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এমনকি যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ধরে ঘাতক ইতোপূর্বে পরিভ্রমণ করেছে, সে সূত্রেও তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে, কিন্তু নিউজিল্যান্ডবাসী দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের বাঁচাতে এ ধরনের ঘটনায় “একাকী নেকড়ে” (অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন ঘটনা) তত্ত্বকে তাদের যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
যাই হোক, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর সেবাস্টাইন কুর্জ একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন, যা ইতোমধ্যেই জানা হয়ে গেছে, সেখানে তিনি বলেন: “এখন আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে নিউজিল্যান্ডের হামলাকারী এবঙ অস্ট্রেলিয়ার আইডেন্টিটেরিয়ান (ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী আন্দোলন) আন্দোলনের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং যোগাযোগ বিদ্যমান রয়েছে।”
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিবৃতি অনুসারে, গত নভেম্বরে হামলাকারী অস্ট্রিয়া সফর করে এবং অভিবাসন বিরোধী আইডেন্টিটেরিয়ান আন্দোলনে ১,৫০০ ইউরো দান করে।
 “নব্য ক্রুসেডার” শিরোনামে আমার নিবন্ধে আমি জেনারেশন আইডেন্টিটি আন্দোলন সম্পর্কে আমি বর্ণনা করেছিলাম: “এই গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রস্তাবনা হচ্ছে গ্রেট রিপ্লেসমেন্টর তথাকথিত তাত্ত্বিক ধারণা। এ মতবাদ অনুসারে যারা ইউরোপে অভিবাসী হয়েছে, কত প্রজন্ম ধরে তারা ইউরোপে বসবাস করেছেন তা বিবেচনা না করেই, তাদেরকে অবশ্যই তাদের আদি ভূমিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর কারণ তাদের মতে ইউরোপ শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিষ্টানদের জন্য। মুসলিম, ইহুদি, শিখ কিংবা অন্য কোন বিশ্বাস অথবা জাতির কোন জায়গা ইউরোপে নেই।”
নিউজিল্যান্ডের গণহত্যারি মেনিফেস্টোর দিকে তাকালে কাকতালীয়ভাবে দেখতে পাবেন, সেটার শিরোনাম হচ্ছে: “গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট”! জেনারেশন আইডেন্টিটি আন্দোলনটি মাত্র পাঁচ বছর আগে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্দোলনটি ইতোমধ্যে পুরো ইউরোপ জুড়ে নিজেদেরকে বড় আকারে সংগঠিত করেছে। ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়া থেকে শুরু করে জার্মানি পর্যন্ত এটি বিস্তার লাভ করেছে এবং ইতালিতেও এটি শিকড় প্রোথিত করেছে।
জরিপ অনুসারে, ফ্রান্সের প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন মারিন লে পেনকে সমর্থন করে। কট্টর ডানপন্থী ইউকেআইপির সাবেক নেতা নিগেল ফারাগ বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, “ইউকেআইপি ধর্মীয় ক্রুসেড লড়া দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।” ফলস্বরূপ তাকে তার অবস্থান থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।
কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান হচ্ছে দিন দিন। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা দেখতে পাচ্ছি কট্টর ডানপন্থা মূলধারার দলগুলোতে সমর্থন পাচ্ছে। কিন্তু আগামী দশ বছরে এমনটা ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন নয় যে এসকল ক্যাম্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাজারো তরুণ অনেকগুলো সংগঠিত দলের সাথে সমবেত হবে এবং রাস্তায় নেমে পড়বে।
একুশ শতকের মুসলিমরা তাদের নিজেদের এলাকায় সবচেয়ে কষ্টদায়ক সময়ের সাক্ষী হচ্ছে, এবং দুর্ভাগ্যবশত এ পরিস্থিতি কেবলই বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
________________________________

নিবন্ধটি তুর্কি দৈনিক ডেইলি সাবাহর ইংরেজি সংস্করণে “Neo-Crusaders of Europeশিরোনামে প্রকাশিত। 

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.