জি’র ‘চীনা স্বপ্ন’ বনাম ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি


বেহজাদ আব্দুল্লাহপউর, এশিয়া টাইমস:
হালফিলে পরাশক্তিদেরকে নিজেদের ঘাড়ে বৈশ্বিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বিনির্মাণের বিশেষ বোঝা বহন করতে হয়। কাজেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জি জিনপিং’র নীতিসমূহের খোঁজ-খবর রাখাটা দরকারী বটে, বিভিন্ন দেশের বিপরীতে তাদের আচরণ ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বিশ্লেষণ করতে এসব নীতি আমাদেরকে সহযোগিতাও করবে।
জি’র “চীনা স্বপ্ন” এবং ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির মধ্যে কিছু সাধারণ সাদৃশ্য আছে, আবার কিছু বৈসাদৃশ্যও আছে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জটিল ও রহস্যজনক পন্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। এই দুটি ধারণাই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আসলে তারা তাদের দীর্ঘ প্রত্যাশিত আশা-উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে এ নীতির মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলতে চায়, তাদের সে উচ্চাকাঙ্ক্ষা হলো নিজেদের অতীতের মাহাত্ম্যকে পুনরুজ্জীবীত করা, যা তাদেরকে অনন্য রাষ্ট্রে পরিণত করবে।
যাই হোক, ট্রাম্প এবং জি উভয়ই মনে করেন যে তাদের নিজেদের দেশের মহিমায় পরিবর্তন এসেছে। এজন্য তারা হারানো মহিমা পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাগ্রহণ দরকার বলে মনে করেন। এ উদ্দেশ্যে ট্রাম্প যেখানে একপাক্ষিক রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করছেন, সেখানে জি বহুপাক্ষিক এবং উইন-উইন (উভয় পক্ষের জেতার মতো পরিস্থিতি) নীতির উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
প্রথমেই “চীনা স্বপ্ন” ও “আমেরিকা ফার্স্ট” ধারণাদ্বয়কে সংজ্ঞায়িত করা দরকার। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে জি সাহেব বলেন, “চীনা স্বপ্ন” শুধুমাত্র চীনের জনগণের স্বপ্ন নয় যে এটি শুধু চায়নিজদেরকে একটি শ্রেয়তর ও অর্থবহ জীবন দান করবে, বরং এটি বিশ্বের অন্যান্য মানুষেরও স্বপ্ন, যা বিশ্ববাসীকে “শান্তি, উন্নয়ন, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুবিধা” প্রদান করবে।
বিশেষজ্ঞ জিন কাই বলেন, চীনা স্বপ্ন দ্বারা “চায়নিজ জনগণের নিজস্ব উন্নয়নের মডেলের অনুসন্ধান এবং চায়নিজ জাতির ‘মহৎ পুনরুজ্জীবন’র প্রত্যাশা”কে বুঝানো হয়। তিনি মনে করেন, এটা “চীনের নিজের রূপকল্প, মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার পতন ঘটানোর কোন নীল-নকশা নয়।”
চীনের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্রাটেজি ২০১৭’ অনুসারে মার্কিন শক্তির শেকড় তার অতীতে নিহিত। প্রতিবেদনটিতে বারবার বলা হয় যে, “যুক্তরাষ্ট্র জীবন, স্বাধীনতা আর সুখের সন্ধান করার নিমিত্তেই জন্মগ্রহণ করেছিল।” ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির মূল বয়ান “মার্কিন জনগণ”কে রক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের জীবনশৈলী, শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় রাখার উপর এবং বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করে। তিনি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তা হিসেবে বিবেচনা করেন।
ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট নীতিসমূহ তার ব্যবসায়িক মানসিকতা দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হয়েছে। কাজেই তিনি অর্থনৈতিক বিষয়াবলীকে প্রাধান্য দিয়েছেন, যেমন তিনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে এনেছেন। উপরন্তু তিনি বিশ্বাস করেন যে চীনের উপর তার অর্থনৈতিক চাপ (যেমন বাণিজ্য যুদ্ধ পরিচালনা) চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের অন্যান্য চলমান সমস্যা (সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার ইত্যাদিসহ) সমাধান করতে পারবে।
জি এবং ট্রাম্প উভয়ের বক্তব্যে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। অবশ্য জি তার দেশপ্রেম ও বৈশ্বিক মনোভাবের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চেষ্টা করলেও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ-নীতিতে স্পষ্টতই তার দেশপ্রেমী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ করেন। এর একটা বড় উদাহরণ হলো ২০১৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তার বক্তব্য, যেখানে তিনি বলেন: “আমেরিকা আমেরিকানদের দ্বার পরিচালিত। বৈশ্বিক আদর্শকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি এবং দেশপ্রেমের মতবাদকে সাদরে গ্রহণ করি।”
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সংগঠসমূহের প্রতি ট্রাম্পের তাচ্ছিল্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি (যা কিনা তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতি থেকে উদ্ভূত) বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্টের নেতৃত্বের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাসের আবহ তৈরী করে, যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলবে।
এদিকে জি’র “চীনা স্বপ্ন” সহযোগিতা, বৈশ্বিক সমৃদ্ধি ও শান্তিকে সামনে নিয়ে আসে। ফলে এটি সারা বিশ্বে বৈশ্বিক যোগাযোগে অগ্রদূত হিসেবে চীনের অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করবে।  উদাহরণস্বরূপ জির বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বিশ্বায়নের ইতিহাসে এক অভুতপূর্ব উদ্যোগ, যা একই নীতি ও উদ্দেশ্যে বিশ্বব্যবস্থায় চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করে। ট্রাম্প সাহেব যদি তার একপাক্ষিক আমেরিকা ফার্স্ট নীতির উপর গুরুত্বারোপ করেন, তবে বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং ঠাণ্ডা যুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠিত হবে সম্ভবত চীন এবং তার মিত্ররাই যুক্তরাষ্ট্রের স্থান দখল করবে।
________________________________

বেহজাদ আব্দুল্লাহপউর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব অধ্যয়ন অনুষদের উত্তর আমেরিকা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তার এই লেখাটি Xis China Dream vs Trumps America First শিরোনামে এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত হয়েছে। ছবি এশিয়া টাইমস থেকে সংগৃহীত।

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.