শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের অপরাধের দায়ও মুসলিমদের কাঁধে...



হুমা ইয়াসিন, আল জাজিরা ইংরেজি:
গত সাতাশ এপ্রিল ১৯ বছর বয়সী জন আর্নেস্ট ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সিনাগগে (ইহুদিদের উপাসনালয়) গিয়ে গুলি করতে শুরু করে; তাতে একজন নিহত ও তিন জন আহত হয়েছেন।
হামলা করতে যাওয়ার কিছু আগে সে অনলাইনে ৪,০০০ শব্দের একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে, এতে সে ক্যালিফোর্নিয়ার ইসকোন্ডিডোতে একটি মসজিদে গুলি করার দায়ও স্বীকার করে; নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চের মসজিদে জুম্মার নমাজরত মুসলিমদের উপর ব্রেন্টন ট্যারেন্ট কর্তৃক হামলার মাত্র নয় দিন পর মার্চের ২৪ তারিখ সে ঘটনাটি ঘটেছিল।
ম্যানিফেস্টোতে আর্নেস্ট অ্যাডলফ হিটলারকে তার আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করে, ট্যারেন্টকে তার অনুপ্রেরণা হিসেবে ঘোষণা করে, এবং রবার্ট বোয়ার্সের প্রশংসা করে, যে ছয় মাস আগে পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গের একটি সিনাগগে ১১ উপাসনাকারীকে হত্যা করেছিল।
সে ইহুদি ও মুসলিম, উভয় জাতির বিরুদ্ধে তার ঘৃণা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন, তার ভাষায়: “ইহুদিরা আমাদের ধৈর্য ও এবং দয়ার ভাণ্ডার খালি করে ফেলেছে।” সে আরো দাবি করে যে “আমি কোন সন্ত্রাসী নয়, কারণ আমি মধ্যপ্রাচ্যের উজবুকদের মতো পোশাক পরি না, আমার চামড়ার রঙ বিষ্ঠার মতো নয়, পুরো কক্ষে আমার গন্ধ তুমি পাবে না... আমি ‘দুরকা দুরকা মোহাম্মদ জিহাদ’ বলে চেঁচামেচি করি না
আর্নেস্টের জঘন্য বর্ণবাদ, স্পষ্টত তার অনুপ্রেরণার নাম উচ্চারণ এবং শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শের ঘোষণা সত্ত্বেও এ সব কিছু উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কংগ্রেসমেন তাৎক্ষণিক ভিন্ন প্রসঙ্গান্তর করে এসবের বদলে ইলহান ওমার, ডেমোক্র্যাট ও “উদারপন্থী” গণমাধ্যমকে এই হামলার জন্য অভিযুক্ত করতে শুরু করেন।
প্রয়াত রিপাব্লিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনের মেয়ে মেঘান ম্যাককেইনও এই বচসায় যুক্ত হয়ে লাইভ টিভি শোতে বলেন, “আমরা যখন অ্যান্টি-সেমিটিজম নিয়ে কথা বলছি, আমাদের উচিত উভয় পক্ষের কট্টপন্থীদের প্রতি খেয়াল রাখা, আমি কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমার ও তার কিছু মন্তব্য সামনে নিয়ে আসতে চাই, যেগুলো মনযোগ আকর্ষণ করছে।”
ম্যাককেইনের এই দাবি শুধু ওমারের বক্তব্যের ভুল চরিত্রায়ণই নয়, (ওমার তার এই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন), বরং এটি বিপজ্জনক মিথ্যা আদর্শিক সমতারও দাবি বটে।
ইলহানের কথার মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০১৭ সালের ইউনাইট দ্যা র‌্যালী চলাকালে শ্বেত জনৈক শ্রেষ্ঠত্ববাদীর হাতে নিহত হিথার হেয়ারের হত্যাকাণ্ডের পর ট্রাম্পের নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতির বিষয়টিকে বিদ্রূপাত্মকভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। সেসময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন: উভয় পক্ষে খুবই ভালো মানুষজন রয়েছে।”
ডানপন্থীদের এসব বাগাড়াম্বরের উদ্দেশ্য হলো মূল উদ্দেশ্য হলো একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে ধামাচাপা দেওয়া, সেটি হচ্ছে: আর্নেস্ট একজন শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী, আর তার লক্ষ্যবস্তু ইহুদী-মুসলিম উভয়েই। আর্নেস্টের চরমপন্থার জন্য মুসলিমরা দায়ী এ ধরনের যে কোন কথাই পুরোপুরি অযৌক্তিক এবং একেবারে স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানবিরোধী।
শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের অপরাধের দায় মুসলমানদের কাঁধে চাপানোর এই সমন্বিত প্রচেষ্টার একমাত্র মানে হলোা অতি ডান চরমপন্থীদের জন্য একটি রাজনৈতিক আচ্ছাদন তৈরি করা এবং এমনিতেই নিগৃহীত একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আরো উত্তেজনা সৃষ্টি করা ও গুরুত্বহীন করে ফেলা।
এ সব কিছু এমন এক সময় হচ্ছে যখন শ্বেত জাতীয়তাবাদ ও অতি ডান মনোভাব সমুজ্জল হচ্ছে এং বর্ণবাদী ঘটনাসমূহের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও একজন কট্টর ডান পুরুষ চরমপন্থী কর্তৃক সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ায় মুসলিম ও ইহুদিদের উপাসনালয়ে দুটি আক্রমণ, লুইসানায় তিনটি কৃষ্ণাঙ্গদের চার্চে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের শেষের দিকে এফবিআই টানা তৃতীয় বছরের মতো ‘ঘৃণা অপরাধ’ বৃদ্ধির বিষয়টি নথিবদ্ধ করে। এসকল ঘটনার ৬০% হয়েছে বর্ণগত বিদ্বেষের কারণে, ২০ শতাংশ ধর্মীয় কারণে এবং ১৬ শতাংশ ছিল যৌন নির্যাতন।
আর হোয়াইট হাউজ কর্তৃপক্ষ যখন বারবার শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে অনাগ্রহ প্রদর্শন করছে, তখন যে কেউ মনে করতেই পারে যে, এসব অপকর্মের পুরোভাগে খোদ কংগ্রেসই রয়েছে। হ্যাঁ, এপিল হাউজ জুডিসিয়ারি কমিটির “ঘৃণা অপরাধ ও শ্বেত জাতীয়তাবাদের উত্থান” শীর্ষক শুনানির সময় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের কোন রাজনৈতিক সদিচ্ছাও নেই।
শুনানি চলাকালে ড. মোহাম্মদ আবু-সালহা ২০১৫ সালে নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ার চ্যাপেল হিলে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের হাতে নিহত তার দুই কন্যা ও এক জামাতা নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করছিলেন। তা সত্ত্বেও একজন হাউজ রিপ্রেজেন্টেটিভ শোকাহত পিতাকে ইঙ্গিত দেন যে মুসলিমরা নিজেরা এমনিতেই চরমপন্থী, এবং তাকে প্রশ্ন করেন, “আপনি কি আপনার সন্তানদেরকে, দুই কন্যাকে ঘৃণা শিক্ষা দিয়েছিলেন?”
ড. আবু-সালহাকে স্বাক্ষ্য দিতে হয়েছিল মার্কিন ইহুদিবাদী সংস্থার সভাপতি মর্ট ক্লেইনের পাশে দাঁড়িয়ে, যিনি হাস্যকরভাবে দাবি করেন যে, “ইহুদি ও মার্কিনদের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়... হলো মুসলিম অ্যান্টি সেমিটিজম।”
ব্যর্থ এই শুনানিটি প্রমাণ করেছে যে, কংগ্রেস শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপদ মোকাবেলায় জাতীয় সংলাপ কিংবা এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতেই শুধু অক্ষম নয়, বরং ইহুদিবাদীদের ইচ্ছাপূরণের স্বার্থে কংগ্রেস শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের শিকার নিগৃহীতদেরকে অপমানিত করতে চাচ্ছে।
নিঃসন্দেহে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের অস্তিত্ব কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই রয়েছে, যার ফলে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করার জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে কংগ্রেস অক্ষম হয়ে পড়েছে, অথচ এই চরমপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু হলো ইহুদি, মুসলিম, আফ্রিকান আমেরিকান, এবং অন্যান্য বর্ণগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। এখন এবং এখনই, যুক্তরাষ্ট্রে নিগৃহীত সংখ্যালঘুদের উচিত নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী জোট গঠন, কট্টর ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যারা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের ফাঁদ তৈরির কৌশল কাজে লাগাচ্ছে।
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে Don't blame Muslims for the crimes of white supremacistsশিরোনামে প্রকাশ হয়েছে। নিবন্ধটির লেখক একজন মার্কিন আইনজীবী। ছবি: আল জাজিরা থেকে সংগৃহীত।

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.