আগস্ট 2019


আনাতোল কালেৎস্কি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা যুক্তরাজ্য বনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার ট্রাজেকমেডি অবশেষ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে। ব্রেক্সিটের সময়সীমা হলো অক্টোবরের ৩১ তারিখ, অথচ বরিস জনসন প্রায় এই সময়সীমা পর্যন্তই সংসদ স্থগিত রাখার চাল চালিয়েছেন, সংসদের স্পিকার জন বের্কো এ বিষয়টিকে “ সাংবিধানিক তাণ্ডবলীলাবলে আখ্যায়িত করেছেন, যদিও এর একটা সুবিধাও আছে। এর ফলে ৬৫০ জন সংসদ সদস্যের সামনে এখন বাছাই করার মত মাত্র দুটো পথ রয়েছে। হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ সেপ্টেম্বরের পয়লা সপ্তাহে বরিসের বদলে নতুন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভোট দেবেন, অন্যথায় তাকে তার প্রতিশ্রুতি অনুসারে “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমতা দিয়ে দিতে হবে, যা কিনা ব্রিটেনকে ইইউর সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে নিয়ে যাবে। দোসরা পথ বেছে নিলে এটি আবার ইইউর ভবিষ্যতের উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।  
তো, এখন কী হবে? সেপ্টেম্বরের পয়লা সপ্তাহে সাংসদরা যখন গ্রীষ্মকালীন অবকাশযাপন শেষে ফিরবেন, বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি কর্বিন নিশ্চয়ই জনসনকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। কারণ জনসনের রক্ষণশীল এবং নর্দার্ন আইরিশ ডেমক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট দল হাউজ অব কমন্সে মাত্র একটি ভোটে সমন্বিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এবং টরি পার্টির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের বিরোধী হওয়ার কারণে জনসনের হেরে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু জনসনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। ২০১১ সালের স্থায়ী সংসদীয় আইন অনুসারে, কোন প্রধানমন্ত্রী যদি অনাস্থা ভোটে হেরে যান, তাহলে হয়তো সংসদকে অবশ্যই পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে তার বদলে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে হবে, অন্যথায় পরাজিত সরকারই থাকবে, এবং এই সরকার পরবর্তী তিনমাসের মধ্যে তাদের সুবিধামাফিক সময়ে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করবে। তিন মাস সময় জনসনের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে “মরি, বাঁচি, ব্রেক্সিট” প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট। এই পরিণতি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন, যেহেতু সংসদ স্থগিত হতে যাচ্ছে, তাই এ কাজটি করতে হবে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই।
বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে কর্বিন ইতোমধ্যে নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করেছেন; তিনি কেবলমাত্র দু’টি কাজ করার সীমাবদ্ধতাসহ সমর্থন চাচ্ছেন: ব্রেক্সিটের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং এরপর যথাশিগগিরই সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন। কিন্তু ইইউপন্থী অনেক টরি দলীয় সদস্য কর্বিনের তীব্র বিরোধীতা করছেন, তাই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলনামুলক কম পক্ষপাতি কেউ প্রার্থী হতে পারেন, যার কোন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। এক্ষেত্রে সাবেক টরি দলের চ্যান্সেলর কেনেথ ক্লার্ক প্রার্থী হতে পারেন, যিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সাংসদ থাকার কারণে “ফাদার অব দ্য হাউজ” হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে থাকেন, কিংবা ২০১৫ সালে অন্তবর্তীকালীন লেবার নেতা হিসেবে দায়িত্বপালনকারী হ্যারিয়েট হার্মানও হতে পারেন।
অথবা কর্বিনকে পাশে সরিয়ে রাখার জন্য সম্ভবত সাবেক লেবার পার্টির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারেট বেকেটিই সবচেয়ে পছন্দের প্রার্থী হতে পারেন। সর্বোপরি বেকেট সেই ৩৬ জন সাংসদের মধ্যকার একজন, যারা কর্বিনকে লেবার দলীয় নেতা নির্বাচনের জন্য পিটিশন সাক্ষর করেছিলেন। তাঁর সমর্থন ব্যতীত কর্বিন আজ যেখানে আছেন, সেখানে পৌছাতে পারতেন না। কাজেই বেকেটকে সমর্থন করার বিষয়টি কর্বিন তাঁর সমর্থকদেরকে সহজে বুঝাতে পারবেন, যিনি আবার চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটবিরোধী টরি দলীয় সাংসদদের সমর্থন সহজে পেতে পারবেন। যাই হোক, জনসনকে এভাবে পদচ্যুত করতে পরলে, অক্টোবরের শেষ দিকে কিংবা নভেম্বরে ভোটের আয়োজন করা সম্ভব হবে, এবং সে সময় পর্যন্ত ইউনিয়নে থাকতে হবে। (ইউরোপীয় নেতারা বারবার বলছেন যে, পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ব্রেক্সিটের সময়সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।)
জনসনের “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের পক্ষে এবং বিপক্ষে রক্ষণশীলরা গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। এদিকে বিরোধীদলগুলো সম্ভবত তাদের সাময়িক সহযোগিতামূলক ভাব থেকে কিছু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করবে। এর ফলাফল হতে পারে “ঝুলন্ত সংসদ”, কোন দলই হয়তো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। যাইহোক, এবার বোধ হয় লেবার, লিবারেল ডেমক্র্যাটস এবং স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি ভালোই প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করবে এবং সম্ভবত সকলে মিলে একটি চুড়ান্ত গণভোটের আয়োজন করতে হবে, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া আর এগুবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
অন্যদিকে সাংসদরা যদি নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে ব্যর্থ হয়ে পড়েন, তাহলে সংসদ সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ থেকে স্থগিত হবে এবং জনসনের পছন্দসই ব্রেক্সিটে আর কোন বাধাই থাকবে না, “চুক্তিসহ কিংবা চুক্তি ছাড়া” যেভাবেই হোক, ব্রেক্সিট হবেই।
জনসন মনে করেন, সংসদ স্থগিত করার মাধ্যমে তিনি নয়া করে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে যে অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছেন, এর ফলে পূর্বসুরী থেরেসা মে’র ব্যর্থ প্রত্যাহার চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দরকষাকষির ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কতিপয় ইউরোপীয় নেতা সম্ভবত আশা করছিলেন, চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের ঝুঁকি নিতে সংসদ রাজি হবে না, এবং এটি প্রতিরোধ করতে সংসদ হস্তক্ষেপ করবে। এই সম্ভাবনা এখন আর নেই বললেই চলে। এই প্রেক্ষাপটে ইইউ চাইলে জনসনকে এরকম একটা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিতে পারে, যাতে ব্রিটেন এবং ইইউর মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাধা দূর করার জন্য “আইরিশ ব্যাকস্টপ” বিধান প্রত্যাহার করা যেতে পারে, যাতে করে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের মধ্যে উম্মুক্ত সীমান্ত অনুমোদন করে নতুন স্থায়ী বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আপাতত বাণিজ্য চলতে পারে।
জনসন হয়তো ঠিকই আছেন। চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটেন যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, ইইউও তেমনি চরম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ যুক্তরাজ্য ইউরোপ মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার।
বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একটি বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে আছে, জার্মানি গাড়ি বিক্রিতে ধ্বস নামার ফলে অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে, ফ্রান্স নাগরিক বিক্ষোভের কারণে উদ্বিগ্ন এবং ইতালি প্রকাশ্যে ইইউর নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, এরকম একটি পরিস্থিতিতে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম খদ্দেরের সাথে সম্পর্কের ফাঁটেলের ঝুঁকিটা বেশ বিজ্জনকই হতে পারে।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will Boris Johnsons Political Coup Succeed? শিরোনামে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


মার্ক লিওনার্ড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ফ্রান্সের বিয়ারিতজ শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সবার আগ্রহের বিষয় ছিল, কার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় বিঘ্নতা আসছে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের, নাকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পক্ষ থেকে? যদিও সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এমন একজন, যার উপস্থিতিই আদতে প্রত্যাশিত ছিল না, তিনি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।
যদিও এই সম্মেলনে গণমাধ্যমের চোখ ছিল বাণিজ্য যুদ্ধ, আমাজনের আগুন এবং বিপজ্জনক “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের উপর, তবে সবচেয়ে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে সম্ভবত ইরানের বিষয়ে। ইরানের সাথে হওয়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ভাগ্য দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে কিনা সেটা যেমন নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি পশ্চিমা রাজনৈতিক জোট টিকে থাকবে কিনা, তাও নির্ধারণ করতে পারে।
বিয়ারিতজে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতা নিরসনের উদ্যোগের সূচনা করেছেন। এবং সাম্প্রতিক দিনগুলিতে ইরান নাটকের মূল খেলোয়াড়রা সকলেই পিছনের দিকে ফিরছেন। যুক্তরাজ্য জিব্রাল্টার থেকে আটককৃত ইরানের ট্যাংকার (গ্রেস ১) ছেড়ে দিয়েছে। এবং, আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাহেব ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রোহানির সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, এমনকি তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের স্বল্পমেয়াদি “লাইন অব ক্রেডিট অথবা লোন” পাওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি করবেন না।
তবু অনেকগুলো বিষয় উত্তেজনা নিরসনের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। প্রথমেই, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো মনে করে যে ইরানের (এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের) উপর যত বেশি চাপ প্রয়োগ করা হবে, ততই ভালো হবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে চান, এবং তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় সহযোগিতার পথ বন্ধ করার মাধ্যমেই এটি করতে হবে। তিনি এবং অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সাথে ইউরোপের ঐক্য নষ্ট করতে সব উপায় অবলম্বন করবেন, এবং স্পষ্টতই তারা সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করবেন যুক্তরাজ্যের উপর। আরো জঘন্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কেউ এবং মধ্যপ্রাচ্যেরও কেউ কেউ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরানকে সামরিক বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য ফাঁদ বানাতে চায়।
ইরানি কট্টরপন্থীদের নিয়েও সমস্যা আছে। তাদের অনেকেই মনে করেন, পারমাণবিক চুক্তি থেকে তারা কিছু্ই পাননি, এবং তাদের মতে উদ্দেশ্য সাধনের উপায়টিই বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ইরানি নেতারাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বিরোধী কাজে উৎসাহী হয়ে পড়েছে, শুধু যে হরমুজে ব্রিটিশ ট্যাংকার দখল করেছে, সেটিই্ এ ধরনের একমাত্র কাজ নয়। (ইউরোপে ইরানেরও পছন্দের ক্ষেত্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেরই মতো।)
ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাব ইসরায়েলেরও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে, যার ফলে ইরাকে তারা ইরানের সম্পত্তিসমূহকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। (ইতিমধ্যে সিরিয়ায় ইরানি বাহিনীর উপর হামলা শুরু করে দিয়েছে।)
বোধগম্য কারণেই ইরান ইনসটেক্স উদ্বোধনে ইউরোপের ধীর গতির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে। ইনসটেক্স মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপ-ইরান বাণিজ্য সম্ভব করে তোলার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু ইরানের যারা দাবি করছেন যে, তারা ইউরোপ থেকে কিছুই পাননি, তারা একেবারেই ভুল দাবি করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের বর্তমান অবস্থান পরিত্যাগ করে ইরানকে চেপে ধরার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিত, তাহলে তারা পার্থক্যটা স্পষ্টতই বুঝতে পারতেন। আসলে তীব্রতাবৃদ্ধির নীতি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ইরান নৈতিক উচ্চ অবস্থান হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, একই ভাবে তারা সেই সকল ইউরোপীয়দের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতি থেকে ভিন্ন ইরান নীতি মানতে চাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে পাত্তা না দিয়ে চুক্তির বিষয়ে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপ যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা অনেককে বিস্মিত করেছে। এমনকি বলতে গেলে ব্রিটিশ সরকারও ইইউর সাথেই আছে এ বিষয়ে। কিন্তু এটা পরিবর্তন হতে পারে। ইরান যদি ব্রিটেনের আরেকটি জাহাজ আটক করে, এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে, তাহলে এর ফলে জনসন ইইউ’র সঙ্গত্যাগ করে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিতে পারে।
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও হতাশার বিষয় হলো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য পারস্য উপসাগরে একটি যৌথ ইউরোপীয় মিশন চালু করতে পারেনি, যাতে তাদের যে কারো উপর আক্রমণ হলে সেটি সকলের উপর আক্রমণ বলে গণ্য হতে পারে। যুক্তরাজ্য যদি ইরান ইস্যুতে ইইউ’র পথ থেকে সরে যায়, তাহলে পরবর্তী কট্টরপন্থীদের (ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশেরই) লক্ষ্যবস্তু হবে জার্মানকে সরানো। একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সেখানে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
এসকল ঝুঁকি ভালো মতন মোকাবেলা করার জন্যে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, ইরান যদি আরেকবার তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম হ্রাস করার মাধ্যমে চুক্তিতে আসতে রাজি হয় এবং পাশ্চাত্যের সাথে আলোচনার দুয়ার খোলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প যেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ... ... এই ক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প আমেরিকার অনন্তকালব্যাপী এবং বিদেশে অযৌক্তিক অভিযানসমূহ যুদ্ধসমূহ সমাপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ইউরোপীয়দেরকেও অবশ্যই ইরানকে বুঝাতে হবে, যেন সে নিজের ক্ষমতাকে অতিমাত্রায় বড় করে না দেখে। একটি নতুন ক্রেডিট লাইনের বিষয়ে ম্যাক্রোঁর প্রস্তাব হয়তো ইরানের মধ্যপন্থীদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু ইউরোপীয়রা যদি ইনসটেক্স চালু করতে এবং চালাতে সক্ষম না হয়, তবে ইরানিদের নিকট তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ হয়ে যাবে। সর্বাবস্থায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অবধি ইরানকে নীরব থাকতে উৎসাহিত করা। ইউরোপেরে উচিত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা, তবে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে, যে ইউরোপীয় স্বার্থে ইরান যদি আর কোন আক্রমণ করে, তাহলে ইইউ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিয়ন্ত্রণ কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে।
সর্বোপরি, পারস্য উপসাগরে ইউরোপের তীক্ষ্ম নজরদারি রাখা দরকার। এমনকি তারা যদি যুক্ত নৌশক্তি সংগঠিত নাও করে, তাদের উচিত হবে উত্তেজনা হ্রাসে কাজ করা, যদি যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইরান কোন সম্মুখ দ্বন্দ্বের জন্য প্ররোচিত করতে চায়। ইরানকে সাথে নিয়ে নৌ-মহড়ার আয়োজন করা এক্ষেত্রে চমৎকার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কৌশল মাথায় রেখেই সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন ম্যাক্রোঁ। কৌশলটি সফল হলে ট্রাম্পের আমলে বিয়ারিতজ সম্মেলনই হবে প্রথম সফল জি৭ সম্মেলন। (সেটা ট্রাম্প জানুন কিংবা নাই জানুন।)

________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will the Iran Conflict Break the West? শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক মার্ক লিওনার্ড বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের পরিচালক। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




রমেশ ঠাকুর, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোপূর্বে বিশেষ মর্যাদার আওতায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চল একটা মাত্রার স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো। এর বদলে এখন কাশ্মীরকে দুটো ইউনিয়ন টেরিটরিতে (মর্যাদার দিক থেকে রাজ্যের নিচে অবস্থান) বিভক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি শাসন করবে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার আওতায় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার ফলে সাত দশক আগে কাশ্মীরের ভারতে যোগদান সহজতর হয়েছিল। কাশ্মীর নামক এই অঞ্চলের উপর ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানও নিজেদের অধিকার দাবি করে। এরকম একটি অঞ্চলের সাথে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতাবস্থাকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
মোদী সরকার খুব ভালো করেই জানে যে তাদের এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীর কিংবা পাকিস্তানে ভালোভাবে নেওয়া হবে না। কাজেই এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগের দিন কাশ্মীরে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।  ঘোষণার পর  মোদী সরকার এ অঞ্চলের জনগণের উপর কারফিউ জারি করে, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদেরকে বের করে দেয়, জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাদেরকে গৃহবন্দী করে, মিডিয়া ও টেলিকম বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু, ভারতীয় বিরোধী দলসমূহের সদস্যদের স্বীকৃতি অনুসারে, কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মোদী সরকারের ক্ষমতা একেবারেই সীমাবদ্ধ, কারণ এসকল কাশ্মীরি দশকের পর দশক ধরে সহিংসতা সহ্য করে আসছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, পাকিস্তান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি আখ্যায়িত করে প্রত্যখ্যান করেছে, এবং “সকল সম্ভাব্য উপায়ে” প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এর ফলে প্রতিবেশী দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে আবারও সামরিক সঙ্ঘাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যু এতোটা একগুয়ে হওয়ার এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত সম্ভবত কাজ না করার পিছনে তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ পরিচিতির সাথে সম্পৃক্ত। কাশ্মীর ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের অসম্পূর্ণ কাজের প্রতিনিধিত্ব করে, যে বিভক্তির ফলে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। একদিকে, ভারতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের অস্তিত্ব উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বদেশ হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল যৌক্তিকতার সাথে বিরোধপূর্ণ। অন্যদিকে ভারত একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি হারিয়ে ফেললে তার সেক্যুলার পরিচিতি হুমকির মধ্যে পড়বে, এবং ১৮০ মিলিয়ন মুসলমানের অবস্থান নিয়ে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
কাশ্মীর এসকল দ্বন্দ্বের যোগসূত্রে অবস্থান করছে। কারণ অন্যান্য প্রিন্সলি স্টেটের মতোই, কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু তখন ভারতের সাথে একীভূত হয়ে যায় নি। ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার সময় কাশ্মীর প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে ভারতের সংবিধানে সংযুক্ত ৩৫এ ধারার অধীনে কাশ্মীরের নাগরিকগণ আরো কিছু অতিরিক্ত বিশেষ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন, এর মধ্যে সম্পত্তির মালিকানা ও সরকারি চাকরি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ছিল।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের ছোটখাট ঝামেলা বাধানোর ইচ্ছা আছে, অন্ততপক্ষে ভবিষ্যতে হলেও। তবে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ হলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কেও পাকিস্তান সচেতন রয়েছে। ভারত জানে যে, হয়তো যুদ্ধের ময়দানে পাকিস্তানকে হারাতে পারবে, কিন্তু পরবর্তীতে সীমান্তে আক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানোর  মতো যথেষ্ট ক্ষমতা তার নেই। এই সামরিক ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবেই চুড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি করে রেখেছে।
সর্বশেষ কারণ, ভারত কার্যত নিজের তৈরি নীতি নির্ধারণী ফাঁদে পড়ে গেছে। ভারতীয় ভোটারদের নিকট তাদের সরকার দাবি করছে যে, আসলে কোন ঝামেলাই নেই। সরকারের দাবি, কাশ্মীর ভারতের অখণ্ড অংশ, তারা এ বিষয়ে বেশ জোর দিয়েছে, তাই কোন আলোচনারই দরকার নাই।  
দুনিয়াবাসীর নিকট ভারতীয় নেতারা পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি আঙুল তুলছেন, বলছেন, পাকিস্তানের সমর্থনে বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠী ভারতে সন্ত্রাসী হামলা করছে, এবং এই ইস্যুতে আলোচনাকে আন্তর্জাতিকীকরণের  যে কোন প্রচেষ্টাকে তারা প্রত্যাখ্যান করছেন। ৩৭০ বাতিলের ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প যখন কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করার কথা বলেছিলেন, মোদী সরাসরি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, বরাবরে মতো সেই পুরনো বুলি আউড়িয়ে বলেছেন, কাশ্মীর ইস্যুতে যে কোন আলোচনায় কেবল মাত্র ভারত এবং পাকিস্তানই সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, আর কেউ নয়।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত মূল লেখাটির শিরোনাম Indias Bad Bet in Kashmir। লেখক রমেশ ঠাকুর জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্রফোর্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির এমেরিটার অধ্যাপক। ভাষান্তর কর্তৃক নিবন্ধটির প্রথম  অংশ বাংলায় অনূদিত এবং সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.