কাশ্মীরে ভারতর জঘন্য বাজি




রমেশ ঠাকুর, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোপূর্বে বিশেষ মর্যাদার আওতায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চল একটা মাত্রার স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো। এর বদলে এখন কাশ্মীরকে দুটো ইউনিয়ন টেরিটরিতে (মর্যাদার দিক থেকে রাজ্যের নিচে অবস্থান) বিভক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি শাসন করবে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার আওতায় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার ফলে সাত দশক আগে কাশ্মীরের ভারতে যোগদান সহজতর হয়েছিল। কাশ্মীর নামক এই অঞ্চলের উপর ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানও নিজেদের অধিকার দাবি করে। এরকম একটি অঞ্চলের সাথে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতাবস্থাকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
মোদী সরকার খুব ভালো করেই জানে যে তাদের এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীর কিংবা পাকিস্তানে ভালোভাবে নেওয়া হবে না। কাজেই এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগের দিন কাশ্মীরে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।  ঘোষণার পর  মোদী সরকার এ অঞ্চলের জনগণের উপর কারফিউ জারি করে, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদেরকে বের করে দেয়, জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাদেরকে গৃহবন্দী করে, মিডিয়া ও টেলিকম বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু, ভারতীয় বিরোধী দলসমূহের সদস্যদের স্বীকৃতি অনুসারে, কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মোদী সরকারের ক্ষমতা একেবারেই সীমাবদ্ধ, কারণ এসকল কাশ্মীরি দশকের পর দশক ধরে সহিংসতা সহ্য করে আসছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, পাকিস্তান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি আখ্যায়িত করে প্রত্যখ্যান করেছে, এবং “সকল সম্ভাব্য উপায়ে” প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এর ফলে প্রতিবেশী দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে আবারও সামরিক সঙ্ঘাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যু এতোটা একগুয়ে হওয়ার এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত সম্ভবত কাজ না করার পিছনে তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ পরিচিতির সাথে সম্পৃক্ত। কাশ্মীর ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের অসম্পূর্ণ কাজের প্রতিনিধিত্ব করে, যে বিভক্তির ফলে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। একদিকে, ভারতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের অস্তিত্ব উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বদেশ হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল যৌক্তিকতার সাথে বিরোধপূর্ণ। অন্যদিকে ভারত একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি হারিয়ে ফেললে তার সেক্যুলার পরিচিতি হুমকির মধ্যে পড়বে, এবং ১৮০ মিলিয়ন মুসলমানের অবস্থান নিয়ে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
কাশ্মীর এসকল দ্বন্দ্বের যোগসূত্রে অবস্থান করছে। কারণ অন্যান্য প্রিন্সলি স্টেটের মতোই, কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু তখন ভারতের সাথে একীভূত হয়ে যায় নি। ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার সময় কাশ্মীর প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে ভারতের সংবিধানে সংযুক্ত ৩৫এ ধারার অধীনে কাশ্মীরের নাগরিকগণ আরো কিছু অতিরিক্ত বিশেষ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন, এর মধ্যে সম্পত্তির মালিকানা ও সরকারি চাকরি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ছিল।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের ছোটখাট ঝামেলা বাধানোর ইচ্ছা আছে, অন্ততপক্ষে ভবিষ্যতে হলেও। তবে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ হলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কেও পাকিস্তান সচেতন রয়েছে। ভারত জানে যে, হয়তো যুদ্ধের ময়দানে পাকিস্তানকে হারাতে পারবে, কিন্তু পরবর্তীতে সীমান্তে আক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানোর  মতো যথেষ্ট ক্ষমতা তার নেই। এই সামরিক ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবেই চুড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি করে রেখেছে।
সর্বশেষ কারণ, ভারত কার্যত নিজের তৈরি নীতি নির্ধারণী ফাঁদে পড়ে গেছে। ভারতীয় ভোটারদের নিকট তাদের সরকার দাবি করছে যে, আসলে কোন ঝামেলাই নেই। সরকারের দাবি, কাশ্মীর ভারতের অখণ্ড অংশ, তারা এ বিষয়ে বেশ জোর দিয়েছে, তাই কোন আলোচনারই দরকার নাই।  
দুনিয়াবাসীর নিকট ভারতীয় নেতারা পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি আঙুল তুলছেন, বলছেন, পাকিস্তানের সমর্থনে বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠী ভারতে সন্ত্রাসী হামলা করছে, এবং এই ইস্যুতে আলোচনাকে আন্তর্জাতিকীকরণের  যে কোন প্রচেষ্টাকে তারা প্রত্যাখ্যান করছেন। ৩৭০ বাতিলের ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প যখন কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করার কথা বলেছিলেন, মোদী সরাসরি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, বরাবরে মতো সেই পুরনো বুলি আউড়িয়ে বলেছেন, কাশ্মীর ইস্যুতে যে কোন আলোচনায় কেবল মাত্র ভারত এবং পাকিস্তানই সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, আর কেউ নয়।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত মূল লেখাটির শিরোনাম Indias Bad Bet in Kashmir। লেখক রমেশ ঠাকুর জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্রফোর্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির এমেরিটার অধ্যাপক। ভাষান্তর কর্তৃক নিবন্ধটির প্রথম  অংশ বাংলায় অনূদিত এবং সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.