সেপ্টেম্বর 2019



আল জাজিরা:
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অচলাবস্থার নির্বাচনের পর ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে এমনটাই জানানো হয়েছে।
গত বুধবারে রাষ্ট্রপতি রিউভেন রিভলিন, নেতানিয়াহু এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের পর ঘোষণাটি এসেছে। বেনি গান্টজ “তীব্র দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন এক জন নেতার,নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ডানপন্থী লিকুদ পার্টির ৬৯ বয়সী নেতা নেতানিয়াহু, যিনি দেশটির সরবচেয়ে দীর্ঘকালীন নেতাও বটে, সরকার গঠনের জন্য তার হাতে ২৮ দিন সময় আছে। অবশ্য দরকার হলে রাষ্টপতির নিকট আরো দুই সপ্তাহ সময় চাইতে পারবেন।
তিনি ব্যর্থ হলে মধ্যপন্থী নীল-সাদা দলের নেতা গান্টজকে সুযোগ দেওয়া হবে।
টেলিভিশনে প্রচারিত মনোনয়ন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রিভলিন নেতানিয়াহুকে বলেন, “মহাশয়, আমি আপনাকে সরকার গঠনের সুযোগ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।”
রিভলিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা নেতানিয়াহু বলেন, সাবেক জেনারেল গান্টজের তুলনায় তার সাফল্যের সম্ভাবনা একটুখানি বেশি।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে এমন একটি পরিস্থিতির কথা কল্পনা করছিলেন, যেখানে তিনি এবং গান্টজ আরেক বার ক্ষমতা ভাগাভাগি করার সুযোগ পাবেন। যখন কিনা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে এসেছিল যে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে তৃতীয় আরেকটি নির্বাচন আয়োজন ছাড়া আর কোন উপায় নেই। উল্লেখ্য ইসরায়েলের অনেকেই তৃতীয় নির্বাচন চাচ্ছিলেন।
তিনি বলেছেন, “আমি যদি সফল না হই তাহলে আমি আপনার প্রস্তাব আপনার নিকট ফিরিয়ে দেব, ঈশ্বর, ইসরায়েলের জনগণ এবং আপনার সহযোগিতায় আমরা একটি সম্প্রসারিত জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করবো।”
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতানিয়াহুর সামনে এখনো পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠনের কোন স্পষ্ট উপায় নেই। এ বছরে দ্বিতীয় বারের মতো গত ১৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
লিকুদ পার্টি নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো ১২০ আসনের সংসদে ৬টি আসন কম থাকার কারণে সরকার গঠন করতে পারছে না। নতুন হিসাবনিকাশে লিকুদ পার্টির হাতে আছে ৫৫টি আসন, এর বিপরীতে নীল-সাদা দলের হাতে আছে ৫৪টি আসন।
নেতানিয়াহু ঐক্যের সরকারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে হুমকি এবং শিগগিরই ট্রাম্পের ঘোষিতব্য “শতাব্দির বন্দোবস্ত” বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পুনর্মিলন দরকার।
ট্রুম্যান ন্যাশনাল নিরাপত্তা প্রকল্পের অংশীদার এলিস জ্যাকবস বলে, রাষ্ট্রপতি নেতানিয়াহুকে দায়িত্ব দিয়েছেন কারণ তার নিকট মনে হয়েছে এটিই সবচেয়ে ভালো উপায়।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এই মুহূর্তে লিকুদ পাার্টির সকল মন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি অনুগত আছেন। কাজেই, নেতানিয়াহু যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হবেন এটি কষ্টকল্পিত হলেও অসম্ভব নয়।”
তিনি আরো যোগ করেন, “রাষ্ট্রপতির পদটি যদিও প্রতীকী, তবু রাষ্ট্রপতি এ বছরের মধ্যে ৩য় নির্বাচন এড়ানোর জন্য তার সাধ্যানুযায়ী সবকিছুই করবেন । আর তিনিও লিকুদ পার্টির সাবেক সদস্য।”

প্রতিবেদনটি আল জাজিরা ইংরেজি থেকে নেওয়া। মূল প্রতিবেদন পড়ুন।


ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বক্তব্য দিচ্ছেন, ছবি: রয়টার্স
ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বক্তব্য দিচ্ছেন, ছবি: রয়টার্স


আল জাজিরা ইংরেজি:
ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণকালে তার দেশএকটি আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে।
১৯৮০’র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ সূচনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি টেলিভিশন ব্ক্তৃতায় রুহানি বলেন যে ইরান তেহরানের নেতৃত্বে উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী অঞ্চলের বৈদেশিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই অঞ্চলের দেশ সমূহের প্রতি “বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের হাত” বাড়াবে। উল্লেখ্য হরমুজ প্রণালী পুরো দুনিয়ার তেল শিল্পের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বলে বিবেচিত হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সম্প্রতি এ অঞ্চলে সৈন্য বৃদ্ধির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় রুহানি উপসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক শক্তির উপস্থিতির বিরুদ্ধে হুশিয়ারি ঘোষণা করেন।
রুহানি বলেন, “বিদেশি সামরিক শক্তি আমাদের জনগণ ও অঞ্চলের অনিরাপত্তা এবং সমস্যার কারণ হতে পারে।” উল্লেখ্য রুহানি এই সপ্তাহের শেষের দিকে জাতিসংঘের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য নিউ ইয়র্ক সফর করবেন।
সৌদি তেলক্ষেত্রে হামলা
গত সপ্তাহে সৌদির অন্যতম বৃহৎ দুই তেল স্থাপনায় হামলার পর থেকে এ অঞ্চলে উত্তেজনা নতুস উচ্চতায় পৌছেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব আরামকোতে হামলার পিছনে ইরানকে দায়ী করছে, যদিও ২০১৫ সাল থেকে সৌদি-আমিরাত জোটের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এ হামলার দায় স্বীকার করেছেন।
ইরান এ হামলার সাথে কোন ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করছে।
এ হামলার পর ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা সৌদি ও আমিরাতে অস্ত্র ও কয়েক শত সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নৌপথ ও প্রধান প্রধান তেল বাণিজ্যপথসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আমিরাত, সৌদি, বাহরাইন, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে একটি নৌ জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
রুহানি তার বক্তব্যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিদেশি শক্তিদের দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন: “তারা যদি আন্তরিক হয়ে থাকে, তবে আমাদের অঞ্চলকে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বানানো তাদের জন্য উচিত হবে না।
তিনি আরো বলেন: “মার্কিনরা অথবা আমাদের শত্রুরা যেখানেই গেছে ... সেখানেই অনিরাপত্তা দেখা দিয়েছে।
“আমরা অন্যদের সীমান্ত লঙ্ঘন করতে যাবো না। একইভাবে অন্য কাউকেও আমাদের সীমান্ত লঙ্ঘন করার সুযোগ দেবো না।”

অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ”
ইরান এবং বিশ্বশক্তিসমূহের মধ্যে ২০১৫ সালে সাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাহার করার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকট দেখা দিয়েছিল, সৌদি আরবে হামলার ফলে সেটি আরো গভীর হয়েছে। এরপর থেকে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞাসমূহ আরোপ করেছে এবং ইরানের তেল রফতানি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।
এর জবাাবে ধীরে ধীরে তেহরান পরমাণু চুক্তির সকল প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত যে কোন ধরনের আলোচনার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করছে।
রুহানি তার বক্তব্যে নিষেধাজ্ঞাগুলোকে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, ইরানের “বিপ্লবী জনগণ” এ সকল হুমকিতে ভীত নয়।
তিনি আরো বলেন, “গত ৪০ বছর ধরে, এবং বিশেষত গত ১০ বছরে আমাদের জনগণ নিষেধাজ্ঞার চাপ সহ্য করতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরো যোগ করেন, “প্রতিরোধ, প্রজ্ঞা ও ঐক্যের মাধ্যমে ... ইরান অবশ্যই এই কঠিন সময় অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।”
________________________________

আল জাজিরা কর্তৃক “Iran to present regional security plan at UNGA: Rouhani” শিরোনামে মূল প্রতিবেদনটি প্রকাশিত। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

মিশরে সিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মিছিল
শুক্রবার রাতে মিশরে সিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মিছিল...


আল জাজিরা ইংরেজি:
রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার হাজার হাজার গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারী মিশরজুড়ে বিভিন্ন শহরে মিছিল করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার গভীর রাতে "জেগে উঠুন, ভয় নেই, সিসিকে অবশ্যই যেতে হবে" এবং "জনগণের দাবি, সরকারের পতন" প্রভৃতি স্লোগান দিচ্ছে।
রাজধানী কায়রো, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়া এবং সুয়েজে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
সাদা পোশাকধারী সেনা কর্মকর্তারা তাহরির চত্ত্বর অভিমুখী বিক্ষোভকারীদের মোকাবেলা করেন, যে চত্ত্বরে ২০১১ শুরু হওয়া আন্দোলনের ফলে হোসনি মুবারাকের পত ঘটেছিল।
মিশরের অভ্যন্তরে খবর সংগ্রহ আল জাজিরার জন্য নিষিদ্ধ, তবে রাজধানীতে বেশ কয়েকটি গ্রেফতার ও আন্দোলনকারীদের উপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে।
স্ব-নির্বাসিত মিশরীয় ব্যবসায়ী ও অভিনেতা মোহাম্মদ আলী রাষ্ট্রপতি এল-সিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনার পর থেকে এই বিক্ষোভগুলি শুরু হয়েছিল, আন্দোলনে জনগণকে রাস্তায় নেমে সিসির অপসারণের দাবি জানিয়েছে। এল-সিসি অভিযোগগুলিকে "মিথ্যা" বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবারে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে আলি বলেন, “সিসি যদি বৃহষ্পতিবারের মধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা না দেন, তবে মিশরীয় জনগণ শুক্রবার চত্ত্বরে বেরিয়ে আসবে
আলি সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ প্রথম ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন। তার সর্বশেষ ভিডিওটি লাখ লাখ বার দেখা হয়, এবং এর ফলে তিনি তার মাতৃভূমিতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে শুক্রবারে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে আলি জনগণকে শক্ত থাকার জন্য এবং অধিকার আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
আলি তার ভিডিও বার্তায় বলেন, আল্লাহ মহান, ইতোমধ্যে যথেষ্ট হয়েছে, আমি মিশরে ফিরতে চাই। আমি মিশর এবং আমার দেশের মানুষদের মিস কির। আল্লাহ আপনাদের সংকল্পকে দৃঢ়তা দান করুন।”
আল জাজিরার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ইহিয়া ঘানেম বলেন, তিনি "স্পষ্টতই" বিশ্বাস করেন যে শুক্রবারের বিক্ষোভ মিশরীয়দের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে।
তিনি বলেন, “মিশরে এখন যা চলছে তা আসলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আন্দোলন ... দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।”
লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ওয়াশিংটনস্থ সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির সিনিয়র ফেলো ডালিয়া ফহমি বলছেন, এসকল আন্দোল ২০১১ সালের বিপ্লব থেকে একেবারেই আলাদা।
ফাহমির মতে, যদিও জনগণ যে ভয়ের বাধা অতিক্রম করেছে তা ছিল বিস্ময়কর, তবে এটি প্রত্যাশিত ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা যদি আজকের জনগণের দিকে থাকাই, লাখ লাখ মানুষের বয়সের গড় কিন্তু ২৩। এখন এর থেকে আপনি যদি ৮ বাদ দেন, তাহলে বিপ্লবের সময় এদের গড় বয় দাঁড়ায় ১৫ বছল।”
যখন আপনার বেশির ভাগ মানুষ বিপ্লব পরবর্তী ট্রমার স্মৃতির মধ্যে বসবাস করছে না। ফলে এক দল তরুণকে আপনি দেখতে পাবেন, যারা বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া ও বিভিন্ন ধরনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসছে। ফলে আট বছর আগে যারা আন্দোলন করেছিল তারা আর এখন যারা আন্দোলন করছে তারা একেবারেই আলাদা।”
শুক্রবারের আন্দোলন একদম বিরল একটি গণবিক্ষোভ ছিল। ২০১৩ সালে মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মুরসিকে পদচ্যুত করে তারই প্রতিরক্ষামন্ত্রী এল-সিসি রাষ্ট্রপতি হওয়াার পর থেকে সব ধরনের অননুমোদিত বিক্ষোভকে বেআইনি ঘোষণা করেন।
তাৎক্ষণিক মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, ন্যাশনাল টিভি এই ঘটনাসমূহের খবর প্রচার করেনি।
সরকারপন্থী একটি টিভি চ্যানেলের উপস্থাপক অবশ্য বলেছেন যে, আন্দোলনকারীদের ছোট্ট একটি দল মধ্য কায়রোতে সমবেত হয়েছিল সেখান থেকে সরার পূর্বে ভিডিও ও সেলফি তোলার জন্য। আরেকটি সরকারপন্থী চ্যানেলের দাবি, তাহরির স্কোয়ারের আশপাশ এলাকার পরিস্থিতি শান্ত আছে।
২০১৪ সালে সিসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনৈতিক কৃচ্ছসাধন শুরু হয়েছে। মূলত ২০১১ সালের আরব বসন্তের পরের অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উন্নতির জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
জুলাই মাসে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে মিসরে প্রতি তিন জনে এক জন মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে যে, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে সিসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে “তার নিরাপত্তা বাহিনী ভয়-ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা, রাজনৈতিক বিরোধীদের এবং অ্যাক্টিভিস্টদের গ্রেফতারের অভিযান বৃদ্ধি করেছে।”
ইতোঃপূর্বে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা “মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর আক্রমণের” জন্য তাদের “গভীর উদ্বেগ প্রকাশ” করেছেন। তাদের উদ্বেগ প্রকাশের কারণসমূহের মধ্যে ছিল অসংখ্য ওয়েবসাইট ব্লক করা এবং বেআইনিভাবে সাংবাদিক ও বিরোধী মতাবলম্বীদের উপর হামলা চালানো ইত্যাদি।
সূত্র: আল জাজিরা ও অন্যান্য সংবাদ সংস্থা সমূহ
________________________________

আল জাজিরা ইংরেজি কর্তৃক প্রতিবেদনটি “In rare protests, Egyptians demand President el-Sisi's removal” শিরোনামে প্রকাশিত। সংযুক্ত ছবিটি রয়টার্সের ফটো সাংবাদিকের তোলা, যা আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




পশ্চিম তীরে আন্দোলনরত ফিলিস্তিনিরা

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯: ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীরা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে... ইসাম রিমাভি/আনাদুলু অ্যাজেন্সি

রাজা শেহাদেহ, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত সপ্তাহে সংসদীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি যদি পুনরায় নির্বাচিত হন, তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন।
তার এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ফিলিস্তিনির নিকট এই ঘোষণা কোন আলাদা অর্থ বহন করে না। আমরা বছরের পর বছর ধরে সহযোগিতার বিষয়ে বিবৃতি শুনে আসছি, অথচ কিছুই পরিবর্তন হয়নি। অসূরের যে রকম বিস্তৃতি ঘটছে, তাতে আমাদের অনেকেই এখন সোজা সাপ্টা কথা শুনতে পছন্দ করে। হারেৎজের কলামিস্ট গিডেওন লেভি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বিষয়ে সম্প্রতি যেমনটা লিখেছেন, “এ অঞ্চলের বাস্তবতাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে দিন, এ বাস্তবতা আর বেশি দিন লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। সত্য প্রকাশ করার সময় এসেছে।”
ইসরায়েল এমনিতেই পশ্চিম তীর সংযোজন করার সব ফায়দা তুলে নিচ্ছে, এ জন্য এই অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের দেখভালের কোন দায়-দায়িত্বও নিতে হচ্ছে না।
নেতানিয়াহু সাহেব নির্বাচনের প্রাক্কালে শুধুমাত্র তার ডানপন্থী সমর্থক গোষ্ঠীর মনোরঞ্জনের জন্য এই ওয়াদা দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক সংযোজন আসলে অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসরত ইসরায়েলিদের জন্য কোন বাস্তব পরিবর্তন বা অতিরিক্ত সুবিধা বয়ে আনবে না। এখনই ইসরায়েলি সরকার তাদের সাথে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসরতদের মতোই আচরণ করছে, তাদেরকে কর ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাড়ও দিচ্ছে।
মূলত এ কারণেই আমার পরিচিত বহু ফিলিস্তিনি এখন এক রাষ্ট্র সমাধানের কথা ভাবতে শুরু করেছে। কারণ পশ্চিম তীরে এতো বেশি সংখ্যক ইসরায়েলি বসতির উপস্থিতিতে দুই রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়ন করা এখন প্রায় অসম্ভব। বলার অপেক্ষা রাখে না, নেতানিয়াহুর আনুষ্ঠানিক সংযোজন পরিকল্পনাকে মনে মনে অনেক ফিলিস্তিনি এ জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছে, কারণ এর মধ্য দিয়ে এই লক্ষ্যের দিকে এগুচ্ছে।
ইসরায়েল সব সময়ই এই ভূমিই চেয়ে এসেছে তবে এর অধিবাসীদের ছাড়াই। এবং যে এলাকাটি নেতানিয়াহু দখল করার ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা খুব কমই। অধিগ্রহণের জন্য ঘোষিত অঞ্চলের বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি ইতোমধ্যে তাদের ভূমি হারিয়েছেন, এবং তারা আর কখনোই এই ভূমি ফেরত পাবেন না। তারা কেবলই ইসরায়েলি দখলদারদের সেবায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত থেকে নিন্দিত হবে।
কিন্তু নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ, অন্ততপক্ষে একটা বিষয় স্পষ্ট করবে: যদি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি ১৯৯৩ সালের ওসলো চুক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করবে। এই বিষয়টাকে বহু ফিলিস্তিনি সাধুবাদ জানাবে, কারণ অনেকেই এই চুক্তির প্রতি হতাশ। চুক্তি অনুসারে পশ্চিম তীরের বিষয়ে পিএলও এবং ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, নেতানিয়াহুর বর্তমান প্রস্তাবনা স্পষ্টতই সে চুক্তির লঙ্ঘন।
একটা সময় এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষে সমোঝতামুলক শান্তি ও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা অর্জিত হবে, এরকমটা প্রত্যাশা করা হতো। কিন্তু তার বদলে এই চুক্তির মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের সীমান্তের বাইরেও পুরো এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করছে।
১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর আগ পর্যন্ত, যখন তিনি বিরোধী দলে ছিলেন, তখন প্রকাশ্যে অসলো চুক্তির বিরোধিতা করতেন। কয়েক মেয়াদে ইসরায়েলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর নেতানিয়াহু এখন তার সমর্থকদের নিকট দাবি করতেই পারেন যে, তিনি পশ্চিম তীর দখল করার জন্য বিচক্ষণতার সাথে সব কিছু ঠিকটাক মতো করে যাচ্ছেন, পুরোপুরি দখল করার আগ পর্যন্ত। পশ্চিম তীরে অবিরত ইহুদি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি এ লক্ষকে এগিয়ে নিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের [১৭ সেপ্টেম্বর] নির্বাচনে ফিলিস্তিনিদের খুব একটা আগ্রহ নেই। নৃশংস ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে বসবাস করার অভিজ্ঞতার ফলে, নাকি অর্থনৈতিক দুরবস্থার ফলে এই নির্বাচন নিয়ে তারা অনাগ্রহী, আমি জানি না। যাই হোক না কেন, আমার ধারণা খুব কম ফিলিস্তিনিই মনে করে যে, কে নির্বাচিত হবে তার ফলে তাদের কিছু একটা যায় আসে। কোন প্রার্থীই ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা সম্পর্কে নিজের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেননি; এ বিষয়গুলো নির্বাচনী ইশতেহারে একেবারেই নেই। প্রায় দেড় বছর আগে গত নির্বাচনের পূর্বেও আমি একই কথা লিখেছিলাম।
যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে চলে আসে, তা হলো ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। নেতানিয়াহু সাহেব যখন ঘোষণা করলেন যে তিনি পশ্চিম তীরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভূমি দখল করবেন, তখন সবাই জানে যে এটি করার মতো মুরোদ তার আছে। কিন্তু মাহমুদ আব্বাস যখন ঘোষণা দিলেন যে, তিনি ওসলো চুক্তির মাধ্যমে তৈরি বিভক্তি তথাকথিত এ, বি ও সি অঞ্চলবাতিল করবেন। কারণ এর মাধ্যমে ইসরায়েল ষাট ভাগেরও বেশি অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সবাই জানে যে, তার আসলে এমনটা করার কোন ক্ষমতাই নাই।

তার চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, নেতানিয়াহু যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটি বাস্তবায়ন এবং তারপর সকল নিন্দা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথষ্ট পরিমাণ বিচক্ষণ একজন নেতা। খুব সম্ভব তিনি তার এ পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাইবেন যেড এটি তার দেশের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ছিল। সম্প্রতি তিনি তার এক ফেসবুক পোস্টে তার ভোটারদেরকে বলেছেন, আরবরা “আমাদের নারী, শিশু, পুরুষ, সকলকে ধ্বংস করতে চায়।” (পরবর্তীতে ফেসবুক তার অ্যাকউন্টের কিছু ফিচার স্থগিত করেছিল, কোম্পানির হেট-স্পিচ নীতিমালা লঙ্ঘনের শাস্তি স্বরূপ।) কাজেই নেতানিয়াহু পুনরায় নির্বাচিত হলে আমাদের দুই জাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুবই কম।
আবার, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান বেনি গান্টজও ফিলিস্তিনিদের জন্য খুব ভালো বিকল্প নয়। তিনি গত সপ্তাহে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো ইসরায়েল।” যেন ইসরায়েলে আরবরা ইসরায়েলিদের সমান মর্যাদা পাচ্ছে এবং আরবদের জন্য দ্বিতীয় সর্বোত্তম স্থান হলো পশ্চিম তীর” যেন ফিলিস্তিনি অথবা অন্য যে কোন মানুষের জন্য অর্ধ শতক ধরে বিদেশিদের দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাস করাটা খুব সুখকর অভিজ্ঞতা আরকি। সত্যের অপলাপ কতটুকু গভীর হতে পারে?!
নেতানিয়াহু একটা নির্লজ্জ। গান্টজ একটা অন্ধ। ফিলিস্তিনিরা এই নির্বাচন নিয়ে কোন আশার আলো দেখছে না। কীভাবে দেখতে পারে?
________________________________

লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য বিভাগে Israel Wants Palestines Land, but Not Its People শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা
ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা

রুওয়া শাহ, আল জাজিরা ইংরেজি:
২০১০ সালের ১১ জুন আমি আমার জীবনে প্রথমবারের মতো মাতৃভূমি কাশ্মীরের দুঃখজন ও সহিংস বাস্তবতার মুখোমুখি হই। যখন গুলির আওয়াজ শুনি, তখন আমি রাজধানী শ্রীনগরের ডাউনটাউন এলাকায় আমার টিউশন সেন্টার থেকে বেরুচ্ছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তায় আতঙ্ক ছেয়ে যায়, শত শত ছাত্র একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক দৌড়াতে শুরু করে।
আমিও আত্মগোপনের জন্য একটুখানি জায়গা খোঁজছিলাম, তখন এক তরুণের শরীর দেখতে পেলাম নিশ্চল পড়ে আছে। তার পুরো শরীর ছিল রক্তমাখা, চোখ ছিল গুলিবিদ্ধ। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সে মৃত।
পরে জানলাম, এই দেহটি ছিল শ্রীনগরের একটি প্রাইভেট স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র তোফায়েল মাট্টুর। ভারতীয় সৈনিক কর্তৃক খুব কাছে থেকে ছোড়া টিয়ার গ্যাসে সে নিহত হয়েছিল।
সমস্যার শুরু হয়েছিল মে মাসে, যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি জায়গায় তিন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশকারী “সন্ত্রাসী” দাবি করে হত্যা করে। কাশ্মীরিরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন, পুলিশ তার চেয়েও বেআইনি সহিংসতার মাধ্যমে এই আন্দোলন মোকাবেলা করে। কয়েক মাসের মধ্যে তারা ১০০ জন হত্যা করে, যাদের অনেকেই ছিলেন অল্পবয়স্ক শিক্ষার্থী।
মিলিয়ন মিলিয়ন কাশ্মীরির মতো আমিও ২০১০ সালের গ্রীষ্মকাল পরিবারের সাথে ঘরের ভিতরেই কাটিয়েছিলাম। তখন কারফিউ চলছিল, কেউ কারফিউ ভেঙে প্রতিবাদ করার দুঃসাহস দেখালে রাস্তায় পড়ে আহত কিংবা নিহত হওয়ার ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হতো।
গ্রীষ্মকাল শেষে কারফিউ প্রত্যাহার করা হলেঅ এবং ভারতীয় সরকার ও চ্যানেলসমূহ আমাদেরকে বললো যে, উপত্যকায় “শান্তি” ফিরে এসেছে। আমাদের জীবসন আবার “স্বাভাবিক” হলো।
কিন্তু আমি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাইনি। কিছু একটা একেবারেই বদলে গিয়েছিল। তোফয়েল হত্যাকাণ্ড ছিল আমার জন্য কাশ্মীর সংঘাতের সহিংসতার প্রথম সরাসরি অভিজ্ঞতা। এই প্রথমবার আমি উপলব্ধি করলাম, কাশ্মীরে বসবাসরত একজন তরুণ হিসেবে ঠিক কী ধরনের ঝুঁকিতে আমি আছি।
আসলে আমি যখন শিশু ছিলাম, তখন থেকেই ভারতীয় রাষ্ট্রের আচরণ ও নিরাপত্তার অজুহাতে কাশ্মীরে তাদের উপস্থিতি নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি নিজেকে করা একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে পেলাম: কেনা আমরা আজাদি চাই?
এবং আমিই একমাত্র ব্যক্তি নই, যে ২০১০ সালে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। পুরো একটি প্রজন্ম ভারতের নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছিলো, যা প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধের বীজ বপন করছিল।
ঐ বছর কোন এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এক দল ভারতীয় কর্মকর্তা কোন কারণ ছাড়াই, নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে তিন কাশ্মীরি কিশোরকে মারধর ও লাঞ্ছিত করেছিল। ঐ ঘটনার পর এদের মধ্য থেকেই একটি ছেলে প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর, ১৫ বছর বয়সী ছেলেটি তার গৃহত্যাগ করে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী দলে যোগ দেয়। তার নাম ছিল বুরহান ওয়ানি।
প্রায় ছয় বছর পর ২০০৬ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হত্যা করে।
তখন থেকে তিনি একজন জনপ্রিয় বিদ্রোহী কমান্ডার এবং কাশ্মীরি সশস্ত্র সংগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটিতে পরিণত হন। ওয়ানির মৃত্যুর ফলে পুরো উপত্যকায় পাঁচ মাস ধরে আন্দোলন বিস্তার লাভ করেছিল, সে সময় এক শতাধিক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।
এ আন্দোলনের ফলাফল সম্পর্কে আমি আমার দাদা সৈয়দ আলি শাহ গিলানির সাথে কথা বলছিলাম, যিনি অল পার্টিজ হুররিয়াক কনফারেন্স (এপিএইচসি) নেতা এবং ২০১০ সাল থেকে তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “বুরহান এবং অন্য যে সকল তরুণ ভারতের বিরুদ্ধে বন্দুক হাতে তোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির জন্য ভারতই দায়ী।”
২০১০ সালে কাশ্মীরে সশস্ত্র দলগুলোতে যোগদানকারী একমাত্র তরুণ যে বুরহান, তা কিন্তু নয়। আরো অনেকেই একই কাজ করেছিল, যাদের বেশির ভাগই দক্ষিণ কাশ্মীরের। ভারতের নৃশংসতা ও নির্যাতনই তাদেরকে এরকম করতে উৎসাহিত করেছে। এবং বুরহান নিজে যখন নিহত হয়েছিলেন, তখন সেটাও কিন্তু কাশ্মীরের নতুন একটি প্রজন্মকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিতে উৎসাহিত করেছিল।
এদিকে ভারতীয় সকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আন্দোলনের নেতাদেরকে দমন করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমার বাবা আলতাফ আহমাদ শাহ ২০১৭ সালে আরো অনেক কাশ্মীরি নেতার সাথে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিন স্বাধীনতাবন্থী এপিএইচসি নেতা। তারা প্রকাশ্যে সশস্ত্র আন্দোলন বর্জন করা সত্ত্বেও এরকমটি হয়েছিল।
এটা আসলে আমাদের করণীয়ন নয়। এটা বরং আত্মহত্যা করার সমতূল্য, শৈশবে সশস্ত্র প্রতিরোধের মতো জটিল বিষয়ে আমার যখন বাবার সাথে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি এরকমটাই বলছিলেন। আমি যখন তাকে এর বিকল্প উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, “আমাদেরকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সকল সম্ভাব্য উপায়ে আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে।”
আমার বাবার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং “ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তৈরির ষড়যন্ত্র”র অভিযোগ আনা হয়েছে, তাকে নয়া দিল্লীর তিহার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়, আজ অবধি তিনি সেখানেই আছেন।
কাশ্মীরের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন, এমন যে কারো নিকট এটি স্পষ্ট যে এসকল গ্রেফতার মূলত কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কণ্ঠস্বরগুলো ভেঙে ফেলার জন্য ভারতীয় সরকারের পদক্ষেপ মাত্র।
আজ, আমি মনে করি, এসকল গ্রেফতার আসলে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের জন্য ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এভাবেই যে কোন শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই দমন করে।
আগস্টে ভারতীয় রাষ্ট্র আবারো কাশ্মীরের জনগণের ‍উপর তাদের বর্বরতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। আমি এখন বিদেশে থাকি, এখান থেকে আমাকে দেখতে হচ্ছে কীভাবে আমার আত্মীয়-স্বজন পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিচ্ছেন। নির্মম নির্যাতন এখনো অব্যহত আছে, তাই এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীর পুরোপুরি গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে।  
৪০ দিন আগে আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলেছিলাম। আমার এক প্রতিবেশী কাশ্মীর থেকে পালিয়ে নয়া দিল্লীতে গিয়েছেন, তাঁর কাছ থেকে খবর পেয়েছি যে “বাড়ির সবাই ভালো আছেন।” তিনি আমার নিকট আমার মায়ের রেকর্ডকৃত ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন, যেটিতে মা আমাকে শক্ত থাকতে বলেছেন।
এই সকল সহিংসতা এবং কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করার ফলস্বরূপ একটি অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এসবের ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদই কাশ্মীরের মূলধারায় পরিণত হবে।
বছরের পর বছর ধরে ভারত ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) এবং পিপলস ডেমক্র্যাটিক পার্টির মতো স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নিকট থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে, এমনকি যারা ভারতীয় সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছিলেন, তারাও হয়তো কারাগারে, নয়তো গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। বিষয়টা এমন নয় যে, এসকল দল ঠিকটাক মতো কাশ্মীরি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে, কিংবা তাদের অনুভূদি ধারণ করছে, কিন্তু অন্ততপক্ষে ভারতের কিছু মানুষ ছিল যারা তাদের পক্ষে কথা চালিয়ে যেতে পারে।
এখন, সকল কাশ্মীরি নেতাকে কারারুদ্ধ করেছে, এমনকি তাদের মধ্যে এমন অনেকেও আছেন যারা ভারতের সাথে কাজ করতে চান। এসবের পর নয়া দিল্লী সরকার কাশ্মীরের জনগণের সাথে যে কোন গঠনমূলক সংলাপের সুযোগই শেষ করে ফেলেছে।
আমার অনেক তরুণ কাশ্মীরি বন্ধু আছে, যারা এক সময় অন্তর থেকে নিজেদেরকে ভারতীয় মনে করতেন। এখন তারা তাদের মন পরিবরত্ন করছেন বলে মনে হচ্ছে।
আমার এক বান্ধবী এক সময় এনসি প্রধান ফারুক আব্দুল্লার সাথে তার একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিল, সেখানে তাকে কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠ নেতা” আখ্যায়িত করেছিল, এখন সে বলে যে ৫ আগস্ট যা ঘটেছে, তার জন্য সে সকল মূলধারার কাশ্মীরি নেতাকে দায়ী মনে করে। সে আমাকে বলছে, “তারা সকলেই বিক্রি হয়ে গেছেন এবং আমাদের আর করার কিছুই নেই।
বছরের পর বছর ধরে ভারত সরকার এটা নিশ্চিত করছে যে, কাশ্মীরের প্রতিটি নতুন প্রজন্ম যেন দখলদারদের নৃশংসতার সাক্ষী হয়, এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর মাধ্যমে কাশ্মীরে প্রতিরোধের নতুন ঢেউ তৈরি করছে। এই প্রজন্ম হয়তো ভারতের সাথে স্বাধীনতার চেয়ে কম কোন কিছুর বিনিময়ে সমোঝতা করতে কখনোই রাজি হবে না।
২০১০ সালের ঘটনার পর থেকে প্রতি বছরই আমরা এ ধরনের শিরোনাম পড়ে থাকি: “কাশ্মীর আরেকটি সহিংস বছর কাটালো” কিংবা “আবারো উত্তপ্ত কাশ্মীর” অথবা “অশান্ত হতে পারে কাশ্মীর।”
এবছরও এরকম বিদ্রোহই প্রত্যাশিত। যাই হোক, এর বিপরীতে ভারতীয় সরকার বহু সেনা প্রেরণ করলেও এসব কখনোই কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ দমন করতে পারবে না। সরকার ৫ আগস্ট যা করেছে, তা কোন কাশ্মীরিই গ্রহণ মেনে নেবে না।

এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং আল জাজিরার সম্পাদকীয় অবস্থান এতে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে India's aggression is fuelling Kashmiri resistance শিরোনামে প্রকাশিত। লেখিকা রুওয়া শাহ তুরস্কে সিনেমা ও টেলিভিশন নিয়ে পড়াশুনা করছেন। এর আগে তিনি ভারতে সাংবাদিকতা করতেন। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



জাসমিন এম. এল গামাল, প্রজেক্টি সিন্ডিকেট:
ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে বহুপাক্ষিক ঐক্যের চর্চা হয় প্রধানত দুইটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এদের একটা হচ্ছে আরব লীগ, যা আরব বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি বড় জোট। আরেক প্রতিষ্ঠান হলো গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি), যা মুখ্যত অর্থনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়েই কাজ করে। এ দুটি সংস্থার ইতিহাস, গুরুত্বের জায়গা ও সদস্যপদ এসব জায়গায় অনেক পার্থক্য আছে ঠিকই, তবে দুটি সংস্থাই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আরব বিশ্বের ঐক্যবদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ ইসরায়েলের বিরোধিতার মতো ইস্যুর কথা বলা যেতে পারে।
গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত আরব দেশগুলোকে একটি সাধারণ অবস্থানে নিয়ে এসেছিল, তারা সকলেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় থেকে আরব দেশগুলোর সামনে তিনটি বিরোধপূর্ণ বিষয় চলে এসেছে, এগুলো হলো- ক. ইরানভীতি; খ. আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান; এবং গ. রাজনৈতিক ইসলামের (কিংবা ইসলামিজমের) উত্থান।
এই বিষয়গুলোর উত্থান আরব বিশ্বের ঐতিহ্যগত জোটগুলোকে ছিন্ন করে ফেলেছে, এবং এ অঞ্চলের বহুপাক্ষিক সহযোগিতামূলক পরিস্থিতি একেবারে শিথিল করে ফেলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের, কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে যুক্তরাষ্টের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
প্রথমত, সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও সক্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গুরুতর হুমকি বলে মনে করে। একদিকে সৌদি-আমিরাত, আরেক দিকে ইরান এরকম একটা ক্রমবর্ধমান শত্রুতা উভয়পক্ষের ঐতিহ্যগত বিরোধী শক্তি ইসরায়েলের বিরোধিতাকে ভালোই ধাক্কা দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অনেকগুলো আরব সরকার ইসরায়েলের সাথে অভূতপূর্ব সম্পর্ত জোরদার করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র ইরানের হুমকি প্রতিহত করার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে আরব-ইসরায়েল এই সহযোগিতামূলক কার্যক্রম চলছিলো পর্দার আড়ালে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ইরান বিরোধী” ওয়ার্সাও সম্মেলনে এই কার্যক্রম হঠাৎ জনম্মুখে চলে আসে, বরং বলা চলে বিস্ফোরিত হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু এই সম্মেলনে আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে সম্মেলনের প্রশংসা করেন। এই সম্পর্ক দিনে দিনে আরো শক্ত হতে থাকবে, কেননা সৌদি এবং ইরানের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং প্রক্সি যুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থান এখনো চলমান আছে।
দ্বিতীয়ত, সিরিয়া ও লিবিয়ায় সহিংস সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জিহাদি সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, মিসর, তিউনিসিয়া, জর্দান এবং আরো কয়েকটি দেশে বিভিন্ন হামলায় জিহাদিরা জড়িয়ে পড়ে, এবং এর ফলে আরব লীগের দেশসমূহ একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লিবিয়ার তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফী ২০১১ সালের শুরুর দিকে একটি জনপ্রিয় আন্দোলন দমন করেছিলেন, তখন আরব লীগ লিবিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করে, এবং পরবর্তীতে ঐ বছরই আরব লীগ সক্রিয়ভাবে ন্যাটো ও লিবিয়ান বিদ্রোহী কর্তৃক গাদ্দাফীর উচ্ছেদে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দেয়।
এরপরই, সিরীয় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসীদেরকে সক্রিয় করার পিছনে ভূমিকা রাখার জন্য অভিযুক্ত করা হলো, এবং সিরিয়াকে বহিষ্কার করা হলো। এখন সিরিয়ার সদস্যতার বিষয়ে আরবলীগ দ্বিধাবিভক্ত। অনেকগুলো সুন্নী রাষ্ট্র খুব কড়া বিরোধিতা করছে। তাদের কথা হলো, আসাদ ইরানকে এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করার এবং লেবাননের হেযবুল্লাহর মতো শিয়া মিলিশিয়াগুলোকে শক্তিশালী করার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা তাদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য ইরাকি ও তিউনিসিয়ান সরকার সিরিয়াকে পুনরায় লীগে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছে।
সবশেষে, আরব বসন্তের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান আঞ্চলিক বিভক্তিকে আরো জোরদার করেছে। ইসলামিস্টদের উত্থানের উদাহরণ হিসেবে মিসর ও তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোতে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়ের কথা বলা যেতে পারে। ইসলামপন্থীদের উত্থানের ভয়ে মিসর, সৌদি এবং আমিরাতি শাসকগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো সংগঠনগুলোর উত্থান ঠেকাতে সমন্বিত ও নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো, ২০১৩তে মিসরের প্রথম  নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসিকে সেনাবাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা, যিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন। আরব দেশগুলো মুরসিকে উচ্ছেদ করার বিষয়েও বিভক্ত ছিল, সৌদি-আমিরাত জোট এর সমর্থনে থাকলেও কাতার প্রবল বিরোধিতা করেছিল।
এই তিনটি বিষয় যে শুধু আরবলীগকে ধ্বংস করেছে, তা নয়, বরং অর্থনৈতিক জোট জিসিসিকেও শেষ করে দিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সৌদি, বাহরাইন, আমিরাত এবং জিসিসির বাইরের মিসর ২০১৭ সাল থেকে কাতারের উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। তাদের অভিযোগ, কাতার সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছে এবং তার রাজধানী দোহাকে এ অঞ্চলের বিতাড়িত ইসলামিস্টদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতারের ঘনিষ্ট সম্পর্কও আঞ্চলিক উত্তেজনার আরেক কারণ।
কাকতালীয়ভাবে, আরবের ঐতিহ্যবাহী বহুপাক্ষিক সম্পর্কের পতনের সাথে সাথে ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিও পরিবর্তিত হয়েছে। ট্রাম্পের পূর্বসূরী বারাক ওবামা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক ও জোট গঠনে গুরুত্ব দিতেন, যার কারণে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি ও লিবিয়াতে ন্যাটোর নেতৃত্বে সামরিকস অভিযান সম্ভব হয়েছিল। ঠিক তার বিপরীতে, ট্রাম্প বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর নেতিবাচক মনোভাব নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করছেন এবং সমমনা অংশীদারদে সাথে (এবং একইভাবে শত্রুদের সাথেও) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এছাড়াও তার প্রবল ইরান বিরোধী অবস্থানের দরুণ যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে পুরোপুরি ইরান বিরোধী ব্লকের সদস্যতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই হাবভাবের দরুণ আরব সরকারসমূহ আরব লীগ এবং জিসিসির মাধ্যমে বিস্তৃত সহযোগিতামূলক জোট না করে বিশেষ বিশেষ আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে নিজেদের মূল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপেক্ষাকৃত সংকোচিত পরিমণ্ডলে সহযোগিতামূলক জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে ফেলছে। আরব ঐক্যের ক্ষীণ সম্ভাবনা আরো ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে।
________________________________

প্রবন্ধটি Is Arab Unity Dead? শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।





প্যারিস, পলিটিকো:
মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থাকে একেবারে ওলট-পালট করে ফেলছেন, কিন্তু তা র আমেরিকা ফার্স্ট নীতিকে ফরসি রাষ্ট্রপতি অ্যামানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিদের সুবিধা মতো কাচে লাগাচ্ছেন।
গত কয়েক মাসে ম্যাক্রোঁ সাহেব বৈশ্বিক পর্যায়ে তার সক্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছেন, ইইউর সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, ইরানে ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু করেছেন, ইউক্রেনে পুনরায় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করেছেন এবং অন্ততপক্ষে সাত জাতির মধ্যে ঐক্যটুকু ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, যা তাঁর দুই পূর্বসূরী পারেন নাই।
ফরাসি রাষ্ট্রপতি বিশ্বকূটনীতিতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, সেটার আংশিক ভিত্তি হচ্ছে এই যে, ট্রাম্প ও পুতিনের মতো বদমেজাজি জুটিকে ঘাঁটাঘাঁটি করার মতো আত্মবিশ্বাস স্পষ্টতই তার রয়েছে।
ম্যাক্রোঁ তার বিদেশনীতি অনুযায়ী যে সকল আক্রমণ চালাচ্ছেন, শেষ পর্যন্ত তার কোন একটিতেও তিনি চুড়ান্ত সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হবেন কি না, সে কথা বলার সময় এখনো হয়নি। এখন অবধি তার হাতে দেখানোর মতো বাস্তবসম্মত ফলাফল খুব একটা নেই। ইতোপূর্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে (ইরান পারমাণবিক চুক্তি অথবা পরিবেশ বিষয়ে) কিংবা পুতিনের বিরুদ্ধে (সিরিয়া এবং সাইবারযুদ্ধ বিষয়ে) জয়ী হওয়ার জন্য তিনি যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা খুব বেশি দূর পর্যন্ত এগুতো পারেনি, এবং শ্বেতভবন-কর্তার টুইট-ক্ষোভ থেকে তাঁকে বাঁচাতেও পারেনি।
লিবিয়াতে তিনি দুটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো থেকে সংবাদপত্রের শিরোনাম হওয়ার চেয়ে বেশি খুব একটা কিছু তিনি অর্জন করতে পারেননি। শুধু যে লিবিয়ার পরিস্থিতির কোন উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাই নয়; বরং উল্টো অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তা তার এসব উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন।
তা সত্ত্বেও, যেই ম্যাক্রোঁ সাহেব ২০১৭তে যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন তখন বিদেশনীতিসমূহকে তার অন্যতম দূর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই তিনি বহুপাক্ষিক অঙ্গনসমূহ থেকে ট্রাম্পের পশ্চাদপসরণ, ব্রিটেনের ব্রেক্সিটাতঙ্ক এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে ফ্রান্সের কূটনৈতিক সক্ষমতার স্মারক হিসেবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন, যদিও তিনি এখনো মার্কিন শক্তির সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।
ফ্রান্সের ভূমিকা হলো মধ্যস্থতাকারী শক্তি হওয়া ... আমাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো আমারা প্রত্যেকের সাথে কথা বলি ... এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্যকরী সমাধান বের করে আনার চেষ্টা করি,” বিয়ারিতজে  জি৭ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদেরকে ম্যাক্রোঁ এসব কথা বলেছিলেন।
ফ্রান্সের অবশ্যই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে দেশটির অবস্থান, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য পদ, সব মিলিয়ে ফ্রান্স অন্য অনেক দেশের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, এমনকি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জার্মানিও এক্ষেত্রে ফ্রান্সের সমকক্ষ নয়।
কিন্তু ম্যাক্রোঁ তার অবস্থানকে আরো এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন।
শুধুই ২০১৫ সালের প্যারিস পরিবেশ চুক্তির সময় থেকেই ফ্রান্স আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এরকম কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে না,” অবসরপ্রাপ্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত মিশেল ডুক্লোস বলছেন, যিনি রাশিয়া, নিউ ইয়র্ক এবং সিরিয়ায় দায়িত্ব পালন করেছেন, এবং বর্তমানে ফ্রেঞ্চ থিংকট্যাংক মন্টেইনে ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত আছেন।
এখন অবধি, যুক্তরাষ্ট্রের শূন্যস্থান পূরণে ম্যাক্রোঁ প্রচেষ্টা নিয়ে জার্মানি, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি ইউরোপীয় শক্তিগুলো উদ্বিগ্ন নয়। বরং এসব দেশের কোন কোন কূটনীতিবিদ তো ম্যাক্রোঁর এই প্রচেষ্টার প্রশংসাই করছেন।
উচ্চপর্যায়ের এক ব্রিটিশ কূটনীতিক বলেন, “ম্যাক্রোঁ এই স্থানটি দখল করছেন, এবং তিনি নতুন চিন্তা নিয়েই এসেছেন।”
আরেক জার্মান কূটনৈতিক কর্মকর্তা বলছেন, “ঝুঁকি নেওয়ার কেউ না কেউ থাকেই, এবং সেই জি-৭’র প্রেক্ষাপটে লাভবান হয়েছে।”
ঐ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে এক পাশে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন, এমনকি নেতৃবৃন্দ বৈঠকে থাকা অবস্থায় তিনি যখন আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফকে বিয়ারিতজ যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, তখনও তিনি ট্রাম্পকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও ট্রাম্প আশেপাশেই ছিলেন। অ্যামাজন ইস্যুতেও তিনি ব্রাজিলিয়ান রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠক করে সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আপাত দৃষ্টিতে ঐ সম্মেলনের বাস্তব ফলাফল ছিল খুবই সামান্য অ্যামাজনের জন্য সহায়তা এবং ডিজিটাল ট্যাক্সের বিষয়ে সীমিত অগ্রগতি ইত্যাদি এই ফলাফলের অন্তর্ভুক্ত। তবে দীর্ঘমেয়াদে ম্যাক্রোঁর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার বিচার হবে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারা-না পারার ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, ইউক্রেন দ্বন্দ্বের সমাধান প্রভৃতি ইস্যু ম্যাক্রোঁর সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে পরিগণিত হবে।
________________________________

পলিটিকো ম্যাগাজিনে প্রকাশিত In a Trump world, diplomacy is being conducted in French (again) শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রথম অংশের অনুবাদ। ছবি পলিটিকোর সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.