আরব ঐক্যের দিন শেষ?



জাসমিন এম. এল গামাল, প্রজেক্টি সিন্ডিকেট:
ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে বহুপাক্ষিক ঐক্যের চর্চা হয় প্রধানত দুইটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এদের একটা হচ্ছে আরব লীগ, যা আরব বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি বড় জোট। আরেক প্রতিষ্ঠান হলো গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি), যা মুখ্যত অর্থনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়েই কাজ করে। এ দুটি সংস্থার ইতিহাস, গুরুত্বের জায়গা ও সদস্যপদ এসব জায়গায় অনেক পার্থক্য আছে ঠিকই, তবে দুটি সংস্থাই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আরব বিশ্বের ঐক্যবদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ ইসরায়েলের বিরোধিতার মতো ইস্যুর কথা বলা যেতে পারে।
গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত আরব দেশগুলোকে একটি সাধারণ অবস্থানে নিয়ে এসেছিল, তারা সকলেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় থেকে আরব দেশগুলোর সামনে তিনটি বিরোধপূর্ণ বিষয় চলে এসেছে, এগুলো হলো- ক. ইরানভীতি; খ. আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান; এবং গ. রাজনৈতিক ইসলামের (কিংবা ইসলামিজমের) উত্থান।
এই বিষয়গুলোর উত্থান আরব বিশ্বের ঐতিহ্যগত জোটগুলোকে ছিন্ন করে ফেলেছে, এবং এ অঞ্চলের বহুপাক্ষিক সহযোগিতামূলক পরিস্থিতি একেবারে শিথিল করে ফেলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের, কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে যুক্তরাষ্টের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
প্রথমত, সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও সক্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গুরুতর হুমকি বলে মনে করে। একদিকে সৌদি-আমিরাত, আরেক দিকে ইরান এরকম একটা ক্রমবর্ধমান শত্রুতা উভয়পক্ষের ঐতিহ্যগত বিরোধী শক্তি ইসরায়েলের বিরোধিতাকে ভালোই ধাক্কা দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অনেকগুলো আরব সরকার ইসরায়েলের সাথে অভূতপূর্ব সম্পর্ত জোরদার করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র ইরানের হুমকি প্রতিহত করার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে আরব-ইসরায়েল এই সহযোগিতামূলক কার্যক্রম চলছিলো পর্দার আড়ালে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ইরান বিরোধী” ওয়ার্সাও সম্মেলনে এই কার্যক্রম হঠাৎ জনম্মুখে চলে আসে, বরং বলা চলে বিস্ফোরিত হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু এই সম্মেলনে আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে সম্মেলনের প্রশংসা করেন। এই সম্পর্ক দিনে দিনে আরো শক্ত হতে থাকবে, কেননা সৌদি এবং ইরানের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং প্রক্সি যুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থান এখনো চলমান আছে।
দ্বিতীয়ত, সিরিয়া ও লিবিয়ায় সহিংস সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জিহাদি সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, মিসর, তিউনিসিয়া, জর্দান এবং আরো কয়েকটি দেশে বিভিন্ন হামলায় জিহাদিরা জড়িয়ে পড়ে, এবং এর ফলে আরব লীগের দেশসমূহ একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লিবিয়ার তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফী ২০১১ সালের শুরুর দিকে একটি জনপ্রিয় আন্দোলন দমন করেছিলেন, তখন আরব লীগ লিবিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করে, এবং পরবর্তীতে ঐ বছরই আরব লীগ সক্রিয়ভাবে ন্যাটো ও লিবিয়ান বিদ্রোহী কর্তৃক গাদ্দাফীর উচ্ছেদে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দেয়।
এরপরই, সিরীয় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসীদেরকে সক্রিয় করার পিছনে ভূমিকা রাখার জন্য অভিযুক্ত করা হলো, এবং সিরিয়াকে বহিষ্কার করা হলো। এখন সিরিয়ার সদস্যতার বিষয়ে আরবলীগ দ্বিধাবিভক্ত। অনেকগুলো সুন্নী রাষ্ট্র খুব কড়া বিরোধিতা করছে। তাদের কথা হলো, আসাদ ইরানকে এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করার এবং লেবাননের হেযবুল্লাহর মতো শিয়া মিলিশিয়াগুলোকে শক্তিশালী করার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা তাদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য ইরাকি ও তিউনিসিয়ান সরকার সিরিয়াকে পুনরায় লীগে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছে।
সবশেষে, আরব বসন্তের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান আঞ্চলিক বিভক্তিকে আরো জোরদার করেছে। ইসলামিস্টদের উত্থানের উদাহরণ হিসেবে মিসর ও তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোতে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়ের কথা বলা যেতে পারে। ইসলামপন্থীদের উত্থানের ভয়ে মিসর, সৌদি এবং আমিরাতি শাসকগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো সংগঠনগুলোর উত্থান ঠেকাতে সমন্বিত ও নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো, ২০১৩তে মিসরের প্রথম  নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসিকে সেনাবাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা, যিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন। আরব দেশগুলো মুরসিকে উচ্ছেদ করার বিষয়েও বিভক্ত ছিল, সৌদি-আমিরাত জোট এর সমর্থনে থাকলেও কাতার প্রবল বিরোধিতা করেছিল।
এই তিনটি বিষয় যে শুধু আরবলীগকে ধ্বংস করেছে, তা নয়, বরং অর্থনৈতিক জোট জিসিসিকেও শেষ করে দিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সৌদি, বাহরাইন, আমিরাত এবং জিসিসির বাইরের মিসর ২০১৭ সাল থেকে কাতারের উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। তাদের অভিযোগ, কাতার সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছে এবং তার রাজধানী দোহাকে এ অঞ্চলের বিতাড়িত ইসলামিস্টদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতারের ঘনিষ্ট সম্পর্কও আঞ্চলিক উত্তেজনার আরেক কারণ।
কাকতালীয়ভাবে, আরবের ঐতিহ্যবাহী বহুপাক্ষিক সম্পর্কের পতনের সাথে সাথে ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিও পরিবর্তিত হয়েছে। ট্রাম্পের পূর্বসূরী বারাক ওবামা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক ও জোট গঠনে গুরুত্ব দিতেন, যার কারণে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি ও লিবিয়াতে ন্যাটোর নেতৃত্বে সামরিকস অভিযান সম্ভব হয়েছিল। ঠিক তার বিপরীতে, ট্রাম্প বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর নেতিবাচক মনোভাব নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করছেন এবং সমমনা অংশীদারদে সাথে (এবং একইভাবে শত্রুদের সাথেও) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এছাড়াও তার প্রবল ইরান বিরোধী অবস্থানের দরুণ যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে পুরোপুরি ইরান বিরোধী ব্লকের সদস্যতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই হাবভাবের দরুণ আরব সরকারসমূহ আরব লীগ এবং জিসিসির মাধ্যমে বিস্তৃত সহযোগিতামূলক জোট না করে বিশেষ বিশেষ আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে নিজেদের মূল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপেক্ষাকৃত সংকোচিত পরিমণ্ডলে সহযোগিতামূলক জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে ফেলছে। আরব ঐক্যের ক্ষীণ সম্ভাবনা আরো ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে।
________________________________

প্রবন্ধটি Is Arab Unity Dead? শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.