ইসরায়েলের দরকার ফিলিস্তিনের ভূমি, মানুষের দরকার নাই...


পশ্চিম তীরে আন্দোলনরত ফিলিস্তিনিরা

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯: ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীরা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে... ইসাম রিমাভি/আনাদুলু অ্যাজেন্সি

রাজা শেহাদেহ, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত সপ্তাহে সংসদীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি যদি পুনরায় নির্বাচিত হন, তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন।
তার এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ফিলিস্তিনির নিকট এই ঘোষণা কোন আলাদা অর্থ বহন করে না। আমরা বছরের পর বছর ধরে সহযোগিতার বিষয়ে বিবৃতি শুনে আসছি, অথচ কিছুই পরিবর্তন হয়নি। অসূরের যে রকম বিস্তৃতি ঘটছে, তাতে আমাদের অনেকেই এখন সোজা সাপ্টা কথা শুনতে পছন্দ করে। হারেৎজের কলামিস্ট গিডেওন লেভি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বিষয়ে সম্প্রতি যেমনটা লিখেছেন, “এ অঞ্চলের বাস্তবতাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে দিন, এ বাস্তবতা আর বেশি দিন লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। সত্য প্রকাশ করার সময় এসেছে।”
ইসরায়েল এমনিতেই পশ্চিম তীর সংযোজন করার সব ফায়দা তুলে নিচ্ছে, এ জন্য এই অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের দেখভালের কোন দায়-দায়িত্বও নিতে হচ্ছে না।
নেতানিয়াহু সাহেব নির্বাচনের প্রাক্কালে শুধুমাত্র তার ডানপন্থী সমর্থক গোষ্ঠীর মনোরঞ্জনের জন্য এই ওয়াদা দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক সংযোজন আসলে অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসরত ইসরায়েলিদের জন্য কোন বাস্তব পরিবর্তন বা অতিরিক্ত সুবিধা বয়ে আনবে না। এখনই ইসরায়েলি সরকার তাদের সাথে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসরতদের মতোই আচরণ করছে, তাদেরকে কর ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাড়ও দিচ্ছে।
মূলত এ কারণেই আমার পরিচিত বহু ফিলিস্তিনি এখন এক রাষ্ট্র সমাধানের কথা ভাবতে শুরু করেছে। কারণ পশ্চিম তীরে এতো বেশি সংখ্যক ইসরায়েলি বসতির উপস্থিতিতে দুই রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়ন করা এখন প্রায় অসম্ভব। বলার অপেক্ষা রাখে না, নেতানিয়াহুর আনুষ্ঠানিক সংযোজন পরিকল্পনাকে মনে মনে অনেক ফিলিস্তিনি এ জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছে, কারণ এর মধ্য দিয়ে এই লক্ষ্যের দিকে এগুচ্ছে।
ইসরায়েল সব সময়ই এই ভূমিই চেয়ে এসেছে তবে এর অধিবাসীদের ছাড়াই। এবং যে এলাকাটি নেতানিয়াহু দখল করার ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা খুব কমই। অধিগ্রহণের জন্য ঘোষিত অঞ্চলের বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি ইতোমধ্যে তাদের ভূমি হারিয়েছেন, এবং তারা আর কখনোই এই ভূমি ফেরত পাবেন না। তারা কেবলই ইসরায়েলি দখলদারদের সেবায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত থেকে নিন্দিত হবে।
কিন্তু নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ, অন্ততপক্ষে একটা বিষয় স্পষ্ট করবে: যদি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি ১৯৯৩ সালের ওসলো চুক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করবে। এই বিষয়টাকে বহু ফিলিস্তিনি সাধুবাদ জানাবে, কারণ অনেকেই এই চুক্তির প্রতি হতাশ। চুক্তি অনুসারে পশ্চিম তীরের বিষয়ে পিএলও এবং ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, নেতানিয়াহুর বর্তমান প্রস্তাবনা স্পষ্টতই সে চুক্তির লঙ্ঘন।
একটা সময় এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষে সমোঝতামুলক শান্তি ও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা অর্জিত হবে, এরকমটা প্রত্যাশা করা হতো। কিন্তু তার বদলে এই চুক্তির মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের সীমান্তের বাইরেও পুরো এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করছে।
১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর আগ পর্যন্ত, যখন তিনি বিরোধী দলে ছিলেন, তখন প্রকাশ্যে অসলো চুক্তির বিরোধিতা করতেন। কয়েক মেয়াদে ইসরায়েলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর নেতানিয়াহু এখন তার সমর্থকদের নিকট দাবি করতেই পারেন যে, তিনি পশ্চিম তীর দখল করার জন্য বিচক্ষণতার সাথে সব কিছু ঠিকটাক মতো করে যাচ্ছেন, পুরোপুরি দখল করার আগ পর্যন্ত। পশ্চিম তীরে অবিরত ইহুদি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি এ লক্ষকে এগিয়ে নিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের [১৭ সেপ্টেম্বর] নির্বাচনে ফিলিস্তিনিদের খুব একটা আগ্রহ নেই। নৃশংস ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে বসবাস করার অভিজ্ঞতার ফলে, নাকি অর্থনৈতিক দুরবস্থার ফলে এই নির্বাচন নিয়ে তারা অনাগ্রহী, আমি জানি না। যাই হোক না কেন, আমার ধারণা খুব কম ফিলিস্তিনিই মনে করে যে, কে নির্বাচিত হবে তার ফলে তাদের কিছু একটা যায় আসে। কোন প্রার্থীই ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা সম্পর্কে নিজের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেননি; এ বিষয়গুলো নির্বাচনী ইশতেহারে একেবারেই নেই। প্রায় দেড় বছর আগে গত নির্বাচনের পূর্বেও আমি একই কথা লিখেছিলাম।
যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে চলে আসে, তা হলো ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। নেতানিয়াহু সাহেব যখন ঘোষণা করলেন যে তিনি পশ্চিম তীরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভূমি দখল করবেন, তখন সবাই জানে যে এটি করার মতো মুরোদ তার আছে। কিন্তু মাহমুদ আব্বাস যখন ঘোষণা দিলেন যে, তিনি ওসলো চুক্তির মাধ্যমে তৈরি বিভক্তি তথাকথিত এ, বি ও সি অঞ্চলবাতিল করবেন। কারণ এর মাধ্যমে ইসরায়েল ষাট ভাগেরও বেশি অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সবাই জানে যে, তার আসলে এমনটা করার কোন ক্ষমতাই নাই।

তার চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, নেতানিয়াহু যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটি বাস্তবায়ন এবং তারপর সকল নিন্দা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথষ্ট পরিমাণ বিচক্ষণ একজন নেতা। খুব সম্ভব তিনি তার এ পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাইবেন যেড এটি তার দেশের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ছিল। সম্প্রতি তিনি তার এক ফেসবুক পোস্টে তার ভোটারদেরকে বলেছেন, আরবরা “আমাদের নারী, শিশু, পুরুষ, সকলকে ধ্বংস করতে চায়।” (পরবর্তীতে ফেসবুক তার অ্যাকউন্টের কিছু ফিচার স্থগিত করেছিল, কোম্পানির হেট-স্পিচ নীতিমালা লঙ্ঘনের শাস্তি স্বরূপ।) কাজেই নেতানিয়াহু পুনরায় নির্বাচিত হলে আমাদের দুই জাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুবই কম।
আবার, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান বেনি গান্টজও ফিলিস্তিনিদের জন্য খুব ভালো বিকল্প নয়। তিনি গত সপ্তাহে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো ইসরায়েল।” যেন ইসরায়েলে আরবরা ইসরায়েলিদের সমান মর্যাদা পাচ্ছে এবং আরবদের জন্য দ্বিতীয় সর্বোত্তম স্থান হলো পশ্চিম তীর” যেন ফিলিস্তিনি অথবা অন্য যে কোন মানুষের জন্য অর্ধ শতক ধরে বিদেশিদের দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাস করাটা খুব সুখকর অভিজ্ঞতা আরকি। সত্যের অপলাপ কতটুকু গভীর হতে পারে?!
নেতানিয়াহু একটা নির্লজ্জ। গান্টজ একটা অন্ধ। ফিলিস্তিনিরা এই নির্বাচন নিয়ে কোন আশার আলো দেখছে না। কীভাবে দেখতে পারে?
________________________________

লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য বিভাগে Israel Wants Palestines Land, but Not Its People শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।
[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.