করাতের দাঁতে গণতন্ত্র...



ড্যানি রডরিক, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
মোহাম্মদ হানিফের রাঙা পাখি (Red Birds) উপন্যাসে এক মার্কিন বোমারু বিমান আরবের কোন এক মরুভূমিতে বিধ্বস্ত হয় বিমানটির পাইলট বিপদে পড়ে আশ্রয় নিলেন স্থানীয় একটি শরণার্থী শিবিরে। তো, তিনি স্থানীয় এক দোকানদারের সাথে চোরদের নিয়ে গল্প করছিলেন, গল্পের এক পর্যায়ে বললেন, আমাদের সরকার হলো সবচেয়ে বড় চোর। এই চোর জীবীতদের নিকট থেকেও চুরি করে, আবার মৃতদের নিকট থেকেও চুরি করে। একথা শুনে দোকানদার বললেন, আল্লাহর শুকরিয়া। আমাদের এখানে এই সমস্যাটা নাই। আমরা কেবল একে অপরের জিনিসপত্র চুরি করি।
এই ছোট্ট গল্পটিতে ড্যারন আচেমোগ্লু ও জেমস রবিনসনের নয়া কেতাব The Narrow Corridor: States, Societies, and the Fate of Libertyএর সংক্ষিপ্তসার ফুটে ওঠেছে। আচেমোগ্লু ও রবিনসনের তত্ত্ব হলো স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির সম্ভাবতনা যেন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আর আইনহীনতা ও সহিংসতার মধ্যে ভারসাম্যের করাতের দাঁতের মাঝখানে পড়ে আছে, যা প্রায়শ সমাজ নিজেই নিজের উপর আরোপ করে। রাষ্ট্রকে সমাজের উপর অতিমাত্রায় ক্ষমতা প্রদান করলে রাষ্ট্র স্বৈরচারী হয়ে পড়ে, আবার রাষ্ট্রকে দূর্বল করে রাখলে সে রাষ্ট্রে নৈরাজ্য দেখা দেয়।
বইটির শিরোনম থেকেই ইশারা পাওয়া যায়, এই দুই নৈরাজ্যকর অবস্থার মাঝখানে আছে কেবল একটি সরু গলি। এই সংকীর্ণ পথটি খোঁজে পেতে সক্ষম হয়েছে হাতে গোণা কয়েকটি রাষ্ট্র, এর মধ্যে বেশির ভাগই হলো পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশ। তাছাড়া পথটি খোছজে পাওয়া মানেই এই পথের উপর অটল থাকতে পারা নয়। (অনেক দেশ পথ খোঁজে পেয়ে আবার হারিয়ে ফেলে।-অনুবাদক) আচেমোগ্লু এবং রবিনসন যে বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করেছেন তা হলো নাগরিক সমাজ যদি সদা সচেতন না থাকে এবং সম্ভাব্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম না হয়, তাহলে সবসময় স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
আচেমোগ্লু ও রবিনসন নতুন বইটি মূলত তাদের পূর্ববর্তী বহুল আলোচিত Why Nations Fail বইটির উপর ভিত্তি করে লিখেছেন। ঐ বইটি এবং তাদের অন্য বিভিন্ন লেখায় তারা স্পষ্ট করেছেন যে তারা কেন মনে করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ” (inclusive institutions)ই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। এসকল প্রতিষ্ঠান (উদাহরণস্বরূপ সম্পত্তির অধিকারের নিশ্চয়তা এবং আইনের শাসন ইত্যাদি।) সকল (অথবা বেশির ভাগ) নাগরিকের নিকট সহজলভ্য হতে হবে, এবং এগুলো কোন বাছাইকৃত ছোট একটি গোষ্ঠীকে সমাজের অপরাপর সদস্যদের উপর কোন ধরনের প্রাধান্য দিতে পারবে না।
একটি দেশ অবশ্য ইতোমধ্যে এই দুই পণ্ডিতের তত্ত্বটিকে কিছুটা সমস্যায় ফেলে দিয়েছে, সেই দেশটি হলো চীন। কারণ সেখানে কম্যুনিস্ট পার্টি অব চীনের রয়েছে একচেটিয়া রাজনৈতিক আধিপত্য, রয়েছে প্রচণ্ড রকমের দুর্নীতি, পার্টির অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরা সেখানে ব্যাপক হারে নিপীড়িত হয়ে থাকেন, এক কথায় চীনে অন্তর্ভুক্তিমুলক প্রতিষ্ঠানের কোন বালাই নেই বললেই চলে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এটি অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে গত চল্লিশ বছরে চীন অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি হাসিল করেছে, ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণে দারিদ্র্য বিমোচন করতে সক্ষম হয়েছে।
Why Nations Fail গ্রন্থে আচেমোগ্লু ও রবিনসন দাবি করেছেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহের পথ ছেড়ে না দেয়, তাহলে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি গতি হারিয়ে ফেলবে।
দ্য নিউ করিডোর বইয়ে তারা তাদের এ মতটিকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করেছেন। তারা চীনকে চিহ্নিত করেছেন এমন একটি দেশ হিসেবে, যেখানে কিনা প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে রাষ্ট্র সমাজকে কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করছে। সরু গলিপথের বাইরে এতো বেশি দিন কাটানোর ফলে এখন এই গলিপথে ফিরে আসাটা তাদের জন্যে বেশ কঠিন। ফলে রাজনৈতিক সংস্কার কিংবা ধারাবাহিক অব্যাহত অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কোনটার সম্ভাবনাই খুব একটা নেই।
––––––––––––––––––––––––––––––
নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক আংশিক অনূদিত, সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে ছবি সংগৃহীত। লেখক ড্যানি রডরিক হার্ভার্ডের জন এফ, কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক। প্রচেক্ট সিন্ডিকেটে এটি Democracy on a Knife-Edge শিরোনামে প্রকাশিত।

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.