আরববিশ্বেরও একটি ‘ব্রেক্সিট বিতর্ক’ দরকার



সামি মাহরূম, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
গত তিন বছর ধরে বিশ্ববাসী বিস্ময়ের সাথে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরুনোর দিনক্ষণ গণনা দেখে আসছে। প্রচলিত ভাষায় যেটাকে বলা হয় ব্রেক্সিট। ইইউ থেকে বেরিয়ে আসলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার কথা। তবু, একজন আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিষয়টি দেখা হয়, তাহলে বলা যায় যে, যুক্তরাজ্যের এই প্রলম্বিত ব্রেক্সিট বিতর্ক আসলে ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার চিহ্ন নয়। বরং উল্টো বলতে হয় যে, যুক্তরাজ্যের মত রাজনৈতিক পরিপক্কতাসম্পন্ন একটি দেশই কেবল এরকম বড় ধরনের আইনি, ব্যবসায়িক এমনকি গত অর্ধ শতাব্দি ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্কের ফাটলজনিত ধকল সহ্য করতে পারে।
অন্যদিকে, আরব বিশ্ব ১৯৪৮ সালের পর থেকে ব্রেক্সিটের মত অন্তত একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছে, এবং সেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফাটল আর কখনোই ঠিক হবে বলে মনে হয় না। এ ধরনের ঘটনার প্রথম পর্ব হলো ইসরায়েলের আত্মপ্রকাশ, এবং এর ফলে সে ভূমিতে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি গড়ে উঠে, নিজেদের সেই ভূখণ্ড থেকে “ফিলিস্তিনি ব্রেক্সিট”। এতো ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক ফিলিস্তিন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে, আর এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর নিয়তি হয়ে পগে দশকের পর দশক শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা। পুরো আরব অর্থনীতি স্থিমিত হয়ে পড়লো, এবং ইসরায়েলকে তার আরব প্রতিবেশীরা বয়কট করলো।
তারপর ১৯৫২ থেকে সত্তুর অবধি জামাল আব্দেল নাসেরের নেতৃত্বে মিসর অর্থনীতির জাতীয়করণে মনযোগ দেয়, সেসময় তারা আমদানির বদলে দেশীয় পণ্যের ব্যবহারে যথাসাধ্য গুরুত্বারোপ করে, ফলে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে দেশটির বাণিজ্যিক সম্পর্ক দূর্বল হয়ে পড়ে। এরপর আব্দেল নাসেরের উত্তরসূরী আনোয়ার সাদাত যখন ১৯৭৯ সালে ইসরায়েলের সাথে শান্তিচুক্তি রচনা সাক্ষর করলেন, তখন আরব দেশগুলো শাস্তিস্বরূপ মিসরের উপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ আরোপ করে।
একই সময়ে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া এবং আলজেরিয়া সহ আরও বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় আরব রাষ্ট্র সোভিয়েত অর্থনৈতিক মডেল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বেসরকারী খাতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫ টি প্রজাতন্ত্রের সোভিয়েত প্রভাবিত আরব রাষ্ট্রগুলো কিন্তু নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চালু রাখেনি, বরং ইরাক এবং সিরিয়ার মতো কয়েকটি রাষ্ট্র উল্টা একে অপরের উপর অবরোধ আরোপ  করলো।
আরব বিশ্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি তখনো ভেঙেও পড়েনি, আবার পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণও হতে পারেনি। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ভূরাজনীতি এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে আরো বড় ক্ষতির সম্মুখীন করলো। ১৯৯০ সালে ইরাকি সৈন্যরা কুয়েতে আক্রমণ করে দেশটি দখল করে ফেলে, আরববিশ্বের এর ফলে সবচেয়ে গতিশীল অর্থনীতির দেশটি তাদের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে বসলো। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইরাক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লো, এবং এই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী কুয়েতের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিল।  এবং অবশ্যই, সেই ধারাবাহিকতার ফলেই, ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকে আক্রমণ করে দখল করে, যে সিদ্ধান্তটি এ অঞ্চলের শৃঙ্খলাকে চুড়ান্ত অশান্তিতে নিমজ্জিত করে, এবং আজ অবধি যার প্রভাব এ অঞ্চলে বিদ্যমান।
২০১০ থেকে ২০১৬ সালের আরব বসন্ত চলাকালে এ অঞ্চল আরেকটি উত্তেজনাপূর্ণ ব্রেক্সিটের মতো ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এসময় বিভিন্ন দেশ (তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, এবং, ঘটনাক্রমে ইরাকও) বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তি চায়, যে ব্যবস্থা হয়তো অবৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে। এদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আলজেরিয়-মরক্কো সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ে, কাতারের সাথে কয়েকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ইরান অর্থনৈতিকভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
আরব “ব্রেক্সিটে আগমণ ঘটে ছোটখাট সতর্কবার্তা, আলোচনা-সংলাপ, সংসদীয় আলোচনা বা সংবাদ মাধ্যমের বিতর্কে মাধ্যমে, এবং সাধারণত কয়েক দশক ধরে সেটা চলমান থাকে। কিন্তু “স্ব-আরোপিত” এসকল অর্থনৈতিক দুর্যোগের ফলাফল্খেন স্পষ্টতই বেদনাদায়ক।
প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন আরব দেশে রাস্তায় বিক্ষোভ, অবরোধ এবং সহিংসতা থেকে মনে হয় যে হিসাব-নিকাশ মেলানোর চুড়ান্ত মুহূর্ত বোধ এসে গেছেএই বিশৃঙ্খলা নিয়ে আসতে পারে দোসরা আরব বসন্ত, আশা করি, এবারের আরব বসন্ত ক্ষমতার চেয়ে সমৃদ্ধির উপর বেশি গুরুত্বারোপ করবে
––––––––––––––––––––––––––––
লেখক সামি মাহরূম ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাসেলসের অধ্যাপক। এই লেখাটি The Arab World Needs a Brexit Debate শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষিপ্তরূপে অনূদিত, এবং সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে ছবিটি সংগৃহীত।


[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.