জাকারবার্গ সমীপে খোলা চিঠি : দুনিয়া জুড়ে মুসলিম বিদ্বেষের ইঞ্জিন ফেসবুক



মেহদি হাসান, দি ইন্টারসেপ্ট:

প্রিয় মার্ক জাকারবার্গ,
আপনার কী হলো?
গত ২০১৫ সালে ডিসেম্বরে আপনি মুসলিমবিদ্বেষের বিরুদ্ধে জোরেশুরে গর্বের সাথে বলেছিলেন, আমি আমার কমিউনিটির এবং সারা দুনিয়ার মুসলমানদের সমর্থনে আমার কণ্ঠস্বরও যুক্ত করতে চাই, আপনি তখন একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, তার দুই দিন পর রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্র্রাম্প দেশে মুসলমানদের প্রবেশ পুরোপুরি এবং সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন আপনি আরো লিখেছিলেন, প্যারিস হামলার পর মুসলিমরা অন্যের কাজের শাস্তি নিয়ে কতটা ভীতির মধ্যে আছে, আমি কেবল তা কল্পনা করতে পারি
এরপর নিউ ইয়র্ক টাইমসের শিরোনাম কী হয়েছিল মনে আছে? ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ মুসলিম ব্যবহারকারীদের আশ্বস্ত করলেন
যদিও এখন আমরা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আছি চার বছর পর এখন আপনি এবং আপনার ফেসবুক মুসলমানদের আশ্বস্ত করার বদলে বরং আমাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা গোঁড়ামি বাড়ানোর কাজ করছেন আপনি এখন অভিনেতা সাচা ব্যারন কোহেনের ভাষায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রোপাগান্ডার মেশিন হিসেবে আপনার ফেসবুককে ব্যবহার করতে দিচ্ছেন, যা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত কয়েকটি মুসলিম কমিউনিটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে এবং শাস্তি দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে
শুরুতেই বলে নিই, মার্ক, একটি সত্যিকারের গণহত্যায় জড়িয়ে পড়তে কেমন অনুভূতি হয়?
আমি অবশ্যই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যার কথা বলছি ২০১৮ সালের মার্চ মাসে মিয়ানমারে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত মিশনের চেয়ারম্যান মার্জুকি ড্যারুসম্যান সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে আপনাদের মতো সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলো সহিংসতায় নির্ধারক ভূমিকা পালন করছিলো, এবং বিদ্বেষ, মতানৈক্য সহিংসতার পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছিল
মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইয়াংহি লি এর সাথে যোগ করেন, মিয়ানমারে সবকিছুই হয়েছিল ফেসবুকের মাধ্যমে, আমার ভয় হচ্ছে ফেসবুক এখন পাশবিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে, যদিও মূলত ফেসবুকের এরকম কোন অভিপ্রায় ছিল না
মার্ক, আপনি এই সবকিছুই জানেন সত্যি বলতে কী, আপনার কোম্পানি সেটা স্বীকারও করেছে ২০১৮ সালের নভেম্বরে আপনার নিজের উৎপাদন নীতি ব্যবস্থাপক অ্যালেক্স ওয়ারোফকা স্বীকার করেছেন যে, আপনি এবং আপনার সহকর্মীগণ এই প্লাটফর্মকে মিয়ানমারে বিভক্তির উসকানি প্রদান এবং অফলাইন সহিংসতাকে প্ররোচিত করা থেকে বিরত রাখতে যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করেন নি
আর আপনি তখন কী করেছেন? ওয়ারোফকা দাবি করছেন, ফেসবুক মিয়ানমারে হেট স্পিচ চিহ্নিত করার প্রোঅ্যাক্টিভ ডিটেকশনের উন্নয়ন করেছে যদিও মিয়ানমারের প্রতি বিশেষ নজর রাখা অলাভজনক মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা মথি স্মিথ এর সাথে দ্বিমত করে আমাকে বলেন: ফেসবুকের অনেক কিছুই করার আছে হ্যাঁ, আপনার কোম্পানি মিয়ানমারের জন্য শতাধিক কন্টেন্ট রিভিউয়ার নিয়োগ করেছে, কিন্তু দেশে ২০ মিলিয়নেরও বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে স্মিথ যেমনটা বলছেন, এখন অবধি যে সকল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা প্লাটফর্মটির অপব্যবহার সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়
তিনি আরো বলছিলেন, জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব পরিস্থিতির গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয় কোম্পানির উচিত রোহিঙ্গাদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণের চিন্তা করা
ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পর্কে কী বলবেন? মার্ক, তাদের পরিণতির পরও কি আপনি সঠিক অবস্থায় আছেন? যদি না হয়, কেন নয়? অক্টোবরে অলাভজনক অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক আভাজ তাদের এক প্রতিবেদনে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলী প্রদেশ আসামে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর মেগাফোন বলে ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে  যে আসামের প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষের (যাদের বেশির ভাগই মুসলিম) নাগরিকত্ব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কট্টর ডান হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার বাতিল করেছে
গত জুনে ভাইস নিউজের সংবাদ অনুসারে, সাউথ এশিয়ান হিউম্যান রাইটস গ্রুপ ইকুয়ালিটি ল্যাবের অপর একটি প্রতিবেদন বলছে: ভারতে ফেসবুকের ইসলামবিদ্বেষী পোস্টগুলোই হেটস্পিচের সবচেয়ে বড় উৎস, যা মোট ধরনের কন্টেন্টের ৩৭ শতাংশ
আপনি বিষয়ে কিছুই বলেন নি, বা কিছুই করেন নি যদিও আপনি মো!দির সাথে বারবার সাক্ষাৎ করেছেন ঘটনাক্রমে তিনিই সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ফলোয়ারের অধিকারী বিশ্বনেতা! আপনি আপনার মা-বাবাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমি অবাক হই: মোদি সরকারের কাশ্মীর লকডাইনের প্রেক্ষিতে ফেসবুক কর্তৃক যার হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভ করে দেওয়া হয়েছে, আপনি কী এমন কোন মুসলিমকে আপনার মা-বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন?
শ্রী লঙ্কার মুসলিমদের কী অবস্থা? কলম্বো ভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠণ যখন আপনার কোম্পানিকে বিভিন্ন ইসলাম বিদ্বেষী ভিডিও সম্পর্কে জানিয়েছিল, এসব পোস্টের মধ্যে একটিতে এরকম ঘোষণাও ছিল, সকল মুসলিমকে হত্যা করো, এমনকি একটি শিশুকেও বাঁচিয়ে রেখো না নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে সব পোস্ট সম্পর্কে একই উত্তর এসেছিল: এই কন্টেন্ট ফেসবুকের স্ট্যান্ডার্ড লংঘন করেনি আপনার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সকল শ্রীলঙ্কান মুসলিমকে হত্যার আহ্বান, আপনাকে একটুও ভাবায় নি? আপনি একটুও বিচলিত হন নি?
আমরা যেন চীনের উইঘুর মুসলিমদের কথা ভুলে না যাই এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে জিনজিয়াং প্রদেশে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী করে রাখা হয়েছে, যেখানে তাদেরকে প্রহার করা হচ্ছে, শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে এমনকি বাজফিড নিউজ গত আগস্টে প্রতিবেদন বের করেছে, কীভাবে চীনের সরকার মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলো ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে উইঘুরদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে
আপনি কি ফেসবুক দিয়ে বিশেষজ্ঞরা যেটাকে বলছেন সাংস্কৃতিক গণহত্যা সেটার প্রচারণা করে খুশি আছেন?
এরপর আসেন যুক্তরাষ্ট্রের কথায় ২০১৮ সালের মে মাসে সাউদার্ন পোভার্টি সেন্টারের একটি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয় যে, কীভাবে মুসলিমবিদ্বেষী কন্টেন্ ফেসবুকে জায়গা পাচ্ছে রিভিলে সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এসেছে, ফেসবুক শ্বেত জাতীয়তাবাদী সংগঠনসমূহের সাথে জড়িত গোষ্ঠীগুলোকে রিমোভ করছে ... ... সামাজিক মাধ্যম এখনো মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায়, DEATH TO ISLAM UNDERCOVER. এর মতো এমন গোষ্ঠীগুলোকে জায়গা দেওয়া অব্যহত রেখেছে
মার্ক, আপনি সব কিছুই জানেন আপনি অজ্ঞতার দোহাই দিতে পারেন না
আবারো বলছি, মার্ক আপনি সবই জানেন আপনি অবশ্যই জানেন আপনি অজ্ঞতার দোহাই দিতে পারেন না আপনি সম্প্রতি নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী মুসলিম অ্যাডভোকেটসের ফারহানা খেরাকে আপনার গৃহে আতিথেয়তা আতিথেয়তা করেছেন তিনি বললেন যে তিনি আপনাকে জানিয়েছেন, “যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে ফেসবুক কীভাবে মুসলিমদের কষ্টের কারণ হচ্ছে সে সম্পর্কেতার ব্যাক্তিগত সাক্ষ্য আপনাকেএকটুও প্রভাবিত করেনি?
এরপর, এর আগে আপনি ফক্স নিউজের উপস্থাপক টাকার কার্লসনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যিনি একদা ইরাকিদেরকে অর্ধ শিক্ষিত আদিম বানরবলতেন, আপনি আরো আতিথেয়তা করেছেন ডেইলি ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা বেন শাপিরোর, যিনি মিথ্যাভাবে দাবি করেছেন যে, পৃথিবীর বেশির ভাগ মুসলিমেই উগ্রপন্থী গতমাসে আপনি রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে গোপনীয় নৈশভোজ করেছেন, এবং সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছেন (চার বছরে কত পার্থক্য হতে পারে!)
–––––––––––––––––––––––––––––––––
দি ইন্টারসেপ্টে মেহদি হাসানের মূল লেখাটি Dear Mark Zuckerberg: Facebook Is an Engine of Anti-Muslim Hate the World Over. Dont You Care শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত, ছবি সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.