বিশারা মারওয়ান, আল জাজিরা:
আফগানিস্তানে আক্রমণ করার দুই দশক পর যুক্তরাষ্ট্র  এখন অনিবার্য পরিণতির দিকে এগুচ্ছে, সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেযুদ্ধে তালিবানদের সাথে না পেরে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত এক সময় যাদেরকে আমেরিকানদের রক্তে রঞ্জিত সন্ত্রাসী মৌলবাদী খুনী বলে আখ্যায়িত করতো, তাদের সাথে সামরিক সমাধানের আশা বাদ দিয়ে সংলাপ মেনে নিয়েছে
গত বছর ফাঁস হওয়াআফগান পেপার্সশীর্ষক গোপন  নথি থেকে জানা যায়, দীর্ঘ দিন ধরে মার্কিন  জনগণকে বুঝানো হচ্ছিল যে সবকিছুই ঠিকটাক আছে, যদিও বাস্তবে কিছুই ঠিকটাক চলছিল না ১৯৭১ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিতপ্যান্টাগন পেপার্সের মতোই”, এবারের নথি থেকেও বুঝা যায় যে যুদ্ধে আফগানরা অজেয়, তাদের সাথে জেতা সম্ভব না, যুক্তরাষ্ট্রের কোন মতে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র
এই পরিপ্রেক্ষিতে দোহায় তালিবানদের সাথে সাক্ষরিত চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষত কিছুটা প্রশমিত করেছে বটে, তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক ছাড় দিতে হয়েছে, তাই এই চুক্তি আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় মিত্রদের জন্য প্রচণ্ড হতাশাজনক
সফলভাবে ব্যর্থ হওয়ার কাহিনি
যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের জন্য তালিবানদের হাতের মুঠো থেকে কাবুল স্বাধীনকরতে মাত্র দুই মাস লেগেছিল, তার দুই বছরেরও কম সময়ে ২০০৩ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যেগুরুতর সামরিক কার্যক্রমসমাপ্ত হয়েছে একই দিনে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন ইরাক যুদ্ধমিশন সম্পন্নহয়েছে
অন্তত সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে আল-কায়েদাকে চূর্-বিচূর্ণ করতে পেরেছিল, এবং ২০১১ সালে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যাও করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে মার্কিন সামরিক কৌশল তালিবানকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়
আল-কায়েদাকে ধ্বংস করার পর বিজয় উদযাপনের পরিবর্তে নিউ ইয়র্ক এবং ওয়াশিংটন তালিবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল কিন্তু এরপর আফগানিস্তানের মাটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে চুরাবালিতে পরিণত হয় দেশটির শক্ত পাথুরে ভূমি, গোত্রপ্রথা আর কঠোর তালিবান যোদ্ধাদের কারণে আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের নিকট অজেয় হয়ে ওঠে
সংঘাতের দ্বিতীয় দশকে তালিবান আরো বেশি শক্তিশালী মারমুখীহয়ে ওঠে, এবং মার্কিন বাহিনি, তাদের জোট আফগান মিত্রদেরকে চওড়া মূল্য দিতে হয় ১৮ বছরের যুদ্ধ শেষে ,৪০০ মার্কিন সৈন্য ১৫০,০০০রও বেশি আফগান নিহত হওয়ার পর, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নেয় এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র অন্ততপক্ষে এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এই যুদ্ধে কারো কারো মতে এই পরিমাণ দুই ট্রিলিয়ন ডলার অংকটি আফগানিস্তানের মোট জিডিপির চেয়ে হাজার গুণ বেশি
এই সময়ের মহাপরাক্রমশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি স্থানীয় আফগান যোদ্ধাদের নিকট হেরে আরো একবার প্রমাণ করলো যে বিশাল সাম্রাজ্য যখন তুলনামূলক দূর্বল কোন প্রতিপক্ষের সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করে, তখন তারাও দূর্বল হয়ে পড়ে ভিয়েতনাম ইরাকের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে পরাজিত হলো, যে যুদ্ধ কিনা আগের সবগুলোর চেয়ে দীর্ঘতর ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সামনে এখন একটাই প্রশ্ন কীভাবে সম্ভাব্য অবমাননা এড়িয়ে সবচেয়ে ভালো উপায়ে সর্বশেষ হেলিকেপ্টারটি নিয়ে পালিয়ে আসা যায়
মুখরক্ষা
চলমান জান-মাল-সম্মান হারানো বন্ধ করার জন্য দুই বছর আগে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তালিবানের সাথে অনেকটা তাদের শর্তানুসারেই সংলাপ মেনে নেয়যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছিল তালিবান প্রথমে আফগান সরকারের সাথে আলোচনায় বসে দেশ সরকার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌছাক, কিন্তু তালিবান নেতারা কাবুলেমার্কিন পুতুলসরকারের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কোন ধরনের আলোচনার পূর্বে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে তারা সরাসরি ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনায় বসার উপর জোর দেয়
যুক্তরাষ্ট্র তালিবানদের কথা মেনে নেয়, কিংবা আফগানিস্তানে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রিয়ান ক্রোকারের ভাষায় বলা চলে, আত্মসমর্পণ করে এরপর দেড় বছর ধরে দোহায় তালিবানদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যায় গত সেপ্টেম্বরে এক আত্মঘাতী হামলায় এক মার্কিন সৈন্য নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প সাহেব আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত করার পরও শেষ পর্যন্ত আলোচনা এগিয়ে যায়। ফলস্বরূপ, গত সপ্তাহে একটা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, অন্ততনীতিগত পর্যায়েহলেও
সাক্ষর করার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত এক সপ্তাহের জন্য তালিবানকে সহিংসতা হ্রাস করার জন্য বলে, যাতে সকল সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপর তালিবানের কর্তৃত্ব প্রমাণিত হয় তালিবান সে প্রস্তাবে রাজি হয় সেই সাথে আফগানিস্তানের আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় না দেওয়ার অঙ্গীকারও করে
কিন্তু  সশস্ত্র গোষ্ঠী আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ডেমক্র্যাটিক কিংবা লিবারেল, এরকম বিশেষ মার্কিন গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং কাবুলের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনার পূর্বে তাদের দলের সকল কারান্তরীণ সদস্যদের মুক্তি দাবি  করে
কোন দলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের প্রাধান্য নয়, বরং মাঠের শক্তির ভারসাম্যই আরেকবার প্রতিফলিত হয় কূটনীতিতে আসলে এটি সকল বিদেশি শক্তির হাত থেকে মুক্ত আফগানিস্তানের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, এখানে কোন যদি, কিন্তু, সম্ভবত নেই
নির্বাচনী হিসাব
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার শাসনামল শুরু করেছিলেন কড়া কথা বলে, হুমকি-ধামকি দিয়ে, এমনকি আফগানিস্তানে কোটি কোটি মানুষ হত্যার হুমকি দিয়ে কিন্তু তালিবান নেতারা এসব কথায় কাবু হননি তারা তখন বলেছিলেন ট্রাম্পের এসব ধাপ্পাবাজির ফলে উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাবে, বলেছিলেন যে তারা বিশ্বাস করেন সময় এখন তাদের পক্ষে আছে
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন এখন কড়া নাড়ছে, তাই ট্রাম্প সাহেব এখন চুক্তি সাক্ষরের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি এমনকি ক্যাম্প ড্যাভিড সামিটের মতো কিছু একটা করার চিন্তা-ভাবনাও করছিলেন, কিন্তু তালিবান তার সে ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মধ্যে বহু গুণের অভাব থাকতে পারে, কিন্তু জেদের কোন ঘাটতি নেই তিনি ইতিমধ্যে তার ওয়াদা পালনে দৃঢ়তা প্রমাণ করেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে এসে, মেক্সিকোর সীমান্তের দেওয়াল নির্মাণ করে, ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে এখন তিনি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য (অবশ্যই এর মধ্যে আফগানিস্তানও আছে) থেকে মার্কিন সামরিক পদচারণা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিশেষত উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানকে ভয় দেখানোর জন্য অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করার পর এটি জরুরি হয়ে পড়েছে
এই চুক্তি যদি কার্যকর হয়, তবে এটি হবে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন, কারণ মার্কিন জনগণ যথাশিগগিরই আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধের সমাপ্তি চায় ওবামা প্রশাসন এর আগে সৈন্য প্রত্যাহারের চেষ্টা করেছিল, কাছাকাছিও চলে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি কাজেই ট্রাম্পের জন্য এটা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের নির্বাচনী সম্বল হতে পারে
––––––––––––––––––––––––––––––
নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতেHas Trump surrendered Afghanistan to the Taliban?শিরোনামে প্রকাশিত ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত