ভারত শাসিত কাশমিরে শিক্ষার জন্য আমার সংগ্রাম


আইলা আহমাদ, আল জাজিরা ইংরেজি:
প্রতি বছর ভারত শাসিত কাশমিরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রত্যাশা করে, বছর হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে, কিছুটা স্বাভাবিক হবে আমরা যখন ক্লাসরুমে যাই, তখন আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা থাকে প্রতিটি মিনিটকে কাজে লাগানোর, যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু অর্জন করার, কারণ আমরা কখনোই জানি না যে পরের দিন আমরা আবার স্কুলে ফিরে আসতে পারবো কি না
সব কিছুর পরও, অনিঃশেষ এই সহিংসতা আর নিপীড়নকে ধন্যবাদ জানাতে হয়, কারণ  আমাদের খুব কমই স্কুলেযাওয়া লাগে আমরা বছরের বেশির ভাগ দিনই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাই না, যেমন বিশ্বের অন্য যে কোন স্থানে বসবাসরত আমাদের সমবয়সীরা পেয়ে থাকে
২০১৯ সালের মার্চে আমি যখন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করি, আমি তখনো আরেকটু ভালো পরিস্থিতির আশা করছিলাম আমি স্কুলে ফিরতে পেরে খুশি ছিলাম, কিন্তু ভয়ে ছিলাম যে কোন সময় উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আমাদের শিক্ষাবর্ষ সংক্ষিপ্ত হয়ে যেতে পারে আমার বন্ধুরা আমার মতই স্নায়ুচাপে ভুগছিল এই কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে অনেক সময় বলতাম, আরেকটিবিরতিহয়তো শিগগিরই শুরু হতে পারে
কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের হাস্যরসই বাস্তবে পরিণত হলো
আগস্টের তারিখ আমাদের জীববিজ্ঞান পরীক্ষা ছিল আমার মনে হচ্ছিল আমার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই, তাই আগের রাতে দোয়া করছিলাম যেন এমন কিছু ঘটে, যাকে পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়, কিংবা বাতিল হলে আরো ভালো হয় অবশ্যই, কি হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না যদি জানতাম, তাহলে সেটা থামানোর জন্য আমি দরকার হলে ১০০টা পরীক্ষা দিতেও রাজি থাকতাম
পরের দিন সকালে আমার বাবা আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন এবং জানালেন যে ভারতীয় সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করেছে সংবিধানের এই ধারাতে আমাদের অঞ্চলের বিশেষ মর্যাদার স্বীকৃতি এবং জনমিতি সংরক্ষণের নিশ্চয়তা ছিল
দিন ঠিক কি করেছিলাম, পুরোপুরি মনে করতে পারছি না যদ্দুর মনে পড়ে, ভাবছিলাম: “আমাদের এখন কি হতে যাচ্ছে?” পরের দিনগুলোতে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যেকে যার যার ধারণা উপস্থাপন করলো প্রতিটি ধারণা তার আগেরটার চেয়ে ভয়াবহ ছিল খুব কাছের প্রতিবেশী ছাড়া আর কারো সাথে অবশ্য ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও আলোচনা করতে পারছিলাম না, কারণ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ফোনের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে, সেই সাথে কার্ফিউ জারি করা হয়েছে
আমি নিজেকে বলছিলামশুধু ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষা করোমুসলমানদের ছুটির দিন ঈদ এই ঘটরার এক সপ্তাহের মধ্যে উদযাপিত হবে, আর আমার ধারণা ছিল এই সময়টা পার হলে ভারত শাসিত কাশমিরের জীবনযাত্রা হয়তোস্বাভাবিকহবে, অথবা অন্ততপক্ষে সামরিক শাসনের আওতায় স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে পারে, এমন একটা পরিস্থিতি হবে
কিন্তু আমি ভুল ছিলাম
ঈদ এসে চলে গেলো, কিন্তু পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হলো না
আমার ধারণা, ১৭ বছর বয়সী একজন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হওয়া পৃথিবীর অন্যত্র এতো সহজ নয় অন্য যে কোন জায়গায় তাদেরকে ভাবতে হয় ভালো ফলাফল সম্পর্কে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিশ্চিত করা সম্পর্কে তাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়, দ্বাদশ শ্রেণির ফলাফল পরবর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে, যা কিনা ভবিষ্যতের উপরও প্রভাব ফেলবে আমি জানি এসবই হচ্ছে আমার বয়সী তরুণদের সাধারণ চিন্তার বিষয় কিন্তু গত বছর ভারত শাসিত কাশমিরে আমার উপর আরেকটি চাপ সংযোজিত হয়েছে, সেটা হলো নিজের ঘরে বন্দী হওয়ার চাপ
আমি পড়তে চাইতাম, কিন্তু অবরোধের কারণে আমার জন্য এটি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লো স্কুলগুলো বন্ধ ছিল, টিউশন সেন্টারসমূহে তালা দেওয়া ছিল, এবং অবশ্যই, অনলাইনে পড়াশুনার সুযোগও ছিল না পুরোপুরি ব্ল্যাকআউটকে ধন্যবাদ, আমি এমনকি আমার শিক্ষকদের নিকট দিকনির্দেশন চাইতে পারিনি, কিংবা কোন বন্ধুর কাছে সহযোগিতাও চাইতে পারিনি
তাছাড়াও, আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে চিন্তিত ছিলাম আমি জানতাম না তারা ঠিক আছে কি না, তাদের কেউ গ্রেফতার হয়েছে কিনা, কিংবা কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে কি না
আমার মা-বাবাও ভোগান্তিতে পড়েছিলেন আমি তাদেরকে এর আগে কখনো এতোটা বিধ্বস্ত আর এতোটা চাপের মুখোমুখি দেখিনি তারা শুধু আমাদের চারপাশের ঘটনাগুলো নিয়েই চিন্তিত ছিলেন না, বরং আমার ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত ছিলেন তারা আমার পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এতোটাই মরিয়া ছিলেন যে, আমাকে পড়াশুনায় সাহায্য করার জন্য কোন প্রতিবেশী শিক্ষক পাওয়া যায় কিনা, খোঁজছিলেন
তারা আমার ভাইয়ের সাথেও যোগাযোগ করতে পারছিলেন না, যিনি তখন দিল্লিতে পড়াশুনা করছিলেন মাঝেমধ্যে যখন তার সাথে যোগাযোগের সুযোগ হতো, তখন বলতেন, তিনিও পড়াশুনায় মনযোগ দিতে পারছেন না, কারণ বাড়িতে তার পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে কি আছে সে সম্পর্কে তারা কোন ধারণা ছিল না
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমি আমাদের বাসার সামনের ফটক খোলার শব্দ শুনলাম, তারপর পরিচিত আওয়াজ পেলাম জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আমার এক বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে, প্রায় দুই মাস ধরে যার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নাই  আমি খালি পায়ে দৌড়ে বাইরে গেলাম তারা আমাকে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে পলেছিল, কারণ আমাদের স্কুল আভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলো চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উল্লেখ্য এই পরীক্ষাগুলো আমাদের চুড়ান্ত পরীক্ষায় অবদান রাখতে পারে
এরপর অক্টোবরে স্কুল শিক্ষা বোর্ড ঘোষণা দিল, ভারত শাসিত কাশমিরের স্কুলগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা হবে, তবে সিলেবাসে কোন ধরনের শিথিলতা থাকবে না তার মানে যদিও আমাদের স্কুল আগস্টের অবরোধের পূর্বে মাত্র ৩০ শতাংশ সিলেবাস পূর্ণ করতে পেরেছে, কিন্তু নভেম্বরে আমাদের পরীক্ষা হবে পুরো সিলেবাসের উপর
আমার রাগ হচ্ছিল, এবং মন খারাপ হচ্ছিল
স্পষ্টতই যারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের কাছে আমরা পাশ করতে পারবো কিনা সেটার কোন গুরুত্ব ছিল না আমরা কোন কিছু শিখতে পেরেছি কিনা সেটাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না তাদের একমাত্র উদ্বেগের বিষয় ছিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তারা চাচ্ছিলেন প্রত্যেকে যেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, যাতে তারা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করতে পারেন, ভারত শাসিত কাশমিরের সব কিছুস্বাভাবিকহয়ে গেছে
সংক্ষিপ্ত সময়ে পুরো সিলেবাস আয়ত্ত করা চেষ্টা ছাড়া আমার আসলে তখন আর কিছুই করার ছিল না
পরীক্ষা আগের এক মাস আমি আমার দাদির বাসায় ছিলাম, যাতে আমার পড়াশুনায় কোন ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে সময় এতোই কম ছিল যে আমি পরীক্ষার আগের দিনও নতুন কিছু অধ্যায় পড়েছিলাম
প্রথম পরীক্ষার দিন রাস্তায় খুব  অল্পসংখ্যক বাস ছিল যেহেতু সবাই ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহার  করতে বাধ্য হয়েছিল, তাই ট্রাফিক জ্যাম ছিল খুব বেশি, ফলে অনেকেই সময় মতো পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌছাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ আবারও এই সমস্যার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলো না কাউকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়নি, অথচ কোন কোন শিক্ষার্থী আধা ঘণ্টা দেরিতে পরীক্ষা শুরু করতে বাধ্য হয়েছিল
আমরা সকলের অকৃতকার্য হওয়াটা নির্ধারিতই ছিল বলা চলে, কিন্তু কেউই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি
পরবর্তী দিনগুলোতেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি এর মধ্যে আবার তুষারপাত শুরু হয়েছিল, এবং এক সপ্তাহ যাবত বিদ্যুৎ ছিল না আবহাওয়া এতোই ঠাণ্ডা ছিল যে কলম ধরে রাখাও কঠিন হতো
আমি যখন সব কিছুর প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করলাম, তখন আমার বাবা এমন একটি কথা বলেছিলেন যা আমি কখনোই ভুলবো না: “এতে অভ্যস্থ হও, কারণ এখন থেকে সব কিছু এরকমই হবে
এতো কিছুর পরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু করেছি কর্তৃপক্ষ আমাদের পার্ফরম্যান্স কিংবা আমরা যে সকল বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হয়েছিলাম, সে সব সম্পর্কে কিছু না বললেও পরীক্ষায় উপস্থিতির উচ্চহার নিয়ে বড়াই করেছিল
কর্তৃপক্ষের চোখে আমরা, কাশমিরি শিক্ষার্থীর স্বাভাবিকতার প্রহেলিকা বাঁচিয়ে রাখার সরঞ্জাম ছাড়া আর কিছুই নই তারা আমাদের শিক্ষা, আমাদের কল্যাণ কিংবা ভবিষ্যৎকে পাত্তা দেয় না তারা কেবল আমাদেরকে পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করে আমাদেরকে, এবং পৃথিবীবাসীকে বুঝাতে চায় যে আমরা শিক্ষা পাচ্ছি কিন্তু আমরা আমাদের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন তারা যাকেস্বাভাবিকবলে বিক্রি করতে চায়, তা যে আসলে কি, সেটা আমরা ভালো করেই জানি
কিন্তু আমাদের সামনের সকল বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমরা আমাদের শক্তি এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন আমরা জানি যে তারা যাই করুক না কেন, এই সত্যকে বদলাতে পারবে না যে, আমরাই এই ভূমির ভবিষ্যৎ
–––––––––––––––––––––––––––––
লেখিকা এক জন কাশমিরি শিক্ষার্থী সে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চায় এই নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতেMy struggle for an education in Indian-administered Kashmirশিরোনামে প্রকাশিত ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত

[blogger]

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.