নেপালে ভারত বিরোধী জনমত
বিরাট অনুপম, দি ডিপ্লমেট:
ভারতীয় অধ্যাপক সুখ দেও মনি যথার্থই ভারত নেপালকেদুনিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ট প্রতিবেশীবলে আখ্যায়িত করেছেন বহু কূটনৈতিক বেসামরিক কার্যক্রম কথাটির যথার্থতা প্রমাণ করে উদাহরণস্বরূপ, নেপালের সেনা প্রধান ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনারারি জেনারেল, আবার ভারতীয় সেনাপ্রধান নেপাল সেনাবাহিনীর অনারারি জেনারেলের মর্যাদা পেয়ে থাকেন নেপালের হাজার হাজার গোর্খা সিপাহী ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করছে
নাগরিকদের পর্যায়ে যদি চিন্তা করেন, দুই দেশের নাগরিকগণ সীমান্তের যে কোন পাশে বসবাস করতে পারেন, কাজ করতে পারেন, কোন ধরনের বাধা ছাড়াই এমন অবিশ্বাস্য সম্পর্ক তিলে তিলে গড়ে উঠেছে আজকের স্বাধীন-সার্বভৌম ভারত নেপাল রাষ্ট্রের জন্মেরও আগে থেকে দুই দেশের একই ঐতিহাসিক শিকড় সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যতাই মূলত এর কারণ
এত ঘনিষ্ট সম্পর্ক সত্ত্বেও নেপালের জনমনে এখন ভারত বিরোধীতা তৈরি হচ্ছে এর পিছনের পাঁচটি কারণ
. অবরোধ
চারদিকে স্থলবেষ্টিত নেপালকে প্রায়ই বলা হয় ভারতবেষ্টিত দেশ কারণ পূর্ব, পশ্চিম, দক্ষিণ তিন দিকেই নেপালের সীমান্ত ভারতের সাথে এই ভৌগলিক সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ভারত তিনবার নেপালের বিরোধ্যে বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করেছিলে ১৯৭৫, ১৯৮৯ ২০১৫ সালে এই তিন ব্লক নেপালে ভারতবিরোধী জনমত গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে ২০১৫ সালে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ভূমিকম্পে নেপাল লণ্ডভণ্ড হওয়ার মাত্র একমাস পর ভারত দেশটির উপর অবরোধ আরোপ করলে নেপাল উত্তর সীমান্তের প্রতিবেশী চীনের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয়

. সীমান্ত
নেপাল-ভারতের প্রায় ,৮০০ কিলোমিটার সীমান্ত উন্মুক্ত কিন্তু সীমান্ত উত্তেজনামুক্ত নয় দুই দেশের মধ্যে বিরোধপূর্ণ অনেকগুলো অঞ্চল রয়েছে, সম্প্রতি নেপাল ভারত সরকার কর্তৃক নয়া মানচিত্র প্রকাশ সে বিরোধের আগুনে আরো ঘি ঢেলেছে
বিবাদের আরেক কারণ হলো- নেপালের বেশির ভাগ সীমান্তেই কোন প্রহরী নেই, কিন্তু অপর দিকে ভারতের পুরো সীমান্ত জুড়ে রয়েছে শক্তিশালী সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বিভিন্ন সময়ে ভারতীয় বাহিনী নেপালের ভূমিতে অবৈধভাবে প্রবেশ করে, এমনকি মাঝেমধ্যে নেপালি নাগরিকদের হত্যা পর্যন্ত করে বসে যে সকল নেপালি ভারতে কাজ করে, তারা প্রায়ই সীমান্তে বিএসএফের হাতে নির্যাতনের স্বীকার হয় এসব ঘটনার ফলেও নেপালিদের মধ্যে ভারত বিদ্বেষী মনোভাব আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে

. বুদ্ধের জন্মস্থান
বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান নেপালের লিম্বিনিতে, বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই নেপালি জনগোষ্ঠীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অংশ হলো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, ফলে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই গৌতম বুদ্ধের ঐতিহ্য তাদের আবেগ-অনুভূতির সাথে জড়িত কিন্তু কিছু কিছু ভারতীয় ফিল্ম, বইপত্র এমনকি জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব দাবি করেন যে গৌতম বুদ্ধ ভারতে জন্মগ্রহণ করেছেন ভারতীয়দের এমন দাবির বিরুদ্ধে নেপালিরা প্রতিবাদ করে এমনকি খোদ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ সভায় তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন যে, ভারতপৃথিবীকে দিয়েছে ... ... গৌতম বুদ্ধের শান্তির বার্তামোদীর বক্তব্য তখন নেপালের সামাজিক মাধ্যমে প্রচণ্ড সমালোচিত হয়, স্বাভাবিকভাবে বিষয়টিও নেপালিদের মধ্যে ভারতবিরোধিতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে

. “বিগ ব্রাদারসুলভ আচরণ
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ নেপাল যখন নেপালের আঞ্চলিক প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ, নেপালের তখন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটিশদের সাথে ছিল শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক ২০১৬ সালের শেষের দিকে নেপাল ব্রিটেন তাদের কূটনৈতিক বন্ধুত্বের ২০০ বছর উদযাপন করে, যেখানে ভারত স্বাধীনতা লাভ করেছে কেবল ১৯৪৭ সালে
নেপালিরা তাদের সার্বভৌমত্বের সম্মানজনক ইতিহাস নিয়ে গর্ব বোধ করেন এতদসত্ত্বেও ভারতের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গণমাধ্যম নেপালকেছোট ভাইসম্বোধন করতে অভ্যস্থ ভারতকে নেপালেরবিগ ব্রাদারবা বড় ভাই দাবি করার যে প্রবণতা ভারতীয় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে লক্ষণীয়, নেপালিদের নিকট তা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় তদুপরি বিষয়ে নেপালের বিরাটদার্শনিকঅভিযোগ আছে নেপাল মনে করে, ভারত শুধুমাত্র আকার বা বড় হওয়ার কারণে নেপালেরবিগ ব্রাদারহতে পারে না নেপালি প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির বিষয়ে বেশ বিখ্যাত একটি বক্তব্য রয়েছেযে কোন দেশ আকার কিংবা জনসংখ্যায় বড় কিংবা ছোট হতে পারে... কিন্তু জাতিগতভাবে কোন দেশই ছোট বা বড় হতে পারে না প্রতিটি দেশই সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাওয়া উচিত

. অসম কূটনৈতিক চুক্তিসমূহ
ভারত-নেপালের মধ্যে অনেকগুলো কূটনৈতিক চুক্তি রয়েছে, নেপালের জনগণের ধারণা, বেশির ভাগ চুক্তিতেই ভারতের স্বার্থের প্রতি বেশি নজর দেওয়া হয়েছে উদাহরণস্বরূপ, গান্দাকি, কোশি মহাকালি পানি চুক্তিসমূহ বেশির ভাগ নেপালিই একেবারে পছন্দ করে না তাদের ভাষ্যমতে এসব চুক্তির মাধ্যমে নেপালের মহামূল্যবান পানিসম্পদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবহারে ভারতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে
এই তিন বিতর্কিত পানি চুক্তি ছাড়াও 1950 Peace and Friendship Treaty (১৯৫০ সালের শান্তি বন্ধুত্ব চুক্তি) নেপালে চরম অজনপ্রিয় চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের নিরাপত্তা ছাতার অধীনে নেপালের অবস্থানের কূটনৈতিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয় নেপালের নাগরিকসমাজ বুদ্ধিজীবীগণ বেশ কঠোরভাবে চুক্তি পরিমার্জন করার দাবি তুলছেন
অনেক নেপালি রাজনীতিক তিন নদীর পানি চুক্তি তথাকথিত বন্ধুত্ব চুক্তির পুনর্বিবেবচনার কথা বলেছেন, যাতে চুক্তিগুলোতে উভয় পক্ষকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় ২০০৮ সালে তৎকালীন নেপালি প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল তাঁর ভারত সফরে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সাথে আলোচনাকালে প্রসঙ্গ তুলেছিলেন এক দশকেরও বেশি দিন পার হয়ে গেছে, কিন্তু এগুলোর মধ্যে কোন চুক্তি সংশোধনেরই অগ্রগতি হয়নি 
______________________________
বিরাট অনুপম নেপালের সরকারি সংবাদ সংস্থান্যাশনাল নিউজ অ্যাজেন্সিরইংরেজি সংস্করণের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক কূটনীতি, ভ্রমণ পরিবেশ সম্পর্কে তিনি লিখে থাকেন তাঁর লেখা নিবন্ধটি দি ডিপ্লমেটে 5 Factors Driving Anti-India Sentiment in Nepal শিরোনামে প্রকাশিত হয় ভাষান্তর কর্তৃক বাংলায় রূপান্তরিত