জানুয়ারী 2021

সৌদি-কাতার সংকট নিরসন

উসাইদ সিদ্দিকি, আল জাজিরা ইংরেজি:

সৌদি আরব কাতারের তাদের আকাশসীমা, স্থল ও জল সীমান্ত পুনরায় উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে, কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত সোমবার এক ঘোষণায় এমনটি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি-কাতার সংকট নিরসনে কুয়েত মধ্যস্থতা করছে।

জিসিসি শীর্ষ সম্মেশনের পূর্ব মুহূর্তে এ ঘোষণাটি সৌদি ও তাদের মিত্র জোট কর্তৃক কাতারের উপর আরোপিত বয়কটের রাজনৈতিক সমাধানের পথ সুগম করতে পারে। 

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং মিশর ২০১৭ সালের জুনে কাতারের উপর সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন ও ইরানের সাথে ঘনিষ্টতার অভিযোগে কূটনৈতিক, বাণিজ্য ও ভ্রমণ বয়কট আরোপ করেছিল।

কাতার বারবার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং সম্পর্ক ছিন্ন করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই বলে দাবি করে এসেছে। 

ইতোমধ্যে আবু সামরা ক্রসিংয়ে কাতার-সৌদি সীমান্ত খুলেছে বলে আল জাজিরার প্রতিনিধি আজ (বাংলাদেশ সময়) রাত তিনটার দিকে  নিশ্চিত করেছেন। 

(আর জাজিরা ইংরেজিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের অনুবাদ।)

 

boycott israel by palestine

হায়দার ঈদ, আল জাজিরা ইংরেজি:

গত নভেম্বরে ফিলিস্তিন স্বাধীনতা সংস্থা (পিএলও)’র নির্বাহী কমিটির মহাসচিব ও মুখ্য ফিলিস্তিনি আলোচক সাইব এরেকাত মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেক ফিলিস্তিনি তাঁর মৃত্যুকে ওসলো-যুগের সমাপ্তির রূপক হিসেবে দেখছেন।

এরেকাত এবং তাঁর প্রজন্মের আরো অনেক ফিলিস্তিনি রাজনীতিক কথিত দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা মনে করতেন ইসরায়েল এবং তাদের মার্কিন পৃষ্ঠপোষকদের সাথে চুক্তি করে ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ভূমিতে ফিলিস্তিনিরা একদিন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন।

দশকের পর দশক ধরে অব্যহত ঔপনিবেশিকতা ও সর্বানাশা চুক্তির সাহায্যে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের এই বিভ্রম বা মোহকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।

১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিডে ইসরায়েলের সাথে মিসর কর্তৃক সাক্ষরিত চুক্তি, ফিলিস্তিনিদের সাক্ষরিত ১৯৯৩ সালের ওসলো চুক্তি এবং জর্দান কর্তৃক ওয়াদি আরাবাতে সাক্ষরিত ১৯৯৪ সালের চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের সমস্যার সমাধান ও মধ্যপ্রাচ্যে “শান্তি” প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হতো। 

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসকল চুক্তিতে একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকেই উপেক্ষা করা হয়েছে, উপেক্ষা করা হয়েছে শরণার্থী ফিলিস্তিনিদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সমঅধিকারের মতো মৌলিক অধিকারসমূহকে।

এসকল মৌলিক অধিকারের উপর জোর দেওয়ার  বদলে, এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মডেল অনুসরণ করে এক ব্যক্তি এক ভোট নীতি বাস্তবায়ন এবং গণতান্ত্রিক অবর্ণবাদী অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বদলে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব উল্টো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে কেবলমাত্র পশ্চিম তীর, গাজা ভূখণ্ড ও পূর্ব জেরুজালেমে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন।

এর ফলে টুকরো টুকরো ভূখণ্ড নিয়ে ফিলিস্তিনি বান্টুস্তান তৈরি হয়েছে,যেখানে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি সামরিক দখলদারদের ক্রমাগত সন্ত্রাসের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সত্যিকার অর্থে তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

ওসলো চুক্তি অনুসারে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের মোহের উপর এখনো জোর দেওয়া হচ্ছে, এমনকি ইসরায়েল কর্তৃক জাতিরাষ্ট্র আইন পাশ করার পরও; যে আইনে ইসরায়েলেরে ভূমিতে কেবলমাত্র অনন্য ইহুদি জনগোষ্ঠীর (ইসরায়েল রাষ্ট্রের সংজ্ঞানুসারে) জাতিগত অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ফিলিস্তিনিরা এ অধিকার ভোগ করতে পারবে না। এখনো দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, অথচ এদিকে আরবরাষ্ট্রগুলো “শান্তির জন্য ভূমি সূত্রে ইসরায়েলের তরফ থেকে কোন ধরনের ছাড় ছাড়াই ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে এগুচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি শান্তি চুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে, যেটিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য চূড়ান্ত অবমাননা ছাড়া আর কিছুই থাকছে না।

ইসরায়েল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যে চরম বর্ণবাদী শাসন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চাপিয়ে দিয়েছে, ওসলো চুক্তি এবং এর অনুসিদ্ধান্তসমূহে সেই চরম বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ যেন ঘরের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিশাল হাতিটিকে না দেখার ভান করে বসে থাকার নামান্তর। ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন-সংগ্রামেযে সুমুদ  বা অবিচলতা লক্ষণীয়, ওসলোওয়ালার সে বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফিলিস্তিনিদের নগিরক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতহাসের প্রতিও তারা ভ্রুক্ষেপ করছে না।

বছরের পর বছর ধরে বহু ফিলিস্তিনি ওসলো চুক্তি আসলে কি জন্যে তা বুঝতে পেরেছে এবং ফিলিস্তিনি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তারা নিজেদের জন্য বিকল্প পন্থা বাছাই করে ফেলেছে।

২য় ইন্তিফাদার মাত্র এক বছর পর ২০০১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এনজিও ফোরাম অফ দি ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অ্যাগেইনস্ট র‌্যাসিজম (ডব্লুসিএআর) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইহুদিবাদী প্রকল্পের স্পষ্ট প্রকৃত রূপ তুলে ধরা হয় এবং ফিলিস্তিনি ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতার জন্য আরো বাস্তবধর্মী কিন্তু প্রগতিশীল পথনির্দেশ করা হয়।

২০০৫ সালে বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংকশনস (বিডিএস) আন্দোলন শুরু হয় এবং দুই বছর পর পরবর্তী কৌশল নির্ধারণের জন্য বিডিএসের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। বিডিএস একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি কিছু উদাহরণ তুলে ধরে, যেগুলো ফিলিস্তিনি মানসিকতাকে ওসলো বিমুখ করার প্রচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে। এবং এই প্রক্রিয়ায় গাজা কেন্দ্রী ভূমিকা পালন করে।

২০০৬ সালের আইন সভা নির্বাচন পরবর্তী গাজার বেশির ভাগ ঘটনা ওসলো চুক্তি ও তার ধারাবাহিকতাসমূহকে প্রত্যাখ্যানের ইঙিত বহন করে। আমরা যদি এ বিষয়টি মনে রাখি যে গাজার ৭৫-৮০ শতাংশ অধিবাসীই শরণার্থী, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলের উপনিবেশবিরোধী ও ওসলোবিরোধী মনোভাব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

“দুই কারাগার সমাধান” কে তালাক দিয়ে বিকল্প প্যারাডাইম স্থাপনের আহ্বান পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবল হয়ে ওঠে। এই প্যারাডাইমে গাজার জনগণের আত্মত্যাগকে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের ভিত্তিতে যে প্যারাডাইম ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৪ সালে গাজার উপর আক্রমণে এবং দি গ্রেট মার্চ অফ রিটার্নে ফিলিস্তিনিদেরকে অনুপ্রাণিত করে।

বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীদের জন্য ফিলিস্তিনকে অসলোমুক্ত করাটা ন্যায্যতার সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্তে পরিণত হয়েছে। এ জন্য ফিলিস্তিনি সংগ্রামকে নতুন করে সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিক শক্তি ও বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রাম হিসেবে এবং ফিলিস্তিনি স্বার্থকে ফিলিস্তিনের মূল তিনটি অংশ তথা গাজা ও পশ্চিম তীর, শরণার্থী এবং ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একত্রিতকরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

লেখক আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয় গাজার সহযোগী অধ্যাপক। লেখাটি আল জাজিরা ইংরেজির ওয়েবসাইটে “The two-state solution: The opium of the Palestinian people” শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.