Articles by "অন্যান্য"

অন্যান্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান



হামিদ দাবাশি, আল জাজিরা ইংরেজি:

নিউ ইয়র্কে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭ টায় আমরা সবাই বাসার বারান্দায় কিংবা দরজার বাইরে এসে কড়াই-পাত্র ইত্যাদিতে টুংটাং শব্দ করে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, যাঁরা করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের সেবা ও সুস্থ করে তোলার জন্য নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।

আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ, তাঁরা প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল ও সরঞ্জামাদি নিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর জন্য দায়ী আমাদের সামরিক সংস্কৃতি। এ কারণে সামরিক সরঞ্জামাদির পিছনে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হলেও স্বাস্থ্য খাতকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে হচ্ছে।

আমরা দুনিয়া জোড়ে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানীদের প্রতিও কৃতজ্ঞ, তাঁরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান সরবরাহ করছেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য কোন কোন নীতি বাস্তবায়ন করা দরকার, সরকারসমূহকে সে সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ভারতের মতো ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প, জাইর বলসনারো ও নরেন্দ্র মোদীর মতো নেতাদের ভীড়ে যারা কিনা তাদের জনগণের স্বাস্থ্যের চেয়ে অর্থনীতি ও তাদের নিজ আদর্শিক গোষ্ঠীর স্বার্থকে বড় করে দেখছেন  ডব্লিউএইচও ডিরেক্টর-জেনারেল টেড্রস অ্যাডানম অথবা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশিয়াস ডিজিজেস’র ডিরেক্টর অ্যান্থনি ফসির মতো ব্যক্তিত্বরাই প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, এবং সুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন।

প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসাকর্মী ও বিজ্ঞানীরাই এই মহামারীতে প্রকৃত বীর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।


বিজ্ঞানের যত সংগ্রাম
চিকিৎসা ব্যক্তিত্ব ও বিজ্ঞানীরা প্রচণ্ড খ্যাতিমান চরিত্র এবং বলা চলে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ফলে বিজ্ঞানকে তার নিজের চ্যালেঞ্জসমূহকেই মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

মহামারীর এই সময়ে বিজ্ঞানীরা ভালো বিজ্ঞান ও খারাপ বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জ্যাকি ফ্লিন মগেনসেন তাঁর সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে লিখেন, “বিজ্ঞানের একটি কুৎসিত, অন্ধকার দিক রয়েছে। এবং করোনা ভাইরাস সেই কুৎসিত দিকটি আমাদের সামনে নিয়ে আসছে।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “এক সময় যেটা ছিল ম্যারাথন দৌড়, এখন সেটা সংকোচিত হয়ে ৪০০-মিটার ড্যাশে পরিণত হয়েছে। গবেষকরা তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশের জন্য দৌড়াচ্ছেন, অ্যাকাডেমিক জার্নাল দৌড়াচ্ছে বেশি করে আর্টিকেল প্রকাশ করার জন্য, আর গণমাধ্যম দৌড়াচ্ছে ভীত ও আগ্রহী জনগণের নিকট নতুন তথ্য পৌছানোর জন্য।” (ফলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় গবেষণা ব্যহত হচ্ছে, সবাই কম সময়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বেশি ফলাফল পেতে চাচ্ছে। অনুবাদক)

জো হামফ্রেইজ সম্প্রতি আইরিশ টাইমসে তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, “করোনা মহামারী শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আঘাত করেনি, এটি আমাদের নীতি-নৈতিকতাকে ধাক্কা দিয়েছে। যে বিষয়গুলোকে আমরা সামাজিকভাবে সহনীয় বলে মনে করি যেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের কর্মীদের নিম্ন আয় এবং হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের বাধা এ বিষয়গুলোই হঠাৎ করে আমাদের নিকট জঘন্য বলে মনে হচ্ছে, এই মহামারীর কালে।”

কিন্তু এই মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কে কথা বলবে? বিজ্ঞানী হিসেবে ডাক্তাররা বলবে, চিন্তকের জায়গা থেকে দার্শনিকরা কথা বলবে, নাকি উভয়েই বলবে, না কেউই কথা বলবে না?

এ ধরনের বিষয় কয়েক প্রজন্ম ধরে বিজ্ঞানের সমাজবিজ্ঞানে (সোশ্যলজি অব সায়েন্স) পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ডিসিপ্লিনের মূল ধারণা হচ্ছে কোন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যকারণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়, এমনকি ধর্মীয় পক্ষপাত থেকেও পুরোপুরি মুক্ত নয়।

বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থানের বিষয়ে আগে থেকে চলে আসা সুস্পষ্ট সমালোচনার মধ্যে কোভিড-১৯’র আবির্ভাব তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় কিছু পর্যবেক্ষণের উদ্ভব ঘটিয়েছে। জানাব গানেশ ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে তার সাম্প্রতিক এক কলামে কলা ও বিজ্ঞানের পার্থক্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কলামটির শিরোনাম “দুই সংস্কৃতির সমাপ্তি (দি এন্ড অব টু কালচার)।

তিনি প্রস্তাব করেন, মহামারীর ফলস্বরূপ “বিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতা আর টিকবে না। দুই সংস্কৃতি (কলা আর বিজ্ঞান) একই সংস্কৃতিতে পরিণত হবে। আর এই সমন্বয়ের কাজটা করতে হবে আমাদের মধ্যে যারা মানবিক বিষয়ের আছেন, তাদেরকেই।

তিনি আরো বলেন, “সাম্প্রতিক সপ্তাহসমূহে শুধুমাত্র মেডিসিন আর রোগতত্ত্বই আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়নি, বরং কোয়ান্টিটিভ সায়েন্সও চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই ইস্যুটি অবশ্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়াবলীর বিভক্তির পিছনের কার্যকারণগুলোর শিকড় মার্কিন ও ইউরোপীয় সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত।


আমাদের সময়ের জন্য একজন ইবন সিনা?
কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে ইবন সিনার (৯৮০-১০৩৭) প্রতি নতুন করে আগ্রহ জন্মাতে দেখা যাচ্ছে। ইবন সিনা (বর্তমান) ইরানের একজন মুসলিম বিজ্ঞানী, চিকিৎসাক্ষেত্রে যার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল। তাঁর প্রধান কাজ, আল-কানুন ছিল মেডিক্যাল লিটারেচাল ও মেডিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অবলম্বন, এবং চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাসে এক অন্যতম ভিত্তি। ঐতিহাসিক জামাল মুসাভির মতে, তাঁর মৃত্যুর ৬০০ বছর পর্যন্ত তার রচনা মুসলিম ও ইউরোপীয় দুনিয়ার চিকিৎসার উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল।

বর্তমানে মুসলমানরা গর্বভরে বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইবন সিনার উত্তরাধিকার মহামারী প্রতিরোধের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করছে। এক মুসলিম লেখক লিখেন, “মাইক্রস্কপিক ভাইরাসের সাথে লড়তে বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক মুসলিম বহুশাস্ত্রজ্ঞ ইবন সিনার  প্রায় সহস্রাব্দ প্রাচীন নির্দেশনাসমূহের দিকে ফিরে যাচ্ছে।”

কীভাবে কোয়ারেন্টাইনের ধারণার মূল ইবন সিনার বৈজ্ঞানিক গবেষণাকর্ম থেকে উৎসারিত, তা তারা তুলে ধরছেন। ইবন সিনা “তাঁর পাঁচ খণ্ডে রচিত চিকিৎসা বিশ্বকোষ আল-কানুনে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন, আল কানুন মূলত ১০২৫ সালে প্রকাশিত হয়।”

বোধগম্যভাবেই এসবের বেশির ভাগই গর্বিত স্মৃতিচারণ, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ অনুল্লেখিত থেকে যাচ্ছে, তা হলো ইবন সিনা কেবলই একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচু মাপের দার্শনিক। এক মুহূর্তের জন্য গভীরভাবে চিন্তা করুন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের পর্বতসম গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব একজন মহাগুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক চিন্তকও ছিলেন।

এই বিষয়টিই এখন চিন্তা করা জরুরি। ডক্টর ফসির কথা চিন্তা করুন। এবার চিন্তা করুন জার্মান দার্শনিক মার্টিন হেইডেগারের কথা। এবং, এবার এই দুই চিত্রকে একত্রিত করার চেষ্টা করুন তাহলে আমরা ইবন সিনার কাছাকাছি একটা ধারণা পেতে পারি।


একজন দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক
ইবন সিনার জীবনকালের অর্জনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন সব্যসাচী বিজ্ঞানী-দার্শনিকই ছিলেন না, যেমনটা আজকাল মনে করা হয়। তাঁর অবস্থান আরো অনেক উপরে। তাঁর কাজগুলো এমন এক জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থা থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যা ইউরোপীয় আধুনিকতার যুগেও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ইউরোপীয় আধুনিকতায় মানবীয় বিজ্ঞানকে যুক্তি বনাম অনুভূতি, কিংবা ধর্ম বনাম বিজ্ঞান, কিংবা মানববিদ্যা বনাম সমাজবিদ্যা এরকম নানা ভাগে টুকরো টুকরো করে ফেলার কাজটি এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।

ইবন সিনা লিখেছেন যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা, আধ্যাত্মবাদ নিয়ে, লিখেছেন মনোবিজ্ঞান, সঙ্গীত, গণিত আর চিকিৎসা বিষয়ে তিনি এসব লিখেছেন গভীরভাবে শিক্ষিত সংস্কৃতিবান এবং দার্শনিক মন দিয়ে।

একটা বিষয় নিশ্চিত থাকা দরকার, ইবন সিনা মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী/দার্শনিক ছিলেন, তবে তিনি তাঁর গ্রিক পূর্বসূরীদের সরাসরি উত্তরাধিকারী ছিলেন। ইসলামি দর্শনের প্রখ্যাত ইরাকি ঐতিহাসিক মুহসিন মাহদির ভাষায়:

মধ্যযুগীয় চিন্তাচর্চায় গ্যালেন ও অ্যারিস্টেটলের মধ্যে এতোটা তর্ক আর কোথাও বাধেনি, যতটা ইবন সিনার কাজে বেধেছে। ইবন সিনার লেখালেখিতে এই দুই মহান ধারা মুখোমুখি হয়েছে। ইবন সিনা গ্যালেনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের মধ্যযুগীয় পাঠ্যপুস্তক আল কানুন লিখেছেন, আবার সে যুগে অ্যারিস্টটলীয় জীববিজ্ঞানের আকর গ্রন্থ আল হাইয়াওয়ানও তিনি লিখেছেন। এ দুটি কাজেই ইবন সিনা অ্যারিস্টটরীয়-গ্যালেনিক বিভক্তির মুখোমুখি হয়েছেন, এবং এই দুই অতিকায় ধারার মধ্যে সমন্বয় সাধনই চিকিৎসা ও জীববিদ্যা নিয়ে তাঁর কাজের মূল আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়।

কিন্তু শুধু বিজ্ঞান আর দর্শনই ইবন সিনার কাজের ক্ষেত্র নয়। আমরা যদি তাঁর বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক সাহিত্যসম্ভারকে এক পাশে রেখে তাঁর মিস্টিকাল মাস্টারপিস “আল ইশারাত ওয়াত তানবিহাত” (ইঙ্গিতাবলি ও হুশিয়ারিনামা) গ্রন্থের দিকে নজর দিই, তবে আমরা ইবন সিনার মনোজগতের পূর্ণচিত্র দেখতে পাবো।

ইবন সিনা কোন ভাবেই ইসলামি বিদ্যাচর্চার ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি নন, যিনি বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন। নাসির উদ্দিন তুসি (১২০১-১২৭১) একই রকম গুরুত্বপূর্ণ আরেক ব্যক্তিত্ব, যিনিও বিজ্ঞান (তাঁর ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞান) ও দর্শন চর্চা করেছেন সমান্তরালে। ইবন সিনার মিস্টিকাল লেখালেখিতে তার টিকা-ভাষ্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

বিষয়টা এমন নয় যে ইবন সিনা একজন স্রষ্টাপ্রদত্ত ব্যতিক্রমী প্রতিভা ছিলেন বলে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান ও দর্শন শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। বরং বাস্তবতা হলো, তিনি এমন এক সমাজের সন্তান, যে সমাজে তখনো বিজ্ঞান আর দর্শনের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে পার্থক্য করা হতো না, আলাদা পেশাদারিত্ব আর পারদর্শিতা অর্জনের প্রথা তখনো চালু হয়নি।

ইবন সিনা কোন পেশাদার চিকিৎসকও ছিলেন না, আবার দর্শনের অধ্যাপকও ছিলেন না। তিনি তার অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ জানাশোনা থেকে লিখেছিলেন, যেখানে গ্রিক ঐতিহ্য একেবারে ভিন্নরূপে উপস্থাপিত হয়েছিলো, কয়েক শতাব্দি পর ইউরোপে যেভাবে গ্রিক ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করা হয়েছে, সে তুলনায়।

বর্তমানে ব্রুনো ল্যাটোরের মতো দার্শনিকের প্রস্তাব করছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হবে, এমন নতুন এক স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার। রাজনীতিবিদস আর বিজ্ঞানীরা মিলে এমন দার্শনিক সত্তাকে খারিজ করে দেওয়ার পূর্বে আমাদের মনে রাখা উচিত, এক কালে দার্শনিক আর বিজ্ঞানী ছিলেন একই ব্যক্তি, অন্তত একই ধরনের ব্যক্তিত্ব তো ছিলেনই।

দুনিয়া জুড়ে বিজ্ঞানের আকর্ষণীয় সব অর্জনকে খারিজ করে দেওয়া এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য নয়, অতীত নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগাও এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং এ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য হলো, বর্তমান মহামারী থেকে উত্তরণের পর পরিবর্তিত বিশ্বে আমাদের নিজেদের আত্মসচেতনতা থাকা দরকার যে, কোন ধরনের জ্ঞান এবং আত্মসচেতনতা মানবজাতিকে এ রকম মহামারী থেকে বাঁচাতে পারে?

এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অনেক বিষয়-আশয় যেমন আছে, তেমনি আছে দার্শনিক বহু বিষয়-আশয়ও। নতুন কোন ইবন সিনার আবির্ভাব হবে কি দৃশ্যপটে? (যিনি বিজ্ঞান আর দর্শনের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবেন?)

––––––––––––––––––––––––––––––––––––––––
আল জাজিরা ইংরেজিতে What can Avicenna teach us in time of Coronavirus শিরোনামে প্রকাশিত হামিদ দাবাশির প্রবন্ধের তরজমা। হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানিয়ান স্টাডিজ অ্যান্ড কম্পারেটিভ লিটারেচারের অধ্যাপক। এই পাতায় ব্যবহৃদ ছবিটি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



ভাষান্তর ডেস্ক:
কোভিড-১৯’র প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচার জন্য মাস্ক পরতে হবে, এমন রব উঠেছে সারা দুনিয়া জুড়ে। আসলেই কি তাই? মাস্ক কার জন্য পরা আবশ্যক? কীভাবে পরতে হবে? পরার ক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক? এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত নির্দেশনার ভাষান্তর

  • আপনি যদি সুস্থ থাকেন, তাহলে কেবল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন রোগীর দেখাশুনার ক্ষেত্রে মাস্ক পরবেন।
  • আপনার যদি হাঁচি কিংবা কাশি থাকে, তাহলে মাস্ক পরুন।
  • মাস্ক পরিধানকে কার্যকর করতে হলে অবশ্যই অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে বারবার ভালো করে হাত পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় মাস্ক কোন কাজে আসবে না।
  • মাস্ক ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই আপনাকে মাস্কের ব্যবহার পদ্ধতি এবং ব্যবহার শেষে যথাযথ উপায়ে বর্জ্যব্যবস্থাপনা (ডিসপোজ) সম্পর্কে জানতে হবে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কখন এবং কীভাবে মাস্ক পরতে হবে:
  • মাস্ক পরার আগে অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে হাত পরিষ্কার করুন।
  • মাস্ক দিয়ে  মুখ এবং নাক ডাকুন, মুখ এবং মাস্কের মধ্যে যেন কোন  ফাঁক না থাকে।
  • মাস্ক ব্যবহারকালে হাত দিয়ে সেটি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। কোন কারণে স্পর্শ করলে সাথে সাথে অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে হাত পরিষ্কার করুন।
  • একই মাস্ক একাধিক বার ব্যবহার করবেন না; ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ার সাথে সাথে পুরনো মাস্ক বদলে নতুন মাস্ক পরুন।
  • মাস্ক খোলার ক্ষেত্রে পিছনের দিক থেকে খুলুন (মাস্কের সামনের দিকে হাত দিবেন না); খোলার সাথে সাথে সেটি ডাকনা দিয়ে বন্ধ বিনে ফেলে দিন; তাৎক্ষণিক অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে বারবার ভালো করে হাত পরিষ্কার করুন।








লেখা ও তথ্যচিত্রসমূহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট থেকে অনূদিত। 



মেহদি হাসান, দি ইন্টারসেপ্ট:

প্রিয় মার্ক জাকারবার্গ,
আপনার কী হলো?
গত ২০১৫ সালে ডিসেম্বরে আপনি মুসলিমবিদ্বেষের বিরুদ্ধে জোরেশুরে গর্বের সাথে বলেছিলেন, আমি আমার কমিউনিটির এবং সারা দুনিয়ার মুসলমানদের সমর্থনে আমার কণ্ঠস্বরও যুক্ত করতে চাই, আপনি তখন একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, তার দুই দিন পর রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্র্রাম্প দেশে মুসলমানদের প্রবেশ পুরোপুরি এবং সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন আপনি আরো লিখেছিলেন, প্যারিস হামলার পর মুসলিমরা অন্যের কাজের শাস্তি নিয়ে কতটা ভীতির মধ্যে আছে, আমি কেবল তা কল্পনা করতে পারি
এরপর নিউ ইয়র্ক টাইমসের শিরোনাম কী হয়েছিল মনে আছে? ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ মুসলিম ব্যবহারকারীদের আশ্বস্ত করলেন
যদিও এখন আমরা ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে আছি চার বছর পর এখন আপনি এবং আপনার ফেসবুক মুসলমানদের আশ্বস্ত করার বদলে বরং আমাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা গোঁড়ামি বাড়ানোর কাজ করছেন আপনি এখন অভিনেতা সাচা ব্যারন কোহেনের ভাষায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রোপাগান্ডার মেশিন হিসেবে আপনার ফেসবুককে ব্যবহার করতে দিচ্ছেন, যা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত কয়েকটি মুসলিম কমিউনিটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে এবং শাস্তি দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে
শুরুতেই বলে নিই, মার্ক, একটি সত্যিকারের গণহত্যায় জড়িয়ে পড়তে কেমন অনুভূতি হয়?
আমি অবশ্যই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যার কথা বলছি ২০১৮ সালের মার্চ মাসে মিয়ানমারে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত মিশনের চেয়ারম্যান মার্জুকি ড্যারুসম্যান সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে আপনাদের মতো সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলো সহিংসতায় নির্ধারক ভূমিকা পালন করছিলো, এবং বিদ্বেষ, মতানৈক্য সহিংসতার পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছিল
মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইয়াংহি লি এর সাথে যোগ করেন, মিয়ানমারে সবকিছুই হয়েছিল ফেসবুকের মাধ্যমে, আমার ভয় হচ্ছে ফেসবুক এখন পাশবিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে, যদিও মূলত ফেসবুকের এরকম কোন অভিপ্রায় ছিল না
মার্ক, আপনি এই সবকিছুই জানেন সত্যি বলতে কী, আপনার কোম্পানি সেটা স্বীকারও করেছে ২০১৮ সালের নভেম্বরে আপনার নিজের উৎপাদন নীতি ব্যবস্থাপক অ্যালেক্স ওয়ারোফকা স্বীকার করেছেন যে, আপনি এবং আপনার সহকর্মীগণ এই প্লাটফর্মকে মিয়ানমারে বিভক্তির উসকানি প্রদান এবং অফলাইন সহিংসতাকে প্ররোচিত করা থেকে বিরত রাখতে যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করেন নি
আর আপনি তখন কী করেছেন? ওয়ারোফকা দাবি করছেন, ফেসবুক মিয়ানমারে হেট স্পিচ চিহ্নিত করার প্রোঅ্যাক্টিভ ডিটেকশনের উন্নয়ন করেছে যদিও মিয়ানমারের প্রতি বিশেষ নজর রাখা অলাভজনক মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা মথি স্মিথ এর সাথে দ্বিমত করে আমাকে বলেন: ফেসবুকের অনেক কিছুই করার আছে হ্যাঁ, আপনার কোম্পানি মিয়ানমারের জন্য শতাধিক কন্টেন্ট রিভিউয়ার নিয়োগ করেছে, কিন্তু দেশে ২০ মিলিয়নেরও বেশি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট রয়েছে স্মিথ যেমনটা বলছেন, এখন অবধি যে সকল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা প্লাটফর্মটির অপব্যবহার সামলানোর জন্য যথেষ্ট নয়
তিনি আরো বলছিলেন, জ্যেষ্ঠ নেতৃত্ব পরিস্থিতির গুরুত্ব পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয় কোম্পানির উচিত রোহিঙ্গাদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণের চিন্তা করা
ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পর্কে কী বলবেন? মার্ক, তাদের পরিণতির পরও কি আপনি সঠিক অবস্থায় আছেন? যদি না হয়, কেন নয়? অক্টোবরে অলাভজনক অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক আভাজ তাদের এক প্রতিবেদনে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলী প্রদেশ আসামে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর মেগাফোন বলে ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে  যে আসামের প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষের (যাদের বেশির ভাগই মুসলিম) নাগরিকত্ব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কট্টর ডান হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার বাতিল করেছে
গত জুনে ভাইস নিউজের সংবাদ অনুসারে, সাউথ এশিয়ান হিউম্যান রাইটস গ্রুপ ইকুয়ালিটি ল্যাবের অপর একটি প্রতিবেদন বলছে: ভারতে ফেসবুকের ইসলামবিদ্বেষী পোস্টগুলোই হেটস্পিচের সবচেয়ে বড় উৎস, যা মোট ধরনের কন্টেন্টের ৩৭ শতাংশ
আপনি বিষয়ে কিছুই বলেন নি, বা কিছুই করেন নি যদিও আপনি মো!দির সাথে বারবার সাক্ষাৎ করেছেন ঘটনাক্রমে তিনিই সবচেয়ে বেশি ফেসবুক ফলোয়ারের অধিকারী বিশ্বনেতা! আপনি আপনার মা-বাবাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমি অবাক হই: মোদি সরকারের কাশ্মীর লকডাইনের প্রেক্ষিতে ফেসবুক কর্তৃক যার হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভ করে দেওয়া হয়েছে, আপনি কী এমন কোন মুসলিমকে আপনার মা-বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন?
শ্রী লঙ্কার মুসলিমদের কী অবস্থা? কলম্বো ভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠণ যখন আপনার কোম্পানিকে বিভিন্ন ইসলাম বিদ্বেষী ভিডিও সম্পর্কে জানিয়েছিল, এসব পোস্টের মধ্যে একটিতে এরকম ঘোষণাও ছিল, সকল মুসলিমকে হত্যা করো, এমনকি একটি শিশুকেও বাঁচিয়ে রেখো না নিউ ইয়র্ক টাইমস জানাচ্ছে সব পোস্ট সম্পর্কে একই উত্তর এসেছিল: এই কন্টেন্ট ফেসবুকের স্ট্যান্ডার্ড লংঘন করেনি আপনার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সকল শ্রীলঙ্কান মুসলিমকে হত্যার আহ্বান, আপনাকে একটুও ভাবায় নি? আপনি একটুও বিচলিত হন নি?
আমরা যেন চীনের উইঘুর মুসলিমদের কথা ভুলে না যাই এক মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে জিনজিয়াং প্রদেশে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী করে রাখা হয়েছে, যেখানে তাদেরকে প্রহার করা হচ্ছে, শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে এমনকি বাজফিড নিউজ গত আগস্টে প্রতিবেদন বের করেছে, কীভাবে চীনের সরকার মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলো ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে উইঘুরদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে
আপনি কি ফেসবুক দিয়ে বিশেষজ্ঞরা যেটাকে বলছেন সাংস্কৃতিক গণহত্যা সেটার প্রচারণা করে খুশি আছেন?
এরপর আসেন যুক্তরাষ্ট্রের কথায় ২০১৮ সালের মে মাসে সাউদার্ন পোভার্টি সেন্টারের একটি প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয় যে, কীভাবে মুসলিমবিদ্বেষী কন্টেন্ ফেসবুকে জায়গা পাচ্ছে রিভিলে সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এসেছে, ফেসবুক শ্বেত জাতীয়তাবাদী সংগঠনসমূহের সাথে জড়িত গোষ্ঠীগুলোকে রিমোভ করছে ... ... সামাজিক মাধ্যম এখনো মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায়, DEATH TO ISLAM UNDERCOVER. এর মতো এমন গোষ্ঠীগুলোকে জায়গা দেওয়া অব্যহত রেখেছে
মার্ক, আপনি সব কিছুই জানেন আপনি অজ্ঞতার দোহাই দিতে পারেন না
আবারো বলছি, মার্ক আপনি সবই জানেন আপনি অবশ্যই জানেন আপনি অজ্ঞতার দোহাই দিতে পারেন না আপনি সম্প্রতি নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী মুসলিম অ্যাডভোকেটসের ফারহানা খেরাকে আপনার গৃহে আতিথেয়তা আতিথেয়তা করেছেন তিনি বললেন যে তিনি আপনাকে জানিয়েছেন, “যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বজুড়ে ফেসবুক কীভাবে মুসলিমদের কষ্টের কারণ হচ্ছে সে সম্পর্কেতার ব্যাক্তিগত সাক্ষ্য আপনাকেএকটুও প্রভাবিত করেনি?
এরপর, এর আগে আপনি ফক্স নিউজের উপস্থাপক টাকার কার্লসনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যিনি একদা ইরাকিদেরকে অর্ধ শিক্ষিত আদিম বানরবলতেন, আপনি আরো আতিথেয়তা করেছেন ডেইলি ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা বেন শাপিরোর, যিনি মিথ্যাভাবে দাবি করেছেন যে, পৃথিবীর বেশির ভাগ মুসলিমেই উগ্রপন্থী গতমাসে আপনি রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে গোপনীয় নৈশভোজ করেছেন, এবং সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, তা প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছেন (চার বছরে কত পার্থক্য হতে পারে!)
–––––––––––––––––––––––––––––––––
দি ইন্টারসেপ্টে মেহদি হাসানের মূল লেখাটি Dear Mark Zuckerberg: Facebook Is an Engine of Anti-Muslim Hate the World Over. Dont You Care শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত, ছবি সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.