Articles by "আমেরিকা"

আমেরিকা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান



নাথান থ্রাল, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বহুল প্রত্যাশিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, যেটি তথাকথিত “শতাব্দির সেরা বন্দোবস্ত” বলে আখ্যায়িত হয়ে আসছে। এই পকিল্পনায় বলা হয়েছে পশ্চিম তীর ও গাজাকে নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে; পুরনো শহরসমেত অবিভক্ত জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী; এবং সকল অবৈধ ইহুদি বসতি ইসরায়েলে অন্তর্ভুক্ত করা হবেএ সকল বসতির মধ্যে রয়েছে জর্দান উপত্যকা, যা কিনা পশ্চিম তীরের এক চতুর্থাংশ, এবং জর্দানের সাথে ফিলিস্তিনের সীমান্ত এই জর্দান উপত্যকায়ই অবস্থিত। এর ফলে ফিলিস্তিন হবে ইসরায়েলি সাগর বেষ্টিত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, যার চারপাশে থাকবে শুধুই ইসরায়েল। ট্রাম্প সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন যে এই পরিকল্পনায় ইসরায়েলকে যে অঞ্চলসমূহ প্রদান করা হয়েছে, তার প্রতিটির উপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তার পরপরই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু সকল বসতি ও জর্দান উপত্যকা অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম আগামী রোববার থেকে শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিক ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য বিরোধীরা এই প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ স্পষ্টতই এর মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেছে। ইসরায়েলি বামপন্থীরা, পিএলও এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য সমর্থকরা এই প্রস্তাবনার সমালোচনা করছেন এই একই কারণে, তারা বলছেন এর মাধ্যমে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কফিনে সর্বশেষ পেরেকেটি মারা হয়েছে।
অর্থাৎ এই প্রস্তাবনার সমর্থক এবং সমালোচক, উভয়েই এ বিষয়ে একমত যে এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি পরিকল্পনাটি এই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিন থেকে বজায় থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানের বিপরীত? নাকি বাস্তবে এটি তাদের অবস্থানের যৌক্তিক পরিপূর্ণরূপ?
শতাব্দি কাল ধরে ফিলিস্তিনের আদি বাসিন্দাদের বলি দেওয়ার ইসরায়েলি লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে পাশ্চাত্য। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি জাতীয় মাতৃভূমি (!) প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, যেখানে সে সময় ইহুদি ছিল মোট জনগণের ৮ শতাংশেরও কম। তিরিশ বছর পর জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে ভাগ করার জন্য একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে, যে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ ভূমি ইহুদিদেরকে দেওয়া হয়, যেখানে তারা তখনো মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম ছিল, আর তাদের মালিকানায় ছিল ৭ শতাংশের কম ভূমি। পরবর্তী যুদ্ধের সময় ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দকৃত ভূমির অর্ধেকেরও বেশি দখল করে; ইসরায়েলের এই নতুন সীমান্তের ভিতর বসবাসকারী চার-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনিকে তখন তাদের বাড়ি ফিরতে বাধা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন ইসরায়েলকে জবরদখলকৃত ভূমি ফেরত দেওয়ার জন্য কিংবা শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়ি ফেরার সুযোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়নি।
১৯৬৭ সালের পর ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ২২ শতাংশ দখল করে ফেলে, সেই সাথে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়, ইসরায়েল তখন দখলকৃত অঞ্চলে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তুলে। এবং একই ভূমিতে বসবাসরত দুই গোষ্ঠী তথা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জন্য ভিন্ন আইনের শাসন চালু করে। ১৯৮০ সালে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্বজেরুজালেম দখল করে, তখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নামেমাত্র কিছু আন্তর্জাতিক নিন্দাজ্ঞাপন হলেও মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা ইসরায়েলকে শক্তিশালী করে।
১৯৯৩ সালে ওসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য তাদের বিচ্ছিন্ন দ্বীপতূল্য অঞ্চলসমূহে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই চুক্তিও ইসরায়েলি বসতি উচ্ছেদ; কিংবা নিদেনপক্ষে আর নতুন কোন বসতি স্থাপন না করার দাবি জানানো হয়নি। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম মার্কিন পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয় বিল ক্লিন্টনের আমলে ২০০০ সালে। এতে বলা হয় বড় বড় ইহুদি বসতি সমূহ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে, এবং একই ভাবে পূর্ব জেরুজালেমের সকল ইহুদি বসতিও ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে বেসামরিকিকৃত, এবং সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান থাকবে, আর জর্দান উপত্যকায় থাকবে আন্তর্জাতিক বাহিনী, যা প্রত্যাহার করা হতে পারে শুধুমাত্র ইসরায়েলের সম্মতির ভিত্তিতে। “শতাব্দির বন্দোবস্তের” মতই, সেই পরিকল্পনায়ও ফিলিস্তিনকে সামান্য বেশি স্বায়ত্তশাসণ দেওয় হয়েছিল, এবং সেটিকেই রাষ্ট্র বলা হয়েছিল।
এখনো, ইসরায়েলের সামরিক হিসাব অনুসারে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ইসরায়েলিদের তুলনায় বেশি সংখ্যক ফিলিস্তিনি বসবাস করছে। ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায়ই হোক, কিংবা ক্লিন্টন সাহেবে পরিকল্পনায়ই হোক, সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে এক-চতুর্থাংশেরও কম ভূমি, আর তার সাথে ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের উপর বিধি-নিষেধ তো আছেই। কাজেই এসব প্রস্তাবনা থেকে যে ফলাফল আসবে, সেটাকে বড় জোর দেড়-রাষ্ট্র সমাধান বলা যেতে পারে, দুই-রাষ্ট্র সমাধান নয়।
ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায় অনেকগুলো ভুল রয়েছে: এটিতে ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইহুদিবাদী স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে পুরষ্কৃত এবং উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এর কোনটাই অতীতের রীতি কিংবা নীতি ভেঙে করা হয়নি। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কেবলমাত্র একটি বাড়ির নির্মাণকাজের শেষ অংশটুকু করা হয়েছে, রিপাব্লিকান ও ডেমক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারা মিলে যে বাড়ি নির্মাণে কয়েক দশক ধরে সহযোগিতা করে আসছেন। গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম তীর দখল করছে, দখলকৃত ভূমিতে ৬ লাখেরও বেশি দখলদারকে পাঠিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন ইসরায়েলকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে ভেটো দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালত ও তদন্তকারী সংস্থাসমূহের উপর চাপ প্রয়োগ করেছে যাতে করে ইসরায়েলকে কোন ধরনের চাপ না দেওয়া হয়, এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্রদান করেছে।  
কোন কোন ডেমক্র্যাট রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী এখন বলছেনন যে তারা ইসরায়েলি এই দখলদারি অনুমোদন করেন না, কিন্তু তারাও এটা বন্ধ করার কোন উপায় প্রস্তাব করছেন না। যেমন মূলধারার ডেমক্র্যাট সিনেপর অ্যামি ক্লবুচার এই দখলদারির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ঘোষণা করেছেনে, এবং ট্রাম্পের সমালোচনা করে লেখা একটি চিঠিতে সাক্ষরও করেছেন। কিন্তু ২০১৬  সালে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রেজুলেশন পাশ করেছিল, তখন নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেউ রেজুলেশনের বিরুদ্ধে গুরুতর আপত্তি প্রকাশ করা” সিনেট রেজুলেশনের কো-স্পন্সর ছিলেন এই তিনিই।
সিনেটর বের্নি স্যান্ডার্স ব্যতীত অন্য কোন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন প্রস্তাবনার কথা বলেননি যা ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনে মার্কিন জটিলতা হ্রাস করবে। দখলদারির বিরোধিতা করার ঘোষণা দেওয়াটা আসলে অন্তঃসারশূন্য, যদি না সেই ঘোষণায় দখলদারি বন্ধের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকে: অবৈধ বসতি নির্মাণের পণ্যসমূহ নিষিদ্ধ করা; দখলিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েল যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বসতি স্থাপন করছে, সেই পরিমাণ আর্থিক সহায়তা হ্রাস করা; অবৈধ বসতি স্থাপনের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলো থেকে ফেডারেল এবং স্টেট সরকারের পেনশন তহবিল সরিয়ে নেওয়া; ইসরায়েল যতক্ষণ না গাজায় অবরুদ্ধ বিশ লক্ষ মানুষকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদেরকে সমান নাগরিক অধিকার প্রদান, যতটুকু নাগরিক অধিকার তাদের আশেপাশে বসবাসরত ইহুদিরা পাচ্ছে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কয়েক দশক ধরে চলে আসা শান্তি প্রক্রিয়ার মতোই ইসরায়েলকে কথিত স্থিতাবস্থার আচ্ছাদন দিচ্ছে, যার মাধ্যমে ইসরায়েল জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকার পায়, কোটি কোটি মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাদের চলাফেরায় বিধি নিষেধ আরোপ করে, তাদের যে কোন বক্তব্যকে “জনশৃঙ্খলা” বিঘ্ন করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, কোন ধরনের বিচার কিংবা অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য “প্রশাসনিক আটকের” নামে বন্দী করতে পারে। আর এসব চলাকালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অন্যরা এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েরে পিঠ চাপড়ে দিতে থাকে, সেই সাথে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার খাতিরে “অর্থপূর্ণ সংলাপ” পুনরায় শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে থাকে।
ইসরায়েলের সমর্থকরা বলতে চাইবেন যে ইসরায়েলকে এক ঘরে করে ফেলা হয়েছে, এবং তারাই সঠিক। অথচ ইসরায়েল হলো একমাত্র রাষ্ট্র, যেটি স্থায়ীভাবে সামরিক দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে, একই অঞ্চলে বসবাসরত দুটি গোষ্ঠীর জন্য বৈষম্যমূলক পৃথক আইন প্রয়োগ করছে, অথচ তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে, তাদের রক্ষা করতে, এমনকি তাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে দুনিয়ার আত্মস্বীকৃত উদারবাদীরা পারলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমালোচনা কারী ডেমক্র্যাটরা আসলে তার চেয়ে ভালো কেউ নন, কারণ তারা কেউই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যথাযথ কোন অবস্থান গ্রহণ করছেন না। কথায় না হলেও কাজে তারাও দখলদারি যুলুমবাজির সমর্থক, ট্রাম্পেরই মতো।


লেখক ইন্টার্ন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আরব-ইসরায়েল প্রকল্পের পরিচালক। নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে Trumps Middle East Peace Plan Exposes the Ugly Truth” শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি নিউ ইয়রক্ টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


মার্ক লিওনার্ড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ফ্রান্সের বিয়ারিতজ শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সবার আগ্রহের বিষয় ছিল, কার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় বিঘ্নতা আসছে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের, নাকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পক্ষ থেকে? যদিও সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এমন একজন, যার উপস্থিতিই আদতে প্রত্যাশিত ছিল না, তিনি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।
যদিও এই সম্মেলনে গণমাধ্যমের চোখ ছিল বাণিজ্য যুদ্ধ, আমাজনের আগুন এবং বিপজ্জনক “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের উপর, তবে সবচেয়ে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে সম্ভবত ইরানের বিষয়ে। ইরানের সাথে হওয়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ভাগ্য দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে কিনা সেটা যেমন নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি পশ্চিমা রাজনৈতিক জোট টিকে থাকবে কিনা, তাও নির্ধারণ করতে পারে।
বিয়ারিতজে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতা নিরসনের উদ্যোগের সূচনা করেছেন। এবং সাম্প্রতিক দিনগুলিতে ইরান নাটকের মূল খেলোয়াড়রা সকলেই পিছনের দিকে ফিরছেন। যুক্তরাজ্য জিব্রাল্টার থেকে আটককৃত ইরানের ট্যাংকার (গ্রেস ১) ছেড়ে দিয়েছে। এবং, আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাহেব ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রোহানির সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, এমনকি তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের স্বল্পমেয়াদি “লাইন অব ক্রেডিট অথবা লোন” পাওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি করবেন না।
তবু অনেকগুলো বিষয় উত্তেজনা নিরসনের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। প্রথমেই, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো মনে করে যে ইরানের (এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের) উপর যত বেশি চাপ প্রয়োগ করা হবে, ততই ভালো হবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে চান, এবং তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় সহযোগিতার পথ বন্ধ করার মাধ্যমেই এটি করতে হবে। তিনি এবং অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সাথে ইউরোপের ঐক্য নষ্ট করতে সব উপায় অবলম্বন করবেন, এবং স্পষ্টতই তারা সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করবেন যুক্তরাজ্যের উপর। আরো জঘন্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কেউ এবং মধ্যপ্রাচ্যেরও কেউ কেউ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরানকে সামরিক বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য ফাঁদ বানাতে চায়।
ইরানি কট্টরপন্থীদের নিয়েও সমস্যা আছে। তাদের অনেকেই মনে করেন, পারমাণবিক চুক্তি থেকে তারা কিছু্ই পাননি, এবং তাদের মতে উদ্দেশ্য সাধনের উপায়টিই বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ইরানি নেতারাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বিরোধী কাজে উৎসাহী হয়ে পড়েছে, শুধু যে হরমুজে ব্রিটিশ ট্যাংকার দখল করেছে, সেটিই্ এ ধরনের একমাত্র কাজ নয়। (ইউরোপে ইরানেরও পছন্দের ক্ষেত্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেরই মতো।)
ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাব ইসরায়েলেরও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে, যার ফলে ইরাকে তারা ইরানের সম্পত্তিসমূহকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। (ইতিমধ্যে সিরিয়ায় ইরানি বাহিনীর উপর হামলা শুরু করে দিয়েছে।)
বোধগম্য কারণেই ইরান ইনসটেক্স উদ্বোধনে ইউরোপের ধীর গতির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে। ইনসটেক্স মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপ-ইরান বাণিজ্য সম্ভব করে তোলার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু ইরানের যারা দাবি করছেন যে, তারা ইউরোপ থেকে কিছুই পাননি, তারা একেবারেই ভুল দাবি করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের বর্তমান অবস্থান পরিত্যাগ করে ইরানকে চেপে ধরার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিত, তাহলে তারা পার্থক্যটা স্পষ্টতই বুঝতে পারতেন। আসলে তীব্রতাবৃদ্ধির নীতি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ইরান নৈতিক উচ্চ অবস্থান হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, একই ভাবে তারা সেই সকল ইউরোপীয়দের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতি থেকে ভিন্ন ইরান নীতি মানতে চাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে পাত্তা না দিয়ে চুক্তির বিষয়ে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপ যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা অনেককে বিস্মিত করেছে। এমনকি বলতে গেলে ব্রিটিশ সরকারও ইইউর সাথেই আছে এ বিষয়ে। কিন্তু এটা পরিবর্তন হতে পারে। ইরান যদি ব্রিটেনের আরেকটি জাহাজ আটক করে, এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে, তাহলে এর ফলে জনসন ইইউ’র সঙ্গত্যাগ করে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিতে পারে।
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও হতাশার বিষয় হলো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য পারস্য উপসাগরে একটি যৌথ ইউরোপীয় মিশন চালু করতে পারেনি, যাতে তাদের যে কারো উপর আক্রমণ হলে সেটি সকলের উপর আক্রমণ বলে গণ্য হতে পারে। যুক্তরাজ্য যদি ইরান ইস্যুতে ইইউ’র পথ থেকে সরে যায়, তাহলে পরবর্তী কট্টরপন্থীদের (ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশেরই) লক্ষ্যবস্তু হবে জার্মানকে সরানো। একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সেখানে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
এসকল ঝুঁকি ভালো মতন মোকাবেলা করার জন্যে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, ইরান যদি আরেকবার তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম হ্রাস করার মাধ্যমে চুক্তিতে আসতে রাজি হয় এবং পাশ্চাত্যের সাথে আলোচনার দুয়ার খোলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প যেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ... ... এই ক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প আমেরিকার অনন্তকালব্যাপী এবং বিদেশে অযৌক্তিক অভিযানসমূহ যুদ্ধসমূহ সমাপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ইউরোপীয়দেরকেও অবশ্যই ইরানকে বুঝাতে হবে, যেন সে নিজের ক্ষমতাকে অতিমাত্রায় বড় করে না দেখে। একটি নতুন ক্রেডিট লাইনের বিষয়ে ম্যাক্রোঁর প্রস্তাব হয়তো ইরানের মধ্যপন্থীদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু ইউরোপীয়রা যদি ইনসটেক্স চালু করতে এবং চালাতে সক্ষম না হয়, তবে ইরানিদের নিকট তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ হয়ে যাবে। সর্বাবস্থায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অবধি ইরানকে নীরব থাকতে উৎসাহিত করা। ইউরোপেরে উচিত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা, তবে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে, যে ইউরোপীয় স্বার্থে ইরান যদি আর কোন আক্রমণ করে, তাহলে ইইউ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিয়ন্ত্রণ কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে।
সর্বোপরি, পারস্য উপসাগরে ইউরোপের তীক্ষ্ম নজরদারি রাখা দরকার। এমনকি তারা যদি যুক্ত নৌশক্তি সংগঠিত নাও করে, তাদের উচিত হবে উত্তেজনা হ্রাসে কাজ করা, যদি যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইরান কোন সম্মুখ দ্বন্দ্বের জন্য প্ররোচিত করতে চায়। ইরানকে সাথে নিয়ে নৌ-মহড়ার আয়োজন করা এক্ষেত্রে চমৎকার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কৌশল মাথায় রেখেই সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন ম্যাক্রোঁ। কৌশলটি সফল হলে ট্রাম্পের আমলে বিয়ারিতজ সম্মেলনই হবে প্রথম সফল জি৭ সম্মেলন। (সেটা ট্রাম্প জানুন কিংবা নাই জানুন।)

________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will the Iran Conflict Break the West? শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক মার্ক লিওনার্ড বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের পরিচালক। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


চার্লস এম. ব্লো, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
এখনো যারা বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না যে ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন আগ্রাসী বর্ণবাদী, তাদেরকে বিশ্বাস করানোর জন্য তিনি তার প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছেন। অন্তত পক্ষে আমি তার মতিগতি সম্পর্কে এরকম ধারণাই পোষণ করি। আসলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে তার সবচেয়ে সত্যিকারের স্বভাব বারবার প্রকাশ পাচ্ছে, এবং তিনি তার সমর্থকদের বর্ণবাদের প্রতি আকর্ষণ করতে নিজের বর্ণবাদকে ব্যবহার করছেন
রোববার সকালে, যেদিন ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা করে যে তারা কাগজ-পত্রবিহীন অভিবাসীদেরকে ধরপাকড় করার জন্য অভিযান চালাবে, একই দিন আবার ট্রাম্প সাহেব তার করা সবচেয়ে জঘন্য বর্ণবাদী ধারাবাহিক তিনটি টুইটের মাধ্যমে নয়া চার কংগ্রেসওম্যান  এবং হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির মধ্যকার দ্বন্দ্বে জোর ভূমিকা পালন করেন টুইট তিনটির ভাষ্য নিম্নরূপ
তোপ্রগতিশীলডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যানদের দেখে বেশ মজা লাগছে, যারা আসলে এমনসব দেশ থেকে এসেছেন, যেগুলোর সরকার পুরোপুরি বিপর্যয়কর, সবচেয়ে জঘন্য, সবচেয়ে দুর্নীতিবাজ দুনিয়ার যে কোন জায়গায়ই অনুপযুক্ত (আদৌ যদি তাদের কোন কার্যকর সরকার থেকে থাকে আরকি), এখন জোরে সোরে ...
... এবং জঘন্যভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে মহান এবং সবচেয়ে ক্ষমতাশালী জাতি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে শেখাচ্ছে, কীভাবে আমাদের সরকার চলা উচিত তারা কেন ফিরে যাচ্ছে না, এবং পুরোপুরি ভেঙে পড়া এবং অপরাধ কবলিত যে সকল জায়গা থেকে এসেছে সেসব জায়গা সংস্কারে সহযোগিতা করছে না এরপর ফিরে আসেন এবং আমাদেরকে দেখান কীভাবে ...
...  এই কাজ করতে হয় সেসকল জায়গার খুব বেশি দরকার তোমাদের সাহায্যের, তোমরা এতো দ্রুত সেগুলোকে পরিত্যাগ করতে পারো না আমি নিশ্চিত ন্যান্সি পেলোসি খুবই খুশি মনে দ্রুত বিনে পয়সায় ভ্রমণের ব্যবস্থা করে দিবেন
এসকল প্রগতিশীল কংগ্রেসওম্যান হলেন নিউ ইয়র্কের আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ, মিনেসটার ইলহান ওমর, মিশিগানের রাশিদা এবং ম্যাসাচুসেটসের আয়েনা এস. প্রেসলি
প্রথমত বাস্তবতা হলো ওকাসিও, রাশিদা এবং প্রেসলিমূলত যে দেশ থেকে এসেছেনসেটি তারা তিনজনই আমেরিকাতে জন্মগ্রহণ করেছেন ইলহান ওমর ছিলেন সোমালিয়ান শরণার্থী
কিন্তু, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: তারা শ্বেতাঙ্গ নন, এবং তারা নারী তারা শ্বেত জাতীয়তাবাদীদের সমাজ কাঠামোতেঅন্যদেরঅন্তর্ভুক্ত তারা আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকান বংশোদ্ভুত
এ ধরনের চিন্তার কেন্দ্রীয় বিন্যাসটা এরকম: এটি একটি শ্বেত-রাষ্ট্র, শ্বেতাঙ্গদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং নির্মিত, কাজেই শ্বেত-রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকাটাই এ রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত যে কেউ সত্যিকারের মার্কিন হতে হলে তাকে অবশ্যই এই ভাষ্যটি গ্রহণ করতে এবং স্বীকার করতে হবে, এই ঐতিহ্যের প্রতি মাথা নোয়াতে হবে এবং এসকল রীতি-নীতির প্রতি অনুগত হতে হবে
এই ভাষ্য অনুসারে যে সকল দেশ থেকে কালো ও বাদামী লোকজন আসে, সেগুলোকে ত্রুটিপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখা হয়পুরোপুরি বিপর্যয়কর, সবচেয়ে খারাপ এবং সবচেয়ে জঘন্য এবং দুনিয়ার যে কোন জায়গায় অনুপযুক্ত কারণ, এর মূল ভিত্তিতে, কালো এবং বাদামী মানুষদেরকে ঊনমানুষ হিসেবে দেখা হয়
এটি শ্বেত আদর্শবাদের একটি ধরন, যা কিনা বহুসংস্কৃতিবাদের বিরোধিতা করে, কিন্তু বিরোধিতা করাটা যে বর্ণবাদের অন্তর্ভুক্ত, সেটা মেনে নিতেও রাজি নয়
এবং তাই, যখন কোন কালো এবং বাদামী মহিলা বাইরের দেশ থেকে বাইরের নাম নিয়ে এই দেশে এসে শ্বেত-পিতৃপুরুষদের চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখায়, তখন এই আদর্শবাদ স্বভাবতই ক্ষুব্ধ হয় কেন তারা জানে না যে এই সমাজে তাদের স্থান আসলে কোথায়? তারা কেন সমাজের ভদ্রলোকদের (শ্বেতাঙ্গদের) নিকট নতজানু হয় না? তারা কেন শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার এবং সম্মান করে না?
এখান থেকে শুরু করুন: কারণ পুরো শ্বেত-শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শ এবং চেতনাই হলো একেবারে মিথ্যা আজকের এই আমেরিকা বেশির ভাগ অঞ্চলে তাদের সীমানা বৃদ্ধি করেছে স্থানীয় আমেরিকানদের রক্ত ঝরিয়ে, এবং তাদের সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে এই রাষ্ট্রের বেশির ভাগ সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে ২৫০ বছরের কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিদানহীন শ্রমের মাধ্যমে
এবং এই দেশের পুরো ইতিহাসজুড়ে, কিছু পরিমাণে কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্বেষ জড়িয়ে আছে এখন, এখানে তীব্র মুসলিম-বিদ্বেষী এবং অভিবাসী-বিদ্বেষী জেনোফোবিয়ার (বিদেশি-ভীতি) অস্তিত্ব রয়েছে
আমেরিকা জন্মসূত্রে অসুস্থ অবস্থাতেই জন্মগ্রহণ করেছে, এবং তখন থেকেই এই রাষ্ট্রটির কার্যকর চিকিৎসা দরকার, যদিও সে প্রায়ই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের অবস্থানে ফিরে গেছে। আমেরিকার নিজের অর্জিত পাপকে চ্যালেঞ্জ করা কোন অশুভ আক্রমণ নয়। এটা বরং দেশপ্রেমরই পরিচয় বহন করে। যেমনটা একবার জেমস বাল্ডউইন বলেছিলেন, “আমি এই পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের তুলনায় আমেরিকাকে বেশি ভালোবাসি, এবং, আসলে ঠিক এই কারণেই, আমি সবসময়ই এর সমালোচনা করার অধিকারের উপর জোর দিই।
এবং, এই কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমেরিকার ভবিষ্যৎ চেহারার প্রতিনিধিত্বকারী এই চার নারীর চেয়ে শ্রেয়তর আর কে হতে পারেন।
কিন্তু, ট্রাম্প এবং তার অনেক সমর্থক ও তার হয়ে তর্ক করা লোকজন তাদের বর্ণবাদী আদর্শকে উগরে দিচ্ছেন এবং তাদের লেখা তারা আবার যখন পড়ছেন তখন নিজেরাই নিজেদেরকে বলছেন যে, এটা পুরোপুরিই গ্রহণযোগ্য। অনেকটা কুকুরের নিজের বমি নিজে খাওয়ার মতো বিষয় আরকি।
এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রাম্প পেলোসি ও চার কংগ্রেসওম্যানের দ্বন্দ্বের আগুনে ঘি ঢাললেন। শুক্রবার মনে হচ্ছিল তিনি পেলোসিকে বাঁচানোর জন্য কথা বলছেন, সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন: “তিনি (পেলোসি) বর্ণবাদী নন। ঠিক আছে? তিনি বর্ণবাদী নন। তারা যে তাকে বর্ণবাদী বলছে, এটা অপমানসূচক।”
কিন্তু, আসলে তিনি পেলোসির পাশে দাঁড়াচ্ছিলেন না, বরং তার পিছনে লুকোচ্ছিলেন। তিনি কায়দা করে যেন বলছিলেন, তার মতো যে সকল লোককে ভুল করে বর্ণবাদী মনে করা হয়, তারা আসলে বর্ণবাদী নন। তিনি পেলোসিকে নিজের সমান্তরালে দাঁড় করালেন, দুজনেই একই ধরনের ভিক্টিম (বর্ণবাদী নন, অথচ মানুষ ভুলভাল তাই মনে করে!)
কিন্তু, এখানে সমান্তরালের কোন বিষয় নেই। ট্রাম্প বর্ণবাদী কি না, তা নিয়ে আর কোন আলোচনা বা বিতর্কের দরকার নাই। তিনি অবশ্যই বর্ণবাদী। তার মনে কি আছে সেটা না জানা সম্পর্কে তিনি আর বাগাড়ম্বর কিংবা ভেলকি দেখানোর দরকার নাই। কারণ, ভিতর যা আছে, সেগুলো বাইরে বেরিয়ে আসতে আমরা দেখি।
শ্বেতাঙ্গ জনগণ শ্বেতত্ব ট্রাম্পের রাষ্প্রপতিত্বের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছে। তার প্রাথমিক মাথাব্যথা হলো এটিকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, প্রচারিত করা যায় সেটি। আমেরিকার রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে তিনি শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদ পুনরুদ্ধারের জন্য নিয়ে আসছেন। এবং, আত্মস্বীকৃত রিপাবলিকানরা অবশ্যই এ কারণে তাকে ভালো বাসেন।
আমরা এই জাতির ইতিহাসের খুবই অন্ধকার একটি অধ্যায় প্রকাশ পেতে দেখছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাষ্ট্রপতি তার শ্বেতভবনে নগ্ন বর্ণবাদকে ফিরিয়ে আনছেন। এবং আমরা অন্যান্য  নাগরিকদেরকে দেখতে পাচ্ছি, সম্ভবত তাদের এক-তৃতীয়াংশকে, তারা ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন অব্যহত রেখে আমাদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ প্রকাশ করছেন।
________________________________

নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত মূল লেখাটির শিরোনাম “Trumps Tweets Prove That He Is a Raging Racist”। ভাষান্তর কর্তৃক বাংলায় অনূদিত এবং সংযুক্ত ছবিটি নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে সংগৃহীত।


নুরিয়েল রুবিনি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
কয়েক বছর আগে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পশ্চিমা প্রতিনিধি দলের একজন হিসেবে চীনের রাষ্ট্রপতি জি জিনপিং সাথে দেখা করেছিলাম আমাদের সাথে কথা বলার সময় রাষ্ট্রপতি জি বুঝিয়ে বলতে চান যে চীনের উত্থান হবে শান্তিপূর্ণ, অন্য কোন রাষ্ট্রের বিশেষতযুক্তরাষ্ট্রেরথুসিডাইডিসের ফাঁদ(থুসিডাইডিস ট্র্যাপ) নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন দরকার নাই থুসিডাইডিসের ফাঁদ এই পরিভাষাটি গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডিসের নামে নামকরণ করা হয়েছে, উদীয়মান অ্যাথেন্স নিয়ে স্পার্টার ভীতি কীভাবে উভয় নগর রাষ্ট্রকে অনিবার্য যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, সে ইতিহাস এই ঐতিহাসিক লিখে গেছেন মূলত সেখান থেকেই এই ধারণার উদ্ভব
উভয় পক্ষই থুসিডাইডিসের ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র যে কোনভাবে এই ফাঁদে পড়বে বলে মনে হচ্ছে যদিও উভয় পরাশক্তির মধ্যে গরম (প্রত্যক্ষ) যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে, ঠাণ্ডা যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি
চলমান উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনকে দোষারোপ করছে এদিকে চীন মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের যে কোন ধরনের উত্থান ঠেকানো কোন পক্ষের যুক্তি শক্তিশালী, সে তর্কে না গিয়েও বলা যায় অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা খুব সম্ভব অবশ্যম্ভাবী বাণিজ্যযুদ্ধ রূপে যে উত্তেজনার সূচনা, সেটি স্থায়ী দ্বিপাক্ষিক শত্রুতায় রূপ নিতে পারে এর প্রতিফলন দেখা যায় ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে, যেখানে চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, এবং সব ক্ষেত্রে চীনের মোকাবেলা করা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়েছে
সে অনুসারে স্পর্শকাতর সেক্টরসমূহের চীনা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) উপর যুক্তরাষ্ট্র কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে, এবং কৌশলগত শিল্পসমূহ যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ৫জি ইত্যাদিতে পশ্চিমা কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য আরো অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইউরেশিয়ান দেশসমূহে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চীন যে বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেই বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে অংশগ্রহণ না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের উপর চাপ প্রয়োগ করছে সেই সাথে পূর্ব দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর টহল বৃদ্ধি পাচ্ছে, এদিকে বিতর্কিত অঞ্চলসমূহ দাবি করার ক্ষেত্রে চীন আরো বেশি আগ্রাসী হয়ে পড়ছে
চীন-মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধের বৈশ্বিক পরিণতি সোভিয়েত-মার্কিন ঠাণ্ডাযুদ্ধের তুলনায় আরো বেশি তীব্র হবে সোভিয়েত ছিল পতনশীল পরাশক্তি ব্যর্থ অর্থনৈতিক মডেলের দেশ, যেখানে চীন শিগগিরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে, এবং খুব সম্ভব অদূর ভবিষ্যতে তার উত্থান অব্যহত থাকবে তাছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য ছিল খুবই সীমিত পরিসরে, যেখানে চীন পুরোপুরিভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে জড়িত এবং বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত
ফলে পূর্ণমাত্রার ঠাণ্ডা যুদ্ধ নতুন মাত্রার বি-বিশ্বায়ন (ডিগ্লোবালাইজেশন) করতে পারে; অন্ততপক্ষে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুটি ব্লকে বিভক্ত করে ফেলবে বহুধা বিভক্ত এ পৃথিবীতে চীন যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই চাইবে অন্য সকল দেশ যেন যে কোন একটি পক্ষ গ্রহণ করে, কিন্তু সেসকল দেশের সরকার উভয় পক্ষের সাথে তাল মিলিয়ে ভালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করবে সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যতটা ব্যবসায় করছে, তার চেয়ে বেশি ব্যবসা (বাণিজ্য বিনিয়োগের দিক থেকে) করছে চীনের সাথে
যদিও ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্র উভয়দেশই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ৫জির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিসমূহ আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, ফলে সেখানে এরকম মাঝামাঝি অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে প্রত্যেক দেশকেই বেছে নিতে হবে দুটি পক্ষের যে কোন একটিকে, এবং এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব হয়তো আবার বি-বিশ্বায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করবে
যাই হোক না কেন, এই শতাব্দির ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একটা পর্যায় পর্যন্ত তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী কিন্তু আদর্শিক দিক থেকে উভয় পক্ষের উচিত হবে গঠনমূলকভাবে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা করা
যদি এই সম্পর্ক ভুলভাবে চলতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ উত্থানকে দমন করার চেষ্টা করে এবং চীন আগ্রাসীভাবে এশিয়া বিশ্বের অন্যত্র তার প্রভাব বিস্তার করে তাহলে একটি পূর্ণমাত্রা ঠাণ্ডাযুদ্ধ সংগঠিত হবে এবং একটি গরম যুদ্ধ (অথবা এক গাদা প্রক্সি যুদ্ধ) এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না হয় তো একবিংশ শতাব্দিতে থুসিডাইডিসের ফাঁদ শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর চীনকে নয়, বরং পুরো পৃথিবীকেই হয়তো গ্রাস করে ফেলবে
________________________________

লেখক: নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লিন্টনের আমলে এই ভদ্রলোক হোয়াইট হাউজে অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করতেন তাঁর লেখাThe Global Consequences of a Sino-American Cold Warশীর্ষক নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশ হয়েছে ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.