Articles by "আল জাজিরা"

আল জাজিরা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান



আল জাজিরা:
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অচলাবস্থার নির্বাচনের পর ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে এমনটাই জানানো হয়েছে।
গত বুধবারে রাষ্ট্রপতি রিউভেন রিভলিন, নেতানিয়াহু এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের পর ঘোষণাটি এসেছে। বেনি গান্টজ “তীব্র দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন এক জন নেতার,নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ডানপন্থী লিকুদ পার্টির ৬৯ বয়সী নেতা নেতানিয়াহু, যিনি দেশটির সরবচেয়ে দীর্ঘকালীন নেতাও বটে, সরকার গঠনের জন্য তার হাতে ২৮ দিন সময় আছে। অবশ্য দরকার হলে রাষ্টপতির নিকট আরো দুই সপ্তাহ সময় চাইতে পারবেন।
তিনি ব্যর্থ হলে মধ্যপন্থী নীল-সাদা দলের নেতা গান্টজকে সুযোগ দেওয়া হবে।
টেলিভিশনে প্রচারিত মনোনয়ন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রিভলিন নেতানিয়াহুকে বলেন, “মহাশয়, আমি আপনাকে সরকার গঠনের সুযোগ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।”
রিভলিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা নেতানিয়াহু বলেন, সাবেক জেনারেল গান্টজের তুলনায় তার সাফল্যের সম্ভাবনা একটুখানি বেশি।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে এমন একটি পরিস্থিতির কথা কল্পনা করছিলেন, যেখানে তিনি এবং গান্টজ আরেক বার ক্ষমতা ভাগাভাগি করার সুযোগ পাবেন। যখন কিনা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে এসেছিল যে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে তৃতীয় আরেকটি নির্বাচন আয়োজন ছাড়া আর কোন উপায় নেই। উল্লেখ্য ইসরায়েলের অনেকেই তৃতীয় নির্বাচন চাচ্ছিলেন।
তিনি বলেছেন, “আমি যদি সফল না হই তাহলে আমি আপনার প্রস্তাব আপনার নিকট ফিরিয়ে দেব, ঈশ্বর, ইসরায়েলের জনগণ এবং আপনার সহযোগিতায় আমরা একটি সম্প্রসারিত জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করবো।”
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতানিয়াহুর সামনে এখনো পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠনের কোন স্পষ্ট উপায় নেই। এ বছরে দ্বিতীয় বারের মতো গত ১৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
লিকুদ পার্টি নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো ১২০ আসনের সংসদে ৬টি আসন কম থাকার কারণে সরকার গঠন করতে পারছে না। নতুন হিসাবনিকাশে লিকুদ পার্টির হাতে আছে ৫৫টি আসন, এর বিপরীতে নীল-সাদা দলের হাতে আছে ৫৪টি আসন।
নেতানিয়াহু ঐক্যের সরকারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে হুমকি এবং শিগগিরই ট্রাম্পের ঘোষিতব্য “শতাব্দির বন্দোবস্ত” বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পুনর্মিলন দরকার।
ট্রুম্যান ন্যাশনাল নিরাপত্তা প্রকল্পের অংশীদার এলিস জ্যাকবস বলে, রাষ্ট্রপতি নেতানিয়াহুকে দায়িত্ব দিয়েছেন কারণ তার নিকট মনে হয়েছে এটিই সবচেয়ে ভালো উপায়।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এই মুহূর্তে লিকুদ পাার্টির সকল মন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি অনুগত আছেন। কাজেই, নেতানিয়াহু যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হবেন এটি কষ্টকল্পিত হলেও অসম্ভব নয়।”
তিনি আরো যোগ করেন, “রাষ্ট্রপতির পদটি যদিও প্রতীকী, তবু রাষ্ট্রপতি এ বছরের মধ্যে ৩য় নির্বাচন এড়ানোর জন্য তার সাধ্যানুযায়ী সবকিছুই করবেন । আর তিনিও লিকুদ পার্টির সাবেক সদস্য।”

প্রতিবেদনটি আল জাজিরা ইংরেজি থেকে নেওয়া। মূল প্রতিবেদন পড়ুন।


ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বক্তব্য দিচ্ছেন, ছবি: রয়টার্স
ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বক্তব্য দিচ্ছেন, ছবি: রয়টার্স


আল জাজিরা ইংরেজি:
ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণকালে তার দেশএকটি আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে।
১৯৮০’র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ সূচনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি টেলিভিশন ব্ক্তৃতায় রুহানি বলেন যে ইরান তেহরানের নেতৃত্বে উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী অঞ্চলের বৈদেশিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই অঞ্চলের দেশ সমূহের প্রতি “বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের হাত” বাড়াবে। উল্লেখ্য হরমুজ প্রণালী পুরো দুনিয়ার তেল শিল্পের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বলে বিবেচিত হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সম্প্রতি এ অঞ্চলে সৈন্য বৃদ্ধির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় রুহানি উপসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক শক্তির উপস্থিতির বিরুদ্ধে হুশিয়ারি ঘোষণা করেন।
রুহানি বলেন, “বিদেশি সামরিক শক্তি আমাদের জনগণ ও অঞ্চলের অনিরাপত্তা এবং সমস্যার কারণ হতে পারে।” উল্লেখ্য রুহানি এই সপ্তাহের শেষের দিকে জাতিসংঘের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য নিউ ইয়র্ক সফর করবেন।
সৌদি তেলক্ষেত্রে হামলা
গত সপ্তাহে সৌদির অন্যতম বৃহৎ দুই তেল স্থাপনায় হামলার পর থেকে এ অঞ্চলে উত্তেজনা নতুস উচ্চতায় পৌছেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব আরামকোতে হামলার পিছনে ইরানকে দায়ী করছে, যদিও ২০১৫ সাল থেকে সৌদি-আমিরাত জোটের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এ হামলার দায় স্বীকার করেছেন।
ইরান এ হামলার সাথে কোন ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করছে।
এ হামলার পর ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা সৌদি ও আমিরাতে অস্ত্র ও কয়েক শত সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নৌপথ ও প্রধান প্রধান তেল বাণিজ্যপথসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আমিরাত, সৌদি, বাহরাইন, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে একটি নৌ জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
রুহানি তার বক্তব্যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিদেশি শক্তিদের দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন: “তারা যদি আন্তরিক হয়ে থাকে, তবে আমাদের অঞ্চলকে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বানানো তাদের জন্য উচিত হবে না।
তিনি আরো বলেন: “মার্কিনরা অথবা আমাদের শত্রুরা যেখানেই গেছে ... সেখানেই অনিরাপত্তা দেখা দিয়েছে।
“আমরা অন্যদের সীমান্ত লঙ্ঘন করতে যাবো না। একইভাবে অন্য কাউকেও আমাদের সীমান্ত লঙ্ঘন করার সুযোগ দেবো না।”

অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ”
ইরান এবং বিশ্বশক্তিসমূহের মধ্যে ২০১৫ সালে সাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাহার করার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকট দেখা দিয়েছিল, সৌদি আরবে হামলার ফলে সেটি আরো গভীর হয়েছে। এরপর থেকে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞাসমূহ আরোপ করেছে এবং ইরানের তেল রফতানি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।
এর জবাাবে ধীরে ধীরে তেহরান পরমাণু চুক্তির সকল প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত যে কোন ধরনের আলোচনার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করছে।
রুহানি তার বক্তব্যে নিষেধাজ্ঞাগুলোকে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, ইরানের “বিপ্লবী জনগণ” এ সকল হুমকিতে ভীত নয়।
তিনি আরো বলেন, “গত ৪০ বছর ধরে, এবং বিশেষত গত ১০ বছরে আমাদের জনগণ নিষেধাজ্ঞার চাপ সহ্য করতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরো যোগ করেন, “প্রতিরোধ, প্রজ্ঞা ও ঐক্যের মাধ্যমে ... ইরান অবশ্যই এই কঠিন সময় অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।”
________________________________

আল জাজিরা কর্তৃক “Iran to present regional security plan at UNGA: Rouhani” শিরোনামে মূল প্রতিবেদনটি প্রকাশিত। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

মিশরে সিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মিছিল
শুক্রবার রাতে মিশরে সিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মিছিল...


আল জাজিরা ইংরেজি:
রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার হাজার হাজার গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারী মিশরজুড়ে বিভিন্ন শহরে মিছিল করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার গভীর রাতে "জেগে উঠুন, ভয় নেই, সিসিকে অবশ্যই যেতে হবে" এবং "জনগণের দাবি, সরকারের পতন" প্রভৃতি স্লোগান দিচ্ছে।
রাজধানী কায়রো, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়া এবং সুয়েজে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
সাদা পোশাকধারী সেনা কর্মকর্তারা তাহরির চত্ত্বর অভিমুখী বিক্ষোভকারীদের মোকাবেলা করেন, যে চত্ত্বরে ২০১১ শুরু হওয়া আন্দোলনের ফলে হোসনি মুবারাকের পত ঘটেছিল।
মিশরের অভ্যন্তরে খবর সংগ্রহ আল জাজিরার জন্য নিষিদ্ধ, তবে রাজধানীতে বেশ কয়েকটি গ্রেফতার ও আন্দোলনকারীদের উপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে।
স্ব-নির্বাসিত মিশরীয় ব্যবসায়ী ও অভিনেতা মোহাম্মদ আলী রাষ্ট্রপতি এল-সিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনার পর থেকে এই বিক্ষোভগুলি শুরু হয়েছিল, আন্দোলনে জনগণকে রাস্তায় নেমে সিসির অপসারণের দাবি জানিয়েছে। এল-সিসি অভিযোগগুলিকে "মিথ্যা" বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবারে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে আলি বলেন, “সিসি যদি বৃহষ্পতিবারের মধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা না দেন, তবে মিশরীয় জনগণ শুক্রবার চত্ত্বরে বেরিয়ে আসবে
আলি সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ প্রথম ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন। তার সর্বশেষ ভিডিওটি লাখ লাখ বার দেখা হয়, এবং এর ফলে তিনি তার মাতৃভূমিতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে শুক্রবারে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে আলি জনগণকে শক্ত থাকার জন্য এবং অধিকার আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
আলি তার ভিডিও বার্তায় বলেন, আল্লাহ মহান, ইতোমধ্যে যথেষ্ট হয়েছে, আমি মিশরে ফিরতে চাই। আমি মিশর এবং আমার দেশের মানুষদের মিস কির। আল্লাহ আপনাদের সংকল্পকে দৃঢ়তা দান করুন।”
আল জাজিরার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ইহিয়া ঘানেম বলেন, তিনি "স্পষ্টতই" বিশ্বাস করেন যে শুক্রবারের বিক্ষোভ মিশরীয়দের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে।
তিনি বলেন, “মিশরে এখন যা চলছে তা আসলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আন্দোলন ... দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।”
লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ওয়াশিংটনস্থ সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির সিনিয়র ফেলো ডালিয়া ফহমি বলছেন, এসকল আন্দোল ২০১১ সালের বিপ্লব থেকে একেবারেই আলাদা।
ফাহমির মতে, যদিও জনগণ যে ভয়ের বাধা অতিক্রম করেছে তা ছিল বিস্ময়কর, তবে এটি প্রত্যাশিত ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা যদি আজকের জনগণের দিকে থাকাই, লাখ লাখ মানুষের বয়সের গড় কিন্তু ২৩। এখন এর থেকে আপনি যদি ৮ বাদ দেন, তাহলে বিপ্লবের সময় এদের গড় বয় দাঁড়ায় ১৫ বছল।”
যখন আপনার বেশির ভাগ মানুষ বিপ্লব পরবর্তী ট্রমার স্মৃতির মধ্যে বসবাস করছে না। ফলে এক দল তরুণকে আপনি দেখতে পাবেন, যারা বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া ও বিভিন্ন ধরনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসছে। ফলে আট বছর আগে যারা আন্দোলন করেছিল তারা আর এখন যারা আন্দোলন করছে তারা একেবারেই আলাদা।”
শুক্রবারের আন্দোলন একদম বিরল একটি গণবিক্ষোভ ছিল। ২০১৩ সালে মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মুরসিকে পদচ্যুত করে তারই প্রতিরক্ষামন্ত্রী এল-সিসি রাষ্ট্রপতি হওয়াার পর থেকে সব ধরনের অননুমোদিত বিক্ষোভকে বেআইনি ঘোষণা করেন।
তাৎক্ষণিক মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, ন্যাশনাল টিভি এই ঘটনাসমূহের খবর প্রচার করেনি।
সরকারপন্থী একটি টিভি চ্যানেলের উপস্থাপক অবশ্য বলেছেন যে, আন্দোলনকারীদের ছোট্ট একটি দল মধ্য কায়রোতে সমবেত হয়েছিল সেখান থেকে সরার পূর্বে ভিডিও ও সেলফি তোলার জন্য। আরেকটি সরকারপন্থী চ্যানেলের দাবি, তাহরির স্কোয়ারের আশপাশ এলাকার পরিস্থিতি শান্ত আছে।
২০১৪ সালে সিসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনৈতিক কৃচ্ছসাধন শুরু হয়েছে। মূলত ২০১১ সালের আরব বসন্তের পরের অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উন্নতির জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
জুলাই মাসে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে মিসরে প্রতি তিন জনে এক জন মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে যে, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে সিসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে “তার নিরাপত্তা বাহিনী ভয়-ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা, রাজনৈতিক বিরোধীদের এবং অ্যাক্টিভিস্টদের গ্রেফতারের অভিযান বৃদ্ধি করেছে।”
ইতোঃপূর্বে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা “মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর আক্রমণের” জন্য তাদের “গভীর উদ্বেগ প্রকাশ” করেছেন। তাদের উদ্বেগ প্রকাশের কারণসমূহের মধ্যে ছিল অসংখ্য ওয়েবসাইট ব্লক করা এবং বেআইনিভাবে সাংবাদিক ও বিরোধী মতাবলম্বীদের উপর হামলা চালানো ইত্যাদি।
সূত্র: আল জাজিরা ও অন্যান্য সংবাদ সংস্থা সমূহ
________________________________

আল জাজিরা ইংরেজি কর্তৃক প্রতিবেদনটি “In rare protests, Egyptians demand President el-Sisi's removal” শিরোনামে প্রকাশিত। সংযুক্ত ছবিটি রয়টার্সের ফটো সাংবাদিকের তোলা, যা আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা
ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা

রুওয়া শাহ, আল জাজিরা ইংরেজি:
২০১০ সালের ১১ জুন আমি আমার জীবনে প্রথমবারের মতো মাতৃভূমি কাশ্মীরের দুঃখজন ও সহিংস বাস্তবতার মুখোমুখি হই। যখন গুলির আওয়াজ শুনি, তখন আমি রাজধানী শ্রীনগরের ডাউনটাউন এলাকায় আমার টিউশন সেন্টার থেকে বেরুচ্ছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তায় আতঙ্ক ছেয়ে যায়, শত শত ছাত্র একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক দৌড়াতে শুরু করে।
আমিও আত্মগোপনের জন্য একটুখানি জায়গা খোঁজছিলাম, তখন এক তরুণের শরীর দেখতে পেলাম নিশ্চল পড়ে আছে। তার পুরো শরীর ছিল রক্তমাখা, চোখ ছিল গুলিবিদ্ধ। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সে মৃত।
পরে জানলাম, এই দেহটি ছিল শ্রীনগরের একটি প্রাইভেট স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র তোফায়েল মাট্টুর। ভারতীয় সৈনিক কর্তৃক খুব কাছে থেকে ছোড়া টিয়ার গ্যাসে সে নিহত হয়েছিল।
সমস্যার শুরু হয়েছিল মে মাসে, যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি জায়গায় তিন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশকারী “সন্ত্রাসী” দাবি করে হত্যা করে। কাশ্মীরিরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন, পুলিশ তার চেয়েও বেআইনি সহিংসতার মাধ্যমে এই আন্দোলন মোকাবেলা করে। কয়েক মাসের মধ্যে তারা ১০০ জন হত্যা করে, যাদের অনেকেই ছিলেন অল্পবয়স্ক শিক্ষার্থী।
মিলিয়ন মিলিয়ন কাশ্মীরির মতো আমিও ২০১০ সালের গ্রীষ্মকাল পরিবারের সাথে ঘরের ভিতরেই কাটিয়েছিলাম। তখন কারফিউ চলছিল, কেউ কারফিউ ভেঙে প্রতিবাদ করার দুঃসাহস দেখালে রাস্তায় পড়ে আহত কিংবা নিহত হওয়ার ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হতো।
গ্রীষ্মকাল শেষে কারফিউ প্রত্যাহার করা হলেঅ এবং ভারতীয় সরকার ও চ্যানেলসমূহ আমাদেরকে বললো যে, উপত্যকায় “শান্তি” ফিরে এসেছে। আমাদের জীবসন আবার “স্বাভাবিক” হলো।
কিন্তু আমি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাইনি। কিছু একটা একেবারেই বদলে গিয়েছিল। তোফয়েল হত্যাকাণ্ড ছিল আমার জন্য কাশ্মীর সংঘাতের সহিংসতার প্রথম সরাসরি অভিজ্ঞতা। এই প্রথমবার আমি উপলব্ধি করলাম, কাশ্মীরে বসবাসরত একজন তরুণ হিসেবে ঠিক কী ধরনের ঝুঁকিতে আমি আছি।
আসলে আমি যখন শিশু ছিলাম, তখন থেকেই ভারতীয় রাষ্ট্রের আচরণ ও নিরাপত্তার অজুহাতে কাশ্মীরে তাদের উপস্থিতি নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি নিজেকে করা একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে পেলাম: কেনা আমরা আজাদি চাই?
এবং আমিই একমাত্র ব্যক্তি নই, যে ২০১০ সালে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। পুরো একটি প্রজন্ম ভারতের নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছিলো, যা প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধের বীজ বপন করছিল।
ঐ বছর কোন এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এক দল ভারতীয় কর্মকর্তা কোন কারণ ছাড়াই, নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে তিন কাশ্মীরি কিশোরকে মারধর ও লাঞ্ছিত করেছিল। ঐ ঘটনার পর এদের মধ্য থেকেই একটি ছেলে প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর, ১৫ বছর বয়সী ছেলেটি তার গৃহত্যাগ করে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী দলে যোগ দেয়। তার নাম ছিল বুরহান ওয়ানি।
প্রায় ছয় বছর পর ২০০৬ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হত্যা করে।
তখন থেকে তিনি একজন জনপ্রিয় বিদ্রোহী কমান্ডার এবং কাশ্মীরি সশস্ত্র সংগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটিতে পরিণত হন। ওয়ানির মৃত্যুর ফলে পুরো উপত্যকায় পাঁচ মাস ধরে আন্দোলন বিস্তার লাভ করেছিল, সে সময় এক শতাধিক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।
এ আন্দোলনের ফলাফল সম্পর্কে আমি আমার দাদা সৈয়দ আলি শাহ গিলানির সাথে কথা বলছিলাম, যিনি অল পার্টিজ হুররিয়াক কনফারেন্স (এপিএইচসি) নেতা এবং ২০১০ সাল থেকে তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “বুরহান এবং অন্য যে সকল তরুণ ভারতের বিরুদ্ধে বন্দুক হাতে তোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির জন্য ভারতই দায়ী।”
২০১০ সালে কাশ্মীরে সশস্ত্র দলগুলোতে যোগদানকারী একমাত্র তরুণ যে বুরহান, তা কিন্তু নয়। আরো অনেকেই একই কাজ করেছিল, যাদের বেশির ভাগই দক্ষিণ কাশ্মীরের। ভারতের নৃশংসতা ও নির্যাতনই তাদেরকে এরকম করতে উৎসাহিত করেছে। এবং বুরহান নিজে যখন নিহত হয়েছিলেন, তখন সেটাও কিন্তু কাশ্মীরের নতুন একটি প্রজন্মকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিতে উৎসাহিত করেছিল।
এদিকে ভারতীয় সকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আন্দোলনের নেতাদেরকে দমন করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমার বাবা আলতাফ আহমাদ শাহ ২০১৭ সালে আরো অনেক কাশ্মীরি নেতার সাথে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিন স্বাধীনতাবন্থী এপিএইচসি নেতা। তারা প্রকাশ্যে সশস্ত্র আন্দোলন বর্জন করা সত্ত্বেও এরকমটি হয়েছিল।
এটা আসলে আমাদের করণীয়ন নয়। এটা বরং আত্মহত্যা করার সমতূল্য, শৈশবে সশস্ত্র প্রতিরোধের মতো জটিল বিষয়ে আমার যখন বাবার সাথে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি এরকমটাই বলছিলেন। আমি যখন তাকে এর বিকল্প উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, “আমাদেরকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সকল সম্ভাব্য উপায়ে আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে।”
আমার বাবার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং “ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তৈরির ষড়যন্ত্র”র অভিযোগ আনা হয়েছে, তাকে নয়া দিল্লীর তিহার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়, আজ অবধি তিনি সেখানেই আছেন।
কাশ্মীরের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন, এমন যে কারো নিকট এটি স্পষ্ট যে এসকল গ্রেফতার মূলত কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কণ্ঠস্বরগুলো ভেঙে ফেলার জন্য ভারতীয় সরকারের পদক্ষেপ মাত্র।
আজ, আমি মনে করি, এসকল গ্রেফতার আসলে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের জন্য ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এভাবেই যে কোন শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই দমন করে।
আগস্টে ভারতীয় রাষ্ট্র আবারো কাশ্মীরের জনগণের ‍উপর তাদের বর্বরতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। আমি এখন বিদেশে থাকি, এখান থেকে আমাকে দেখতে হচ্ছে কীভাবে আমার আত্মীয়-স্বজন পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিচ্ছেন। নির্মম নির্যাতন এখনো অব্যহত আছে, তাই এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীর পুরোপুরি গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে।  
৪০ দিন আগে আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলেছিলাম। আমার এক প্রতিবেশী কাশ্মীর থেকে পালিয়ে নয়া দিল্লীতে গিয়েছেন, তাঁর কাছ থেকে খবর পেয়েছি যে “বাড়ির সবাই ভালো আছেন।” তিনি আমার নিকট আমার মায়ের রেকর্ডকৃত ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন, যেটিতে মা আমাকে শক্ত থাকতে বলেছেন।
এই সকল সহিংসতা এবং কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করার ফলস্বরূপ একটি অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এসবের ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদই কাশ্মীরের মূলধারায় পরিণত হবে।
বছরের পর বছর ধরে ভারত ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) এবং পিপলস ডেমক্র্যাটিক পার্টির মতো স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নিকট থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে, এমনকি যারা ভারতীয় সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছিলেন, তারাও হয়তো কারাগারে, নয়তো গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। বিষয়টা এমন নয় যে, এসকল দল ঠিকটাক মতো কাশ্মীরি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে, কিংবা তাদের অনুভূদি ধারণ করছে, কিন্তু অন্ততপক্ষে ভারতের কিছু মানুষ ছিল যারা তাদের পক্ষে কথা চালিয়ে যেতে পারে।
এখন, সকল কাশ্মীরি নেতাকে কারারুদ্ধ করেছে, এমনকি তাদের মধ্যে এমন অনেকেও আছেন যারা ভারতের সাথে কাজ করতে চান। এসবের পর নয়া দিল্লী সরকার কাশ্মীরের জনগণের সাথে যে কোন গঠনমূলক সংলাপের সুযোগই শেষ করে ফেলেছে।
আমার অনেক তরুণ কাশ্মীরি বন্ধু আছে, যারা এক সময় অন্তর থেকে নিজেদেরকে ভারতীয় মনে করতেন। এখন তারা তাদের মন পরিবরত্ন করছেন বলে মনে হচ্ছে।
আমার এক বান্ধবী এক সময় এনসি প্রধান ফারুক আব্দুল্লার সাথে তার একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিল, সেখানে তাকে কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠ নেতা” আখ্যায়িত করেছিল, এখন সে বলে যে ৫ আগস্ট যা ঘটেছে, তার জন্য সে সকল মূলধারার কাশ্মীরি নেতাকে দায়ী মনে করে। সে আমাকে বলছে, “তারা সকলেই বিক্রি হয়ে গেছেন এবং আমাদের আর করার কিছুই নেই।
বছরের পর বছর ধরে ভারত সরকার এটা নিশ্চিত করছে যে, কাশ্মীরের প্রতিটি নতুন প্রজন্ম যেন দখলদারদের নৃশংসতার সাক্ষী হয়, এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর মাধ্যমে কাশ্মীরে প্রতিরোধের নতুন ঢেউ তৈরি করছে। এই প্রজন্ম হয়তো ভারতের সাথে স্বাধীনতার চেয়ে কম কোন কিছুর বিনিময়ে সমোঝতা করতে কখনোই রাজি হবে না।
২০১০ সালের ঘটনার পর থেকে প্রতি বছরই আমরা এ ধরনের শিরোনাম পড়ে থাকি: “কাশ্মীর আরেকটি সহিংস বছর কাটালো” কিংবা “আবারো উত্তপ্ত কাশ্মীর” অথবা “অশান্ত হতে পারে কাশ্মীর।”
এবছরও এরকম বিদ্রোহই প্রত্যাশিত। যাই হোক, এর বিপরীতে ভারতীয় সরকার বহু সেনা প্রেরণ করলেও এসব কখনোই কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ দমন করতে পারবে না। সরকার ৫ আগস্ট যা করেছে, তা কোন কাশ্মীরিই গ্রহণ মেনে নেবে না।

এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং আল জাজিরার সম্পাদকীয় অবস্থান এতে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে India's aggression is fuelling Kashmiri resistance শিরোনামে প্রকাশিত। লেখিকা রুওয়া শাহ তুরস্কে সিনেমা ও টেলিভিশন নিয়ে পড়াশুনা করছেন। এর আগে তিনি ভারতে সাংবাদিকতা করতেন। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



আল জাজিরা ইংরেজি:
মিসরের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত খবর অনুসারে কায়রোর একটি আদালতে বিচারকার্য চলাকালে দেশটির সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসি জ্ঞান হারানোর পর মৃত্যুবরণ করেন।
মুরসি ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং আধুনিক মিসরের ইতিহাসের প্রথম (এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র-অনুবাদক) গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। ২০১৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি সেনাবাহিনী কর্তৃক অপসারিত হন, এরপর থেকে তিনি কারাগারে ছিলেন।
রাষ্ট্রী টেলিভিশন জানিয়েছে, মুরসির (৬৭) বিরুদ্ধে সোমবার আদালতে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে শুনানি চলছিল। মুর্ছা যাওয়ার পর তার দেহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
মুরসির আকস্মিক মৃত্যুতে বিশ্বব্যাপী অনেকেই বিবৃতি দিয়েছেন। নিচে তাদের বিবৃতিসমূহ উল্লেখ করা হলো:

কাতারের আমির

কাতারি আমির তামিম বিন হামাদ আল থানি মুরসির পরিবারবর্গ ও মিসরের জনগণের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। তিনি এক টুইটার বার্তায় বলেন:
আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। আমি তার পরিবারবর্গ ও মিসরীয় জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

তুরস্কের রাষ্ট্রপতি

তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান মুরসিকে ‘শহিদ’ আখ্যা দিয়ে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
“আমাদের ভাই, আমাদের শহিদ মুরসির আত্মাকে আল্লাহ শান্তিতে রাখুন,” বলেছেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, মুরসির সাথে যাঁর ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল।

জাতিসংঘ

জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিখ মুরসির আত্মীয়-স্বজন ও সমর্থকদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক সারাহ লিয়াহ উইটসন মুরসির মৃত্যুকে “ভয়াবহ কিন্তু পুরোপুরি প্রত্যাশিত” বলে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা  করার ব্যর্থতার জন্য সরকারকে দায়ী করেন।
বিগত কয়েক বছরে আমরা প্রমাণ পাচ্ছিলাম, যে বাস্তবতা হলো তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। যতবার তাকে বিচারকের সামনে দেখা গেছে, তিনি প্রাইভেট মেডিকেল কেয়ার এবং চিকিৎসা সেবার জন্য অনুরোধ করেছেন।” উইটসন এসব কথা আল জাজিরাকে বলেন।
তিনি পর্যাপ্ত খাবার এবং চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তার শারীরিক অবস্থার অধঃপতন সম্পর্কে মিসর সরকার খুব স্পষ্টভাবেই জানতো। তিনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওজন হারিয়েছিলেন এবং আদালতে কয়েকবার মুর্ছা গিয়েছিলেন।
টেলিভিশন, ইমেইল কিংবা বন্ধু-বান্ধব ও পরিবার-পরিজনের সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ ছাড়াই তিনি নির্জন কারাগারে বন্দী ছিলেন,” উইটসন আরো যোগ করেন যে, মুরসির মৃত্যুর বিষয়ে কোন নির্ভরযোগ্য স্বাধীন তদন্ত হবে না “কারণ তাদের (মিসর সরকার) কাজ এবং ভূমিকা হলো নিজেদের সব দোষক্ষালন করা।

মোহাম্মদ মুরসির ছেলে

মোহাম্মদ মুরসির ছেলে আহমদ একটি ফেসবুক পোস্টে তার বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে লিখেন: “আল্লাহর সামনে, আমার বাবা এবং আমরা সকলে একত্রিত হবো।”

মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য

লন্ডনে মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃস্থানীয় সদস্য মোহাম্মদ সুদান মুরসির মৃত্যুকে “পূর্বনির্ধারিত হত্যা” বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরো বলেন যে, সাবেক রাষ্ট্রপতিকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি, এবং তার স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কে খুব সামান্য তথ্য পাওয়া যেতো।
বিচার চলাকালে তাকে (মুরসিকে) একটি গ্লাসের খাঁচার মধ্যে রাখা হতো। কেউ তার কথা শুনতে পেতো না, কিংবা তার প্রতি কী হচ্ছে, সেটা জানতেও পারতো না। কয়েক মাস ধরে, অথবা প্রায় এক বছরের কাছাকাছি সময় ধরে তাকে কো চিকিৎসক দেখেন নি। ইতোপূর্বে তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি তার ঔষধ পাচ্ছেন না। এটি পূর্ব নির্ধারিত হত্যা। এটি ধীর মৃত্যু।”
________________________________

মিসরের সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসির মৃত্যুতে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে আল জাজিরা ইংরেজি। বাংলাদেশ থেকে আল জাজিরা ইংরেজি ভিজিট করা যায় না। তাই বাংলাদেশি পাঠকদের জন্য হুবহু সেই প্রতিক্রিয়াসমূহ বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া হলো। মূল নিবন্ধের লিংক: Mohamed Morsi's death: World reaction



নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়, আল জাজিরা ইংরেজি:
ভারতের সাধারণ নির্বাচনের আগের সপ্তাহের জনমত জরিপেই দেখা গিয়েছিল, স্বচ্ছ নির্বাচন হলেও নরেন্দ্র মোদির আবার প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সাথে সামরিক উত্তেজনার পর থেকে তিনি সামরিক জাতীয়তাবাদের চূড়ায় আরোহণ করছিলেন।
তবু কেউ কেউ আশা করছিলেন শেষ পর্যন্ত হয়তো স্রোত বিরোধীদের দিকে ঘোরতে পারে। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ২৩ মে প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফল এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী ও দলীয় প্রধান অমিত শাহের নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও ভালো হয়েছে: সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে তারা পেয়েছেন তিন শতাধিক আসন।
বিজেপি তাদের জোটের অন্যান্য দলকে সাথে নিয়ে জিতেছে ৩৫৩ আসন, এর ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে মোদিই হতে যাচ্ছেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি এক মেয়াদ সম্পূর্ণ করে আরেক বার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকারে ফিরছেন।
নির্বাচনী বিজয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদী শুধু আরেক মেয়াদ ক্ষমতাই নিশ্চিত করেন নি (আবারও তিনি তার জোটসঙ্গীদেরকে খুব কমই গুরুত্ব দিবেন), বরং সেই সাথে তিনি তাঁর হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে এগুনোর পক্ষে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থনও পেয়েছেন।
ঠিক এই জায়গাতেই ভবিষ্যতে ভারতের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে ভয়ের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
গত মার্চে বিজেপির গেরুয়া পোশাকধারী আইন প্রণেতাদের একজন হিন্দু ডানপন্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সাক্ষী মহারাজ একটি ভীতিকর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেন, “মোদী একটি সুনামির নাম, যা পুরো দেশকে জাগিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই নির্বাচর সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৪ সালে আর কোন নির্বাচন হবে না।”
অনেকে এই কথার অর্থ তুলেছেন এভাবে যে আগামী পাঁচ বছরে মোদী তার ক্ষমতা এমনভাবে শক্তিশালী করবেন যে অন্য কোন রাজনৈতিক শক্তিই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হবে না। এই বক্তব্য এই ভয় তৈরি করছে যে বিজেপি হয়তো সংসদীয় ব্যবস্থাকে অনির্বাচিত ব্যবস্থা দিয়ে পরিবর্তিত করার জন্য আইনে পরিবর্তন আনার কথা বিবেচনা করতে পারে।
যদিও মহারাজের বক্তব্যকে বিজেপির বেশির ভাগ নেতা বিচ্ছিন্ন অসংলগ্ন বক্তব্য হিসেবে দেখাচ্ছেন, তবু এই বক্তব্য শাসক দলের সুদূরপ্রসারী উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়।
ঠিক এইখানে ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটা যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়, এবং এর পিছনে কমপক্ষে তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মোদী এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে তিনি হিন্দু কট্টর ডানপন্থাকে বাধা দেবেন না। বিজেপি মহারাজ এবং তার মতো অসংলগ্ন মন্তব্য করার প্রবণতা আছে এমন অনেককেই পুনরায় মনোয়ন প্রদান তো করেছেই, উপরন্তু এমন একজন প্রার্থীকেও নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছে, যিনি বর্তমানে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ মোকাবেলা করছেন।
প্রজ্ঞা ঠাকুর, যিনি ২০০৮ সালের মালেগাও বোমা হামলার জন্য অভিযুক্ত, মধ্যপ্রদেশের নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন, তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংসদ, যিনি “সন্ত্রাস” হিসেবে অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় সংসদে একটি আসন নিশ্চিত করেছেন নিজের জন্য। দেশব্যাপী ক্ষোভ সত্ত্বেও মোদীসহ বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাকে মনোনয়ন প্রদানের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
প্রজ্ঞা ঠাকুর মহাত্মা গান্ধীর ডানপন্থী ঘাতকের গুণগান করে বিজেপি নেতৃত্বকে বিব্রত করতে শুরু করেছেন, আগামী দিনে মোদীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তিনি প্রজ্ঞাকে দল থেকে বহিষ্কার করবেন কি করবেন না। তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বুঝা যাবে যে, দলের নেতৃত্ব বিভক্ত কণ্ঠে কথা বলে এবং বিজেপি তাদের দ্বিতীয় মেয়াদেও কট্টর ডানপন্থার পক্ষে সমর্থন অব্যহত রাখবে।
মোদীর বিজয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজেপির অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। প্রথম মেয়াদে বিজেপি বিচার বিভাগ ও আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে বহুবার নাক গলিয়েছে। বিচারকগণ এবং তদন্তকারীরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের তৃতীয় কারণ হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাথে মোদীর আদর্শিক সম্পর্ক, যে সংঘ কিনা আবার বিজেপির আদর্শিক উৎসও বটে। মোদী নিজেও বহু বছর এই সংঘের সদস্য ছিলেন। আরএসএস যে মূলনীতি মেনে চলে তা হলো “এক চালক অনুবর্তীত্ব”, সংস্কৃত এ কথাটির অর্থ “এক নেতার অনুসরণ”, এই সংঘ গণতান্ত্রিক মূলনীতি পরিহার করে চলে।
মোদী নিজেও আরএসএসের আদর্শিক গুরু দীনদয়াল উপাধ্যায়ের অনুসারী, যার তত্ত্বগ্রন্থ “অখণ্ড মানবতা”, বিজেপির দার্শনিক গাইডবুকসমূহের একটি। এই অভিসন্ধর্ভে উপাধ্যায় জাতীয়তাবাদের পশ্চিমা ধারণা, পশ্চিমা সেক্যুলারিজম ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভারতীয়করণের উপর জোর দিয়েছেন”। যদিও তিনি ভারতীয় গণতন্ত্রের রূপরেখার মধ্যে রাজনৈতিক আলাপকে সমর্থন করেছেন, লিখেছেন, “আমরা যদি এটাকে আরেক কট্টরপন্থায় নিয়ে যাই, তবে সেটা হয়তো সমস্যা বলে প্রতীয়মান হতে পারে।”
উপরের সব কয়টি কারণ হিন্দু কট্টর ডানপন্থার সমর্থন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকরণ এবং অগণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আনুগত্য  মোদীর দ্বিতীয় মেয়াদে দেশকে এক জাতির কর্তৃত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী।
খুব স্বাভাবিকভাবেই, বিজেপি মোসলমানদেরকে রাজনৈতিক স্পেস কিংবা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। বিজেপির কৌশল হলো মোসলমানদেরকে রাজনৈতিকভাবে এড়িয়ে চলা এবং স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদেরকে স্বীকার না করা।

মোদী যেহেতু তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে গঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী নীতি নিয়ে এগুচ্ছেন, বহুজাতিক রাষ্ট্র ভারত ক্রমবর্ধমান হারে বিভক্ত হতে থাকবে। পুরো দেশের উপর সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দুদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিজেপি দুনিয়ার সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষষ্ট্রের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে ফেলবে।
________________________________

লেখক দিল্লী ভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয় হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে “Should we fear for India's democracy?” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ভাষান্তর কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু অনূদিত।


সোমবারে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমান রমজান মাস শুরু করেছেন। অন্যান্য দেশে শুরু হয়েছে মঙ্গলবারে।

রমজান ইসলামি চান্দ্র বর্ষের নবম মাস। এই মাসে মুসলমানরা ভোর থেকে সূর্যাস্ত অবধি পানাহার থেকে বিরত থাকেন। এই উপবাসব্রতের উদ্দেশ্য হলো স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন ও সুবিধাবঞ্চিতদের কষ্ট অনুধাবন করা।

মুসলিদের নিকট রমজান হচ্ছে কুরআন নাযিলের মাস, ১,৪০০ বছর পূর্বে এই মাসে মহানবী (সা.) এর নিকট কুরআনের প্রথম আয়াত অবতীর্ণ হয়।

ঈমান আনয়ন, নমাজ, হজ্জ এবং যাকাতের পাশাপাশি রোজাও ইসলাম ধর্মের পাঁচটি ভিত্তির মধ্যে একটি।

বিভিন্ন দেশে রমজানের আগমনী চিত্র নিয়ে আল জাজিরার বিশেষ আয়োজনটি ভাষান্তরের পাঠকদের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হলো।
















হুমা ইয়াসিন, আল জাজিরা ইংরেজি:
গত সাতাশ এপ্রিল ১৯ বছর বয়সী জন আর্নেস্ট ক্যালিফোর্নিয়ার একটি সিনাগগে (ইহুদিদের উপাসনালয়) গিয়ে গুলি করতে শুরু করে; তাতে একজন নিহত ও তিন জন আহত হয়েছেন।
হামলা করতে যাওয়ার কিছু আগে সে অনলাইনে ৪,০০০ শব্দের একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে, এতে সে ক্যালিফোর্নিয়ার ইসকোন্ডিডোতে একটি মসজিদে গুলি করার দায়ও স্বীকার করে; নিউ জিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চের মসজিদে জুম্মার নমাজরত মুসলিমদের উপর ব্রেন্টন ট্যারেন্ট কর্তৃক হামলার মাত্র নয় দিন পর মার্চের ২৪ তারিখ সে ঘটনাটি ঘটেছিল।
ম্যানিফেস্টোতে আর্নেস্ট অ্যাডলফ হিটলারকে তার আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করে, ট্যারেন্টকে তার অনুপ্রেরণা হিসেবে ঘোষণা করে, এবং রবার্ট বোয়ার্সের প্রশংসা করে, যে ছয় মাস আগে পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গের একটি সিনাগগে ১১ উপাসনাকারীকে হত্যা করেছিল।
সে ইহুদি ও মুসলিম, উভয় জাতির বিরুদ্ধে তার ঘৃণা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন, তার ভাষায়: “ইহুদিরা আমাদের ধৈর্য ও এবং দয়ার ভাণ্ডার খালি করে ফেলেছে।” সে আরো দাবি করে যে “আমি কোন সন্ত্রাসী নয়, কারণ আমি মধ্যপ্রাচ্যের উজবুকদের মতো পোশাক পরি না, আমার চামড়ার রঙ বিষ্ঠার মতো নয়, পুরো কক্ষে আমার গন্ধ তুমি পাবে না... আমি ‘দুরকা দুরকা মোহাম্মদ জিহাদ’ বলে চেঁচামেচি করি না
আর্নেস্টের জঘন্য বর্ণবাদ, স্পষ্টত তার অনুপ্রেরণার নাম উচ্চারণ এবং শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শের ঘোষণা সত্ত্বেও এ সব কিছু উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কংগ্রেসমেন তাৎক্ষণিক ভিন্ন প্রসঙ্গান্তর করে এসবের বদলে ইলহান ওমার, ডেমোক্র্যাট ও “উদারপন্থী” গণমাধ্যমকে এই হামলার জন্য অভিযুক্ত করতে শুরু করেন।
প্রয়াত রিপাব্লিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনের মেয়ে মেঘান ম্যাককেইনও এই বচসায় যুক্ত হয়ে লাইভ টিভি শোতে বলেন, “আমরা যখন অ্যান্টি-সেমিটিজম নিয়ে কথা বলছি, আমাদের উচিত উভয় পক্ষের কট্টপন্থীদের প্রতি খেয়াল রাখা, আমি কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমার ও তার কিছু মন্তব্য সামনে নিয়ে আসতে চাই, যেগুলো মনযোগ আকর্ষণ করছে।”
ম্যাককেইনের এই দাবি শুধু ওমারের বক্তব্যের ভুল চরিত্রায়ণই নয়, (ওমার তার এই বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন), বরং এটি বিপজ্জনক মিথ্যা আদর্শিক সমতারও দাবি বটে।
ইলহানের কথার মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০১৭ সালের ইউনাইট দ্যা র‌্যালী চলাকালে শ্বেত জনৈক শ্রেষ্ঠত্ববাদীর হাতে নিহত হিথার হেয়ারের হত্যাকাণ্ডের পর ট্রাম্পের নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতির বিষয়টিকে বিদ্রূপাত্মকভাবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া। সেসময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন: উভয় পক্ষে খুবই ভালো মানুষজন রয়েছে।”
ডানপন্থীদের এসব বাগাড়াম্বরের উদ্দেশ্য হলো মূল উদ্দেশ্য হলো একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতাকে ধামাচাপা দেওয়া, সেটি হচ্ছে: আর্নেস্ট একজন শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী, আর তার লক্ষ্যবস্তু ইহুদী-মুসলিম উভয়েই। আর্নেস্টের চরমপন্থার জন্য মুসলিমরা দায়ী এ ধরনের যে কোন কথাই পুরোপুরি অযৌক্তিক এবং একেবারে স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানবিরোধী।
শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের অপরাধের দায় মুসলমানদের কাঁধে চাপানোর এই সমন্বিত প্রচেষ্টার একমাত্র মানে হলোা অতি ডান চরমপন্থীদের জন্য একটি রাজনৈতিক আচ্ছাদন তৈরি করা এবং এমনিতেই নিগৃহীত একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আরো উত্তেজনা সৃষ্টি করা ও গুরুত্বহীন করে ফেলা।
এ সব কিছু এমন এক সময় হচ্ছে যখন শ্বেত জাতীয়তাবাদ ও অতি ডান মনোভাব সমুজ্জল হচ্ছে এং বর্ণবাদী ঘটনাসমূহের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও একজন কট্টর ডান পুরুষ চরমপন্থী কর্তৃক সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ায় মুসলিম ও ইহুদিদের উপাসনালয়ে দুটি আক্রমণ, লুইসানায় তিনটি কৃষ্ণাঙ্গদের চার্চে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
গত বছরের শেষের দিকে এফবিআই টানা তৃতীয় বছরের মতো ‘ঘৃণা অপরাধ’ বৃদ্ধির বিষয়টি নথিবদ্ধ করে। এসকল ঘটনার ৬০% হয়েছে বর্ণগত বিদ্বেষের কারণে, ২০ শতাংশ ধর্মীয় কারণে এবং ১৬ শতাংশ ছিল যৌন নির্যাতন।
আর হোয়াইট হাউজ কর্তৃপক্ষ যখন বারবার শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে অনাগ্রহ প্রদর্শন করছে, তখন যে কেউ মনে করতেই পারে যে, এসব অপকর্মের পুরোভাগে খোদ কংগ্রেসই রয়েছে। হ্যাঁ, এপিল হাউজ জুডিসিয়ারি কমিটির “ঘৃণা অপরাধ ও শ্বেত জাতীয়তাবাদের উত্থান” শীর্ষক শুনানির সময় এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের কোন রাজনৈতিক সদিচ্ছাও নেই।
শুনানি চলাকালে ড. মোহাম্মদ আবু-সালহা ২০১৫ সালে নর্থ ক্যালিফোর্নিয়ার চ্যাপেল হিলে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের হাতে নিহত তার দুই কন্যা ও এক জামাতা নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করছিলেন। তা সত্ত্বেও একজন হাউজ রিপ্রেজেন্টেটিভ শোকাহত পিতাকে ইঙ্গিত দেন যে মুসলিমরা নিজেরা এমনিতেই চরমপন্থী, এবং তাকে প্রশ্ন করেন, “আপনি কি আপনার সন্তানদেরকে, দুই কন্যাকে ঘৃণা শিক্ষা দিয়েছিলেন?”
ড. আবু-সালহাকে স্বাক্ষ্য দিতে হয়েছিল মার্কিন ইহুদিবাদী সংস্থার সভাপতি মর্ট ক্লেইনের পাশে দাঁড়িয়ে, যিনি হাস্যকরভাবে দাবি করেন যে, “ইহুদি ও মার্কিনদের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়... হলো মুসলিম অ্যান্টি সেমিটিজম।”
ব্যর্থ এই শুনানিটি প্রমাণ করেছে যে, কংগ্রেস শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপদ মোকাবেলায় জাতীয় সংলাপ কিংবা এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতেই শুধু অক্ষম নয়, বরং ইহুদিবাদীদের ইচ্ছাপূরণের স্বার্থে কংগ্রেস শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের শিকার নিগৃহীতদেরকে অপমানিত করতে চাচ্ছে।
নিঃসন্দেহে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদের অস্তিত্ব কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই রয়েছে, যার ফলে শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করার জন্য কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে কংগ্রেস অক্ষম হয়ে পড়েছে, অথচ এই চরমপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু হলো ইহুদি, মুসলিম, আফ্রিকান আমেরিকান, এবং অন্যান্য বর্ণগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। এখন এবং এখনই, যুক্তরাষ্ট্রে নিগৃহীত সংখ্যালঘুদের উচিত নিজেদের মধ্যে শক্তিশালী জোট গঠন, কট্টর ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যারা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের ফাঁদ তৈরির কৌশল কাজে লাগাচ্ছে।
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে Don't blame Muslims for the crimes of white supremacistsশিরোনামে প্রকাশ হয়েছে। নিবন্ধটির লেখক একজন মার্কিন আইনজীবী। ছবি: আল জাজিরা থেকে সংগৃহীত।

এপ্রিলের ১১ তারিখ থেকে শুরু হওয়া ভারতীয় নির্বাচন চলবে ১৯ মে পর্যন্ত। আর সে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হবে ২৩ মে। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নির্বাচনী উৎসব। ভারতীয় নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চিত্র নিয়ে আল জাজিরা ইংরেজি কয়েকটি চমৎকার তথ্যচিত্র তৈরি করেছে। ভাষান্তরের পাঠকদের জন্য সেসকল তথ্যচিত্রের বাংলা সংস্করণ তৈরি করা হলো

এক নজরে ২০১৯ সালের ভারতীয় নির্বাচন


ভারতীয় সংসদের কাঠামো ও নির্বাচন প্রক্রিয়া

কোন দফায় কত তারিখ কতটি সংসদীয় আসনে নির্বাচন হবে...
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণ নাম ও তাদের প্রতীক
________________________________

তথ্যচিত্রগুলো আল জাজিরা ইংরেজির “India elections: All you need to know” শীর্ষক নিবন্ধ থেকে সংগৃহীত ও অনূদিত। 



মারওয়ান বিশারা, আল জাজিরা ইংরেজি:
তাকে জোচ্চোর বলতে পারেন, বলতে পারেন যুদ্ধোম্মাদ, কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু ছাড়া আর কে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া, এবং উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও পুতিনের সাথে সফল বৈঠক করতে পারতেন, তাও আবার ইসরায়েলের নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে?
তার আপাত-উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট, তবে নির্বাচনে জেতার কূটনীতির বাইরেও আরো কিছু নিশ্চয়ই আছে। এ ধরনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বদের আরো বৃহত্তর কৌশলগত প্রভাব রয়েছে।
তো, এরকম পুঁচকে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হুমকির সম্মুখীন, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতা কী করে বিশ্বপরাশক্তিদের কাছ থেকে অভ্যর্থনা পেলেন, তাও আবার তার পছন্দের সময়সীমাতেই?
এর উত্তর নিহিত আছে তিনপাক্ষিক ঘনিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে, কখনো কখনো যেটির বহিঃপ্রকাশ ঘটে, এবং সম্ভবত এই সম্পর্কই আগামী কয়েক বছরের মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গড়ন ঠিক করে দেবে।

দাবার গ্র্যান্ড মাস্টার!
সবকিছুর শুরু হয়েছিলো ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ট্রাম্প টাওয়ারে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে।
নেতানিয়িাহু তখন জাতিসংঘের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য নিউ ইয়র্ক সিটিতে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রিপাব্লিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক অনানুষ্ঠানিক ও অনির্ধারিত পরিচিতিমূলক বৈঠকে বসেন।
ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননের বয়ান অনুসারে, সে বৈঠকটি খুব শিগগিরই বিশ্ব ভূরাজনীতির “মাস্টার ক্লাস” বৈঠকে রূপান্তরিত হলো। বিশ্ব-রাজনীতির পাকা খেলোয়াড় ইসরায়েলের চারবারের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বিলিয়নিয়ার এই রাজনৈতিক নবিশকে মধ্যপ্রাচ্যের তিক্ত বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের গুরুত্ব সম্পর্কে সবক দিলেন।
দুই জনেই এই সুযোগটা কাজে লাগালেন। বেশ ভালোভাবেই।
নেতানিয়াহু শুধু যে ট্রাম্পের সব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিয়েছিলেন, তাই নয়। তিনি ট্রাম্পের নিজস্ব কিন্তু এলোপাতাড়ি বিদেশনীতিসমূহকে যুক্তির ভিত্তিতে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দাঁড় করিয়ে দিলেন। নিরাপত্তা, অভিবাসন, সন্ত্রাসবাদ, ইসলাম ইত্যাদি এমনকি সীমান্ত-প্রাচীরের সুবিধা, কোন কিছুকেই তিনি বাদ দেন নি।
তিনি গুরুত্ব সহকারে ট্রাম্পকে সহজ একটা সূত্র বুঝালেন, রাশিয়া নয়, ইরানই “আমাদের” প্রধান শত্রু। বুঝালেন যে- সত্যি কথা হলো, রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট আয়াতুল্লাহদের বিরুদ্ধে এবং চরমপন্থী ইসলামের বিরুদ্ধে আমাদেরকে দ্ব্যর্থহীনভাবে সাহায্য করতে আগ্রহী।
বেস্ট সেলার বই কুশেনার, ইনক.র লেখক ভিকি ওয়ার্ডের মতে, নেতানিয়াহুই আসলে “গ্র্যান্ড মাস্টার দাবাড়ু”, যিনি ট্রাম্পকে পুতিনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন এবং রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়নে প্ররোচিত করেছেন।
এসব মন্ত্রণা শুনতে ট্রাম্পেরও বেশ ভালোই লাগছিল। তিনি ইতোমধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে নিজদেশে এবং ইউরোপে তার নিন্দুকদের ব্যাপারে ব্যক্তিগত মতবিনিময় করেছেন। এখন তিনি একটা কৌশলগত তত্ত্ব পেয়ে আরো শক্তি পেলেন। এ তত্ত্ব অনুসারে সমমনা শক্তিশালীদের সাথে নয়া অংশীদারিত্ব স্থাপন করতে হবে।

আকর্ষণ
এটা তখনো ব্যক্তিগত পর্যায়ে সহজ একটা মিত্রতা ছিল। বেনজামিন, ডোনাল্ড এবং ভ্লাদিমির আসলে একে অপরকে পছন্দ করতে লাগলেন এবং একে অপরের প্রশংসাও করতে লাগলেন। তাদের হয়তো ভিন্ন অতীত এবং ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে, কিন্তু তারা তো একই ধাতুতে গড়া।
তিন শ্বেতাঙ্গ বুড়া, তিনজনের ব্যক্তিত্বই একই ধরনের, আদর্শের দিক থেকে লোকলঞ্জনবাদী জাতীয়তাবাদী। মোটাদাগে তিনজনই কূটকৌশলে পারদর্শী, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে কাজ করার ক্ষেত্রে সুপটু। তারা তিন জনেই আবার মুক্ত সাংবাদিকতা ও সক্রিয় স্বাধীন বিচার বিভাগকে অপছন্দ করেন।
এই তিনজনার উত্থানের মূল কারণ, তাদের চুড়ান্ত রকমের প্রতিশোধপরায়ণতা, তিন জনেই সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করেন বারাক ওবামা এবং তিনি যে সকল বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করেন: সেটা হোক বহুসংস্কৃতির চর্চা, উদার আদর্শ কিংবা উদার বিদেশ নীতি।
হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করার পরপরই ট্রাম্প সাহেব ওবামা দেশে-বিদেশে যেখানে যা করেছেন, সব কিছু ধ্বংস করতে উঠ-পড়ে লেগে যান। এসব করতে গিয়ে তিনি সকল আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তিকে পদদলন করেন, শুধু মাত্র তার দুই জানে-জিগর দোস্ত আর বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান বিশেষ ধরনের ভক্ত সম্প্রদায়ের সন্তুষ্টির নিমিত্তে।
তিনি প্যারিস জলবায়ু পরিবর্তন চুক্তি ও ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন, মধ্যপ্রাচ্য ও তার বাইরের অনেক দেশে জঘন্য উৎপীড়ক শাসকদের নিঃশর্ত সমর্থন প্রদান করেন।
এই ত্রয়ী নতুন একদল ক্ষমতার পুজারী উগ্রজাতীয়তাবাদীদের আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করতে শুরু করলেন। এদের মধ্যে সৌদি আরবের মুহাম্মাদ বিন সালমান এবং মিসরের আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসি থেকে শুরু করে ব্রাজিলের জায়র বলসনারো এবং হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান প্রমুখ রয়েছেন। ট্রাম্প এবং পুতিন হয়তো এই গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কিন্তু নেতানিয়াহু প্রকৃত অর্থে এদের “উদ্যোমী সক্রিয়কারী”।
এই তিন নেতা ধনতান্ত্রিক লোকরঞ্জনবাদকে প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে উদারনীতি ও প্রগতিশীর চিন্তাকে উচ্ছেদ করতে চাইলেন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী নতুন একটি লোকরঞ্জনবাদী (পপ্যুলিস্ট) প্রবণতার নেতৃত্বদানে তাদের সাফল্য তাদের মধ্যকার ব্রোমান্সকে (অতি ঘনিষ্ট সম্পর্ক) যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার নৈকট্য বৃদ্ধিতে কাজে লাগাতে না পারার ব্যর্থতাকে আড়াল করতে পারে না।

একগুঁয়ে ভূরাজনীতি
ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহু কেউই পুতিনের সাথে সুসম্পর্কের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরকে রাজি করতে পারেন নি, এমনকি ইরান বিরোধিতার নামেও সম্ভব হয়নি।
ইরান হয়তো একটা আঞ্চলিক ঝামেলা, কিন্তু ডেমক্র্যাট এবং রিপাব্লিকান উভয় পক্ষের পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতিনির্ধারকরাই মনে করেন, রাশিয়া বিপজ্জনক বৈশ্বিক শত্রু।
পরাশক্তির রাজনীতির এক দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, পরাশক্তিরা এক অরাজক পৃথিবীতেও তাদের প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাবে, এমনকি যদি যুদ্ধের ঝুঁকিও থাকে নেতৃত্বে কে থাকছে, কিংবা কোন সরকার পদ্ধতি চলছে, সেটা এক্ষেত্রে বিবেচ্য হয় না।
এভাবে রাশিয়া আবারো বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে, এবং সেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হিসেবে। এটা স্পষ্ট হয় উকরাইন এবং সিরিয়ায় পুতিনের সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ভেনিজুয়েলায় রাশিয়ান সেনা মোতায়েনের বিষয়ে তার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত থেকে, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বে সরাসরি ওয়াশিংটনকে চ্যালেঞ্চ করা হচ্ছে।
যদিও ট্রাম্প এবং পুতিন একইভাবে চিন্তা করেন, তাদের দেশ সব বিষয়ে ভিন্ন অবস্থানে থাকে: সাইবার যুদ্ধ থেকে শুরু করে পরমাণবিক বিস্তার, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, এবং অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ান হস্তক্ষেপ, এসব বিষয়েই দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।
কিন্তু তারা ইসরায়েলের বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন অথবা নিদেনপক্ষে পুতিন এবং ট্রাম্প নেতানিয়াহুর বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন। এ ভালোবাসা পেতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী উৎকোচ প্রদান করেছেন এমন অভিযোগ কোনভাবেই করা যাবে না।

উদ্দেশ্য সাধনের উপায়
ট্রাম্প এবং পুতিন একবার শীর্ষ সম্মেলনে বসেছিলেন, যেটি আপেক্ষিক ব্যর্থতায় সমাপ্ত হয়েছে, এবং তাদের মধ্যে চারবার সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছে। নেতানিয়াহু গত দুই বছরে ট্রাম্পের সাথে পাঁচটি সফল বৈঠক করেছেন, এবং একই সমান সফল ১৩টি বৈঠক করেছেন পুতিনের সাথে গত চার বছরে।
নেতানিয়াহু নেটওয়ার্ক স্থাপনের ব্যাপারে বেশ পারদর্শী, কার সাথে সখ্য গড়তে হয়, সেটা তিনি বেশ ভালো করেই জানেন। তিনি অনেক বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি পুতিনের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন, কারণ রাশিয়া একমাত্র পরাশক্তি, যাদের মধ্যপ্রাচ্যের সব কয়টি গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় শক্তিদের সাথে সরাসরি আলোচনা চলছে। রাশিয়ার আলোচনা চলছে এরকম শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে হামাস ও হেযবুল্লাহ এবং ইরান, সৌদি, মিসর ও তুরস্কের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো।
ওয়াশিংটনের কাছ থেকে নিজেদের পরাশক্তি হিসেবে এবং তাদের প্রভাবের জায়গাগুলোর স্বীকৃতি পাওয়ার ব্যাপারে রাশিয়ার আগ্রহের সুযোগকে নেতানিয়াহু কাজে লাগান। এ জন্য তিনি ট্রাম্পের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ককে ব্যবহার করেন।
২০১৮ সালে রাশিয়ার সামরিক বিমান ভূপাতিত করার বিষয়ে ইসরায়েলের ভূমিকা রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট খুব তাড়াতাড়ি অতিক্রম করতে পেরেছেন, সে ঘটনায় ১৫ জন রাশিয়ান নাগরিক নিহত হয়েছিলেন। ইতোমধ্যে পুতিন সাহেব সিরিয়া থেকে বিদেশী শক্তি সরানোর ব্যাপরে ইসরায়েলের সাথে একটি কার্যকর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।
ইসরায়েল কর্তৃক সিরিয়ার আকাশসীমা লঙ্ঘন এবং ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে খোলামেলা বোমা হামলার প্রতিও পুতিনের নীরব সম্মতি রয়েছে।
ক্রেমলিন (রাশিয়া) নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্র, সিরিয়া এবং ইরানের মধ্যে ‘গ্র্যান্ড উইথড্রয়াল’এর ব্যাপারে সালিসি করতে বলা থেকে দূরে থাকছে। এ পরিকল্পনা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাখ্যানই করতেন, কারণ এতে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা তাড়াতাড়ি প্রত্যাহার করার আহ্বান রয়েছে।  

দুই কূল রক্ষার খেলা
এটা একটা কূটনৈতিক জুয়াখেলার মতো। নেতানিয়াহু নেতানিয়াহু রাশিয়ান সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিনিয়োগ করে ফেলেছেন। কারণ এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সিরিয়া নিয়ে রাশিয়ার সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে “যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে” এমন কোন চুক্তি করার বিষয়ে তাকে “খুব বেশি সচেতন” থাকার জন্য সতর্ক করেছিলেন।
তা সত্ত্বেও, কয়েক মাস পরও যখন তার সতর্কীকরণে কোন ফল আসেনি, গ্রাহাম তারপরও নেতানিয়াহুর জন্য অপেক্ষা করেন এবং গোলান মালভূমির বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে ইসরায়েলি অন্তর্ভুক্তিকরণের স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান।
ট্রাম্প খুশি মনে এটা মেনে নেন, এ প্রক্রিয়ায় তিনি আন্তর্জাতিক আইন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত নীতি উপেক্ষা করেন। এর জবাবে পুতিন কিছুই করেন নি এবং নেতানিয়াহুর সাথে তার সর্বশেষ বৈঠকেও স্পষ্টত কিছু বলেন নি।
রাশিয়ার হয়তো কিছু বন্দী দরকার, কিন্তু নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউজে এর চেয়ে ভালো কোন সহযোগীর কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না। ট্রাম্প ইরানের ব্যাপারে ইসরায়েলের অবস্থানকে এবং জেরুজালেম ও গোলান মালভূমি দখলকে পুরোপুরি সমর্থন করেছেন।
এরপর পশ্চিম তীরের পালা। নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি যদি নির্বাচনে বিজয়ী হন, তবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলসমূহকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলবেন। এবং আবারো, তিনি ট্রাম্পের সমর্থন এবং পুতিনের নীরবতা প্রত্যাশা করবেন।
সর্বোপরি, নেতানিয়াহু হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের আকার পুনঃনির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে এক সাথে কাজ করাতে ব্যর্থ হয়েছেন, তবে ভূমধ্য সাগরের পূর্বাঞ্চল ইসরায়েল যেভাবে চায় সেভাবে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্প এবং পুতিনের সমর্থন আদায় করতে তিনি সক্ষম হয়েছেন।
________________________________

সুদীর্ঘ এ নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজির ইন-ডেপথ বিভাগে “Netanyahu, Trump and Putin: A love story” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখক আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ছবি: আল জাজিরা থেকে সংগৃহীত।

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.