Articles by "ইউরোপ"

ইউরোপ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান



প্যারিস, পলিটিকো:
মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থাকে একেবারে ওলট-পালট করে ফেলছেন, কিন্তু তা র আমেরিকা ফার্স্ট নীতিকে ফরসি রাষ্ট্রপতি অ্যামানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিদের সুবিধা মতো কাচে লাগাচ্ছেন।
গত কয়েক মাসে ম্যাক্রোঁ সাহেব বৈশ্বিক পর্যায়ে তার সক্রিয়তা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছেন, ইইউর সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, ইরানে ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু করেছেন, ইউক্রেনে পুনরায় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করেছেন এবং অন্ততপক্ষে সাত জাতির মধ্যে ঐক্যটুকু ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, যা তাঁর দুই পূর্বসূরী পারেন নাই।
ফরাসি রাষ্ট্রপতি বিশ্বকূটনীতিতে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, সেটার আংশিক ভিত্তি হচ্ছে এই যে, ট্রাম্প ও পুতিনের মতো বদমেজাজি জুটিকে ঘাঁটাঘাঁটি করার মতো আত্মবিশ্বাস স্পষ্টতই তার রয়েছে।
ম্যাক্রোঁ তার বিদেশনীতি অনুযায়ী যে সকল আক্রমণ চালাচ্ছেন, শেষ পর্যন্ত তার কোন একটিতেও তিনি চুড়ান্ত সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হবেন কি না, সে কথা বলার সময় এখনো হয়নি। এখন অবধি তার হাতে দেখানোর মতো বাস্তবসম্মত ফলাফল খুব একটা নেই। ইতোপূর্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে (ইরান পারমাণবিক চুক্তি অথবা পরিবেশ বিষয়ে) কিংবা পুতিনের বিরুদ্ধে (সিরিয়া এবং সাইবারযুদ্ধ বিষয়ে) জয়ী হওয়ার জন্য তিনি যে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা খুব বেশি দূর পর্যন্ত এগুতো পারেনি, এবং শ্বেতভবন-কর্তার টুইট-ক্ষোভ থেকে তাঁকে বাঁচাতেও পারেনি।
লিবিয়াতে তিনি দুটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন, কিন্তু সেগুলো থেকে সংবাদপত্রের শিরোনাম হওয়ার চেয়ে বেশি খুব একটা কিছু তিনি অর্জন করতে পারেননি। শুধু যে লিবিয়ার পরিস্থিতির কোন উন্নয়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাই নয়; বরং উল্টো অনেক ইউরোপীয় কর্মকর্তা তার এসব উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন।
তা সত্ত্বেও, যেই ম্যাক্রোঁ সাহেব ২০১৭তে যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন তখন বিদেশনীতিসমূহকে তার অন্যতম দূর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই তিনি বহুপাক্ষিক অঙ্গনসমূহ থেকে ট্রাম্পের পশ্চাদপসরণ, ব্রিটেনের ব্রেক্সিটাতঙ্ক এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে ফ্রান্সের কূটনৈতিক সক্ষমতার স্মারক হিসেবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছেন, যদিও তিনি এখনো মার্কিন শক্তির সমকক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।
ফ্রান্সের ভূমিকা হলো মধ্যস্থতাকারী শক্তি হওয়া ... আমাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো আমারা প্রত্যেকের সাথে কথা বলি ... এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্যকরী সমাধান বের করে আনার চেষ্টা করি,” বিয়ারিতজে  জি৭ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদেরকে ম্যাক্রোঁ এসব কথা বলেছিলেন।
ফ্রান্সের অবশ্যই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে দেশটির অবস্থান, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য পদ, সব মিলিয়ে ফ্রান্স অন্য অনেক দেশের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, এমনকি অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ জার্মানিও এক্ষেত্রে ফ্রান্সের সমকক্ষ নয়।
কিন্তু ম্যাক্রোঁ তার অবস্থানকে আরো এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন।
শুধুই ২০১৫ সালের প্যারিস পরিবেশ চুক্তির সময় থেকেই ফ্রান্স আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এরকম কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে না,” অবসরপ্রাপ্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত মিশেল ডুক্লোস বলছেন, যিনি রাশিয়া, নিউ ইয়র্ক এবং সিরিয়ায় দায়িত্ব পালন করেছেন, এবং বর্তমানে ফ্রেঞ্চ থিংকট্যাংক মন্টেইনে ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত আছেন।
এখন অবধি, যুক্তরাষ্ট্রের শূন্যস্থান পূরণে ম্যাক্রোঁ প্রচেষ্টা নিয়ে জার্মানি, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি ইউরোপীয় শক্তিগুলো উদ্বিগ্ন নয়। বরং এসব দেশের কোন কোন কূটনীতিবিদ তো ম্যাক্রোঁর এই প্রচেষ্টার প্রশংসাই করছেন।
উচ্চপর্যায়ের এক ব্রিটিশ কূটনীতিক বলেন, “ম্যাক্রোঁ এই স্থানটি দখল করছেন, এবং তিনি নতুন চিন্তা নিয়েই এসেছেন।”
আরেক জার্মান কূটনৈতিক কর্মকর্তা বলছেন, “ঝুঁকি নেওয়ার কেউ না কেউ থাকেই, এবং সেই জি-৭’র প্রেক্ষাপটে লাভবান হয়েছে।”
ঐ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে এক পাশে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন, এমনকি নেতৃবৃন্দ বৈঠকে থাকা অবস্থায় তিনি যখন আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফকে বিয়ারিতজ যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন, তখনও তিনি ট্রাম্পকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও ট্রাম্প আশেপাশেই ছিলেন। অ্যামাজন ইস্যুতেও তিনি ব্রাজিলিয়ান রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠক করে সংবাদ মাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আপাত দৃষ্টিতে ঐ সম্মেলনের বাস্তব ফলাফল ছিল খুবই সামান্য অ্যামাজনের জন্য সহায়তা এবং ডিজিটাল ট্যাক্সের বিষয়ে সীমিত অগ্রগতি ইত্যাদি এই ফলাফলের অন্তর্ভুক্ত। তবে দীর্ঘমেয়াদে ম্যাক্রোঁর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার বিচার হবে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারা-না পারার ভিত্তিতে। উদাহরণস্বরূপ ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, ইউক্রেন দ্বন্দ্বের সমাধান প্রভৃতি ইস্যু ম্যাক্রোঁর সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে পরিগণিত হবে।
________________________________

পলিটিকো ম্যাগাজিনে প্রকাশিত In a Trump world, diplomacy is being conducted in French (again) শীর্ষক প্রতিবেদনের প্রথম অংশের অনুবাদ। ছবি পলিটিকোর সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


আনাতোল কালেৎস্কি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা যুক্তরাজ্য বনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার ট্রাজেকমেডি অবশেষ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে। ব্রেক্সিটের সময়সীমা হলো অক্টোবরের ৩১ তারিখ, অথচ বরিস জনসন প্রায় এই সময়সীমা পর্যন্তই সংসদ স্থগিত রাখার চাল চালিয়েছেন, সংসদের স্পিকার জন বের্কো এ বিষয়টিকে “ সাংবিধানিক তাণ্ডবলীলাবলে আখ্যায়িত করেছেন, যদিও এর একটা সুবিধাও আছে। এর ফলে ৬৫০ জন সংসদ সদস্যের সামনে এখন বাছাই করার মত মাত্র দুটো পথ রয়েছে। হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ সেপ্টেম্বরের পয়লা সপ্তাহে বরিসের বদলে নতুন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভোট দেবেন, অন্যথায় তাকে তার প্রতিশ্রুতি অনুসারে “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমতা দিয়ে দিতে হবে, যা কিনা ব্রিটেনকে ইইউর সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে নিয়ে যাবে। দোসরা পথ বেছে নিলে এটি আবার ইইউর ভবিষ্যতের উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।  
তো, এখন কী হবে? সেপ্টেম্বরের পয়লা সপ্তাহে সাংসদরা যখন গ্রীষ্মকালীন অবকাশযাপন শেষে ফিরবেন, বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি কর্বিন নিশ্চয়ই জনসনকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। কারণ জনসনের রক্ষণশীল এবং নর্দার্ন আইরিশ ডেমক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট দল হাউজ অব কমন্সে মাত্র একটি ভোটে সমন্বিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এবং টরি পার্টির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের বিরোধী হওয়ার কারণে জনসনের হেরে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু জনসনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। ২০১১ সালের স্থায়ী সংসদীয় আইন অনুসারে, কোন প্রধানমন্ত্রী যদি অনাস্থা ভোটে হেরে যান, তাহলে হয়তো সংসদকে অবশ্যই পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে তার বদলে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে হবে, অন্যথায় পরাজিত সরকারই থাকবে, এবং এই সরকার পরবর্তী তিনমাসের মধ্যে তাদের সুবিধামাফিক সময়ে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করবে। তিন মাস সময় জনসনের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে “মরি, বাঁচি, ব্রেক্সিট” প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট। এই পরিণতি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন, যেহেতু সংসদ স্থগিত হতে যাচ্ছে, তাই এ কাজটি করতে হবে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই।
বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে কর্বিন ইতোমধ্যে নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করেছেন; তিনি কেবলমাত্র দু’টি কাজ করার সীমাবদ্ধতাসহ সমর্থন চাচ্ছেন: ব্রেক্সিটের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং এরপর যথাশিগগিরই সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন। কিন্তু ইইউপন্থী অনেক টরি দলীয় সদস্য কর্বিনের তীব্র বিরোধীতা করছেন, তাই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলনামুলক কম পক্ষপাতি কেউ প্রার্থী হতে পারেন, যার কোন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। এক্ষেত্রে সাবেক টরি দলের চ্যান্সেলর কেনেথ ক্লার্ক প্রার্থী হতে পারেন, যিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সাংসদ থাকার কারণে “ফাদার অব দ্য হাউজ” হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে থাকেন, কিংবা ২০১৫ সালে অন্তবর্তীকালীন লেবার নেতা হিসেবে দায়িত্বপালনকারী হ্যারিয়েট হার্মানও হতে পারেন।
অথবা কর্বিনকে পাশে সরিয়ে রাখার জন্য সম্ভবত সাবেক লেবার পার্টির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারেট বেকেটিই সবচেয়ে পছন্দের প্রার্থী হতে পারেন। সর্বোপরি বেকেট সেই ৩৬ জন সাংসদের মধ্যকার একজন, যারা কর্বিনকে লেবার দলীয় নেতা নির্বাচনের জন্য পিটিশন সাক্ষর করেছিলেন। তাঁর সমর্থন ব্যতীত কর্বিন আজ যেখানে আছেন, সেখানে পৌছাতে পারতেন না। কাজেই বেকেটকে সমর্থন করার বিষয়টি কর্বিন তাঁর সমর্থকদেরকে সহজে বুঝাতে পারবেন, যিনি আবার চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটবিরোধী টরি দলীয় সাংসদদের সমর্থন সহজে পেতে পারবেন। যাই হোক, জনসনকে এভাবে পদচ্যুত করতে পরলে, অক্টোবরের শেষ দিকে কিংবা নভেম্বরে ভোটের আয়োজন করা সম্ভব হবে, এবং সে সময় পর্যন্ত ইউনিয়নে থাকতে হবে। (ইউরোপীয় নেতারা বারবার বলছেন যে, পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ব্রেক্সিটের সময়সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।)
জনসনের “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের পক্ষে এবং বিপক্ষে রক্ষণশীলরা গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। এদিকে বিরোধীদলগুলো সম্ভবত তাদের সাময়িক সহযোগিতামূলক ভাব থেকে কিছু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করবে। এর ফলাফল হতে পারে “ঝুলন্ত সংসদ”, কোন দলই হয়তো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। যাইহোক, এবার বোধ হয় লেবার, লিবারেল ডেমক্র্যাটস এবং স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি ভালোই প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করবে এবং সম্ভবত সকলে মিলে একটি চুড়ান্ত গণভোটের আয়োজন করতে হবে, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া আর এগুবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
অন্যদিকে সাংসদরা যদি নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে ব্যর্থ হয়ে পড়েন, তাহলে সংসদ সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ থেকে স্থগিত হবে এবং জনসনের পছন্দসই ব্রেক্সিটে আর কোন বাধাই থাকবে না, “চুক্তিসহ কিংবা চুক্তি ছাড়া” যেভাবেই হোক, ব্রেক্সিট হবেই।
জনসন মনে করেন, সংসদ স্থগিত করার মাধ্যমে তিনি নয়া করে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে যে অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছেন, এর ফলে পূর্বসুরী থেরেসা মে’র ব্যর্থ প্রত্যাহার চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দরকষাকষির ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কতিপয় ইউরোপীয় নেতা সম্ভবত আশা করছিলেন, চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের ঝুঁকি নিতে সংসদ রাজি হবে না, এবং এটি প্রতিরোধ করতে সংসদ হস্তক্ষেপ করবে। এই সম্ভাবনা এখন আর নেই বললেই চলে। এই প্রেক্ষাপটে ইইউ চাইলে জনসনকে এরকম একটা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিতে পারে, যাতে ব্রিটেন এবং ইইউর মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাধা দূর করার জন্য “আইরিশ ব্যাকস্টপ” বিধান প্রত্যাহার করা যেতে পারে, যাতে করে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের মধ্যে উম্মুক্ত সীমান্ত অনুমোদন করে নতুন স্থায়ী বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আপাতত বাণিজ্য চলতে পারে।
জনসন হয়তো ঠিকই আছেন। চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটেন যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, ইইউও তেমনি চরম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ যুক্তরাজ্য ইউরোপ মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার।
বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একটি বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে আছে, জার্মানি গাড়ি বিক্রিতে ধ্বস নামার ফলে অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে, ফ্রান্স নাগরিক বিক্ষোভের কারণে উদ্বিগ্ন এবং ইতালি প্রকাশ্যে ইইউর নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, এরকম একটি পরিস্থিতিতে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম খদ্দেরের সাথে সম্পর্কের ফাঁটেলের ঝুঁকিটা বেশ বিজ্জনকই হতে পারে।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will Boris Johnsons Political Coup Succeed? শিরোনামে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


মার্ক লিওনার্ড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ফ্রান্সের বিয়ারিতজ শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সবার আগ্রহের বিষয় ছিল, কার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় বিঘ্নতা আসছে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের, নাকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পক্ষ থেকে? যদিও সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এমন একজন, যার উপস্থিতিই আদতে প্রত্যাশিত ছিল না, তিনি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।
যদিও এই সম্মেলনে গণমাধ্যমের চোখ ছিল বাণিজ্য যুদ্ধ, আমাজনের আগুন এবং বিপজ্জনক “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের উপর, তবে সবচেয়ে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে সম্ভবত ইরানের বিষয়ে। ইরানের সাথে হওয়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ভাগ্য দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে কিনা সেটা যেমন নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি পশ্চিমা রাজনৈতিক জোট টিকে থাকবে কিনা, তাও নির্ধারণ করতে পারে।
বিয়ারিতজে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতা নিরসনের উদ্যোগের সূচনা করেছেন। এবং সাম্প্রতিক দিনগুলিতে ইরান নাটকের মূল খেলোয়াড়রা সকলেই পিছনের দিকে ফিরছেন। যুক্তরাজ্য জিব্রাল্টার থেকে আটককৃত ইরানের ট্যাংকার (গ্রেস ১) ছেড়ে দিয়েছে। এবং, আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাহেব ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রোহানির সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, এমনকি তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের স্বল্পমেয়াদি “লাইন অব ক্রেডিট অথবা লোন” পাওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি করবেন না।
তবু অনেকগুলো বিষয় উত্তেজনা নিরসনের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। প্রথমেই, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো মনে করে যে ইরানের (এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের) উপর যত বেশি চাপ প্রয়োগ করা হবে, ততই ভালো হবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে চান, এবং তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় সহযোগিতার পথ বন্ধ করার মাধ্যমেই এটি করতে হবে। তিনি এবং অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সাথে ইউরোপের ঐক্য নষ্ট করতে সব উপায় অবলম্বন করবেন, এবং স্পষ্টতই তারা সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করবেন যুক্তরাজ্যের উপর। আরো জঘন্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কেউ এবং মধ্যপ্রাচ্যেরও কেউ কেউ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরানকে সামরিক বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য ফাঁদ বানাতে চায়।
ইরানি কট্টরপন্থীদের নিয়েও সমস্যা আছে। তাদের অনেকেই মনে করেন, পারমাণবিক চুক্তি থেকে তারা কিছু্ই পাননি, এবং তাদের মতে উদ্দেশ্য সাধনের উপায়টিই বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ইরানি নেতারাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বিরোধী কাজে উৎসাহী হয়ে পড়েছে, শুধু যে হরমুজে ব্রিটিশ ট্যাংকার দখল করেছে, সেটিই্ এ ধরনের একমাত্র কাজ নয়। (ইউরোপে ইরানেরও পছন্দের ক্ষেত্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেরই মতো।)
ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাব ইসরায়েলেরও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে, যার ফলে ইরাকে তারা ইরানের সম্পত্তিসমূহকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। (ইতিমধ্যে সিরিয়ায় ইরানি বাহিনীর উপর হামলা শুরু করে দিয়েছে।)
বোধগম্য কারণেই ইরান ইনসটেক্স উদ্বোধনে ইউরোপের ধীর গতির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে। ইনসটেক্স মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপ-ইরান বাণিজ্য সম্ভব করে তোলার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু ইরানের যারা দাবি করছেন যে, তারা ইউরোপ থেকে কিছুই পাননি, তারা একেবারেই ভুল দাবি করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের বর্তমান অবস্থান পরিত্যাগ করে ইরানকে চেপে ধরার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিত, তাহলে তারা পার্থক্যটা স্পষ্টতই বুঝতে পারতেন। আসলে তীব্রতাবৃদ্ধির নীতি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ইরান নৈতিক উচ্চ অবস্থান হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, একই ভাবে তারা সেই সকল ইউরোপীয়দের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতি থেকে ভিন্ন ইরান নীতি মানতে চাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে পাত্তা না দিয়ে চুক্তির বিষয়ে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপ যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা অনেককে বিস্মিত করেছে। এমনকি বলতে গেলে ব্রিটিশ সরকারও ইইউর সাথেই আছে এ বিষয়ে। কিন্তু এটা পরিবর্তন হতে পারে। ইরান যদি ব্রিটেনের আরেকটি জাহাজ আটক করে, এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে, তাহলে এর ফলে জনসন ইইউ’র সঙ্গত্যাগ করে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিতে পারে।
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও হতাশার বিষয় হলো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য পারস্য উপসাগরে একটি যৌথ ইউরোপীয় মিশন চালু করতে পারেনি, যাতে তাদের যে কারো উপর আক্রমণ হলে সেটি সকলের উপর আক্রমণ বলে গণ্য হতে পারে। যুক্তরাজ্য যদি ইরান ইস্যুতে ইইউ’র পথ থেকে সরে যায়, তাহলে পরবর্তী কট্টরপন্থীদের (ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশেরই) লক্ষ্যবস্তু হবে জার্মানকে সরানো। একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সেখানে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
এসকল ঝুঁকি ভালো মতন মোকাবেলা করার জন্যে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, ইরান যদি আরেকবার তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম হ্রাস করার মাধ্যমে চুক্তিতে আসতে রাজি হয় এবং পাশ্চাত্যের সাথে আলোচনার দুয়ার খোলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প যেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ... ... এই ক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প আমেরিকার অনন্তকালব্যাপী এবং বিদেশে অযৌক্তিক অভিযানসমূহ যুদ্ধসমূহ সমাপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ইউরোপীয়দেরকেও অবশ্যই ইরানকে বুঝাতে হবে, যেন সে নিজের ক্ষমতাকে অতিমাত্রায় বড় করে না দেখে। একটি নতুন ক্রেডিট লাইনের বিষয়ে ম্যাক্রোঁর প্রস্তাব হয়তো ইরানের মধ্যপন্থীদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু ইউরোপীয়রা যদি ইনসটেক্স চালু করতে এবং চালাতে সক্ষম না হয়, তবে ইরানিদের নিকট তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ হয়ে যাবে। সর্বাবস্থায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অবধি ইরানকে নীরব থাকতে উৎসাহিত করা। ইউরোপেরে উচিত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা, তবে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে, যে ইউরোপীয় স্বার্থে ইরান যদি আর কোন আক্রমণ করে, তাহলে ইইউ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিয়ন্ত্রণ কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে।
সর্বোপরি, পারস্য উপসাগরে ইউরোপের তীক্ষ্ম নজরদারি রাখা দরকার। এমনকি তারা যদি যুক্ত নৌশক্তি সংগঠিত নাও করে, তাদের উচিত হবে উত্তেজনা হ্রাসে কাজ করা, যদি যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইরান কোন সম্মুখ দ্বন্দ্বের জন্য প্ররোচিত করতে চায়। ইরানকে সাথে নিয়ে নৌ-মহড়ার আয়োজন করা এক্ষেত্রে চমৎকার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কৌশল মাথায় রেখেই সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন ম্যাক্রোঁ। কৌশলটি সফল হলে ট্রাম্পের আমলে বিয়ারিতজ সম্মেলনই হবে প্রথম সফল জি৭ সম্মেলন। (সেটা ট্রাম্প জানুন কিংবা নাই জানুন।)

________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will the Iran Conflict Break the West? শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক মার্ক লিওনার্ড বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের পরিচালক। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



এমিলি জনস ও ক্যালাম মিলার, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ইইউ কর্তৃক সর্বশেষ যুক্তরাজ্যের সদস্যপদের মেয়াদ বৃদ্ধির পর থেকে বিশ্ব জুড়ে পর্যবেক্ষকরা বিস্মিত হতে পারেন যে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া এতো প্যাঁচালো বলে প্রমাণিত হচ্ছে কেন? সংক্ষেপে এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, যুক্তরাজ্য সরকার ও সংসদ তাদের তিনিটি অসঙ্গতিপূর্ণ লক্ষ্য পূর্ণ করতে চাচ্ছে, এ তিনটি হলো: দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কঠোর সীমান্তে ফিরে না যাওয়া এবং যুক্তরাজ্যের নিজস্ব বাণিজ্য চুক্তি করার সক্ষমতা অর্জন, অর্থাৎ বাণিজ্য নীতির স্বায়ত্তশাসন।
ব্রিটিশরা শেষ পর্যন্ত যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা হলো এক সাথে এই তিনটি লক্ষ্যের মধ্যে বড়জোর দুইটি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। এর মানে ব্রেক্সিট ইস্যুতে আগাতে হলে তিনটি দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
প্রথম দৃশ্যপটটি “ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন” কেন্দ্রিক, এটির মাধ্যমে ব্রিটেন ট্রেড পলিসি এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার নিশ্চয়তা পাচ্ছে, কিন্তু তার বিনিময়ে আয়ারল্যান্ডে কঠোর সীমান্ত মেনে নিতে হবে। ট্রেড পলিসি স্বায়ত্ত শাসনের জন্য যুক্তরাজ্যকে ইইউ কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজার উভয়টি ত্যাগ করতে হবে। উভয় ক্ষেত্রে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সীমান্তের মধ্যে কাস্টম এবং রেগুলেটরি চেক স্থাপন করতে হবে। যদিও কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন যে, নতুন প্রযুক্তি বাহ্যিক সীমান্তের প্রয়োজনীয়তা থেকে রেহাই দিতে পারে, কিন্তু আদতে এরকম কোন প্রযুক্তি বিদ্যমান নেই। এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কঠোর সীমান্ত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি ঝুঁকিতে পড়বে, যে চুক্তির ফলে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের কয়েক দশক ধরে চলে আসা সহিংসতার সমাপ্তি হয়েছিল।
দোসরা দৃশ্যপটে আইরিশ প্রশ্নের সমাধান পাওয়া যায়। যুক্তরাজ্য আয়ারল্যান্ডে কঠোর সীমান্ত ছাড়াই নিজেদের মতো করে তাদের ট্রেড পলিসি নির্ধারণের সুযোগ ভোগ করতে পারে, কিন্তু এজন্য দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে বলি দিতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে ইইউ কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজারে রাখা যাবে, কিন্তু তার ফলে আইরিশ সাগরে একটা সীমান্ত প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটি হবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড এবং গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে। অর্থাৎ দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বিপন্ন হয়ে পড়বে।
এই ব্যবস্থায় সমস্যা হলো যুক্তরাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন অংশে আলাদা আলাদা ব্যবসায়িক নিয়ম-নীতি চালু হবে। শুধু ইউনিয়নে থেকে যাওয়া নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডই যে যুক্তরাজ্যের বাকি অংশ থেকে আলাদা হয়ে যাবে, তাই নয় নয়া আরো ঝুঁকি বেড়ে যাবে হয়তো স্কটল্যান্ডও ইইউর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রাখতে চাইবে তখন। আর স্কটল্যান্ড যদি আরেকটি স্বাধীন গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পুরো যুক্তরাজ্যই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তৃতীয় দৃশ্যপট অনুসারে, যুক্তরাজ্য হয়তো আইরিশ সমস্যা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার সমস্যা এড়িয়ে যেতে পারবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজার উভয়টিতে থাকতে হবে, এর ফলে যুক্তরাজ্যের “গ্লোবাল ব্রিটেনের” স্বপ্ন ত্যাগ করতে হবে। এ পদ্ধতিতে ট্রেড পলিসিতে কোন অর্থবহ নিজস্ব সক্ষমতা অর্জিত হবে না। হাউজ অব কমনসে উপস্থাপিত “কমন মার্কেট-২” প্রস্তাবনার সারাংশ হচ্ছে এই।
নরওয়ের অনুসরণ করে যুক্তরাজ্যও বেছে বেছে সাধারণ কৃষিনীতি (কমন অ্যাগ্রিকালচারাল পলিসি) ও সাধারণ মৎস্য নীতি (কমন ফিশারিজ পলিসি) থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, এভাবে ইইউর বাজেটে যুক্তরাজ্যের অবদান হ্রাস করা যেতে পারে। কিন্তু এ ব্যবস্থায়ও ইইউ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের যুক্তরাজ্যে অবিভাসী হওয়ার সুযোগ থাকবে, যা কিনা “প্রস্থান” প্রচারণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। একইভাবে, ব্রিটেন ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের বিচারের আওতায়ও থেকে যাবে, যদিও সেটা পরোক্ষভাবে হবে।
এছাড়াও আরেকটি বিকল্প আছে, সেটি হলো ইইউর সাথে শুধুমাত্র কাস্টমস ইউনিয়নে থাকা, এ বিকল্পটি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সবচেয়ে কাছাকাছি আছে এখন অবধি। কিন্তু এতেও ব্রেক্সিটের ত্রিমাত্রিক ঝামেলার সমাধান হয় না। এ পদ্ধতি যদি যুক্তরাজ্যকে অভিবাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের অনুমতি দেয়, তাহলে ব্রিটেন ও ইইউর মধ্যে নতুন রেগুলেটরি চেকের দরকার পড়বে। এর মানে ব্রিটেন একক বাজার থেকে আলাদা হয়ে পড়বে, অথচ ইইউতে যুক্তরাজ্যের মোট রফতানির ৪০%ই এই একক বাজারের মাধ্যমে হয়, ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী।
ব্রেক্সিটে অসম্ভাব্যতার এই ত্রিভূজ থেকে স্পষ্ট হয়, কেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র প্রস্তাবিত চুক্তি বারবার হাউজ অব কমন্সে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। প্রস্থান চুক্তি হিসেবে এতে ইইউর সাথে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যত সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা থাকছে, কিন্তু এর মধ্যে আয়ার‌ল্যান্ডের কঠোর সীমান্তে ফিরে যাওয়া প্রতিরোধের আইনি বাধ্যবাধকতাও অন্তর্ভুক্ত আছে। ব্রেক্সিটের ত্রিমাত্রিক এ ঝামেলার মধ্যে মে’র প্রস্তাবিত চুক্তিতে “ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন” তথা প্রথম দৃশ্যপটকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ট্রেড পলিসি অটনমি ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার মধ্যে কোনটি বেছে নেওয়া হবে, সেটি ব্রেক্সিট আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এই অস্পষ্টতার কারণেই অনেক সাংসদ চিন্তায় পড়ে গেছেন।
কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীরা ট্রেড পলিসিতে স্বায়ত্তশাসন (অটনমি) নিশ্চিত করার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, এর মানে তারা আইরিশ সাগরে একটি সীমান্ত মেনে নিতে প্রস্তুত। কিন্তু এরকম হলে তারপরই স্কটল্যান্ড ইইউর সাথে তাদের নিজস্ব বন্দোবস্ত করতে চাইবে, যা কিনা যুক্তরাজ্যকে বড় ধরনের সাংবিধানিক সমস্যা, এমনকি সম্ভবত রাজ্যগুলোর মধ্যে বিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দেবে।  এ পরিস্থিতি এড়াতে হলে গুড ফ্রাইডে অ্যাগ্রিমেন্ট এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে যুক্তরাজ্যকে ট্রেড পলিসিতে নিজেদের স্বাধিকারের বিষয়টিকে বলি দিতে হবে। কিন্তু এটি কট্টর ব্রেক্সিটপন্থীদের অপছন্দের কারণ হবে, এবং সম্ভবত কনজারভেটিভ পার্টিতে বিভক্তি দেখা দেবে, কিন্তু থেরেসা মে এই ঝুঁকি নিতে চান না।
ব্রিটিশ নেতাদের স্বীকার করতে হবে যে ব্রেক্সিটের এ সকল পরিস্থিতির মধ্যে যে কোন একটিই বেছে নিতে হবে, এবং এ জন্য ভোটারদের অগ্রাধিকার চিহ্নিত করার সুবিধার্থে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় বিতর্কের আয়োজন করা দরকার। এক্ষেত্রে হয়তো উপরের তিনটি পরিস্থিতির যে কোন একটিকে গ্রহণ করতে হবে, অথবা পুরো ব্রেক্সিট প্রক্রিয়াকেই স্থগিত করার পথ বেছে নিতে হবে। একটি পরিপক্ক ও খোলামেলা আলোচনা না হলে যুক্তরাজ্যকে অন্তহীন অনিশ্চয়তা আর সিদ্ধান্তহীনতার ক্ষয়-ক্ষতি বহন করে যেতে হবে।
কিন্তু অবশ্যই একটি যথাযথ বিতর্কের জন্য দরকার কার্যকর নেতৃত্ব, যে কিনা বিকল্পসমূহের উপর গুরুত্বারোপ করবে এবং ছাড় দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে। যদি কখনো ব্রেক্সিটের ক্ষত নিরাময় করতে হয়, তবে অবশ্যই ভোটারদেরকে দলীয় রাজনীতিতে সেসকল নেতাকে বরণ করে নিতে হবে যারা অপর পক্ষের নিকট পৌছতে পারেন এবং নীতিনির্ধারণী বিষয়সমূহে সততার সাথে কথা বলতে পারেন। কেবলমাত্র সবাই মিলে এক সাথে কাজ করলেই যুক্তরাজ্যে সর্বজনগ্রাহ্য সমাধানে পৌছা সম্ভব হবে।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “The Brexit Impossibility Triangle” শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক এমিলি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লাভাটনিক স্কুল অব গভর্নমেন্টের পাবলিক পলিসি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক। আর মিলার একই স্কুলের অ্যাসোসিয়েট ডিন ও চিফ অপারেটিং অফিসার। ছবি: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত।


আইজেমা ওলুও, দ্য গার্ডিয়ান:
ভেবেচিন্তে কীভাবে বর্ণ নিয়ে কথা বলতে হয় পুরো দিন ধরে সে বিষয়ে কর্মশালা পরিচালনা করে দিন শেষে আমি একটি বাণিজ্যিক কার্যালয় থেকে বের হচ্ছিলাম। এর আগে আমি অনেকগুলো কর্মশালায় যেরকমটা দেখেছি, এ দিনের সেশনসমূহের দর্শকরাও একই রকম ছিলেন। সেখানে অশ্বেতাঙ্গদেরকে বাড়িয়ে উপস্থাপন করা হচ্ছিল, এবং সাদা কর্মীদের কম করে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। অশ্বেতাঙ্গ অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত আমার সাথে চোখে চোখে যোগাযোগ করছিলেন, আমিও সাড়া দিচ্ছিলাম তাদের মুখে আমি মাঝে-মধ্যে “তাই তো, তাই তো” জাতীয় শব্দ শুনছিলাম তবে কখনোই প্রশ্ন কিংবা কোন মন্তব্য করার জন্য প্রথমে হাত তুলছিলেন না। এদিকে শ্বেতাঙ্গরা সব সময় তাদের মতামত আমাদের সামনে পেশ করতে বেশ আগ্রহী ছিলেন। এধরনের সেশনে আমি শ্বেতাঙ্গদের জোর কণ্ঠস্বরকে সমন্বয় করার পাশাপাশি সাধারণত ঠিক পথে এগুচ্ছি কি না সেটা নিশ্চিত করার জন্য অশ্বেতাঙ্গদের নীরব প্রতিক্রিয়ার উপর নির্ভর করি।
সভাকক্ষে প্রবেশ পথে একজন এশীয় মহিলার সাথে আমার চোখাচোখি হলো, তিনি বললেন, “ধন্যবাদ।” একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ আমার কাঁধ চাপড়ে বললেন, “মেয়ে, তুমি যদি জানতে!” আরেক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা আমাকে থামিয়ে চারদিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে নিশ্চিত হলেন যে কেউ শুনতে পাচ্ছে কি না, তারপর বললেন, “তুমি সত্য কথা বলেছ। আমার ইচ্ছা হচ্ছে আমি যদি আমার গল্প তোমার সাথে আলোচনা করতে পারতাম, তাহলে তুমি বুঝতে পারতে যে তুমি কতখানি সত্য। কিন্তু এসব আলোচনার জন্য এটা সঠিক জায়গা নয়।”
সেটা সঠিক জায়গা ছিল না। এসব সেশনে অশ্বেতাঙ্গদের দিকে মনযোগ দেওয়ার জন্য এবং তাদেরকে নিরাপদ রাখার জন্য আমি যত্নশীল হওয়া সত্ত্বেও সেটা সঠিক জায়গা ছিল না। আবারো, অশ্বেতাঙ্গদের সত্যিকারের বিপদের আলোচনা শ্বেতাঙ্গদের অনুভূতি সম্পর্কে, তাদের প্রত্যাশ্যা সম্পর্কে, তাদের চাহিদা সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে চুপসে গেছে।
যেহেতু আমি সেখানে দাঁড়িয়ে বর্ণ সম্পর্কে শত শত কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া কথোপকথনের স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম, এক সাদা মহিলা আমার মনযোগ ফেরালেন। আশেপাশের কেউ তার কথা শুনে ফেলছে কি না, সেটা নিয়ে তিনি মোটেও চিন্তিত ছিলেন না। আমার হাতে তার সাথে কথা বলার সময় আছে কি না, সেটাও তিনি আমাকে জিজ্ঞাস করছিলেন না, যদিও আমি দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।
“তোমার আলোচনা আসলেই চমৎকার হয়েছে,” তিনি তার কথা শুরু করলেন। “তুমি অনেক ভালো ভালো কথা বলেছ, যেগুলো প্রচুর মানুষের জন্য উপকারী হবে।”
তিনি একটু থামলেন, এরপর আবার বললেন, “কিন্তু বিষয় হলো, তুমি আজ এমন কিছুই বলো নি, যে আরো বেশি কৃষ্ণাঙ্গ বন্ধু বানাতে আমকে সহযোগিতা করবে।”
একেবারে শুরুর দিকে বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনায় আমি যোগদান করেছিলাম, এমন একটি প্যানেলের কথা মনে পড়লো। সিয়াটল শহরে (ওয়াশিংটন রাজ্যের একটি শহর) একজন কালো লোককে এক নিরাপত্তারক্ষী পিপার স্প্রে করেছে, তার অপরাধ শুধু এতোটুকু ছিল যে তিনি একটি শপিং সেন্টারের দিকে হাটছিলেন। ঘটনাক্রমে সেটা ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল। একদল কালো লেখক-অ্যাক্টিভিস্ট এদের মধ্যে আমিও ছিলাম সিয়াটলের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্বেতাঙ্গদের সামনে সে ঘটনা নিয়ে কথা বলছিলাম। আমার সাথে থাকা প্যানেলিস্ট চার্লস মুডেড, যিনি একাধারে একাধারে একজন মেধাবী লেখক, ফিল্ম মেকার এবং অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক, কর্মক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পদ্ধতির কথা উল্লেখ করে বলছিলেন: এই নিরাপত্তারক্ষীকে বলে দেওয়া হয়েছে যে তার দায়িত্ব হলো তার নিয়োগকর্তার লাভ করার সক্ষমতাকে রক্ষা করা। তাকে বলা হয়েছে যে তার দায়িত্ব হলো শুধু সেসকল ক্রেতাদেরকে রাখা, যাদের সুখে স্বাচ্ছন্দে ও নিরাপদে ব্যয় করার মতো টাকা আছে। আর কার টাকা আছে কার টাকা নাই, কে সহিংস, কে সহিংস নয়, সে সম্পর্কে প্রতিদিন তাকে সাংস্কৃতিক বার্তা গেলানো হচ্ছে। চার্লস যুক্তি দেখান যে নিরাপত্তারক্ষী শুধুমাত্র তার দায়িত্ব পালন করেছিল। একটি শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, আপনার কাজটি ঠিক এরকমই দেখায়।
যাক, তিনি অন্তত এই অবস্থানে যুক্তি দাঁড় করার চেষ্টা করছিলেন। কারণ মাঝপথে এক সাদা মহিলা দাঁড়িয়ে তাকে আটকালেন।
 “দেখ, আমি নিশ্চিত যে তুমি এসকল স্টাফ সম্পর্কে প্রচুর জানো।” সে মহিলা কোমরের উপর হাত রেখে বলছিলেন, “কিন্তু আমি এখানে অর্থনীতির পাঠ শেখার জন্য আসি নি। আমি এসেছি কারণ এই লোকটির প্রতি যা ঘটেছে, সেটাতে আমার খারাপ লেগেছে এবং আমি জানতে চাই যে এখন কী করার আছে।”
হয়তো, সেই আলোচনা কক্ষও সঠিক জায়গা ছিল না। সেই মহিলার কথা অনুসারে, উপরের এলাচনা হওয়া উচিত হয় নি, পিপার স্প্রে দ্বারা যাকে আক্রমণ করা হয়েছে তার অনুভূতি অথবা আরো বৃহদাকারে কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের অনুভূতি আলোচনা করাটা যথোপযুক্ত ছিল না। যদিও আমরা নিজেরা নিজেদের শহরে কতটা অনিরাপাদ, সে আলোচনা সেটারই প্রমাণ ছিল মাত্র। সেই মহিলার খারাপ লেগেছে এবং তিনি তার খারাপ লাগা বন্ধ করতে চান। আর তিনি আমাদের নিকট প্রত্যাশা করেন আমরা কার সেই খারাপ লাগা বন্ধ করে দেব।
গত মাসে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আলোচনা করছিলাম প্রকাশনার ‘শ্বেত ধোলাই’ সম্পর্কে, এবং অশ্বেতাঙ্গদের আরো বেশি ছাকনিবিহীন (অর্থাৎ কোন ধরনের কাট-ছাট ব্যাতিরেখে) আখ্যানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে, একজন সাদা ভদ্রলোক বেশ জোর গলায় বললেন, আমরা (কৃষ্ণাঙ্গরা) যদি নিজেদেরকে আরো সহজবোধ না করি, তাহলে শ্বেতাঙ্গদের পক্ষে আমাদেরকে বোঝার কোন উপায় নেই। আমি যখন তাকে জিজ্ঞাস করলাম, শুধুমাত্র নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য অশ্বেতাঙ্গরা শ্বেত সংস্কৃতির সকল উপাদানের সাথে নিজেদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে কি না, তখন তিনি মাথা ঝাঁকালেন এবং তার নোটবুকের দিকে তাকালেন। গত সপ্তাহে আমার পরিচালিত একটি কর্মশালায় এক সাদা মহিলা সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন আমেরিকার অশ্বেতাঙ্গরা বর্ণ সম্পর্কে সম্ভবত অতি মাত্রায় সংবেদনশীল। তিনি কীভাবে জানতে সক্ষম হবেন, যদি আমরা তার প্রশ্নে সব সময় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি।
অসংখ্য বার আমি এ রকমের বাধা এবং উত্তরের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এমনকি যখন পোস্টারে আমার নাম লেখা থাকে, তখনো সেসকল জায়গাকে আমি এবং আমার মতো অশ্বেতাঙ্গ লোকজন যেসকল বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন মনে করি সেকল কথার জন্য সঠিক জায়গা বলে মনে হয় না। সুতরাং প্রায়ই কোন বিষয়ে আলোচনা হবে, তারা কী শুনবে, কী জানবে, সেটা সম্পর্কে শ্বেতাঙ্গ উপস্থিতিই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এবং এটা তাদের জায়গা, সব জায়গাই তো তাদের।
একদিন, হতাশা হয়ে, আমি সামাজিক মাধ্যমে এই স্ট্যাটাস পোস্ট করি:
 “যদি তোমার বর্ণবাদ বিরোধী কাজে শ্বেত আমেরিকার ‘প্রবৃদ্ধি’ এবং ‘আলোকোদ্ভাসিত দিক’ অশ্বেতাঙ্গদের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং মানবতার উপর প্রাধান্য পায়, তাহলে এটি বর্ণবাদ বিরোধী কাজ নয়। এটি বরং শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী কাজের অংশ।”
শ্বেতাঙ্গদের নিকট প্রাপ্ত একেবারে শুরুর দিকের মন্তব্যগুলোর একটি ছিল: “ঠিক আছে, কিন্তু কোন কিছু না হওয়ার চেয়ে এটা কি ভালো নয়?”
আসলই কি তাই? সামান্য মুছে ফেলা অনেক বেশি মুছে ফেলার চেয়ে ভালো নাকি? বর্ণবাদ বিরোধী কাজের ফাঁকে সামান্য শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদ কোন বর্ণবাদ বিরোধী কাজই না হওয়ার চেয়ে ভালো? আমেরিকায় জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমি যখনই দাঁড়াই, আমি জানি যে আমার সামনে প্রচুর শ্বেতাঙ্গ আছে, যারা এখানে এসেছে বর্ণবৈষম্য ও সহিংসতার খবর পড়ে একটু কম খারাপ লাগার জন্য, সবাইকে একথা জানানোর জন্য যে তারা অন্যদের মতো নয়, আরো কালো বন্ধু বানানোর জন্য। এসবই তাদের উপস্থিতির উদ্দেশ্য। আমি জানি আমি এমন প্রচুর শ্বেতাঙ্গের সামনে কথা বলছি, যারা মনে করে তারা সমস্যার অংশ নয়, যেহেতু তারা এখানে উপস্থিত হয়েছে।
শুধু একটি বার আমি এমন একদল শ্বেতাঙ্গের সামনে কথা বলতে চাই, যারা জানে যে তারা এখানে এসেছে কারণ তারা এই সমস্যার অংশ। যারা জানে যে তারা এখানে এসেছে, যাতে তারা কোন কোন জায়গায় ভুল করছে, ক্ষতিকর কাজ করছে সেটা জেনে আরো ভালো কাজ করতে শুরু করতে সক্ষম হয়। কারণ শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদ তাদেরই গড়া, এটি থেকে তারা উপকৃত হয়েছে, এবং এটি ধ্বংস করা তাদেরই দায়িত্ব।
আমি এবং আরো অনেক অশ্বেতাঙ্গ অংশগ্রহণকারী প্রায়ই ক্লান্ত এবং হতাশ হয়ে এসব আলোচনা বাদ দিয়ে দিই, তবে আমি এখনও সবাইকে স্পষ্ট করে বাস্তব অবস্থা দেখাই এবং কথা বলি। আমি বাস্তব অবস্থা দেখিয়ে দিতে থাকি এই আশায় যে, হয়তো এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত অচলায়তন ভাঙবে, অথবা আমাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যেটা আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের আরো কাছাকাছি। আমি সেসকল কৃষ্ণাঙ্গের জন্য কথা বলি, যারা মুক্তভাবে কথা বলতে পারে না, যাতে করে তাদেরকে সবাই দেখতে পায়, শুনতে পায়। আমি কথা বলি, কারণ এই কক্ষে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যাদের শুনা দরকার যে বর্ণবাদী নিপীড়নের বোঁঝা তাদের বহন করা উচিত নয়, যেখানে এই নিপীড়ন থেকে যারা উপকৃত হয়, তারা প্রত্যাশা করে যে বর্ণবাদ বিরোধী প্রচেষ্টায় প্রথমে তাদের চাহিদা পূর্ণ করা হবে। আমার একেবারে সাম্প্রতিক আলোচনার পর, এক কালো মহিলা আমার নিকট একটি নোট পাঠান যেখানে তিনি লিখেছিলেন যে বর্ণবাদ তার জীবনে কী রকম প্রভাব ফেলছে তিনি কখনোই তার শ্বেত সহকর্মীদের নিকট থেকে প্রতিশোধের ঝুঁকি ছাড়া সেটা খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন না। “আমি বাড়িতে নীরব থেকেই আরোগ্য লাভ করি,” এভাবেই তিনি তার কথা শেষ করেন।
এটা কি কোন কিছু না হওয়া থেকে উত্তম? নাকি বাস্তবতা এই যে ২০১৯ সালেও প্রতিদিন নিজেকে সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রশ্নটি করতে হচ্ছে যে
________________________________

নিবন্ধটি দ্য গার্ডিয়ানে “Confronting racism is not about the needs and feelings of white people শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত, দ্য গার্ডিয়ান থেকে ছবি সংগৃহীত।



হিলাল কাপলান, ডেইলি সাবাহ:
তুর্কি দৈনিক সাবাহ পত্রিকায় ডিসেম্বরে লেখা আমার একটি কলামের শিরোনাম ছিল এরকমই। সে কলামের শুরুটা হয়েছিলো: “একেবারে ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে একটি নাৎসী আন্দোলন বেড়ে উঠছে। তারা শুধু সক্রিয়ই নয়, বরং কল্পনার চেয়েও বেশি ছড়িয়ে পড়ছে। যে কোন মুহূর্তে পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে তারা প্রস্তুত।”
দুর্ভাগ্যবশত মাত্র আমার এই নিবন্ধ লেখার মাত্র তিন মাস পর নিউজিল্যান্ড তার সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যার সাক্ষী হলো, যেখানে একজন সন্ত্রাসী ৫০ জন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে এবং পুরো ঘটনাটি লাইভ করেছে।
ঘাতক তার “ম্যানিফেস্টো”তে নিজেকে ক্রুসেডার হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। এবং এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে ঘাতক তার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছে মুসলমানদেরকে হত্যাকারী ক্রুসেডার কমান্ডারদেরকে।
যদিও নিউজিল্যান্ড সরকার এবং বিশেষত প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডের্ন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি চমৎকারভাবে তাদের সমালোচনা ব্যক্ত করেছেন, তবে এখন পর্যন্ত তারা ঘাতকের প্রেক্ষাপটের উপর আলোকপাত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
এমনকি যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ধরে ঘাতক ইতোপূর্বে পরিভ্রমণ করেছে, সে সূত্রেও তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করার যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে, কিন্তু নিউজিল্যান্ডবাসী দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের বাঁচাতে এ ধরনের ঘটনায় “একাকী নেকড়ে” (অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন ঘটনা) তত্ত্বকে তাদের যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
যাই হোক, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর সেবাস্টাইন কুর্জ একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছেন, যা ইতোমধ্যেই জানা হয়ে গেছে, সেখানে তিনি বলেন: “এখন আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে নিউজিল্যান্ডের হামলাকারী এবঙ অস্ট্রেলিয়ার আইডেন্টিটেরিয়ান (ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কট্টর ডানপন্থী আন্দোলন) আন্দোলনের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং যোগাযোগ বিদ্যমান রয়েছে।”
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বিবৃতি অনুসারে, গত নভেম্বরে হামলাকারী অস্ট্রিয়া সফর করে এবং অভিবাসন বিরোধী আইডেন্টিটেরিয়ান আন্দোলনে ১,৫০০ ইউরো দান করে।
 “নব্য ক্রুসেডার” শিরোনামে আমার নিবন্ধে আমি জেনারেশন আইডেন্টিটি আন্দোলন সম্পর্কে আমি বর্ণনা করেছিলাম: “এই গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রস্তাবনা হচ্ছে গ্রেট রিপ্লেসমেন্টর তথাকথিত তাত্ত্বিক ধারণা। এ মতবাদ অনুসারে যারা ইউরোপে অভিবাসী হয়েছে, কত প্রজন্ম ধরে তারা ইউরোপে বসবাস করেছেন তা বিবেচনা না করেই, তাদেরকে অবশ্যই তাদের আদি ভূমিতে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর কারণ তাদের মতে ইউরোপ শুধুমাত্র শ্বেতাঙ্গ এবং খ্রিষ্টানদের জন্য। মুসলিম, ইহুদি, শিখ কিংবা অন্য কোন বিশ্বাস অথবা জাতির কোন জায়গা ইউরোপে নেই।”
নিউজিল্যান্ডের গণহত্যারি মেনিফেস্টোর দিকে তাকালে কাকতালীয়ভাবে দেখতে পাবেন, সেটার শিরোনাম হচ্ছে: “গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট”! জেনারেশন আইডেন্টিটি আন্দোলনটি মাত্র পাঁচ বছর আগে ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আন্দোলনটি ইতোমধ্যে পুরো ইউরোপ জুড়ে নিজেদেরকে বড় আকারে সংগঠিত করেছে। ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়া থেকে শুরু করে জার্মানি পর্যন্ত এটি বিস্তার লাভ করেছে এবং ইতালিতেও এটি শিকড় প্রোথিত করেছে।
জরিপ অনুসারে, ফ্রান্সের প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন মারিন লে পেনকে সমর্থন করে। কট্টর ডানপন্থী ইউকেআইপির সাবেক নেতা নিগেল ফারাগ বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, “ইউকেআইপি ধর্মীয় ক্রুসেড লড়া দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।” ফলস্বরূপ তাকে তার অবস্থান থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।
কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান হচ্ছে দিন দিন। রাজনৈতিক অঙ্গনে আমরা দেখতে পাচ্ছি কট্টর ডানপন্থা মূলধারার দলগুলোতে সমর্থন পাচ্ছে। কিন্তু আগামী দশ বছরে এমনটা ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন নয় যে এসকল ক্যাম্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাজারো তরুণ অনেকগুলো সংগঠিত দলের সাথে সমবেত হবে এবং রাস্তায় নেমে পড়বে।
একুশ শতকের মুসলিমরা তাদের নিজেদের এলাকায় সবচেয়ে কষ্টদায়ক সময়ের সাক্ষী হচ্ছে, এবং দুর্ভাগ্যবশত এ পরিস্থিতি কেবলই বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
________________________________

নিবন্ধটি তুর্কি দৈনিক ডেইলি সাবাহর ইংরেজি সংস্করণে “Neo-Crusaders of Europeশিরোনামে প্রকাশিত। 



জি ভেরফস্টাড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
বিনিয়োগ মূলধন এবং আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তি খোঁজার ক্ষেত্রে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবসময় ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের সার্বিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে না বিশেষত চীনের সাথে যেকোন বিষয়ে এটি আরো বেশি হয়ে থাকে যদিও একতরফাভাবে চীনের সাথে এরকম সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদেরকে এবং বাদবাকি পুরো ইউরোপকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়
একথা সত্যি যে চীনের বিষয়ে ইউরোপের সাধারণ অবস্থা এখনো একেবারেই সীমাবদ্ধ অনিঃশেষ ব্রেক্সিট নাটকের বিভ্রান্তি এবং বিগ টেকের কারণে আরোপিত বিপদসমূহের কারণে ইইউ নেতারা অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এখনো পাচ্ছেন না তা সত্ত্বেও, এপ্রিলের ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে এই মাসে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে চীনের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা তাদের একটি সাধারণ অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, সেখানে তারা চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (বিআরআই) সমর্থন করার বিষয়ে ইতালি সরকারের সিদ্ধান্তের ঝুঁকির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন
এই সতর্কতা আসলে কোন গুরুত্ব পায়নি তার পরের দিনই ইতালির লোকরঞ্জনবাদী জোট সরকার চীনা প্রেসিডেন্ট জিকে রোমে স্বাগত জানায় এবং চীনের সাথে একটি সমোঝতা স্মারক স্বাক্ষর করে কার্যত বাদবাকি ইইউর সাথে ভিন্নমত সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করেই দুঃথজনক বিষয় হলো, একতরফাভাবে ইতালি যে বিআরআইতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা চীনের বিপরীতে শুধু ইইউর সামষ্টিক প্রভাবকেই ক্ষুণ্ন করবে না, বরং এর ফলে ইতালির জনগণও ক্ষতিগ্রস্থ হবে
চীনের নেতৃত্বাধীন অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে স্বাক্ষরকারী প্রথম ইইউ সদস্য দেশ ইতালি নয়; তবে ইতালিই সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় অর্থনীতি প্রথম জি- সদস্য দেশ বিষয়ে খুব কম সন্দেহ আছে যে ইতালি সরকারের পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট জি অভ্যুত্থান এবং ইউরোপের বিপদের প্রতিনিধিত্ব করে সর্বোপরি বিআরআই মানবজাতির কল্যাণার্থে গৃহীত কোন দাতব্য উদ্যোগ নয় স্পষ্টতই এটি একটি বিদেশ-নীতি প্রকল্প, যা বিশ্বব্যাপী চীনের অর্থনৈতিক ভূকৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সতর্কবাণী অনুসারে বলা যায়, ইতালি সরকার ইতালির জনগণের কোন উপকার নিশ্চিত না করেই চীনেরপ্রতারণামূলক বিনিয়োগ পদ্ধতিকে বৈধতা প্রদানকরার পথে আছে
জি মার্চ ২২-২৪ তারিখের সফরের সময়টা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় সম্প্রতি ব্রেক্সিটের সময়সীমা বৃদ্ধি করার পূর্বে ২৯ মার্চে যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার কথা ছিল ব্রেক্সিট এবং মে মাসে আসন্ন ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ইউরোপীয় নেতার পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আছেন ইউরোপীয় সরকারগুলোর নিকট থেকে চীনা বিনিয়োগের (বলা যায়, যা মূলত উচ্চ শর্তসাপেক্ষ ঋণ) প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না
সৌভাগ্যবশত ইতালি সরকারের অজ্ঞতাসুলভ আচরণের বিপরীতে ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট জি সাথে তার বৈঠকে জার্মান চ্যান্সেলল অ্যাঙ্গেলা মার্কেল এবং ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট জিন-ক্লাউড জাংকারকে সংযুক্ত করেছিলেন অন্যান্য দূরদর্শী চিন্তাসম্পন্ন ইউরোপীয় নেতাদের মতোই তিনি স্বীকার করেছেন যে চীন, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে ইউরোপ সম্মানের সাথে টিকে থাকতে পারবে শুধুমাত্র যদি ইউরোপের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়
এখনো, ইইউ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট কৌশল না থাকলে, ইউরোপ পরাশক্তিদের ভাগ-করো-জয়-করো কৌশলের নিকট অরক্ষিতই থেকে যাবে, এবং ইউরোপীয়রা বঞ্চিত হবে একটি সামষ্টিক কণ্ঠস্বর থেকে, যেটি কিনা তাদের স্বার্থ দেখাশুনা করবে রাশিয়া যেমন নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যম্যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একের বিরুদ্ধে অপরকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে, চীনও তেমনি যত বেশি সম্ভব ইউরোপীয় দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার চেষ্টা করবে এরকম আলোচনার ক্ষেত্রে চীনই সবসময় ভালো অবস্থানে থাকবে
ইইউ কমিশনার গুন্থার ওটিঙ্গার প্রস্তাবিত একটি সম্ভাব্য সমাধান হচ্ছে ইইউতে যে কোন ধরনের চীনা বিনিয়োগের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কমিশনে ভেটো দেওয়া এই ধারণাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আলাদাভাবে ইইউ সদস্য দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তসমূহ বাকি ইউরোপকে নিরাপত্তা অর্থনীতিবিষয়ক জটিলতায় ফেলে দিতে পারে তাছাড়াও জাতীয় সরকারগুলোর নিজস্ব পদ্ধতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য ইইউর প্রচেষ্টাকে ব্যহত করতে পারে
একটি শক্তিশালী ইইউ-চীন সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্যই ভালো রকমের লাভজনক হতে পারে ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে একটি ইইউ-চীন বিনিয়োগ চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়াটা ইতিবাচকতার স্বাক্ষর হতে পারে। এরকম একটি সমোঝতা হয়তো ইউরোপীয় সংস্থাগুলোর জন্য চীনের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের বাঁধাসমূহ দূর করে এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগকারীদের বিপক্ষে বৈষম্য হ্রাস করে অনেক নতুন নতুন দরজা খোলে দেবে। কিন্তু একইভাবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে ইউরোপের একটি সাধারণ পদ্ধতি থাকা দরকার, যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়, বিশেষত ৫জি যন্ত্রপাতির (যেগুলোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হচ্ছে চীনের হুওয়াওয়ে) বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষী চীন কর্তৃক আরোপিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইইউ খুবই ধীর গতিতে সচেতন হচ্ছে কিন্তু আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে এখনো আমরা একটি ইউরো-চীন সম্পর্ক বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবো, যে সম্পর্কটি ভবিষ্যতে আমাদের সকলের স্বার্থ রক্ষা করবে
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “Europe MustUnite on China” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখক বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অ্যালায়েন্স অব লিবারেলস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস ফর ইউরোপ গ্রুপ (এএলডিই)’র প্রেসিডেন্ট এবং Europe’s Last Chance: Why the European States Must Form a More Perfect Union গ্রন্থের লেখক।

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.