Articles by "চীন"

চীন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

দুই কালক্রম নির্ণয়

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে, আর চীনের সাথে বন্ধন শক্তিশালী হচ্ছে

তবে সরকার এশিয়ার উভয় পরাশক্তির সাথে একই সাথেই সুসম্পর্ক রাখতে আগ্রহী



দি ইকনমিস্ট:

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহর সিলেট ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার (আনুমানিক) দূরে অবস্থিত। কিন্তু এই শহরটিতে একটি বিমানবন্দর টার্মিনাল নির্মাণের জন্য গত এপ্রিলে সরকার দরপত্র আহ্বান করলে ভারতীয় দরদাতাদের হারিয়ে সেটি জিতে নিয়েছে বেইজিং আরবান কনস্ট্রাকশন গ্রুপ নামের এক চায়নিজ ফার্ম। জুনে বাংলাদেশের ৯৭% রফতানি পণ্যকে করমুক্ত ঘোষণা করেছে চীন। এই মাসে বাংলাদেশ ভারতের সাথে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে দশকব্যাপী নৈরাশ্যকে পাশ কাটিয়ে তার বদলে পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নের জন্য চীনকে অনুরোধ করেছে।

 

বাংলাদেশ ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কারণ, ১৯৭১ সালে ভারতের সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে প্রবেশ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছে। ফলে সব সময়ই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। কিন্তু বহু বাংলাদেশি মনে করে, ভারত বাংলাদেশের দাদাসুলভ ও অসৌজন্যমূলক মিত্র। এক বাংলাদেশি সাংবাদিক বলেন, তারা আসলে বিশ্বাস করে না যে আমরা স্বাধীন। তারা সব বিষয়ে নাক গলায়। তারা মনে করে আমাদের প্রশাসন তাদের জন্য কাজ করে। ভারতের বর্তমান সরকারের নানাবিধ মুসলিম বিরোধী নীতিও ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আস্থাহীনতা বৃদ্ধি করছে, কারণ বাংলাদেশের প্রায় ৯০% জনগণ মুসলিম।

 

চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সাতটি মৈত্রী সেতু নির্মাণ করেছে। ২০১৮ সালে ভারতকে পিছনে ফেলে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশে পরিণত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারও বটে। ২০১৬ সালে জি জিনপিং এক রাষ্ট্রীয় সফরে ২৭টি অবকাঠামোগত প্রকল্পে আরো ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করার ওয়াদা করেছেন। বাংলাদেশে বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক শীর্ষস্থানীয় এক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসাইন বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পাওয়ার ও টেলিকম খাতে চায়নিজ বাণিজ্য পরিচালিত হয়।

 

অন্য পশ্চিমা দাতাগোষ্ঠীর তুলনায় চীনের দ্বিধার জায়গা অনেক কম, যেমনটা বলছিলেন ইলিনয়স বিশ্ববিদ্যালয়ের আলি রিয়াজ। ২০১৩ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু করলে বাংলাদেশ পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের ১.২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ প্রত্যাখ্যান করে। তখনই চীন সে প্রকল্পে পা রাখে।

 

জনাব রিয়াজ বলেন, গত কয়েক বছরে চীনে অধ্যয়নরত বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণমাধ্যমের চীনমুখিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের এক ফিন্যান্সিয়াল পত্রিকার প্রতিবেদক জানান, তার পত্রিকার ৭০% সাংবাদিকই চীনে গিয়েছেন। তিনি নিজেও ২০১৮ সালে চীনে দশ মাসের একটি ফেলোশিপে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশে কোভিড-১৯ পৌছার প্রায় সাথে সাথেই মহামারী প্রতিরোধে সহায়তা করার জন্য চীনা চিকিৎসক দল বাংলাদেশে প্রেরিত হয়েছিলেন।

 

এসব সহযোগিতা কাজেও আসছে। চায়নিজ সরকার ভারতীয় সরকারের তুলনায় অনেক বেশি মুসলিমদের নির্যাতন করছে। বাংলাদেশি পণ্যের ডিউটি-ফ্রি প্রবেশাধিকারও যথেষ্ট ধীর গতিতেই প্রদান করেছে চীন। এতদসত্ত্বেও বাংলাদেশের মিডিয়ায় ভারতের তুলনায় চীন কম সমালোচনার শিকার হচ্ছে।

 

বাংলাদেশের সরকার একটু বেশিই সতর্ক। চীনের নিকট দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ার ব্যাপারে সরকার চিন্তিত, আবার ভারতকে তিরষ্কার করার ব্যাপারেও সতর্ক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত মার্চে ঢাকা সফর করার কথা ছিল, করোনা ভাইরাসের দরুণ সে সফর বাতিল হয়েছে। তবে এরকম বড় ও শক্তিশালী প্রতিবেশী থাকাটা বেশ যন্ত্রণাদায়ক বটে। জনাব রিয়াজ বলেন, ভারতের নীতিনির্ধারক মহল ও গণমাধ্যম সব সময় বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দিতে থাকে যে বাংলাদেশ ছোট ও অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। চীন এমনটা করে না।” ■

 

––––––––––––––––––––––––––––––––

নিবন্ধটি দি ইকনমিস্ট পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণের এশিয়া অংশে "Two-timing" শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। দি ইকনমিস্টের অনলাইন সংস্করণে নিবন্ধটি As Bangladeshs relations with India weaken, ties with China strengthenশিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ছবি দি ইকনমিস্টের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

 

 


নুরিয়েল রুবিনি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
কয়েক বছর আগে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পশ্চিমা প্রতিনিধি দলের একজন হিসেবে চীনের রাষ্ট্রপতি জি জিনপিং সাথে দেখা করেছিলাম আমাদের সাথে কথা বলার সময় রাষ্ট্রপতি জি বুঝিয়ে বলতে চান যে চীনের উত্থান হবে শান্তিপূর্ণ, অন্য কোন রাষ্ট্রের বিশেষতযুক্তরাষ্ট্রেরথুসিডাইডিসের ফাঁদ(থুসিডাইডিস ট্র্যাপ) নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন দরকার নাই থুসিডাইডিসের ফাঁদ এই পরিভাষাটি গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডিসের নামে নামকরণ করা হয়েছে, উদীয়মান অ্যাথেন্স নিয়ে স্পার্টার ভীতি কীভাবে উভয় নগর রাষ্ট্রকে অনিবার্য যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, সে ইতিহাস এই ঐতিহাসিক লিখে গেছেন মূলত সেখান থেকেই এই ধারণার উদ্ভব
উভয় পক্ষই থুসিডাইডিসের ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র যে কোনভাবে এই ফাঁদে পড়বে বলে মনে হচ্ছে যদিও উভয় পরাশক্তির মধ্যে গরম (প্রত্যক্ষ) যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে, ঠাণ্ডা যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি
চলমান উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনকে দোষারোপ করছে এদিকে চীন মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের যে কোন ধরনের উত্থান ঠেকানো কোন পক্ষের যুক্তি শক্তিশালী, সে তর্কে না গিয়েও বলা যায় অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা খুব সম্ভব অবশ্যম্ভাবী বাণিজ্যযুদ্ধ রূপে যে উত্তেজনার সূচনা, সেটি স্থায়ী দ্বিপাক্ষিক শত্রুতায় রূপ নিতে পারে এর প্রতিফলন দেখা যায় ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে, যেখানে চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, এবং সব ক্ষেত্রে চীনের মোকাবেলা করা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়েছে
সে অনুসারে স্পর্শকাতর সেক্টরসমূহের চীনা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) উপর যুক্তরাষ্ট্র কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে, এবং কৌশলগত শিল্পসমূহ যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ৫জি ইত্যাদিতে পশ্চিমা কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য আরো অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইউরেশিয়ান দেশসমূহে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চীন যে বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেই বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে অংশগ্রহণ না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের উপর চাপ প্রয়োগ করছে সেই সাথে পূর্ব দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর টহল বৃদ্ধি পাচ্ছে, এদিকে বিতর্কিত অঞ্চলসমূহ দাবি করার ক্ষেত্রে চীন আরো বেশি আগ্রাসী হয়ে পড়ছে
চীন-মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধের বৈশ্বিক পরিণতি সোভিয়েত-মার্কিন ঠাণ্ডাযুদ্ধের তুলনায় আরো বেশি তীব্র হবে সোভিয়েত ছিল পতনশীল পরাশক্তি ব্যর্থ অর্থনৈতিক মডেলের দেশ, যেখানে চীন শিগগিরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে, এবং খুব সম্ভব অদূর ভবিষ্যতে তার উত্থান অব্যহত থাকবে তাছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য ছিল খুবই সীমিত পরিসরে, যেখানে চীন পুরোপুরিভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে জড়িত এবং বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত
ফলে পূর্ণমাত্রার ঠাণ্ডা যুদ্ধ নতুন মাত্রার বি-বিশ্বায়ন (ডিগ্লোবালাইজেশন) করতে পারে; অন্ততপক্ষে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুটি ব্লকে বিভক্ত করে ফেলবে বহুধা বিভক্ত এ পৃথিবীতে চীন যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই চাইবে অন্য সকল দেশ যেন যে কোন একটি পক্ষ গ্রহণ করে, কিন্তু সেসকল দেশের সরকার উভয় পক্ষের সাথে তাল মিলিয়ে ভালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করবে সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যতটা ব্যবসায় করছে, তার চেয়ে বেশি ব্যবসা (বাণিজ্য বিনিয়োগের দিক থেকে) করছে চীনের সাথে
যদিও ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্র উভয়দেশই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ৫জির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিসমূহ আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, ফলে সেখানে এরকম মাঝামাঝি অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে প্রত্যেক দেশকেই বেছে নিতে হবে দুটি পক্ষের যে কোন একটিকে, এবং এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব হয়তো আবার বি-বিশ্বায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করবে
যাই হোক না কেন, এই শতাব্দির ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একটা পর্যায় পর্যন্ত তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী কিন্তু আদর্শিক দিক থেকে উভয় পক্ষের উচিত হবে গঠনমূলকভাবে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা করা
যদি এই সম্পর্ক ভুলভাবে চলতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ উত্থানকে দমন করার চেষ্টা করে এবং চীন আগ্রাসীভাবে এশিয়া বিশ্বের অন্যত্র তার প্রভাব বিস্তার করে তাহলে একটি পূর্ণমাত্রা ঠাণ্ডাযুদ্ধ সংগঠিত হবে এবং একটি গরম যুদ্ধ (অথবা এক গাদা প্রক্সি যুদ্ধ) এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না হয় তো একবিংশ শতাব্দিতে থুসিডাইডিসের ফাঁদ শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর চীনকে নয়, বরং পুরো পৃথিবীকেই হয়তো গ্রাস করে ফেলবে
________________________________

লেখক: নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লিন্টনের আমলে এই ভদ্রলোক হোয়াইট হাউজে অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করতেন তাঁর লেখাThe Global Consequences of a Sino-American Cold Warশীর্ষক নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশ হয়েছে ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.