Articles by "নিউ ইয়র্ক টাইমস"

নিউ ইয়র্ক টাইমস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান



আসিম আলী, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত মঙ্গলবার দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ট সহযোগী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হিন্দু জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে বিভেদমূলক সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালিয়েছিলেন, মুসলমানদেরকে দেশের জন্য ভয়ঙ্কর এবং আম আদমি পার্টি (আপ) ও দলটির নেতৃবৃন্দকে দেশদ্রোহী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন।
তবু দিল্লির ৭০ আসনের মধ্যে মোদি ও অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন বিজেপি জিতেছে মাত্র আটটি আসনে, আর ২০১৫ সাল থেকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আপ জিতেঝে ৬২ আসন।
দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কর্মী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া কেজরিওয়াল মূলত তাঁর দলের অবদানের বিষয়কে সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়েছিলেন পাবলিক হাসপাতাল পরিষেবায় যে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ এবং দিল্লির বিদ্যুতের মূল্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি যা করেছেন, সেসবের ভিত্তিতেই প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেজরিওয়ালের অবদানের কারণে দিল্লি তাঁকে বেছে নিয়েছে। অথচ বিজেপি পুরো শহর মোদীর ছবি দিয়ে মুড়িয়ে ফেলেছে, কিন্তু কেজরিওয়াল বা তাঁর দলের প্রার্থীদের তুলনায় যোগ্যতর কোন প্রার্থীকে তারা দেখাতে পারেনি।
মোদী এবং তার দল হয়তো একটি নির্বাচনে হেরেছে মাত্র, কিন্তু আদর্শিক যুদ্ধে তাঁরা জিতে গেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা এ কথাটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে যে, ভারতে নির্বাচনে জিততে হলে এখন আর নাগরিক সমতা এবং ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকারের পক্ষে কিংবা সহিংসতা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলে পার পাওয়া যাবে না।
দিল্লির নির্বাচন এমন এক সময়ে হয়েছে যখন পুরো ভারতজুড়ে গত ডিসেম্বরে মোদী সরকার কর্তৃক পাসকৃত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, যেটি ধর্মকে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নতুন আইন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের সৃষ্টি করে এবং ভারতকে কর্তৃত্ববাদী হিন্দ জাতিতে রূপান্তরিত করার হিন্দু জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে নেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জোর দিয়ে বলেছেন যে, নতুন নাগরিকত্ব আইনের পর জাতীয় নাগরিকপুঞ্জি বা এনআরসি প্রণয়ন করা হবে, তখন নাগরিকদেরকে নিজেদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণে কাগজপত্র জমা দিতে হবে। ভারতের মুসলমানগণ ও উদারতাবাদীদের আশঙ্কা এনআরসি মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিলের একটি সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
গত দুই মাস ধরে নাগরিকত্ব আইন ও আসন্ন এনআরসির বিরুদ্ধে আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে দরিদ্র মুসলিম বসতি অবধি, দূর সীমান্তের রাজ্য থেকে তারকাখচিত বলিউড অবধি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ মোদী সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দিল্লির পুলিশ জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীদের উপর সহিংস আক্রমণ চালায়, যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রচুর মুসলিম শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মুসলিম বসতি শাহীনবাগের শ্রমিক শ্রেণির নারীরা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে ফেলেন। রাস্তায় একটি তাঁবু স্থাপন করা হয় এবং আন্দোলনটি দ্রুতই বেপরোয়া হয়ে পড়ে।
দ্রুতই আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, নাগরিকত্ব আইনবিরোধী সব ধরনের লোকজন শাহীনবাগে এসে সংহতি প্রকাশ করেন। তীব্র শীতের দুটি মাস কেটে গেছে; কিন্তু নারীরা শীত ও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণ সত্ত্বেও তাদের আন্দোল অব্যহত রাখেন।
দিল্লির নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে মোদী সাহেবের দল শাহীন বাগকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে এবং আন্দোলনকারীদের মুসলমানিত্বের উপর জোর দিয়ে নগরীর হিন্দুদেরকে ভীত করে তুলতে চেষ্টা করে। ইসলামোফোবিয়ার বয়ান মোদী সাহেবের ভারতে স্বাভাবিক হয়ে গেছে, কিন্তু দিল্লির প্রচারণা সেটিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। শাহ সাহেব, যিনি কিনা বিজেপির সভাপতিও বটেন, তিনি সমর্থকদের নিকট যে সুরটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটি হলো ইভিএমে বিজেপির প্রতীকের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সেটি শাহীন বাগের আন্দোলনকারীরা (যাদের বেশির ভাগ মুসলিম) আরো উদ্দীপ্ত হবে।
দিল্লির একটি মিছিলে শাহ সাহেবের সহকর্মী ও ভারতের অর্থপ্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর এক ভয়াবহ স্লোগান শুরু করেন: “এরা জাতির বিশ্বাসঘাতক, এদের গুলি কর!তার কিছুদিন পর দুই হিন্দু জাতীয়তাবাদী জামিয়া মিল্লিয়ার ছাত্র আন্দোলন ও শাহিনবাগে গুলি করে।
মোদী সাহেবের দলের আরেক সংসদ সদস্য পরবেশ বর্ম শাহীন বাগের আন্দোলনকারীদেরকে খুনি এবং ধর্ষক আখ্যায়িত করে হিন্দুদেরকে ভয় দেখিয়ে বলেন: “তারা আপনাদের ঘরে প্রবেশ করবে, আপনাদের বোন এবং কন্যাদেরকে ধর্ষণ করবে এবং তাদেরকে হত্যা করবে। এখনো সময় আছে। এরপর আর মোদীজি এবং অমিত শাহ আপনাদেরকে রক্ষা করতে আসবেন না।” দলটির অন্য নেতারা শাহিনবাগকে পাকিস্তানের সাথে তুলনা করেন এবং দিল্লি নির্বাচনকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রতিযোগিতা হিসেবে চিত্রায়িত করেন।
কেজরিওয়াল সাহেব নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, এটিকে তিনি অর্থনীতিতে মোদী সাহেবের ব্যর্থতা থেকে জনগণের নজর অন্য দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বয়ান এড়িয়ে গেছেন এবং মুসলমানদের উপর আক্রমণের বিষয়টিও উপেক্ষা করেছেন।
পুলিশ যখন জামিয়া মিল্লিয়াতে ঢুকে ছাত্রদের উপর আক্রমণ করলো, কেজরিওয়াল সাহেব কয়েক দিন ধরে এ বিষয়ে নীরবতা পালন করেন। তাঁকে যখন দিল্লির আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি ঘোষণা করেন দিল্লি পুলিশ যদি কেন্দ্রী সরকারের অধীনে না হয়ে তাঁর সরকারের অধীনে থাকতো, তাহলে তিনি দুই ঘণ্টার মধ্যে শাহিনবাগের রাস্তা পরিস্কার করতেন।
নিজের হিন্দুত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি জনসম্মুখে হিন্দু ধর্মীয় প্রার্থনা করেন, এবং নির্বাচনে বিজয়ের ভাষণের পরপর একটি মন্দিরে গমণ করেন। আসলে তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের নির্ধারণ করে দেওয়া সীমার ভিতরে থেকে কাজ করেছেন এবং তাদের রাজনীতিরই তুলনামূলক শিথিল সংস্করণকে নিজের জন্য গ্রহণ করেছেন।
দিল্লি নির্বাচন থেকে বুঝা যায়, ভারত এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে আদর্শিক পরিভাষা ও রাজনীতির ভাষা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা নির্ধারিত। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কোন না কোন ভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও উগ্রদেশপ্রেমের যে কোন এক রূপকে ধারণ করতে হবে, যার মূল নজির পেশ করেছেন মোদী সাহেব।
মোদীর ঐকমত্য এ কথা নিশ্চিত করেছে যে ভারতে মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে শুধুই শক্তিহীন নয়, বরং অদৃশ্যও বটে। স্বাধীনতার তেয়াত্তর বছর পর এখনো ভারতের মুসলমানরা সমান নাগরিকত্বের জন্য লড়াই করছে। আমরা এখন চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সমতা অর্জনের জন্য নয়, বরং শুধু আইনি সমতা অর্জনের জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করে চলছি।
নয়া নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন মূলত আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়া কিংবা নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কারই প্রকাশ। নির্বাচনে বেশির ভাগ নাগরিক যেখানে তাদের বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভোট দেয়, ভারতীয় মুসলমানরা সেখানে কেবল নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভোট দেয়। কেজরিওয়াল সাহেব এবং তাঁর দল আপ মুসলমানদের উদ্বেগের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দিল্লির মুসলমানরা গণহারে তাঁর দলকে সমর্থন দিয়েছে, কারণ এই দলটি সক্রিয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায় না।
মোদী সাহেবের দলে দিল্লিতে পরাজয়কে তার হিন্দু কর্তৃত্ববাদী আদর্শের পরাজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করলে সেটি গুরুতর ভুল ব্যাখ্যা হবে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুসারে, দিল্লির চার-পঞ্চমাংশ ভোটারই মোদী সাহেবকে সমর্থন করেন এবং তিন-চতুর্থাংশ ভোটার তাঁর কেন্দ্রী সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
কেজরিওয়াল সাহেব যেভাবে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গী হিন্দু জাতীয়তাবাদকে এড়িয়ে গিয়ে দিল্লি মতো একটি ছোট শহুরে রাজ্যে শুধুমাত্র সুশাসন ও পরিষেবা সরবরাহ নিশ্চিত করে বিজয়ী হয়েছেন, সেটা দিল্লির বাইরে সম্ভব কিনা তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিজেপি যেটির নির্বাচনী শাখা) একক লক্ষ্য হলো: হিন্দ কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা। এই মূল লক্ষ্যের বিষয়ে মোদী ও তাঁর দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মুরোদ আছে, বর্তমানে এমন কোন রাজনীতিবিদও নেই। মোদী সাহেব ও তাঁর দল হয়তো একটা নির্বাচনে হেরেছে, কিন্তু আদর্শিক যুদ্ধে তারাই জিতেছে।
––––––––––––––––––––––
লেখক নয়া দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চে কর্মরত আছেন। নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে “Modi Lost in Delhi. It Doesnt Matter.” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ছবি নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



নাথান থ্রাল, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বহুল প্রত্যাশিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, যেটি তথাকথিত “শতাব্দির সেরা বন্দোবস্ত” বলে আখ্যায়িত হয়ে আসছে। এই পকিল্পনায় বলা হয়েছে পশ্চিম তীর ও গাজাকে নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে; পুরনো শহরসমেত অবিভক্ত জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী; এবং সকল অবৈধ ইহুদি বসতি ইসরায়েলে অন্তর্ভুক্ত করা হবেএ সকল বসতির মধ্যে রয়েছে জর্দান উপত্যকা, যা কিনা পশ্চিম তীরের এক চতুর্থাংশ, এবং জর্দানের সাথে ফিলিস্তিনের সীমান্ত এই জর্দান উপত্যকায়ই অবস্থিত। এর ফলে ফিলিস্তিন হবে ইসরায়েলি সাগর বেষ্টিত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, যার চারপাশে থাকবে শুধুই ইসরায়েল। ট্রাম্প সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন যে এই পরিকল্পনায় ইসরায়েলকে যে অঞ্চলসমূহ প্রদান করা হয়েছে, তার প্রতিটির উপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তার পরপরই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু সকল বসতি ও জর্দান উপত্যকা অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম আগামী রোববার থেকে শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিক ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য বিরোধীরা এই প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ স্পষ্টতই এর মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেছে। ইসরায়েলি বামপন্থীরা, পিএলও এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য সমর্থকরা এই প্রস্তাবনার সমালোচনা করছেন এই একই কারণে, তারা বলছেন এর মাধ্যমে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কফিনে সর্বশেষ পেরেকেটি মারা হয়েছে।
অর্থাৎ এই প্রস্তাবনার সমর্থক এবং সমালোচক, উভয়েই এ বিষয়ে একমত যে এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি পরিকল্পনাটি এই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিন থেকে বজায় থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানের বিপরীত? নাকি বাস্তবে এটি তাদের অবস্থানের যৌক্তিক পরিপূর্ণরূপ?
শতাব্দি কাল ধরে ফিলিস্তিনের আদি বাসিন্দাদের বলি দেওয়ার ইসরায়েলি লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে পাশ্চাত্য। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি জাতীয় মাতৃভূমি (!) প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, যেখানে সে সময় ইহুদি ছিল মোট জনগণের ৮ শতাংশেরও কম। তিরিশ বছর পর জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে ভাগ করার জন্য একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে, যে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ ভূমি ইহুদিদেরকে দেওয়া হয়, যেখানে তারা তখনো মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম ছিল, আর তাদের মালিকানায় ছিল ৭ শতাংশের কম ভূমি। পরবর্তী যুদ্ধের সময় ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দকৃত ভূমির অর্ধেকেরও বেশি দখল করে; ইসরায়েলের এই নতুন সীমান্তের ভিতর বসবাসকারী চার-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনিকে তখন তাদের বাড়ি ফিরতে বাধা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন ইসরায়েলকে জবরদখলকৃত ভূমি ফেরত দেওয়ার জন্য কিংবা শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়ি ফেরার সুযোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়নি।
১৯৬৭ সালের পর ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ২২ শতাংশ দখল করে ফেলে, সেই সাথে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়, ইসরায়েল তখন দখলকৃত অঞ্চলে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তুলে। এবং একই ভূমিতে বসবাসরত দুই গোষ্ঠী তথা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জন্য ভিন্ন আইনের শাসন চালু করে। ১৯৮০ সালে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্বজেরুজালেম দখল করে, তখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নামেমাত্র কিছু আন্তর্জাতিক নিন্দাজ্ঞাপন হলেও মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা ইসরায়েলকে শক্তিশালী করে।
১৯৯৩ সালে ওসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য তাদের বিচ্ছিন্ন দ্বীপতূল্য অঞ্চলসমূহে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই চুক্তিও ইসরায়েলি বসতি উচ্ছেদ; কিংবা নিদেনপক্ষে আর নতুন কোন বসতি স্থাপন না করার দাবি জানানো হয়নি। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম মার্কিন পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয় বিল ক্লিন্টনের আমলে ২০০০ সালে। এতে বলা হয় বড় বড় ইহুদি বসতি সমূহ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে, এবং একই ভাবে পূর্ব জেরুজালেমের সকল ইহুদি বসতিও ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে বেসামরিকিকৃত, এবং সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান থাকবে, আর জর্দান উপত্যকায় থাকবে আন্তর্জাতিক বাহিনী, যা প্রত্যাহার করা হতে পারে শুধুমাত্র ইসরায়েলের সম্মতির ভিত্তিতে। “শতাব্দির বন্দোবস্তের” মতই, সেই পরিকল্পনায়ও ফিলিস্তিনকে সামান্য বেশি স্বায়ত্তশাসণ দেওয় হয়েছিল, এবং সেটিকেই রাষ্ট্র বলা হয়েছিল।
এখনো, ইসরায়েলের সামরিক হিসাব অনুসারে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ইসরায়েলিদের তুলনায় বেশি সংখ্যক ফিলিস্তিনি বসবাস করছে। ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায়ই হোক, কিংবা ক্লিন্টন সাহেবে পরিকল্পনায়ই হোক, সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে এক-চতুর্থাংশেরও কম ভূমি, আর তার সাথে ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের উপর বিধি-নিষেধ তো আছেই। কাজেই এসব প্রস্তাবনা থেকে যে ফলাফল আসবে, সেটাকে বড় জোর দেড়-রাষ্ট্র সমাধান বলা যেতে পারে, দুই-রাষ্ট্র সমাধান নয়।
ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায় অনেকগুলো ভুল রয়েছে: এটিতে ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইহুদিবাদী স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে পুরষ্কৃত এবং উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এর কোনটাই অতীতের রীতি কিংবা নীতি ভেঙে করা হয়নি। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কেবলমাত্র একটি বাড়ির নির্মাণকাজের শেষ অংশটুকু করা হয়েছে, রিপাব্লিকান ও ডেমক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারা মিলে যে বাড়ি নির্মাণে কয়েক দশক ধরে সহযোগিতা করে আসছেন। গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম তীর দখল করছে, দখলকৃত ভূমিতে ৬ লাখেরও বেশি দখলদারকে পাঠিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন ইসরায়েলকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে ভেটো দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালত ও তদন্তকারী সংস্থাসমূহের উপর চাপ প্রয়োগ করেছে যাতে করে ইসরায়েলকে কোন ধরনের চাপ না দেওয়া হয়, এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্রদান করেছে।  
কোন কোন ডেমক্র্যাট রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী এখন বলছেনন যে তারা ইসরায়েলি এই দখলদারি অনুমোদন করেন না, কিন্তু তারাও এটা বন্ধ করার কোন উপায় প্রস্তাব করছেন না। যেমন মূলধারার ডেমক্র্যাট সিনেপর অ্যামি ক্লবুচার এই দখলদারির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ঘোষণা করেছেনে, এবং ট্রাম্পের সমালোচনা করে লেখা একটি চিঠিতে সাক্ষরও করেছেন। কিন্তু ২০১৬  সালে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রেজুলেশন পাশ করেছিল, তখন নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেউ রেজুলেশনের বিরুদ্ধে গুরুতর আপত্তি প্রকাশ করা” সিনেট রেজুলেশনের কো-স্পন্সর ছিলেন এই তিনিই।
সিনেটর বের্নি স্যান্ডার্স ব্যতীত অন্য কোন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন প্রস্তাবনার কথা বলেননি যা ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনে মার্কিন জটিলতা হ্রাস করবে। দখলদারির বিরোধিতা করার ঘোষণা দেওয়াটা আসলে অন্তঃসারশূন্য, যদি না সেই ঘোষণায় দখলদারি বন্ধের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকে: অবৈধ বসতি নির্মাণের পণ্যসমূহ নিষিদ্ধ করা; দখলিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েল যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বসতি স্থাপন করছে, সেই পরিমাণ আর্থিক সহায়তা হ্রাস করা; অবৈধ বসতি স্থাপনের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলো থেকে ফেডারেল এবং স্টেট সরকারের পেনশন তহবিল সরিয়ে নেওয়া; ইসরায়েল যতক্ষণ না গাজায় অবরুদ্ধ বিশ লক্ষ মানুষকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদেরকে সমান নাগরিক অধিকার প্রদান, যতটুকু নাগরিক অধিকার তাদের আশেপাশে বসবাসরত ইহুদিরা পাচ্ছে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কয়েক দশক ধরে চলে আসা শান্তি প্রক্রিয়ার মতোই ইসরায়েলকে কথিত স্থিতাবস্থার আচ্ছাদন দিচ্ছে, যার মাধ্যমে ইসরায়েল জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকার পায়, কোটি কোটি মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাদের চলাফেরায় বিধি নিষেধ আরোপ করে, তাদের যে কোন বক্তব্যকে “জনশৃঙ্খলা” বিঘ্ন করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, কোন ধরনের বিচার কিংবা অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য “প্রশাসনিক আটকের” নামে বন্দী করতে পারে। আর এসব চলাকালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অন্যরা এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েরে পিঠ চাপড়ে দিতে থাকে, সেই সাথে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার খাতিরে “অর্থপূর্ণ সংলাপ” পুনরায় শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে থাকে।
ইসরায়েলের সমর্থকরা বলতে চাইবেন যে ইসরায়েলকে এক ঘরে করে ফেলা হয়েছে, এবং তারাই সঠিক। অথচ ইসরায়েল হলো একমাত্র রাষ্ট্র, যেটি স্থায়ীভাবে সামরিক দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে, একই অঞ্চলে বসবাসরত দুটি গোষ্ঠীর জন্য বৈষম্যমূলক পৃথক আইন প্রয়োগ করছে, অথচ তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে, তাদের রক্ষা করতে, এমনকি তাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে দুনিয়ার আত্মস্বীকৃত উদারবাদীরা পারলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমালোচনা কারী ডেমক্র্যাটরা আসলে তার চেয়ে ভালো কেউ নন, কারণ তারা কেউই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যথাযথ কোন অবস্থান গ্রহণ করছেন না। কথায় না হলেও কাজে তারাও দখলদারি যুলুমবাজির সমর্থক, ট্রাম্পেরই মতো।


লেখক ইন্টার্ন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আরব-ইসরায়েল প্রকল্পের পরিচালক। নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে Trumps Middle East Peace Plan Exposes the Ugly Truth” শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি নিউ ইয়রক্ টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



মেভলুত চাভুসোগ্লু, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
দুঃখজনক হলেও সত্যি, সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তুরস্কের অভিযানের বিষয়টিতে মার্কিন গণমাধ্যমে কুর্দিদের উপর হামলা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, দেখানো হচ্ছে দায়েশের (কথিত ইসলামিক স্টেট) অবশিষ্টাংশের বিরুদ্ধে লড়াইকে দুর্বল করে ফেলার প্রচেষ্টা এবং মিত্রদের নিকট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার উপর আঘাত হিসেবে আমি বিষয়টি স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভব করছি, কারণ তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ৬৭ বছরের পুরনো ন্যাটো জোট কোন সাময়িক, কৌশলগত কিংবা নিছক লেনদেনভিত্তিক কোন ঐক্য নয়
সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্ত্রাসীদের দ্বারা সৃষ্ট ঝুঁকি দূরীকরণের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তুরস্ক চলমান অভিযান শুরু করেছে এই অভিযান এসব এলাকায় বসবাসরত সিরীয়দেরকে সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি দেবে এবং সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা রাজনৈতিক ঐক্যকে হুমকির মুখ থেকে বাঁচাবে। এই দুই ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলে বাস্তুচ্যুত সিরীয় নাগরিকগণ নিরাপদে এবং স্বেচ্ছায় তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে
তুরস্ক কখনোই তার সীমান্তে কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর করিডর মেনে নেয়নি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গায় আমরা বারবার সীমান্তে একটি নিরাপদ অঞ্চল (সেফ জোন) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছি জাতিসংঘে আমরা সন্ত্রাসীদেরকে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলাম
কিন্তু মার্কিন নিরাপত্তা বিষয়ক আমলাতন্ত্র পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি নামে পরিচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী থেকে আলাদা হতে পারেনি যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, সিরিয়ার ডেমক্র্যাটিক ফোর্সের প্রধান অংশটি গঠিত যে ওয়াইপিজি দ্বারা, সেই ওয়াইপিজি মূলত তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) অবিচ্ছেদ্য অংশ আর পিকেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ ন্যাটো কর্তৃক স্বীকৃত সন্ত্রাসী সংগঠন
আমাদের সাথে সংলাপরত মার্কিন প্রতিনিধিও এসকল শক্তিকে সীমান্ত থেকে অপসারণ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একমত হয়েছিলেন বলে মনে হয়েছিল, এমনকি বিষয়ে একটি সময়সীমার বিষয়েও আমরা একমত হয়েছিলাম অতি সম্প্রতি উভয় পক্ষের সামরিক বাহিনীর মধ্যকার আলোচনায় গত আগস্টে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এমন একটি নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে, যেখান থেকে পিওয়াইডি/ওয়াইপিজিকে অপসারণ করা হবে কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তো করলোই না, বরং উল্টো তাদের কার্যক্রমে আমাদের স্পষ্ট ধারণা তৈরি হলো যে তারা কালক্ষেপণ করছে, যাতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সিরিয়ার আরো গভীরে প্রবেশ করতে পারে
পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি হয়তো সারা দুনিয়ার সামনে নিজেদেরকে দায়েশবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, কিন্তু এই সংগঠনটিই তুরস্কের মাটিতে সুড়ঙ্গ খনন করে পিকেকের নিকট বিস্ফোরক সরবরাহ করে থাকে এই সংগঠনের সদস্যরা দায়েশের কারাবন্দীদেরকে তুরস্কে পাঠাচ্ছে, এমনটাও আমরা পেয়েছি এবং ২০১৭ সালের নভেম্বরে বিবিসি একটি গোপন চুক্তির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যে চুক্তির অধীনে সিরিয়ান ডেমক্র্যাটিক ফোর্সেস রাকা শহর মুক্ত করার স্বার্থে যৌথ অভিযান চলাকালে শত শত দায়েশ সন্ত্রাসীকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং যানবাহনের ব্যবস্থা করে দেয়
আমাদের কিছু একটা করতে হচ্ছিল অনেকেই সিরিয়ায় কুর্দি জনসাধারণের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমরা আবারো বলতে চাই, এবং কথার উপর গুরুত্ব দিতে চাই যে, তুরস্কের লড়াই কুর্দিদের বিরুদ্ধে নয় আমাদের যুদ্ধ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনায় কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কজাতীয় যে কোন বর্ণনা মূলত বিদ্বেষপ্রসূত এবং মিথ্যা কুর্দিরা আমাদের শত্রু নয়
আমাদের লক্ষ্যবস্তু হলো কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি কর্তৃত পরিচালিত যৌথ সন্ত্রাসী কার্যক্রম, যারা কিনা শিশু সৈনিকদের নিযুক্ত করছে, ভিন্নমতাবলম্বীদেকে ভীতি প্রদর্শন করছে, ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন করে ফেলছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে ভর্তি করছে
কুর্দি, আরব, খ্রিষ্টান এবং অন্য যারাই পিওয়াইডি/ওয়াইপিজির অধীনে ভুক্তভোগী আছে, তারা সকলেই সন্ত্রাসীদের থেকে মুক্তি পেলে উপকৃত হবে ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব আরামিয়ান খ্রিষ্টান বিষয়টির উপর বিশেষভাবে জোর দিয়ে আসছে
এই অভিযান পরিচালনা শুরুর আগে আমরা নিরস্ত্র জনগণের ঝুঁকি হ্রাস এবং মানবিক সংকট প্রতিহত করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি গত কয়েক বছর ধরে তুরস্ক আরব, কুর্দ তুর্কমানসহ সকল জাতির বিরাট সংখ্যক শরণার্থীদেরকে আশ্রয় প্রদান করছে
৩০০,০০০ এরও বেশি কুর্দিসহ এসকল শরণার্থীর বেশির ভাগই সন্ত্রাসীদের দ্বারা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন আমরা তুরস্কে তাদেরকে নিরাপত্তা দিয়েছি, আশ্রয় দিয়েছি, জীবনধারণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি আমরা তাদের সাথে আমাদের রুটি ভাগাভাগি করেছি, গণ পরিষেবা ভাগাভাগি করেছি তুরস্ক মানবিক খাতে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যয়কারী দেশ, এবং সবচেয়ে বেশি শরণার্থীদের আশ্রয়দাতা দেশ
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ক্ষেত্রে তুরস্ক গত তিন বছরে বিশ্বাসযোগ্য নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে ২০১৬-১৭ সালে জারাবুলুস এবং তার আশেপাশে তুরস্কের অভিযান, ২০১৮ সালে আফরিন অভিযানসহ সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তুরস্কে পূর্ববর্তী অভিযানসমূহ বিশাল এলাকাকে সন্ত্রাসীমুক্ত করেছে এসকল অভিযানের ফলে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার ভুক্তভোগী জনসাধারণ শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করেছে, নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সুফল পেতে শুরু করেছে প্রায় ৩৬৫,০০০ শরণার্থী সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাদের বাড়িঘরে ফিরে গিয়েছে
এসব অঞ্চলে আমরা গণপরিষেবা চালু করেছি, ২৩০,০০০ এরও বেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন করেছি সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুক্ত এলাকাসমূহে ৫৫টি অ্যাম্বুলেন্স, সিরীয় তুর্কিসহ দুই সহস্রাধিক কর্মী নিয়ে টি হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে একটি স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন খেলাধুলা বিনোদনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এসব অঞ্চলে ব্যবসায়-বাণিজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বাণিজ্যের সুবিধার্থে একটি সীমান্তপথ খোলে দেওয়া হয়েছে কৃষি পশুপালনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও প্রদান করা হয়েছে
আপনি যদি তুরস্কের পূর্ববর্তী অভিযানসমূহের সাথে জোট কর্তৃক রাক্কা শহর ধ্বংস করে দেওয়ার অভিযানের তুলনা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন আমরা কতটুকু সতর্কতার সাথে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানসমূহ পরিচালনা করি সকল অভিযান থেকে আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সেসকল অভিজ্ঞতা আমাদেরকে এখন আরো ভালোভাবে অভিযান পরিচালনা করতে সহযোগিতা করবে
পিকেকে এবং পিওয়াইডি/ওয়াইপিজি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্ল্যাকিমেইল করে দাবি করছে যে, তাদেকে বাদ দিলে দায়েশের বিরুদ্ধে লড়াই দূর্বল হয়ে পড়তে পারে কিন্তু আদতে এসকল নৃশংস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই মোটেও দূর্বল হবে না, বিশেষত আমাদের মিত্ররা যদি তাদের অবস্থানে ঠিক থাকেন এবং তুরস্কের সাথে সহযোগিতা অব্যহত রাখেন আমরাই একমাত্র জাতি, যারা দায়েশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়িয়ে আছি
দায়েশ এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই সকলের অংশগ্রহণ সহযোগিতার মাধ্যমে অব্যহত রাখতে হবে অনেক ইউরোপীয় দেশ এসকল গোষ্ঠীর সাথে সংযুক্ত তাদের নাগরিকদেরকে দেশে ফেরার অনুমতি দিতে অনিচ্ছুক যদিও সমস্যা থেকে দূরে থাকতে চাওয়া কখনোই কোন নীতি হতে পারে না তাদেরকে অবশ্যই নিজেদের বোঝা নিজেদের কাঁধেই নিতে হবে
তুরস্কে আমরা বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত যে, আমরা সিরীয় শরণার্থীদের বাড়ি ফেরার পথ প্রশস্ত করছি, দায়েশ এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পুনরায় উত্থান ঘটবে না এমন নিশ্চয়তাও আমরা দিতে পারি
আমি বিষয়ে সচেতন আছি যে, সিরীয় শরণার্থীদের নিরাপদ এবং স্বেচ্ছা প্রত্যাবর্তন অবশ্যই খুবই সতর্কতার সাথে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপিত হতে হবে এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হতে হবে সিরিয়া বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর আবাসস্থল, কাজেই চলমান সিরীয় সংকটের রাজনৈতিক সমাধান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কার্যকরী প্রতিনিধিত্বমূলক স্থানীয় কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা দরকার
আমাদের সর্বশেষ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের পর, কুর্দি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাসমূহে তুরস্ক স্থানীয় সরকার কাউন্সিল সমূহে কুর্দিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে, যাতে স্থানীয় সরকারে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়
সিরীয় শরণার্থীরা এখন তাদের দেশে ফিরতে চায় তারা প্রচুর কষ্ট ভোগ করেছে স্বদেশপ্রত্যাবর্তনকারী মিলিয়ন মিলিয়ন শরণার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় শান্তিপূর্ণ অবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছি প্রচলিত ধারণার বিপরীতে আমাদের অভিযান সমস্যার মানবিক দিক চিহ্নিত করতে সহযোগিতা করবে, ঐক্য পুনরুদ্ধার করতে অবদান রাখবে এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করবে
––––––––––––––––––––––––––––––
লেখক তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মূল নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে Why Turkey Took the Fight to Syria শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে ভাষান্তর কর্তৃক নিবন্ধটি অনূদিত, এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে ছবি সংগৃহীত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.