Articles by "প্রজেক্ট সিন্ডিকেট"

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান



সামি মাহরূম, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
গত তিন বছর ধরে বিশ্ববাসী বিস্ময়ের সাথে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরুনোর দিনক্ষণ গণনা দেখে আসছে। প্রচলিত ভাষায় যেটাকে বলা হয় ব্রেক্সিট। ইইউ থেকে বেরিয়ে আসলে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার কথা। তবু, একজন আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিষয়টি দেখা হয়, তাহলে বলা যায় যে, যুক্তরাজ্যের এই প্রলম্বিত ব্রেক্সিট বিতর্ক আসলে ভেঙে পড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার চিহ্ন নয়। বরং উল্টো বলতে হয় যে, যুক্তরাজ্যের মত রাজনৈতিক পরিপক্কতাসম্পন্ন একটি দেশই কেবল এরকম বড় ধরনের আইনি, ব্যবসায়িক এমনকি গত অর্ধ শতাব্দি ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্কের ফাটলজনিত ধকল সহ্য করতে পারে।
অন্যদিকে, আরব বিশ্ব ১৯৪৮ সালের পর থেকে ব্রেক্সিটের মত অন্তত একটি ঘটনার সাক্ষী হয়েছে, এবং সেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ফাটল আর কখনোই ঠিক হবে বলে মনে হয় না। এ ধরনের ঘটনার প্রথম পর্ব হলো ইসরায়েলের আত্মপ্রকাশ, এবং এর ফলে সে ভূমিতে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রটি গড়ে উঠে, নিজেদের সেই ভূখণ্ড থেকে “ফিলিস্তিনি ব্রেক্সিট”। এতো ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক ফিলিস্তিন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে, আর এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর নিয়তি হয়ে পগে দশকের পর দশক শরণার্থী শিবিরে বসবাস করা। পুরো আরব অর্থনীতি স্থিমিত হয়ে পড়লো, এবং ইসরায়েলকে তার আরব প্রতিবেশীরা বয়কট করলো।
তারপর ১৯৫২ থেকে সত্তুর অবধি জামাল আব্দেল নাসেরের নেতৃত্বে মিসর অর্থনীতির জাতীয়করণে মনযোগ দেয়, সেসময় তারা আমদানির বদলে দেশীয় পণ্যের ব্যবহারে যথাসাধ্য গুরুত্বারোপ করে, ফলে এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে দেশটির বাণিজ্যিক সম্পর্ক দূর্বল হয়ে পড়ে। এরপর আব্দেল নাসেরের উত্তরসূরী আনোয়ার সাদাত যখন ১৯৭৯ সালে ইসরায়েলের সাথে শান্তিচুক্তি রচনা সাক্ষর করলেন, তখন আরব দেশগুলো শাস্তিস্বরূপ মিসরের উপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবরোধ আরোপ করে।
একই সময়ে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া এবং আলজেরিয়া সহ আরও বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় আরব রাষ্ট্র সোভিয়েত অর্থনৈতিক মডেল দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বেসরকারী খাতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫ টি প্রজাতন্ত্রের সোভিয়েত প্রভাবিত আরব রাষ্ট্রগুলো কিন্তু নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চালু রাখেনি, বরং ইরাক এবং সিরিয়ার মতো কয়েকটি রাষ্ট্র উল্টা একে অপরের উপর অবরোধ আরোপ  করলো।
আরব বিশ্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি তখনো ভেঙেও পড়েনি, আবার পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণও হতে পারেনি। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে ভূরাজনীতি এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে আরো বড় ক্ষতির সম্মুখীন করলো। ১৯৯০ সালে ইরাকি সৈন্যরা কুয়েতে আক্রমণ করে দেশটি দখল করে ফেলে, আরববিশ্বের এর ফলে সবচেয়ে গতিশীল অর্থনীতির দেশটি তাদের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে বসলো। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইরাক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়লো, এবং এই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী কুয়েতের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিল।  এবং অবশ্যই, সেই ধারাবাহিকতার ফলেই, ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট ইরাকে আক্রমণ করে দখল করে, যে সিদ্ধান্তটি এ অঞ্চলের শৃঙ্খলাকে চুড়ান্ত অশান্তিতে নিমজ্জিত করে, এবং আজ অবধি যার প্রভাব এ অঞ্চলে বিদ্যমান।
২০১০ থেকে ২০১৬ সালের আরব বসন্ত চলাকালে এ অঞ্চল আরেকটি উত্তেজনাপূর্ণ ব্রেক্সিটের মতো ঘটনার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এসময় বিভিন্ন দেশ (তিউনিসিয়া, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন, এবং, ঘটনাক্রমে ইরাকও) বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্তি চায়, যে ব্যবস্থা হয়তো অবৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে। এদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আলজেরিয়-মরক্কো সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে পড়ে, কাতারের সাথে কয়েকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ইরান অর্থনৈতিকভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে।
আরব “ব্রেক্সিটে আগমণ ঘটে ছোটখাট সতর্কবার্তা, আলোচনা-সংলাপ, সংসদীয় আলোচনা বা সংবাদ মাধ্যমের বিতর্কে মাধ্যমে, এবং সাধারণত কয়েক দশক ধরে সেটা চলমান থাকে। কিন্তু “স্ব-আরোপিত” এসকল অর্থনৈতিক দুর্যোগের ফলাফল্খেন স্পষ্টতই বেদনাদায়ক।
প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন আরব দেশে রাস্তায় বিক্ষোভ, অবরোধ এবং সহিংসতা থেকে মনে হয় যে হিসাব-নিকাশ মেলানোর চুড়ান্ত মুহূর্ত বোধ এসে গেছেএই বিশৃঙ্খলা নিয়ে আসতে পারে দোসরা আরব বসন্ত, আশা করি, এবারের আরব বসন্ত ক্ষমতার চেয়ে সমৃদ্ধির উপর বেশি গুরুত্বারোপ করবে
––––––––––––––––––––––––––––
লেখক সামি মাহরূম ফ্রি ইউনিভার্সিটি অফ ব্রাসেলসের অধ্যাপক। এই লেখাটি The Arab World Needs a Brexit Debate শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষিপ্তরূপে অনূদিত, এবং সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে ছবিটি সংগৃহীত।




ড্যানি রডরিক, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
মোহাম্মদ হানিফের রাঙা পাখি (Red Birds) উপন্যাসে এক মার্কিন বোমারু বিমান আরবের কোন এক মরুভূমিতে বিধ্বস্ত হয় বিমানটির পাইলট বিপদে পড়ে আশ্রয় নিলেন স্থানীয় একটি শরণার্থী শিবিরে। তো, তিনি স্থানীয় এক দোকানদারের সাথে চোরদের নিয়ে গল্প করছিলেন, গল্পের এক পর্যায়ে বললেন, আমাদের সরকার হলো সবচেয়ে বড় চোর। এই চোর জীবীতদের নিকট থেকেও চুরি করে, আবার মৃতদের নিকট থেকেও চুরি করে। একথা শুনে দোকানদার বললেন, আল্লাহর শুকরিয়া। আমাদের এখানে এই সমস্যাটা নাই। আমরা কেবল একে অপরের জিনিসপত্র চুরি করি।
এই ছোট্ট গল্পটিতে ড্যারন আচেমোগ্লু ও জেমস রবিনসনের নয়া কেতাব The Narrow Corridor: States, Societies, and the Fate of Libertyএর সংক্ষিপ্তসার ফুটে ওঠেছে। আচেমোগ্লু ও রবিনসনের তত্ত্ব হলো স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির সম্ভাবতনা যেন রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আর আইনহীনতা ও সহিংসতার মধ্যে ভারসাম্যের করাতের দাঁতের মাঝখানে পড়ে আছে, যা প্রায়শ সমাজ নিজেই নিজের উপর আরোপ করে। রাষ্ট্রকে সমাজের উপর অতিমাত্রায় ক্ষমতা প্রদান করলে রাষ্ট্র স্বৈরচারী হয়ে পড়ে, আবার রাষ্ট্রকে দূর্বল করে রাখলে সে রাষ্ট্রে নৈরাজ্য দেখা দেয়।
বইটির শিরোনম থেকেই ইশারা পাওয়া যায়, এই দুই নৈরাজ্যকর অবস্থার মাঝখানে আছে কেবল একটি সরু গলি। এই সংকীর্ণ পথটি খোঁজে পেতে সক্ষম হয়েছে হাতে গোণা কয়েকটি রাষ্ট্র, এর মধ্যে বেশির ভাগই হলো পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশ। তাছাড়া পথটি খোছজে পাওয়া মানেই এই পথের উপর অটল থাকতে পারা নয়। (অনেক দেশ পথ খোঁজে পেয়ে আবার হারিয়ে ফেলে।-অনুবাদক) আচেমোগ্লু এবং রবিনসন যে বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করেছেন তা হলো নাগরিক সমাজ যদি সদা সচেতন না থাকে এবং সম্ভাব্য স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম না হয়, তাহলে সবসময় স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
আচেমোগ্লু ও রবিনসন নতুন বইটি মূলত তাদের পূর্ববর্তী বহুল আলোচিত Why Nations Fail বইটির উপর ভিত্তি করে লিখেছেন। ঐ বইটি এবং তাদের অন্য বিভিন্ন লেখায় তারা স্পষ্ট করেছেন যে তারা কেন মনে করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহ” (inclusive institutions)ই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি। এসকল প্রতিষ্ঠান (উদাহরণস্বরূপ সম্পত্তির অধিকারের নিশ্চয়তা এবং আইনের শাসন ইত্যাদি।) সকল (অথবা বেশির ভাগ) নাগরিকের নিকট সহজলভ্য হতে হবে, এবং এগুলো কোন বাছাইকৃত ছোট একটি গোষ্ঠীকে সমাজের অপরাপর সদস্যদের উপর কোন ধরনের প্রাধান্য দিতে পারবে না।
একটি দেশ অবশ্য ইতোমধ্যে এই দুই পণ্ডিতের তত্ত্বটিকে কিছুটা সমস্যায় ফেলে দিয়েছে, সেই দেশটি হলো চীন। কারণ সেখানে কম্যুনিস্ট পার্টি অব চীনের রয়েছে একচেটিয়া রাজনৈতিক আধিপত্য, রয়েছে প্রচণ্ড রকমের দুর্নীতি, পার্টির অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীরা সেখানে ব্যাপক হারে নিপীড়িত হয়ে থাকেন, এক কথায় চীনে অন্তর্ভুক্তিমুলক প্রতিষ্ঠানের কোন বালাই নেই বললেই চলে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এটি অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে গত চল্লিশ বছরে চীন অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি হাসিল করেছে, ইতিহাসে রেকর্ড পরিমাণে দারিদ্র্য বিমোচন করতে সক্ষম হয়েছে।
Why Nations Fail গ্রন্থে আচেমোগ্লু ও রবিনসন দাবি করেছেন, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহের পথ ছেড়ে না দেয়, তাহলে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি গতি হারিয়ে ফেলবে।
দ্য নিউ করিডোর বইয়ে তারা তাদের এ মতটিকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করেছেন। তারা চীনকে চিহ্নিত করেছেন এমন একটি দেশ হিসেবে, যেখানে কিনা প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে রাষ্ট্র সমাজকে কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ করছে। সরু গলিপথের বাইরে এতো বেশি দিন কাটানোর ফলে এখন এই গলিপথে ফিরে আসাটা তাদের জন্যে বেশ কঠিন। ফলে রাজনৈতিক সংস্কার কিংবা ধারাবাহিক অব্যাহত অর্থনৈতিক অগ্রগতি, কোনটার সম্ভাবনাই খুব একটা নেই।
––––––––––––––––––––––––––––––
নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক আংশিক অনূদিত, সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে ছবি সংগৃহীত। লেখক ড্যানি রডরিক হার্ভার্ডের জন এফ, কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক। প্রচেক্ট সিন্ডিকেটে এটি Democracy on a Knife-Edge শিরোনামে প্রকাশিত।



জাসমিন এম. এল গামাল, প্রজেক্টি সিন্ডিকেট:
ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে বহুপাক্ষিক ঐক্যের চর্চা হয় প্রধানত দুইটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এদের একটা হচ্ছে আরব লীগ, যা আরব বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি বড় জোট। আরেক প্রতিষ্ঠান হলো গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি), যা মুখ্যত অর্থনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়েই কাজ করে। এ দুটি সংস্থার ইতিহাস, গুরুত্বের জায়গা ও সদস্যপদ এসব জায়গায় অনেক পার্থক্য আছে ঠিকই, তবে দুটি সংস্থাই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আরব বিশ্বের ঐক্যবদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ ইসরায়েলের বিরোধিতার মতো ইস্যুর কথা বলা যেতে পারে।
গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত আরব দেশগুলোকে একটি সাধারণ অবস্থানে নিয়ে এসেছিল, তারা সকলেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় থেকে আরব দেশগুলোর সামনে তিনটি বিরোধপূর্ণ বিষয় চলে এসেছে, এগুলো হলো- ক. ইরানভীতি; খ. আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান; এবং গ. রাজনৈতিক ইসলামের (কিংবা ইসলামিজমের) উত্থান।
এই বিষয়গুলোর উত্থান আরব বিশ্বের ঐতিহ্যগত জোটগুলোকে ছিন্ন করে ফেলেছে, এবং এ অঞ্চলের বহুপাক্ষিক সহযোগিতামূলক পরিস্থিতি একেবারে শিথিল করে ফেলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের, কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে যুক্তরাষ্টের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
প্রথমত, সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও সক্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গুরুতর হুমকি বলে মনে করে। একদিকে সৌদি-আমিরাত, আরেক দিকে ইরান এরকম একটা ক্রমবর্ধমান শত্রুতা উভয়পক্ষের ঐতিহ্যগত বিরোধী শক্তি ইসরায়েলের বিরোধিতাকে ভালোই ধাক্কা দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অনেকগুলো আরব সরকার ইসরায়েলের সাথে অভূতপূর্ব সম্পর্ত জোরদার করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র ইরানের হুমকি প্রতিহত করার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে আরব-ইসরায়েল এই সহযোগিতামূলক কার্যক্রম চলছিলো পর্দার আড়ালে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ইরান বিরোধী” ওয়ার্সাও সম্মেলনে এই কার্যক্রম হঠাৎ জনম্মুখে চলে আসে, বরং বলা চলে বিস্ফোরিত হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু এই সম্মেলনে আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে সম্মেলনের প্রশংসা করেন। এই সম্পর্ক দিনে দিনে আরো শক্ত হতে থাকবে, কেননা সৌদি এবং ইরানের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং প্রক্সি যুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থান এখনো চলমান আছে।
দ্বিতীয়ত, সিরিয়া ও লিবিয়ায় সহিংস সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জিহাদি সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, মিসর, তিউনিসিয়া, জর্দান এবং আরো কয়েকটি দেশে বিভিন্ন হামলায় জিহাদিরা জড়িয়ে পড়ে, এবং এর ফলে আরব লীগের দেশসমূহ একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লিবিয়ার তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফী ২০১১ সালের শুরুর দিকে একটি জনপ্রিয় আন্দোলন দমন করেছিলেন, তখন আরব লীগ লিবিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করে, এবং পরবর্তীতে ঐ বছরই আরব লীগ সক্রিয়ভাবে ন্যাটো ও লিবিয়ান বিদ্রোহী কর্তৃক গাদ্দাফীর উচ্ছেদে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দেয়।
এরপরই, সিরীয় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসীদেরকে সক্রিয় করার পিছনে ভূমিকা রাখার জন্য অভিযুক্ত করা হলো, এবং সিরিয়াকে বহিষ্কার করা হলো। এখন সিরিয়ার সদস্যতার বিষয়ে আরবলীগ দ্বিধাবিভক্ত। অনেকগুলো সুন্নী রাষ্ট্র খুব কড়া বিরোধিতা করছে। তাদের কথা হলো, আসাদ ইরানকে এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করার এবং লেবাননের হেযবুল্লাহর মতো শিয়া মিলিশিয়াগুলোকে শক্তিশালী করার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা তাদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য ইরাকি ও তিউনিসিয়ান সরকার সিরিয়াকে পুনরায় লীগে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছে।
সবশেষে, আরব বসন্তের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান আঞ্চলিক বিভক্তিকে আরো জোরদার করেছে। ইসলামিস্টদের উত্থানের উদাহরণ হিসেবে মিসর ও তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোতে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়ের কথা বলা যেতে পারে। ইসলামপন্থীদের উত্থানের ভয়ে মিসর, সৌদি এবং আমিরাতি শাসকগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো সংগঠনগুলোর উত্থান ঠেকাতে সমন্বিত ও নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো, ২০১৩তে মিসরের প্রথম  নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসিকে সেনাবাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা, যিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন। আরব দেশগুলো মুরসিকে উচ্ছেদ করার বিষয়েও বিভক্ত ছিল, সৌদি-আমিরাত জোট এর সমর্থনে থাকলেও কাতার প্রবল বিরোধিতা করেছিল।
এই তিনটি বিষয় যে শুধু আরবলীগকে ধ্বংস করেছে, তা নয়, বরং অর্থনৈতিক জোট জিসিসিকেও শেষ করে দিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সৌদি, বাহরাইন, আমিরাত এবং জিসিসির বাইরের মিসর ২০১৭ সাল থেকে কাতারের উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। তাদের অভিযোগ, কাতার সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছে এবং তার রাজধানী দোহাকে এ অঞ্চলের বিতাড়িত ইসলামিস্টদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতারের ঘনিষ্ট সম্পর্কও আঞ্চলিক উত্তেজনার আরেক কারণ।
কাকতালীয়ভাবে, আরবের ঐতিহ্যবাহী বহুপাক্ষিক সম্পর্কের পতনের সাথে সাথে ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিও পরিবর্তিত হয়েছে। ট্রাম্পের পূর্বসূরী বারাক ওবামা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক ও জোট গঠনে গুরুত্ব দিতেন, যার কারণে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি ও লিবিয়াতে ন্যাটোর নেতৃত্বে সামরিকস অভিযান সম্ভব হয়েছিল। ঠিক তার বিপরীতে, ট্রাম্প বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর নেতিবাচক মনোভাব নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করছেন এবং সমমনা অংশীদারদে সাথে (এবং একইভাবে শত্রুদের সাথেও) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এছাড়াও তার প্রবল ইরান বিরোধী অবস্থানের দরুণ যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে পুরোপুরি ইরান বিরোধী ব্লকের সদস্যতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই হাবভাবের দরুণ আরব সরকারসমূহ আরব লীগ এবং জিসিসির মাধ্যমে বিস্তৃত সহযোগিতামূলক জোট না করে বিশেষ বিশেষ আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে নিজেদের মূল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপেক্ষাকৃত সংকোচিত পরিমণ্ডলে সহযোগিতামূলক জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে ফেলছে। আরব ঐক্যের ক্ষীণ সম্ভাবনা আরো ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে।
________________________________

প্রবন্ধটি Is Arab Unity Dead? শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




আনাতোল কালেৎস্কি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
দীর্ঘ দিন থেকে চলে আসা যুক্তরাজ্য বনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার ট্রাজেকমেডি অবশেষ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে। ব্রেক্সিটের সময়সীমা হলো অক্টোবরের ৩১ তারিখ, অথচ বরিস জনসন প্রায় এই সময়সীমা পর্যন্তই সংসদ স্থগিত রাখার চাল চালিয়েছেন, সংসদের স্পিকার জন বের্কো এ বিষয়টিকে “ সাংবিধানিক তাণ্ডবলীলাবলে আখ্যায়িত করেছেন, যদিও এর একটা সুবিধাও আছে। এর ফলে ৬৫০ জন সংসদ সদস্যের সামনে এখন বাছাই করার মত মাত্র দুটো পথ রয়েছে। হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদ সেপ্টেম্বরের পয়লা সপ্তাহে বরিসের বদলে নতুন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভোট দেবেন, অন্যথায় তাকে তার প্রতিশ্রুতি অনুসারে “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমতা দিয়ে দিতে হবে, যা কিনা ব্রিটেনকে ইইউর সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থানে নিয়ে যাবে। দোসরা পথ বেছে নিলে এটি আবার ইইউর ভবিষ্যতের উপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।  
তো, এখন কী হবে? সেপ্টেম্বরের পয়লা সপ্তাহে সাংসদরা যখন গ্রীষ্মকালীন অবকাশযাপন শেষে ফিরবেন, বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি কর্বিন নিশ্চয়ই জনসনকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করবেন। কারণ জনসনের রক্ষণশীল এবং নর্দার্ন আইরিশ ডেমক্র্যাটিক ইউনিয়নিস্ট দল হাউজ অব কমন্সে মাত্র একটি ভোটে সমন্বিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এবং টরি পার্টির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের বিরোধী হওয়ার কারণে জনসনের হেরে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু জনসনকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট নয়। ২০১১ সালের স্থায়ী সংসদীয় আইন অনুসারে, কোন প্রধানমন্ত্রী যদি অনাস্থা ভোটে হেরে যান, তাহলে হয়তো সংসদকে অবশ্যই পরবর্তী ১৪ দিনের মধ্যে তার বদলে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিতে হবে, অন্যথায় পরাজিত সরকারই থাকবে, এবং এই সরকার পরবর্তী তিনমাসের মধ্যে তাদের সুবিধামাফিক সময়ে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করবে। তিন মাস সময় জনসনের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে “মরি, বাঁচি, ব্রেক্সিট” প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট। এই পরিণতি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন, যেহেতু সংসদ স্থগিত হতে যাচ্ছে, তাই এ কাজটি করতে হবে ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই।
বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে কর্বিন ইতোমধ্যে নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রস্তাব করেছেন; তিনি কেবলমাত্র দু’টি কাজ করার সীমাবদ্ধতাসহ সমর্থন চাচ্ছেন: ব্রেক্সিটের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং এরপর যথাশিগগিরই সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন। কিন্তু ইইউপন্থী অনেক টরি দলীয় সদস্য কর্বিনের তীব্র বিরোধীতা করছেন, তাই তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলনামুলক কম পক্ষপাতি কেউ প্রার্থী হতে পারেন, যার কোন ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। এক্ষেত্রে সাবেক টরি দলের চ্যান্সেলর কেনেথ ক্লার্ক প্রার্থী হতে পারেন, যিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সাংসদ থাকার কারণে “ফাদার অব দ্য হাউজ” হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে থাকেন, কিংবা ২০১৫ সালে অন্তবর্তীকালীন লেবার নেতা হিসেবে দায়িত্বপালনকারী হ্যারিয়েট হার্মানও হতে পারেন।
অথবা কর্বিনকে পাশে সরিয়ে রাখার জন্য সম্ভবত সাবেক লেবার পার্টির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গারেট বেকেটিই সবচেয়ে পছন্দের প্রার্থী হতে পারেন। সর্বোপরি বেকেট সেই ৩৬ জন সাংসদের মধ্যকার একজন, যারা কর্বিনকে লেবার দলীয় নেতা নির্বাচনের জন্য পিটিশন সাক্ষর করেছিলেন। তাঁর সমর্থন ব্যতীত কর্বিন আজ যেখানে আছেন, সেখানে পৌছাতে পারতেন না। কাজেই বেকেটকে সমর্থন করার বিষয়টি কর্বিন তাঁর সমর্থকদেরকে সহজে বুঝাতে পারবেন, যিনি আবার চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটবিরোধী টরি দলীয় সাংসদদের সমর্থন সহজে পেতে পারবেন। যাই হোক, জনসনকে এভাবে পদচ্যুত করতে পরলে, অক্টোবরের শেষ দিকে কিংবা নভেম্বরে ভোটের আয়োজন করা সম্ভব হবে, এবং সে সময় পর্যন্ত ইউনিয়নে থাকতে হবে। (ইউরোপীয় নেতারা বারবার বলছেন যে, পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ব্রেক্সিটের সময়সীমা বৃদ্ধি করা যেতে পারে।)
জনসনের “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের পক্ষে এবং বিপক্ষে রক্ষণশীলরা গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে। এদিকে বিরোধীদলগুলো সম্ভবত তাদের সাময়িক সহযোগিতামূলক ভাব থেকে কিছু রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করবে। এর ফলাফল হতে পারে “ঝুলন্ত সংসদ”, কোন দলই হয়তো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না। যাইহোক, এবার বোধ হয় লেবার, লিবারেল ডেমক্র্যাটস এবং স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি ভালোই প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করবে এবং সম্ভবত সকলে মিলে একটি চুড়ান্ত গণভোটের আয়োজন করতে হবে, ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া আর এগুবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
অন্যদিকে সাংসদরা যদি নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করতে ব্যর্থ হয়ে পড়েন, তাহলে সংসদ সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ থেকে স্থগিত হবে এবং জনসনের পছন্দসই ব্রেক্সিটে আর কোন বাধাই থাকবে না, “চুক্তিসহ কিংবা চুক্তি ছাড়া” যেভাবেই হোক, ব্রেক্সিট হবেই।
জনসন মনে করেন, সংসদ স্থগিত করার মাধ্যমে তিনি নয়া করে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে যে অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছেন, এর ফলে পূর্বসুরী থেরেসা মে’র ব্যর্থ প্রত্যাহার চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দরকষাকষির ক্ষেত্রে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কতিপয় ইউরোপীয় নেতা সম্ভবত আশা করছিলেন, চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের ঝুঁকি নিতে সংসদ রাজি হবে না, এবং এটি প্রতিরোধ করতে সংসদ হস্তক্ষেপ করবে। এই সম্ভাবনা এখন আর নেই বললেই চলে। এই প্রেক্ষাপটে ইইউ চাইলে জনসনকে এরকম একটা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিতে পারে, যাতে ব্রিটেন এবং ইইউর মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কের বাধা দূর করার জন্য “আইরিশ ব্যাকস্টপ” বিধান প্রত্যাহার করা যেতে পারে, যাতে করে উত্তর আয়ারল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের মধ্যে উম্মুক্ত সীমান্ত অনুমোদন করে নতুন স্থায়ী বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আপাতত বাণিজ্য চলতে পারে।
জনসন হয়তো ঠিকই আছেন। চুক্তিবিহীন ব্রেক্সিটের ফলে ব্রিটেন যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হবে, ইইউও তেমনি চরম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কারণ যুক্তরাজ্য ইউরোপ মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার।
বিশেষত এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন একটি বাণিজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে আছে, জার্মানি গাড়ি বিক্রিতে ধ্বস নামার ফলে অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে, ফ্রান্স নাগরিক বিক্ষোভের কারণে উদ্বিগ্ন এবং ইতালি প্রকাশ্যে ইইউর নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে, এরকম একটি পরিস্থিতিতে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম খদ্দেরের সাথে সম্পর্কের ফাঁটেলের ঝুঁকিটা বেশ বিজ্জনকই হতে পারে।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will Boris Johnsons Political Coup Succeed? শিরোনামে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


মার্ক লিওনার্ড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ফ্রান্সের বিয়ারিতজ শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সবার আগ্রহের বিষয় ছিল, কার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় বিঘ্নতা আসছে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের, নাকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পক্ষ থেকে? যদিও সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এমন একজন, যার উপস্থিতিই আদতে প্রত্যাশিত ছিল না, তিনি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।
যদিও এই সম্মেলনে গণমাধ্যমের চোখ ছিল বাণিজ্য যুদ্ধ, আমাজনের আগুন এবং বিপজ্জনক “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের উপর, তবে সবচেয়ে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে সম্ভবত ইরানের বিষয়ে। ইরানের সাথে হওয়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ভাগ্য দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে কিনা সেটা যেমন নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি পশ্চিমা রাজনৈতিক জোট টিকে থাকবে কিনা, তাও নির্ধারণ করতে পারে।
বিয়ারিতজে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতা নিরসনের উদ্যোগের সূচনা করেছেন। এবং সাম্প্রতিক দিনগুলিতে ইরান নাটকের মূল খেলোয়াড়রা সকলেই পিছনের দিকে ফিরছেন। যুক্তরাজ্য জিব্রাল্টার থেকে আটককৃত ইরানের ট্যাংকার (গ্রেস ১) ছেড়ে দিয়েছে। এবং, আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাহেব ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রোহানির সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, এমনকি তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের স্বল্পমেয়াদি “লাইন অব ক্রেডিট অথবা লোন” পাওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি করবেন না।
তবু অনেকগুলো বিষয় উত্তেজনা নিরসনের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। প্রথমেই, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো মনে করে যে ইরানের (এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের) উপর যত বেশি চাপ প্রয়োগ করা হবে, ততই ভালো হবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে চান, এবং তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় সহযোগিতার পথ বন্ধ করার মাধ্যমেই এটি করতে হবে। তিনি এবং অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সাথে ইউরোপের ঐক্য নষ্ট করতে সব উপায় অবলম্বন করবেন, এবং স্পষ্টতই তারা সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করবেন যুক্তরাজ্যের উপর। আরো জঘন্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কেউ এবং মধ্যপ্রাচ্যেরও কেউ কেউ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরানকে সামরিক বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য ফাঁদ বানাতে চায়।
ইরানি কট্টরপন্থীদের নিয়েও সমস্যা আছে। তাদের অনেকেই মনে করেন, পারমাণবিক চুক্তি থেকে তারা কিছু্ই পাননি, এবং তাদের মতে উদ্দেশ্য সাধনের উপায়টিই বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ইরানি নেতারাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বিরোধী কাজে উৎসাহী হয়ে পড়েছে, শুধু যে হরমুজে ব্রিটিশ ট্যাংকার দখল করেছে, সেটিই্ এ ধরনের একমাত্র কাজ নয়। (ইউরোপে ইরানেরও পছন্দের ক্ষেত্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেরই মতো।)
ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাব ইসরায়েলেরও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে, যার ফলে ইরাকে তারা ইরানের সম্পত্তিসমূহকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। (ইতিমধ্যে সিরিয়ায় ইরানি বাহিনীর উপর হামলা শুরু করে দিয়েছে।)
বোধগম্য কারণেই ইরান ইনসটেক্স উদ্বোধনে ইউরোপের ধীর গতির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে। ইনসটেক্স মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপ-ইরান বাণিজ্য সম্ভব করে তোলার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু ইরানের যারা দাবি করছেন যে, তারা ইউরোপ থেকে কিছুই পাননি, তারা একেবারেই ভুল দাবি করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের বর্তমান অবস্থান পরিত্যাগ করে ইরানকে চেপে ধরার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিত, তাহলে তারা পার্থক্যটা স্পষ্টতই বুঝতে পারতেন। আসলে তীব্রতাবৃদ্ধির নীতি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ইরান নৈতিক উচ্চ অবস্থান হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, একই ভাবে তারা সেই সকল ইউরোপীয়দের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতি থেকে ভিন্ন ইরান নীতি মানতে চাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে পাত্তা না দিয়ে চুক্তির বিষয়ে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপ যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা অনেককে বিস্মিত করেছে। এমনকি বলতে গেলে ব্রিটিশ সরকারও ইইউর সাথেই আছে এ বিষয়ে। কিন্তু এটা পরিবর্তন হতে পারে। ইরান যদি ব্রিটেনের আরেকটি জাহাজ আটক করে, এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে, তাহলে এর ফলে জনসন ইইউ’র সঙ্গত্যাগ করে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিতে পারে।
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও হতাশার বিষয় হলো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য পারস্য উপসাগরে একটি যৌথ ইউরোপীয় মিশন চালু করতে পারেনি, যাতে তাদের যে কারো উপর আক্রমণ হলে সেটি সকলের উপর আক্রমণ বলে গণ্য হতে পারে। যুক্তরাজ্য যদি ইরান ইস্যুতে ইইউ’র পথ থেকে সরে যায়, তাহলে পরবর্তী কট্টরপন্থীদের (ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশেরই) লক্ষ্যবস্তু হবে জার্মানকে সরানো। একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সেখানে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
এসকল ঝুঁকি ভালো মতন মোকাবেলা করার জন্যে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, ইরান যদি আরেকবার তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম হ্রাস করার মাধ্যমে চুক্তিতে আসতে রাজি হয় এবং পাশ্চাত্যের সাথে আলোচনার দুয়ার খোলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প যেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ... ... এই ক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প আমেরিকার অনন্তকালব্যাপী এবং বিদেশে অযৌক্তিক অভিযানসমূহ যুদ্ধসমূহ সমাপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ইউরোপীয়দেরকেও অবশ্যই ইরানকে বুঝাতে হবে, যেন সে নিজের ক্ষমতাকে অতিমাত্রায় বড় করে না দেখে। একটি নতুন ক্রেডিট লাইনের বিষয়ে ম্যাক্রোঁর প্রস্তাব হয়তো ইরানের মধ্যপন্থীদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু ইউরোপীয়রা যদি ইনসটেক্স চালু করতে এবং চালাতে সক্ষম না হয়, তবে ইরানিদের নিকট তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ হয়ে যাবে। সর্বাবস্থায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অবধি ইরানকে নীরব থাকতে উৎসাহিত করা। ইউরোপেরে উচিত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা, তবে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে, যে ইউরোপীয় স্বার্থে ইরান যদি আর কোন আক্রমণ করে, তাহলে ইইউ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিয়ন্ত্রণ কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে।
সর্বোপরি, পারস্য উপসাগরে ইউরোপের তীক্ষ্ম নজরদারি রাখা দরকার। এমনকি তারা যদি যুক্ত নৌশক্তি সংগঠিত নাও করে, তাদের উচিত হবে উত্তেজনা হ্রাসে কাজ করা, যদি যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইরান কোন সম্মুখ দ্বন্দ্বের জন্য প্ররোচিত করতে চায়। ইরানকে সাথে নিয়ে নৌ-মহড়ার আয়োজন করা এক্ষেত্রে চমৎকার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কৌশল মাথায় রেখেই সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন ম্যাক্রোঁ। কৌশলটি সফল হলে ট্রাম্পের আমলে বিয়ারিতজ সম্মেলনই হবে প্রথম সফল জি৭ সম্মেলন। (সেটা ট্রাম্প জানুন কিংবা নাই জানুন।)

________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will the Iran Conflict Break the West? শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক মার্ক লিওনার্ড বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের পরিচালক। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




রমেশ ঠাকুর, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোপূর্বে বিশেষ মর্যাদার আওতায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চল একটা মাত্রার স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো। এর বদলে এখন কাশ্মীরকে দুটো ইউনিয়ন টেরিটরিতে (মর্যাদার দিক থেকে রাজ্যের নিচে অবস্থান) বিভক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি শাসন করবে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার আওতায় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার ফলে সাত দশক আগে কাশ্মীরের ভারতে যোগদান সহজতর হয়েছিল। কাশ্মীর নামক এই অঞ্চলের উপর ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানও নিজেদের অধিকার দাবি করে। এরকম একটি অঞ্চলের সাথে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতাবস্থাকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
মোদী সরকার খুব ভালো করেই জানে যে তাদের এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীর কিংবা পাকিস্তানে ভালোভাবে নেওয়া হবে না। কাজেই এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগের দিন কাশ্মীরে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।  ঘোষণার পর  মোদী সরকার এ অঞ্চলের জনগণের উপর কারফিউ জারি করে, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদেরকে বের করে দেয়, জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাদেরকে গৃহবন্দী করে, মিডিয়া ও টেলিকম বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু, ভারতীয় বিরোধী দলসমূহের সদস্যদের স্বীকৃতি অনুসারে, কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মোদী সরকারের ক্ষমতা একেবারেই সীমাবদ্ধ, কারণ এসকল কাশ্মীরি দশকের পর দশক ধরে সহিংসতা সহ্য করে আসছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, পাকিস্তান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি আখ্যায়িত করে প্রত্যখ্যান করেছে, এবং “সকল সম্ভাব্য উপায়ে” প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এর ফলে প্রতিবেশী দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে আবারও সামরিক সঙ্ঘাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যু এতোটা একগুয়ে হওয়ার এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত সম্ভবত কাজ না করার পিছনে তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ পরিচিতির সাথে সম্পৃক্ত। কাশ্মীর ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের অসম্পূর্ণ কাজের প্রতিনিধিত্ব করে, যে বিভক্তির ফলে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। একদিকে, ভারতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের অস্তিত্ব উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বদেশ হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল যৌক্তিকতার সাথে বিরোধপূর্ণ। অন্যদিকে ভারত একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি হারিয়ে ফেললে তার সেক্যুলার পরিচিতি হুমকির মধ্যে পড়বে, এবং ১৮০ মিলিয়ন মুসলমানের অবস্থান নিয়ে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
কাশ্মীর এসকল দ্বন্দ্বের যোগসূত্রে অবস্থান করছে। কারণ অন্যান্য প্রিন্সলি স্টেটের মতোই, কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু তখন ভারতের সাথে একীভূত হয়ে যায় নি। ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার সময় কাশ্মীর প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে ভারতের সংবিধানে সংযুক্ত ৩৫এ ধারার অধীনে কাশ্মীরের নাগরিকগণ আরো কিছু অতিরিক্ত বিশেষ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন, এর মধ্যে সম্পত্তির মালিকানা ও সরকারি চাকরি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ছিল।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের ছোটখাট ঝামেলা বাধানোর ইচ্ছা আছে, অন্ততপক্ষে ভবিষ্যতে হলেও। তবে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ হলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কেও পাকিস্তান সচেতন রয়েছে। ভারত জানে যে, হয়তো যুদ্ধের ময়দানে পাকিস্তানকে হারাতে পারবে, কিন্তু পরবর্তীতে সীমান্তে আক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানোর  মতো যথেষ্ট ক্ষমতা তার নেই। এই সামরিক ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবেই চুড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি করে রেখেছে।
সর্বশেষ কারণ, ভারত কার্যত নিজের তৈরি নীতি নির্ধারণী ফাঁদে পড়ে গেছে। ভারতীয় ভোটারদের নিকট তাদের সরকার দাবি করছে যে, আসলে কোন ঝামেলাই নেই। সরকারের দাবি, কাশ্মীর ভারতের অখণ্ড অংশ, তারা এ বিষয়ে বেশ জোর দিয়েছে, তাই কোন আলোচনারই দরকার নাই।  
দুনিয়াবাসীর নিকট ভারতীয় নেতারা পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি আঙুল তুলছেন, বলছেন, পাকিস্তানের সমর্থনে বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠী ভারতে সন্ত্রাসী হামলা করছে, এবং এই ইস্যুতে আলোচনাকে আন্তর্জাতিকীকরণের  যে কোন প্রচেষ্টাকে তারা প্রত্যাখ্যান করছেন। ৩৭০ বাতিলের ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প যখন কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করার কথা বলেছিলেন, মোদী সরাসরি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, বরাবরে মতো সেই পুরনো বুলি আউড়িয়ে বলেছেন, কাশ্মীর ইস্যুতে যে কোন আলোচনায় কেবল মাত্র ভারত এবং পাকিস্তানই সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, আর কেউ নয়।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত মূল লেখাটির শিরোনাম Indias Bad Bet in Kashmir। লেখক রমেশ ঠাকুর জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্রফোর্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির এমেরিটার অধ্যাপক। ভাষান্তর কর্তৃক নিবন্ধটির প্রথম  অংশ বাংলায় অনূদিত এবং সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত


নুরিয়েল রুবিনি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
কয়েক বছর আগে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে পশ্চিমা প্রতিনিধি দলের একজন হিসেবে চীনের রাষ্ট্রপতি জি জিনপিং সাথে দেখা করেছিলাম আমাদের সাথে কথা বলার সময় রাষ্ট্রপতি জি বুঝিয়ে বলতে চান যে চীনের উত্থান হবে শান্তিপূর্ণ, অন্য কোন রাষ্ট্রের বিশেষতযুক্তরাষ্ট্রেরথুসিডাইডিসের ফাঁদ(থুসিডাইডিস ট্র্যাপ) নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোন দরকার নাই থুসিডাইডিসের ফাঁদ এই পরিভাষাটি গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডিসের নামে নামকরণ করা হয়েছে, উদীয়মান অ্যাথেন্স নিয়ে স্পার্টার ভীতি কীভাবে উভয় নগর রাষ্ট্রকে অনিবার্য যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, সে ইতিহাস এই ঐতিহাসিক লিখে গেছেন মূলত সেখান থেকেই এই ধারণার উদ্ভব
উভয় পক্ষই থুসিডাইডিসের ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র যে কোনভাবে এই ফাঁদে পড়বে বলে মনে হচ্ছে যদিও উভয় পরাশক্তির মধ্যে গরম (প্রত্যক্ষ) যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে, ঠাণ্ডা যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি
চলমান উত্তেজনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনকে দোষারোপ করছে এদিকে চীন মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনের যে কোন ধরনের উত্থান ঠেকানো কোন পক্ষের যুক্তি শক্তিশালী, সে তর্কে না গিয়েও বলা যায় অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রযুক্তিগত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা খুব সম্ভব অবশ্যম্ভাবী বাণিজ্যযুদ্ধ রূপে যে উত্তেজনার সূচনা, সেটি স্থায়ী দ্বিপাক্ষিক শত্রুতায় রূপ নিতে পারে এর প্রতিফলন দেখা যায় ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে, যেখানে চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে, এবং সব ক্ষেত্রে চীনের মোকাবেলা করা দরকার বলে বিবেচনা করা হয়েছে
সে অনুসারে স্পর্শকাতর সেক্টরসমূহের চীনা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) উপর যুক্তরাষ্ট্র কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে, এবং কৌশলগত শিল্পসমূহ যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ৫জি ইত্যাদিতে পশ্চিমা কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার জন্য আরো অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ইউরেশিয়ান দেশসমূহে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চীন যে বিশাল প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেই বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে অংশগ্রহণ না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের উপর চাপ প্রয়োগ করছে সেই সাথে পূর্ব দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর টহল বৃদ্ধি পাচ্ছে, এদিকে বিতর্কিত অঞ্চলসমূহ দাবি করার ক্ষেত্রে চীন আরো বেশি আগ্রাসী হয়ে পড়ছে
চীন-মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধের বৈশ্বিক পরিণতি সোভিয়েত-মার্কিন ঠাণ্ডাযুদ্ধের তুলনায় আরো বেশি তীব্র হবে সোভিয়েত ছিল পতনশীল পরাশক্তি ব্যর্থ অর্থনৈতিক মডেলের দেশ, যেখানে চীন শিগগিরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে, এবং খুব সম্ভব অদূর ভবিষ্যতে তার উত্থান অব্যহত থাকবে তাছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য ছিল খুবই সীমিত পরিসরে, যেখানে চীন পুরোপুরিভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে জড়িত এবং বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত
ফলে পূর্ণমাত্রার ঠাণ্ডা যুদ্ধ নতুন মাত্রার বি-বিশ্বায়ন (ডিগ্লোবালাইজেশন) করতে পারে; অন্ততপক্ষে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুটি ব্লকে বিভক্ত করে ফেলবে বহুধা বিভক্ত এ পৃথিবীতে চীন যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই চাইবে অন্য সকল দেশ যেন যে কোন একটি পক্ষ গ্রহণ করে, কিন্তু সেসকল দেশের সরকার উভয় পক্ষের সাথে তাল মিলিয়ে ভালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করবে সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যতটা ব্যবসায় করছে, তার চেয়ে বেশি ব্যবসা (বাণিজ্য বিনিয়োগের দিক থেকে) করছে চীনের সাথে
যদিও ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্র উভয়দেশই কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা ৫জির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিসমূহ আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, ফলে সেখানে এরকম মাঝামাঝি অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে প্রত্যেক দেশকেই বেছে নিতে হবে দুটি পক্ষের যে কোন একটিকে, এবং এর মধ্য দিয়ে বিশ্ব হয়তো আবার বি-বিশ্বায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করবে
যাই হোক না কেন, এই শতাব্দির ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হবে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক একটা পর্যায় পর্যন্ত তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী কিন্তু আদর্শিক দিক থেকে উভয় পক্ষের উচিত হবে গঠনমূলকভাবে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা করা
যদি এই সম্পর্ক ভুলভাবে চলতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ উত্থানকে দমন করার চেষ্টা করে এবং চীন আগ্রাসীভাবে এশিয়া বিশ্বের অন্যত্র তার প্রভাব বিস্তার করে তাহলে একটি পূর্ণমাত্রা ঠাণ্ডাযুদ্ধ সংগঠিত হবে এবং একটি গরম যুদ্ধ (অথবা এক গাদা প্রক্সি যুদ্ধ) এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না হয় তো একবিংশ শতাব্দিতে থুসিডাইডিসের ফাঁদ শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর চীনকে নয়, বরং পুরো পৃথিবীকেই হয়তো গ্রাস করে ফেলবে
________________________________

লেখক: নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লিন্টনের আমলে এই ভদ্রলোক হোয়াইট হাউজে অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করতেন তাঁর লেখাThe Global Consequences of a Sino-American Cold Warশীর্ষক নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশ হয়েছে ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.