Articles by "ফিলিস্তিন"

ফিলিস্তিন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

 

boycott israel by palestine

হায়দার ঈদ, আল জাজিরা ইংরেজি:

গত নভেম্বরে ফিলিস্তিন স্বাধীনতা সংস্থা (পিএলও)’র নির্বাহী কমিটির মহাসচিব ও মুখ্য ফিলিস্তিনি আলোচক সাইব এরেকাত মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেক ফিলিস্তিনি তাঁর মৃত্যুকে ওসলো-যুগের সমাপ্তির রূপক হিসেবে দেখছেন।

এরেকাত এবং তাঁর প্রজন্মের আরো অনেক ফিলিস্তিনি রাজনীতিক কথিত দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁরা মনে করতেন ইসরায়েল এবং তাদের মার্কিন পৃষ্ঠপোষকদের সাথে চুক্তি করে ফিলিস্তিনের ঐতিহাসিক ভূমিতে ফিলিস্তিনিরা একদিন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন।

দশকের পর দশক ধরে অব্যহত ঔপনিবেশিকতা ও সর্বানাশা চুক্তির সাহায্যে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের এই বিভ্রম বা মোহকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল।

১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিডে ইসরায়েলের সাথে মিসর কর্তৃক সাক্ষরিত চুক্তি, ফিলিস্তিনিদের সাক্ষরিত ১৯৯৩ সালের ওসলো চুক্তি এবং জর্দান কর্তৃক ওয়াদি আরাবাতে সাক্ষরিত ১৯৯৪ সালের চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের নিজেদের সমস্যার সমাধান ও মধ্যপ্রাচ্যে “শান্তি” প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হতো। 

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসকল চুক্তিতে একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বকেই উপেক্ষা করা হয়েছে, উপেক্ষা করা হয়েছে শরণার্থী ফিলিস্তিনিদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সমঅধিকারের মতো মৌলিক অধিকারসমূহকে।

এসকল মৌলিক অধিকারের উপর জোর দেওয়ার  বদলে, এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মডেল অনুসরণ করে এক ব্যক্তি এক ভোট নীতি বাস্তবায়ন এবং গণতান্ত্রিক অবর্ণবাদী অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বদলে ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব উল্টো ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে কেবলমাত্র পশ্চিম তীর, গাজা ভূখণ্ড ও পূর্ব জেরুজালেমে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন।

এর ফলে টুকরো টুকরো ভূখণ্ড নিয়ে ফিলিস্তিনি বান্টুস্তান তৈরি হয়েছে,যেখানে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি সামরিক দখলদারদের ক্রমাগত সন্ত্রাসের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সত্যিকার অর্থে তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

ওসলো চুক্তি অনুসারে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের মোহের উপর এখনো জোর দেওয়া হচ্ছে, এমনকি ইসরায়েল কর্তৃক জাতিরাষ্ট্র আইন পাশ করার পরও; যে আইনে ইসরায়েলেরে ভূমিতে কেবলমাত্র অনন্য ইহুদি জনগোষ্ঠীর (ইসরায়েল রাষ্ট্রের সংজ্ঞানুসারে) জাতিগত অধিকারের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ফিলিস্তিনিরা এ অধিকার ভোগ করতে পারবে না। এখনো দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, অথচ এদিকে আরবরাষ্ট্রগুলো “শান্তির জন্য ভূমি সূত্রে ইসরায়েলের তরফ থেকে কোন ধরনের ছাড় ছাড়াই ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দিকে এগুচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি শান্তি চুক্তি এগিয়ে নিচ্ছে, যেটিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য চূড়ান্ত অবমাননা ছাড়া আর কিছুই থাকছে না।

ইসরায়েল ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যে চরম বর্ণবাদী শাসন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চাপিয়ে দিয়েছে, ওসলো চুক্তি এবং এর অনুসিদ্ধান্তসমূহে সেই চরম বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ যেন ঘরের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিশাল হাতিটিকে না দেখার ভান করে বসে থাকার নামান্তর। ফিলিস্তিনিদের আন্দোলন-সংগ্রামেযে সুমুদ  বা অবিচলতা লক্ষণীয়, ওসলোওয়ালার সে বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফিলিস্তিনিদের নগিরক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের দীর্ঘ ইতহাসের প্রতিও তারা ভ্রুক্ষেপ করছে না।

বছরের পর বছর ধরে বহু ফিলিস্তিনি ওসলো চুক্তি আসলে কি জন্যে তা বুঝতে পেরেছে এবং ফিলিস্তিনি অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তারা নিজেদের জন্য বিকল্প পন্থা বাছাই করে ফেলেছে।

২য় ইন্তিফাদার মাত্র এক বছর পর ২০০১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এনজিও ফোরাম অফ দি ওয়ার্ল্ড কনফারেন্স অ্যাগেইনস্ট র‌্যাসিজম (ডব্লুসিএআর) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইহুদিবাদী প্রকল্পের স্পষ্ট প্রকৃত রূপ তুলে ধরা হয় এবং ফিলিস্তিনি ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতার জন্য আরো বাস্তবধর্মী কিন্তু প্রগতিশীল পথনির্দেশ করা হয়।

২০০৫ সালে বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট অ্যান্ড স্যাংকশনস (বিডিএস) আন্দোলন শুরু হয় এবং দুই বছর পর পরবর্তী কৌশল নির্ধারণের জন্য বিডিএসের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। বিডিএস একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি কিছু উদাহরণ তুলে ধরে, যেগুলো ফিলিস্তিনি মানসিকতাকে ওসলো বিমুখ করার প্রচেষ্টার প্রতিনিধিত্ব করে। এবং এই প্রক্রিয়ায় গাজা কেন্দ্রী ভূমিকা পালন করে।

২০০৬ সালের আইন সভা নির্বাচন পরবর্তী গাজার বেশির ভাগ ঘটনা ওসলো চুক্তি ও তার ধারাবাহিকতাসমূহকে প্রত্যাখ্যানের ইঙিত বহন করে। আমরা যদি এ বিষয়টি মনে রাখি যে গাজার ৭৫-৮০ শতাংশ অধিবাসীই শরণার্থী, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলের উপনিবেশবিরোধী ও ওসলোবিরোধী মনোভাব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

“দুই কারাগার সমাধান” কে তালাক দিয়ে বিকল্প প্যারাডাইম স্থাপনের আহ্বান পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবল হয়ে ওঠে। এই প্যারাডাইমে গাজার জনগণের আত্মত্যাগকে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের ভিত্তিতে যে প্যারাডাইম ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৪ সালে গাজার উপর আক্রমণে এবং দি গ্রেট মার্চ অফ রিটার্নে ফিলিস্তিনিদেরকে অনুপ্রাণিত করে।

বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীদের জন্য ফিলিস্তিনকে অসলোমুক্ত করাটা ন্যায্যতার সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্তে পরিণত হয়েছে। এ জন্য ফিলিস্তিনি সংগ্রামকে নতুন করে সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিক শক্তি ও বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রাম হিসেবে এবং ফিলিস্তিনি স্বার্থকে ফিলিস্তিনের মূল তিনটি অংশ তথা গাজা ও পশ্চিম তীর, শরণার্থী এবং ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একত্রিতকরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

লেখক আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয় গাজার সহযোগী অধ্যাপক। লেখাটি আল জাজিরা ইংরেজির ওয়েবসাইটে “The two-state solution: The opium of the Palestinian people” শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




নাথান থ্রাল, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বহুল প্রত্যাশিত মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপরিকল্পনা ঘোষণা করলেন, যেটি তথাকথিত “শতাব্দির সেরা বন্দোবস্ত” বলে আখ্যায়িত হয়ে আসছে। এই পকিল্পনায় বলা হয়েছে পশ্চিম তীর ও গাজাকে নিয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে; পুরনো শহরসমেত অবিভক্ত জেরুজালেম হবে ইসরায়েলের রাজধানী; এবং সকল অবৈধ ইহুদি বসতি ইসরায়েলে অন্তর্ভুক্ত করা হবেএ সকল বসতির মধ্যে রয়েছে জর্দান উপত্যকা, যা কিনা পশ্চিম তীরের এক চতুর্থাংশ, এবং জর্দানের সাথে ফিলিস্তিনের সীমান্ত এই জর্দান উপত্যকায়ই অবস্থিত। এর ফলে ফিলিস্তিন হবে ইসরায়েলি সাগর বেষ্টিত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, যার চারপাশে থাকবে শুধুই ইসরায়েল। ট্রাম্প সাহেব ঘোষণা দিয়েছেন যে এই পরিকল্পনায় ইসরায়েলকে যে অঞ্চলসমূহ প্রদান করা হয়েছে, তার প্রতিটির উপর ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তার পরপরই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু সকল বসতি ও জর্দান উপত্যকা অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম আগামী রোববার থেকে শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
ইসরায়েলের ডানপন্থী রাজনীতিক ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য বিরোধীরা এই প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ স্পষ্টতই এর মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে গেছে। ইসরায়েলি বামপন্থীরা, পিএলও এবং দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অন্যান্য সমর্থকরা এই প্রস্তাবনার সমালোচনা করছেন এই একই কারণে, তারা বলছেন এর মাধ্যমে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের কফিনে সর্বশেষ পেরেকেটি মারা হয়েছে।
অর্থাৎ এই প্রস্তাবনার সমর্থক এবং সমালোচক, উভয়েই এ বিষয়ে একমত যে এর মধ্য দিয়ে কয়েক দশকের মার্কিন ও আন্তর্জাতিক নীতি ভঙ্গ করা হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি পরিকল্পনাটি এই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিন থেকে বজায় থাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থানের বিপরীত? নাকি বাস্তবে এটি তাদের অবস্থানের যৌক্তিক পরিপূর্ণরূপ?
শতাব্দি কাল ধরে ফিলিস্তিনের আদি বাসিন্দাদের বলি দেওয়ার ইসরায়েলি লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে পাশ্চাত্য। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ইহুদি জনগণের জন্য ফিলিস্তিনে একটি জাতীয় মাতৃভূমি (!) প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে, যেখানে সে সময় ইহুদি ছিল মোট জনগণের ৮ শতাংশেরও কম। তিরিশ বছর পর জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে ভাগ করার জন্য একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করে, যে পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ ভূমি ইহুদিদেরকে দেওয়া হয়, যেখানে তারা তখনো মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম ছিল, আর তাদের মালিকানায় ছিল ৭ শতাংশের কম ভূমি। পরবর্তী যুদ্ধের সময় ইসরায়েল আরব রাষ্ট্রের জন্য বরাদ্দকৃত ভূমির অর্ধেকেরও বেশি দখল করে; ইসরায়েলের এই নতুন সীমান্তের ভিতর বসবাসকারী চার-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনিকে তখন তাদের বাড়ি ফিরতে বাধা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন ইসরায়েলকে জবরদখলকৃত ভূমি ফেরত দেওয়ার জন্য কিংবা শরণার্থীদেরকে তাদের বাড়ি ফেরার সুযোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়নি।
১৯৬৭ সালের পর ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ২২ শতাংশ দখল করে ফেলে, সেই সাথে মিসরের সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়, ইসরায়েল তখন দখলকৃত অঞ্চলে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তুলে। এবং একই ভূমিতে বসবাসরত দুই গোষ্ঠী তথা ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের জন্য ভিন্ন আইনের শাসন চালু করে। ১৯৮০ সালে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্বজেরুজালেম দখল করে, তখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নামেমাত্র কিছু আন্তর্জাতিক নিন্দাজ্ঞাপন হলেও মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা ইসরায়েলকে শক্তিশালী করে।
১৯৯৩ সালে ওসলো চুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য তাদের বিচ্ছিন্ন দ্বীপতূল্য অঞ্চলসমূহে সীমিত স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু এই চুক্তিও ইসরায়েলি বসতি উচ্ছেদ; কিংবা নিদেনপক্ষে আর নতুন কোন বসতি স্থাপন না করার দাবি জানানো হয়নি। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রথম মার্কিন পরিকল্পনা উপস্থাপিত হয় বিল ক্লিন্টনের আমলে ২০০০ সালে। এতে বলা হয় বড় বড় ইহুদি বসতি সমূহ ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে, এবং একই ভাবে পূর্ব জেরুজালেমের সকল ইহুদি বসতিও ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত হবে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে বেসামরিকিকৃত, এবং সেখানে ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান থাকবে, আর জর্দান উপত্যকায় থাকবে আন্তর্জাতিক বাহিনী, যা প্রত্যাহার করা হতে পারে শুধুমাত্র ইসরায়েলের সম্মতির ভিত্তিতে। “শতাব্দির বন্দোবস্তের” মতই, সেই পরিকল্পনায়ও ফিলিস্তিনকে সামান্য বেশি স্বায়ত্তশাসণ দেওয় হয়েছিল, এবং সেটিকেই রাষ্ট্র বলা হয়েছিল।
এখনো, ইসরায়েলের সামরিক হিসাব অনুসারে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে ইসরায়েলিদের তুলনায় বেশি সংখ্যক ফিলিস্তিনি বসবাস করছে। ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায়ই হোক, কিংবা ক্লিন্টন সাহেবে পরিকল্পনায়ই হোক, সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে দেওয়া হয়েছে এক-চতুর্থাংশেরও কম ভূমি, আর তার সাথে ফিলিস্তিনি সার্বভৌমত্বের উপর বিধি-নিষেধ তো আছেই। কাজেই এসব প্রস্তাবনা থেকে যে ফলাফল আসবে, সেটাকে বড় জোর দেড়-রাষ্ট্র সমাধান বলা যেতে পারে, দুই-রাষ্ট্র সমাধান নয়।
ট্রাম্প সাহেবের পরিকল্পনায় অনেকগুলো ভুল রয়েছে: এটিতে ফিলিস্তিনিদের তুলনায় ইহুদিবাদী স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা অবৈধ বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে পুরষ্কৃত এবং উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এর কোনটাই অতীতের রীতি কিংবা নীতি ভেঙে করা হয়নি। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় কেবলমাত্র একটি বাড়ির নির্মাণকাজের শেষ অংশটুকু করা হয়েছে, রিপাব্লিকান ও ডেমক্র্যাট উভয় দলের আইনপ্রণেতারা মিলে যে বাড়ি নির্মাণে কয়েক দশক ধরে সহযোগিতা করে আসছেন। গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম তীর দখল করছে, দখলকৃত ভূমিতে ৬ লাখেরও বেশি দখলদারকে পাঠিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন ইসরায়েলকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে ভেটো দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালত ও তদন্তকারী সংস্থাসমূহের উপর চাপ প্রয়োগ করেছে যাতে করে ইসরায়েলকে কোন ধরনের চাপ না দেওয়া হয়, এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্রদান করেছে।  
কোন কোন ডেমক্র্যাট রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী এখন বলছেনন যে তারা ইসরায়েলি এই দখলদারি অনুমোদন করেন না, কিন্তু তারাও এটা বন্ধ করার কোন উপায় প্রস্তাব করছেন না। যেমন মূলধারার ডেমক্র্যাট সিনেপর অ্যামি ক্লবুচার এই দখলদারির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ঘোষণা করেছেনে, এবং ট্রাম্পের সমালোচনা করে লেখা একটি চিঠিতে সাক্ষরও করেছেন। কিন্তু ২০১৬  সালে যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে রেজুলেশন পাশ করেছিল, তখন নিরাপত্তা কাউন্সিলের সেউ রেজুলেশনের বিরুদ্ধে গুরুতর আপত্তি প্রকাশ করা” সিনেট রেজুলেশনের কো-স্পন্সর ছিলেন এই তিনিই।
সিনেটর বের্নি স্যান্ডার্স ব্যতীত অন্য কোন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট কোন প্রস্তাবনার কথা বলেননি যা ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনে মার্কিন জটিলতা হ্রাস করবে। দখলদারির বিরোধিতা করার ঘোষণা দেওয়াটা আসলে অন্তঃসারশূন্য, যদি না সেই ঘোষণায় দখলদারি বন্ধের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ অন্তর্ভুক্ত থাকে: অবৈধ বসতি নির্মাণের পণ্যসমূহ নিষিদ্ধ করা; দখলিকৃত অঞ্চলে ইসরায়েল যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বসতি স্থাপন করছে, সেই পরিমাণ আর্থিক সহায়তা হ্রাস করা; অবৈধ বসতি স্থাপনের সাথে জড়িত কোম্পানিগুলো থেকে ফেডারেল এবং স্টেট সরকারের পেনশন তহবিল সরিয়ে নেওয়া; ইসরায়েল যতক্ষণ না গাজায় অবরুদ্ধ বিশ লক্ষ মানুষকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করা এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদেরকে সমান নাগরিক অধিকার প্রদান, যতটুকু নাগরিক অধিকার তাদের আশেপাশে বসবাসরত ইহুদিরা পাচ্ছে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা কয়েক দশক ধরে চলে আসা শান্তি প্রক্রিয়ার মতোই ইসরায়েলকে কথিত স্থিতাবস্থার আচ্ছাদন দিচ্ছে, যার মাধ্যমে ইসরায়েল জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকার পায়, কোটি কোটি মানুষকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাদের চলাফেরায় বিধি নিষেধ আরোপ করে, তাদের যে কোন বক্তব্যকে “জনশৃঙ্খলা” বিঘ্ন করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে, কোন ধরনের বিচার কিংবা অভিযোগ ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য “প্রশাসনিক আটকের” নামে বন্দী করতে পারে। আর এসব চলাকালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অন্যরা এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েরে পিঠ চাপড়ে দিতে থাকে, সেই সাথে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষার খাতিরে “অর্থপূর্ণ সংলাপ” পুনরায় শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে থাকে।
ইসরায়েলের সমর্থকরা বলতে চাইবেন যে ইসরায়েলকে এক ঘরে করে ফেলা হয়েছে, এবং তারাই সঠিক। অথচ ইসরায়েল হলো একমাত্র রাষ্ট্র, যেটি স্থায়ীভাবে সামরিক দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে, একই অঞ্চলে বসবাসরত দুটি গোষ্ঠীর জন্য বৈষম্যমূলক পৃথক আইন প্রয়োগ করছে, অথচ তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে, তাদের রক্ষা করতে, এমনকি তাদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে দুনিয়ার আত্মস্বীকৃত উদারবাদীরা পারলে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার সমালোচনা কারী ডেমক্র্যাটরা আসলে তার চেয়ে ভালো কেউ নন, কারণ তারা কেউই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে যথাযথ কোন অবস্থান গ্রহণ করছেন না। কথায় না হলেও কাজে তারাও দখলদারি যুলুমবাজির সমর্থক, ট্রাম্পেরই মতো।


লেখক ইন্টার্ন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আরব-ইসরায়েল প্রকল্পের পরিচালক। নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে Trumps Middle East Peace Plan Exposes the Ugly Truth” শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি নিউ ইয়রক্ টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


পশ্চিম তীরে আন্দোলনরত ফিলিস্তিনিরা

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯: ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীরা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে... ইসাম রিমাভি/আনাদুলু অ্যাজেন্সি

রাজা শেহাদেহ, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত সপ্তাহে সংসদীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি যদি পুনরায় নির্বাচিত হন, তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন।
তার এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ফিলিস্তিনির নিকট এই ঘোষণা কোন আলাদা অর্থ বহন করে না। আমরা বছরের পর বছর ধরে সহযোগিতার বিষয়ে বিবৃতি শুনে আসছি, অথচ কিছুই পরিবর্তন হয়নি। অসূরের যে রকম বিস্তৃতি ঘটছে, তাতে আমাদের অনেকেই এখন সোজা সাপ্টা কথা শুনতে পছন্দ করে। হারেৎজের কলামিস্ট গিডেওন লেভি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বিষয়ে সম্প্রতি যেমনটা লিখেছেন, “এ অঞ্চলের বাস্তবতাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে দিন, এ বাস্তবতা আর বেশি দিন লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। সত্য প্রকাশ করার সময় এসেছে।”
ইসরায়েল এমনিতেই পশ্চিম তীর সংযোজন করার সব ফায়দা তুলে নিচ্ছে, এ জন্য এই অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের দেখভালের কোন দায়-দায়িত্বও নিতে হচ্ছে না।
নেতানিয়াহু সাহেব নির্বাচনের প্রাক্কালে শুধুমাত্র তার ডানপন্থী সমর্থক গোষ্ঠীর মনোরঞ্জনের জন্য এই ওয়াদা দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক সংযোজন আসলে অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসরত ইসরায়েলিদের জন্য কোন বাস্তব পরিবর্তন বা অতিরিক্ত সুবিধা বয়ে আনবে না। এখনই ইসরায়েলি সরকার তাদের সাথে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসরতদের মতোই আচরণ করছে, তাদেরকে কর ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাড়ও দিচ্ছে।
মূলত এ কারণেই আমার পরিচিত বহু ফিলিস্তিনি এখন এক রাষ্ট্র সমাধানের কথা ভাবতে শুরু করেছে। কারণ পশ্চিম তীরে এতো বেশি সংখ্যক ইসরায়েলি বসতির উপস্থিতিতে দুই রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়ন করা এখন প্রায় অসম্ভব। বলার অপেক্ষা রাখে না, নেতানিয়াহুর আনুষ্ঠানিক সংযোজন পরিকল্পনাকে মনে মনে অনেক ফিলিস্তিনি এ জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছে, কারণ এর মধ্য দিয়ে এই লক্ষ্যের দিকে এগুচ্ছে।
ইসরায়েল সব সময়ই এই ভূমিই চেয়ে এসেছে তবে এর অধিবাসীদের ছাড়াই। এবং যে এলাকাটি নেতানিয়াহু দখল করার ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা খুব কমই। অধিগ্রহণের জন্য ঘোষিত অঞ্চলের বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি ইতোমধ্যে তাদের ভূমি হারিয়েছেন, এবং তারা আর কখনোই এই ভূমি ফেরত পাবেন না। তারা কেবলই ইসরায়েলি দখলদারদের সেবায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত থেকে নিন্দিত হবে।
কিন্তু নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ, অন্ততপক্ষে একটা বিষয় স্পষ্ট করবে: যদি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি ১৯৯৩ সালের ওসলো চুক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করবে। এই বিষয়টাকে বহু ফিলিস্তিনি সাধুবাদ জানাবে, কারণ অনেকেই এই চুক্তির প্রতি হতাশ। চুক্তি অনুসারে পশ্চিম তীরের বিষয়ে পিএলও এবং ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, নেতানিয়াহুর বর্তমান প্রস্তাবনা স্পষ্টতই সে চুক্তির লঙ্ঘন।
একটা সময় এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষে সমোঝতামুলক শান্তি ও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা অর্জিত হবে, এরকমটা প্রত্যাশা করা হতো। কিন্তু তার বদলে এই চুক্তির মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের সীমান্তের বাইরেও পুরো এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করছে।
১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর আগ পর্যন্ত, যখন তিনি বিরোধী দলে ছিলেন, তখন প্রকাশ্যে অসলো চুক্তির বিরোধিতা করতেন। কয়েক মেয়াদে ইসরায়েলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর নেতানিয়াহু এখন তার সমর্থকদের নিকট দাবি করতেই পারেন যে, তিনি পশ্চিম তীর দখল করার জন্য বিচক্ষণতার সাথে সব কিছু ঠিকটাক মতো করে যাচ্ছেন, পুরোপুরি দখল করার আগ পর্যন্ত। পশ্চিম তীরে অবিরত ইহুদি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি এ লক্ষকে এগিয়ে নিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের [১৭ সেপ্টেম্বর] নির্বাচনে ফিলিস্তিনিদের খুব একটা আগ্রহ নেই। নৃশংস ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে বসবাস করার অভিজ্ঞতার ফলে, নাকি অর্থনৈতিক দুরবস্থার ফলে এই নির্বাচন নিয়ে তারা অনাগ্রহী, আমি জানি না। যাই হোক না কেন, আমার ধারণা খুব কম ফিলিস্তিনিই মনে করে যে, কে নির্বাচিত হবে তার ফলে তাদের কিছু একটা যায় আসে। কোন প্রার্থীই ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা সম্পর্কে নিজের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেননি; এ বিষয়গুলো নির্বাচনী ইশতেহারে একেবারেই নেই। প্রায় দেড় বছর আগে গত নির্বাচনের পূর্বেও আমি একই কথা লিখেছিলাম।
যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে চলে আসে, তা হলো ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। নেতানিয়াহু সাহেব যখন ঘোষণা করলেন যে তিনি পশ্চিম তীরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভূমি দখল করবেন, তখন সবাই জানে যে এটি করার মতো মুরোদ তার আছে। কিন্তু মাহমুদ আব্বাস যখন ঘোষণা দিলেন যে, তিনি ওসলো চুক্তির মাধ্যমে তৈরি বিভক্তি তথাকথিত এ, বি ও সি অঞ্চলবাতিল করবেন। কারণ এর মাধ্যমে ইসরায়েল ষাট ভাগেরও বেশি অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সবাই জানে যে, তার আসলে এমনটা করার কোন ক্ষমতাই নাই।

তার চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, নেতানিয়াহু যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটি বাস্তবায়ন এবং তারপর সকল নিন্দা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথষ্ট পরিমাণ বিচক্ষণ একজন নেতা। খুব সম্ভব তিনি তার এ পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাইবেন যেড এটি তার দেশের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ছিল। সম্প্রতি তিনি তার এক ফেসবুক পোস্টে তার ভোটারদেরকে বলেছেন, আরবরা “আমাদের নারী, শিশু, পুরুষ, সকলকে ধ্বংস করতে চায়।” (পরবর্তীতে ফেসবুক তার অ্যাকউন্টের কিছু ফিচার স্থগিত করেছিল, কোম্পানির হেট-স্পিচ নীতিমালা লঙ্ঘনের শাস্তি স্বরূপ।) কাজেই নেতানিয়াহু পুনরায় নির্বাচিত হলে আমাদের দুই জাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুবই কম।
আবার, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান বেনি গান্টজও ফিলিস্তিনিদের জন্য খুব ভালো বিকল্প নয়। তিনি গত সপ্তাহে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো ইসরায়েল।” যেন ইসরায়েলে আরবরা ইসরায়েলিদের সমান মর্যাদা পাচ্ছে এবং আরবদের জন্য দ্বিতীয় সর্বোত্তম স্থান হলো পশ্চিম তীর” যেন ফিলিস্তিনি অথবা অন্য যে কোন মানুষের জন্য অর্ধ শতক ধরে বিদেশিদের দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাস করাটা খুব সুখকর অভিজ্ঞতা আরকি। সত্যের অপলাপ কতটুকু গভীর হতে পারে?!
নেতানিয়াহু একটা নির্লজ্জ। গান্টজ একটা অন্ধ। ফিলিস্তিনিরা এই নির্বাচন নিয়ে কোন আশার আলো দেখছে না। কীভাবে দেখতে পারে?
________________________________

লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য বিভাগে Israel Wants Palestines Land, but Not Its People শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


ফাওয়াজ . গের্জেস, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:

একটি তিক্ত নির্বাচনী প্রচারাভিযানের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু শান্তিবাদী নেতার চেয়ে আধিপত্যবাদী নেতা হিসেবেই তার নিজের অবস্থানটাকে সুরক্ষিত করেছেন গত এক দশক ধরে তিনি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কোন ধরনের সমন্বয় সাধনের সম্ভাবনাকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছেন, এমনকি অভ্যন্তরীণ বিষয়েও ইসরায়েলকে গভীরভাবে বিভক্ত করে ফেলেছেন

মধ্যপ্রাচ্যে যারা শান্তি প্রত্যাশা করেন, তাদের প্রত্যেকেরই নেতানিয়াহুর এ রকম নীতির ধারাবাহিকতার ব্যাপারে গভীরভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া উচিত, সকল নীতির ফলাফল আগামী কয়েক দশক ধরে অনুভব করতে হবে অধিকৃত অঞ্চলসমূহকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করা, আরব ইসরায়েলিদেরকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং নিষ্ঠুরভাবে ফিলিস্তিনি জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ প্রভৃতি নীতি ইসরায়েল এবং তার প্রতিবেশীদের মধ্যে চিরস্থায়ী সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এমনকি আরো আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সাংস্কৃতিক যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর বাগাড়ম্বর ভূমির মালিকানার সংঘাতকেসভ্যতার সংঘাতেরূপান্তরিত করতে পারে যা সব পক্ষের চরমপন্থীদেরকে আরো উৎসাহ প্রদান করবে

নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে একটি একচোখা গণতন্ত্রে পরিণত করছেন  ভীতি বর্ণবাদ ছড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদি সম্প্রদায় ইসরায়েলি আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে স্থায়ী বিরোধ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন উল্লেখ্য ইসরায়েলি আরব সম্প্রদায় দেশের মোট জনসংখ্যার ২০% (এদের মধ্যে মুসলিম খৃষ্টান উভয় ধর্মের মানুষই আছেন, তবে বেশির ভাগই মুসলিম। -অনুবাদক)

উদাহরণস্বরূপ গতবছর নেতানিয়াহু একটিজাতিরাষ্ট্র আইনকরেছেন, যা ইহুদিদেরকে আত্মনির্ভরশীলতারএককঅধিকার প্রদান করে, এবং একইভাবে আরব ইসরায়েলিদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে ইসরায়েলি অভিনেতা রোতেম সেলা এই আইনের সমালোচনা করলে নেতানিয়াহু তার জবাবে বলেছিলেনজাতি রাষ্ট্র, তবে সকল নাগরিকের জন্য নয়, বরং শুধু ইহুদিদের জন্যএই প্রকাশ্য শত্রুতার পর, ২০১৫ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনে আরব ইসরায়েলিদের উপস্থিতি ১৫ শতাংশ কম ছিল, তা খুব বেশি বিস্ময়কর কিছু নয় যখন আপনার দেশের প্রধানমন্ত্রী কোন ধরনের শর্ত ছাড়াই আপনাকে দেশের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ে সমান মর্যাদার অধিকারী নয় বলে ঘোষণা করেন, তখন সে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণটাকে নিরর্থক বিষয় মনে হতেই পারে  

দেশের ভিতরে গণতন্ত্র হ্রাসের পাশাপাশি, নেতানিয়াহু শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করেছেন এবং ইসরায়েলের দীর্ঘ মেয়াদি নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছেন যদিও তিনি ইসরায়েলকে নিরাপদ শক্তিশালী করার ব্যাপারে প্রায়ই আত্মশ্লাঘায় ভোগেন, কিন্তু তার কাছে নিরাপত্তার মানে এতোটাই সংকীর্ণ স্বল্পমেয়াদি যে কার্যত এটা অর্থহীনই তার সকল পদক্ষেপই স্বল্পকালীন হিসাব নিকাশ ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক রাখাকে কেন্দ্র করে, এর বিনিময়ে তিনি প্রকৃত শান্তিকে বলি দিচ্ছেন শক্তিশালী আরব মিত্ররা ইসরায়েলকে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা দেবে না শুধুমাত্র আরব বিশ্বের জনগণের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ইসরায়েল দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে তবে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার স্বার্থে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে আরব জনগণের সাথে, স্বৈরশাসকদের সাথে নয়

শেষমেশ তখনই সত্যিকারের নিরাপত্তা অর্জিত হবে, যখন ইসরায়েলিরা এবং ফিলিস্তিনিরা তাদের মধ্যকার শতাব্দি-প্রাচীন সংঘাত নিরসনের পথ খোঁজে পাবে, এবং পাশাপাশি বসবাস করতে রাজি হবে, সেটা দুই রাষ্ট্রেই হোক, আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই হোক এছাড়া আর কোন টেকসই সমাধান নেই যতদিন অবধি ফিলিস্তিনিরা নির্যাতিত হতে থাকবে, এবং তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রে অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে, ততদিন অবধি সংঘাত চলতে থাকবে

এছাড়াও, গত ১৩ বছরে নেতানিয়াহু অধিকৃত পশ্চিম তীর পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রবল উদ্যোমে সমর্থন দিয়ে গেছেন তিনি ভালো করে জানেন যে এসকল বসতি স্থায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পথে প্রত্যক্ষরূপে কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়াবে

তাছাড়া সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি পুনঃনির্বাচিত হলেপুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণকরার মাধ্যমে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করবেন তার কথাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার পশ্চিম তীরকে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রতিশ্রুতি তার দীর্ঘ দিন ধরে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধিতা করার ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যশীল নতুন করে নির্বাচিত হয়ে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেবের নিঃশর্ত সমর্থন নিয়ে তিনি কল্যাণার্থে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তির প্রত্যাশাকে কফিনে ঢুকাতে এখন আরো বেশি সাহসী ভূমিকা পালন করবেন

নেতানিয়াহুর গৃহীত পদক্ষেপসমূহ যত বেপরোয়াই হোক না কেন, তাকে খুব বড় ধরনের কোন বাধার মুখোমুখি হতে হবে না ইসরায়েলের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তি নাটকীয়ভাবে ডানে চলে এসেছে, আর তার নিজের জোট কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলো নিয়ে গঠিত, যেগুলো ফিলিস্তিনি ভূমি ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছে তিনি এখন হয়তো নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজেকে বাঁচানোর স্বার্থে তাদের দাবি সমূহকে আইনি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত করবেন

বারাক ওবামা যেখানে নেতানিয়াহুর চরমপন্থী প্রবণতাকে দমন করে রেখেছিলেন, ট্রাম্প সাহেব সেখানে তাকে আরো সাহস যোগাচ্ছেন নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সহযোগিতা করার নিয়তেই ট্রাম্প সাহেব সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন পরে গর্বভরে বলেছিলেন, তিনি তার জামাতা জারেদ কুশনারের নিকট থেকে ইতিহাসেরদ্রুতপাঠ গ্রহণের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এরপর সিএনএন যখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে জিজ্ঞেস করলো, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শান্তি পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্থ করবে বলে আপনি মনে করেন নি না, পম্পেও সাহেব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেনআমি এরকম মনে করি না

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জবাব থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে নেতানিয়াহুকে পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হবে এবং ট্রাম্প প্রশাসন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারি আাহ্বান জানাবে না তার মানে শান্তি প্রক্রিয়া শেষ, নেতানিয়াহুই বিজয়ী স্পষ্টতই, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু একই রাজনৈতিক মুদ্রার দুই পিঠ তারা তাদের রক্ষণশীল গণভিত্তির সন্তুষ্টি অর্জনের স্বার্থে যে কোন কিছু করতে পারেন, ভুল না সঠিক সে প্রশ্ন তাদের হিসাবে থাকবে না  

ফিলিস্তিনিদের বাদ দেওয়া হয়েছে ফিলিস্তিনের নেতৃত্ব অতি মাত্রায় দুর্বল বিভক্ত, তাদের পক্ষে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব বসতি সম্প্রসারণ প্রতিহত করা সম্ভব নয় সৌদি আরব অন্যান্য প্রভাবশালী আরব রাষ্ট্রসমূহ, যারা এক সময় ফিলিস্তিনিদের সমর্থন যুগিয়েছিল, এখন তাদের ইসরায়েল নীতিতে ফিলিস্তিনের বদলে ইরান বেশি গুরুত্ব পায়

এরপরও সংঘাত এখনো অনিবার্য নয়, এমনকি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সমস্যা অবশেষে সমাধান হতেও পারে কিন্তু সেটা হতে হলে অবশ্যই দুই পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন দরকার অঞ্চলে ইসরায়েলে সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং মধ্য প্রাচ্যের প্রতিবেশীদের সাথে ইসরায়েলের প্রকাশ্য মিলন সব সময়ই ফিলিস্তিনিদের সাথে সমন্বয় সাধনের উপর শর্তযুক্ত থাকবে

ফিলিস্তিনিদের সাথে বোঝাপড়ায় আসার ব্যাপারে নেতানিয়াহু কোন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না তার বর্ণবাদী নীতি এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি বর্বরতা বিভক্তিকে আরো গভীর করবে, সেতুবন্ধন তৈরি করবে না তিনি যে পথে আছেন, কেবল যুদ্ধ আর আরো অনেক দুর্ভোগের মাধ্যমেই সে পথের সমাপ্তি হতে পারে
________________________________

লেখক লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স অ্যান্ড পলিটিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটেNetanyahu Means Warশিরোনামে প্রকাশিত হয় ছবি: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.