Articles by "ভারত"

ভারত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা
ভারতীয় বাহিনীর টিয়ার গ্যাস থেকে আত্মরক্ষার জন্য দৌড়াচ্ছে কাশ্মীরিরা

রুওয়া শাহ, আল জাজিরা ইংরেজি:
২০১০ সালের ১১ জুন আমি আমার জীবনে প্রথমবারের মতো মাতৃভূমি কাশ্মীরের দুঃখজন ও সহিংস বাস্তবতার মুখোমুখি হই। যখন গুলির আওয়াজ শুনি, তখন আমি রাজধানী শ্রীনগরের ডাউনটাউন এলাকায় আমার টিউশন সেন্টার থেকে বেরুচ্ছিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তায় আতঙ্ক ছেয়ে যায়, শত শত ছাত্র একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এদিক-ওদিক দৌড়াতে শুরু করে।
আমিও আত্মগোপনের জন্য একটুখানি জায়গা খোঁজছিলাম, তখন এক তরুণের শরীর দেখতে পেলাম নিশ্চল পড়ে আছে। তার পুরো শরীর ছিল রক্তমাখা, চোখ ছিল গুলিবিদ্ধ। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে সে মৃত।
পরে জানলাম, এই দেহটি ছিল শ্রীনগরের একটি প্রাইভেট স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র তোফায়েল মাট্টুর। ভারতীয় সৈনিক কর্তৃক খুব কাছে থেকে ছোড়া টিয়ার গ্যাসে সে নিহত হয়েছিল।
সমস্যার শুরু হয়েছিল মে মাসে, যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি জায়গায় তিন নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশকারী “সন্ত্রাসী” দাবি করে হত্যা করে। কাশ্মীরিরা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য রাস্তায় নেমে আসেন, পুলিশ তার চেয়েও বেআইনি সহিংসতার মাধ্যমে এই আন্দোলন মোকাবেলা করে। কয়েক মাসের মধ্যে তারা ১০০ জন হত্যা করে, যাদের অনেকেই ছিলেন অল্পবয়স্ক শিক্ষার্থী।
মিলিয়ন মিলিয়ন কাশ্মীরির মতো আমিও ২০১০ সালের গ্রীষ্মকাল পরিবারের সাথে ঘরের ভিতরেই কাটিয়েছিলাম। তখন কারফিউ চলছিল, কেউ কারফিউ ভেঙে প্রতিবাদ করার দুঃসাহস দেখালে রাস্তায় পড়ে আহত কিংবা নিহত হওয়ার ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হতো।
গ্রীষ্মকাল শেষে কারফিউ প্রত্যাহার করা হলেঅ এবং ভারতীয় সরকার ও চ্যানেলসমূহ আমাদেরকে বললো যে, উপত্যকায় “শান্তি” ফিরে এসেছে। আমাদের জীবসন আবার “স্বাভাবিক” হলো।
কিন্তু আমি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাইনি। কিছু একটা একেবারেই বদলে গিয়েছিল। তোফয়েল হত্যাকাণ্ড ছিল আমার জন্য কাশ্মীর সংঘাতের সহিংসতার প্রথম সরাসরি অভিজ্ঞতা। এই প্রথমবার আমি উপলব্ধি করলাম, কাশ্মীরে বসবাসরত একজন তরুণ হিসেবে ঠিক কী ধরনের ঝুঁকিতে আমি আছি।
আসলে আমি যখন শিশু ছিলাম, তখন থেকেই ভারতীয় রাষ্ট্রের আচরণ ও নিরাপত্তার অজুহাতে কাশ্মীরে তাদের উপস্থিতি নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমি নিজেকে করা একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে পেলাম: কেনা আমরা আজাদি চাই?
এবং আমিই একমাত্র ব্যক্তি নই, যে ২০১০ সালে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। পুরো একটি প্রজন্ম ভারতের নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছিলো, যা প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধের বীজ বপন করছিল।
ঐ বছর কোন এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এক দল ভারতীয় কর্মকর্তা কোন কারণ ছাড়াই, নিছক বিনোদনের উদ্দেশ্যে তিন কাশ্মীরি কিশোরকে মারধর ও লাঞ্ছিত করেছিল। ঐ ঘটনার পর এদের মধ্য থেকেই একটি ছেলে প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর, ১৫ বছর বয়সী ছেলেটি তার গৃহত্যাগ করে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী দলে যোগ দেয়। তার নাম ছিল বুরহান ওয়ানি।
প্রায় ছয় বছর পর ২০০৬ সালে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হত্যা করে।
তখন থেকে তিনি একজন জনপ্রিয় বিদ্রোহী কমান্ডার এবং কাশ্মীরি সশস্ত্র সংগ্রামের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একটিতে পরিণত হন। ওয়ানির মৃত্যুর ফলে পুরো উপত্যকায় পাঁচ মাস ধরে আন্দোলন বিস্তার লাভ করেছিল, সে সময় এক শতাধিক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়।
এ আন্দোলনের ফলাফল সম্পর্কে আমি আমার দাদা সৈয়দ আলি শাহ গিলানির সাথে কথা বলছিলাম, যিনি অল পার্টিজ হুররিয়াক কনফারেন্স (এপিএইচসি) নেতা এবং ২০১০ সাল থেকে তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, “বুরহান এবং অন্য যে সকল তরুণ ভারতের বিরুদ্ধে বন্দুক হাতে তোলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির জন্য ভারতই দায়ী।”
২০১০ সালে কাশ্মীরে সশস্ত্র দলগুলোতে যোগদানকারী একমাত্র তরুণ যে বুরহান, তা কিন্তু নয়। আরো অনেকেই একই কাজ করেছিল, যাদের বেশির ভাগই দক্ষিণ কাশ্মীরের। ভারতের নৃশংসতা ও নির্যাতনই তাদেরকে এরকম করতে উৎসাহিত করেছে। এবং বুরহান নিজে যখন নিহত হয়েছিলেন, তখন সেটাও কিন্তু কাশ্মীরের নতুন একটি প্রজন্মকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিতে উৎসাহিত করেছিল।
এদিকে ভারতীয় সকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ আন্দোলনের নেতাদেরকে দমন করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমার বাবা আলতাফ আহমাদ শাহ ২০১৭ সালে আরো অনেক কাশ্মীরি নেতার সাথে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিন স্বাধীনতাবন্থী এপিএইচসি নেতা। তারা প্রকাশ্যে সশস্ত্র আন্দোলন বর্জন করা সত্ত্বেও এরকমটি হয়েছিল।
এটা আসলে আমাদের করণীয়ন নয়। এটা বরং আত্মহত্যা করার সমতূল্য, শৈশবে সশস্ত্র প্রতিরোধের মতো জটিল বিষয়ে আমার যখন বাবার সাথে কথা হচ্ছিল, তখন তিনি এরকমটাই বলছিলেন। আমি যখন তাকে এর বিকল্প উপায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, “আমাদেরকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সকল সম্ভাব্য উপায়ে আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে।”
আমার বাবার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং “ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তৈরির ষড়যন্ত্র”র অভিযোগ আনা হয়েছে, তাকে নয়া দিল্লীর তিহার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়, আজ অবধি তিনি সেখানেই আছেন।
কাশ্মীরের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেন, এমন যে কারো নিকট এটি স্পষ্ট যে এসকল গ্রেফতার মূলত কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রামের কণ্ঠস্বরগুলো ভেঙে ফেলার জন্য ভারতীয় সরকারের পদক্ষেপ মাত্র।
আজ, আমি মনে করি, এসকল গ্রেফতার আসলে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের জন্য ভারতের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এভাবেই যে কোন শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই দমন করে।
আগস্টে ভারতীয় রাষ্ট্র আবারো কাশ্মীরের জনগণের ‍উপর তাদের বর্বরতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। আমি এখন বিদেশে থাকি, এখান থেকে আমাকে দেখতে হচ্ছে কীভাবে আমার আত্মীয়-স্বজন পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিচ্ছেন। নির্মম নির্যাতন এখনো অব্যহত আছে, তাই এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীর পুরোপুরি গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে।  
৪০ দিন আগে আমি আমার মায়ের সাথে কথা বলেছিলাম। আমার এক প্রতিবেশী কাশ্মীর থেকে পালিয়ে নয়া দিল্লীতে গিয়েছেন, তাঁর কাছ থেকে খবর পেয়েছি যে “বাড়ির সবাই ভালো আছেন।” তিনি আমার নিকট আমার মায়ের রেকর্ডকৃত ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন, যেটিতে মা আমাকে শক্ত থাকতে বলেছেন।
এই সকল সহিংসতা এবং কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করার ফলস্বরূপ একটি অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। এসবের ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদই কাশ্মীরের মূলধারায় পরিণত হবে।
বছরের পর বছর ধরে ভারত ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) এবং পিপলস ডেমক্র্যাটিক পার্টির মতো স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নিকট থেকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমানে, এমনকি যারা ভারতীয় সংবিধানের আলোকে শপথ নিয়েছিলেন, তারাও হয়তো কারাগারে, নয়তো গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। বিষয়টা এমন নয় যে, এসকল দল ঠিকটাক মতো কাশ্মীরি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে, কিংবা তাদের অনুভূদি ধারণ করছে, কিন্তু অন্ততপক্ষে ভারতের কিছু মানুষ ছিল যারা তাদের পক্ষে কথা চালিয়ে যেতে পারে।
এখন, সকল কাশ্মীরি নেতাকে কারারুদ্ধ করেছে, এমনকি তাদের মধ্যে এমন অনেকেও আছেন যারা ভারতের সাথে কাজ করতে চান। এসবের পর নয়া দিল্লী সরকার কাশ্মীরের জনগণের সাথে যে কোন গঠনমূলক সংলাপের সুযোগই শেষ করে ফেলেছে।
আমার অনেক তরুণ কাশ্মীরি বন্ধু আছে, যারা এক সময় অন্তর থেকে নিজেদেরকে ভারতীয় মনে করতেন। এখন তারা তাদের মন পরিবরত্ন করছেন বলে মনে হচ্ছে।
আমার এক বান্ধবী এক সময় এনসি প্রধান ফারুক আব্দুল্লার সাথে তার একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছিল, সেখানে তাকে কাশ্মীরের শ্রেষ্ঠ নেতা” আখ্যায়িত করেছিল, এখন সে বলে যে ৫ আগস্ট যা ঘটেছে, তার জন্য সে সকল মূলধারার কাশ্মীরি নেতাকে দায়ী মনে করে। সে আমাকে বলছে, “তারা সকলেই বিক্রি হয়ে গেছেন এবং আমাদের আর করার কিছুই নেই।
বছরের পর বছর ধরে ভারত সরকার এটা নিশ্চিত করছে যে, কাশ্মীরের প্রতিটি নতুন প্রজন্ম যেন দখলদারদের নৃশংসতার সাক্ষী হয়, এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর মাধ্যমে কাশ্মীরে প্রতিরোধের নতুন ঢেউ তৈরি করছে। এই প্রজন্ম হয়তো ভারতের সাথে স্বাধীনতার চেয়ে কম কোন কিছুর বিনিময়ে সমোঝতা করতে কখনোই রাজি হবে না।
২০১০ সালের ঘটনার পর থেকে প্রতি বছরই আমরা এ ধরনের শিরোনাম পড়ে থাকি: “কাশ্মীর আরেকটি সহিংস বছর কাটালো” কিংবা “আবারো উত্তপ্ত কাশ্মীর” অথবা “অশান্ত হতে পারে কাশ্মীর।”
এবছরও এরকম বিদ্রোহই প্রত্যাশিত। যাই হোক, এর বিপরীতে ভারতীয় সরকার বহু সেনা প্রেরণ করলেও এসব কখনোই কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ দমন করতে পারবে না। সরকার ৫ আগস্ট যা করেছে, তা কোন কাশ্মীরিই গ্রহণ মেনে নেবে না।

এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং আল জাজিরার সম্পাদকীয় অবস্থান এতে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে India's aggression is fuelling Kashmiri resistance শিরোনামে প্রকাশিত। লেখিকা রুওয়া শাহ তুরস্কে সিনেমা ও টেলিভিশন নিয়ে পড়াশুনা করছেন। এর আগে তিনি ভারতে সাংবাদিকতা করতেন। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




রমেশ ঠাকুর, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোপূর্বে বিশেষ মর্যাদার আওতায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চল একটা মাত্রার স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো। এর বদলে এখন কাশ্মীরকে দুটো ইউনিয়ন টেরিটরিতে (মর্যাদার দিক থেকে রাজ্যের নিচে অবস্থান) বিভক্ত করা হয়েছে, যেগুলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি শাসন করবে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারার আওতায় কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার ফলে সাত দশক আগে কাশ্মীরের ভারতে যোগদান সহজতর হয়েছিল। কাশ্মীর নামক এই অঞ্চলের উপর ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানও নিজেদের অধিকার দাবি করে। এরকম একটি অঞ্চলের সাথে সম্পর্কের ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতাবস্থাকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
মোদী সরকার খুব ভালো করেই জানে যে তাদের এই সিদ্ধান্ত কাশ্মীর কিংবা পাকিস্তানে ভালোভাবে নেওয়া হবে না। কাজেই এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগের দিন কাশ্মীরে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।  ঘোষণার পর  মোদী সরকার এ অঞ্চলের জনগণের উপর কারফিউ জারি করে, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদেরকে বের করে দেয়, জনপ্রিয় স্থানীয় নেতাদেরকে গৃহবন্দী করে, মিডিয়া ও টেলিকম বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু, ভারতীয় বিরোধী দলসমূহের সদস্যদের স্বীকৃতি অনুসারে, কাশ্মীরিদের প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মোদী সরকারের ক্ষমতা একেবারেই সীমাবদ্ধ, কারণ এসকল কাশ্মীরি দশকের পর দশক ধরে সহিংসতা সহ্য করে আসছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, পাকিস্তান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি আখ্যায়িত করে প্রত্যখ্যান করেছে, এবং “সকল সম্ভাব্য উপায়ে” প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এর ফলে প্রতিবেশী দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে আবারও সামরিক সঙ্ঘাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
কাশ্মীর ইস্যু এতোটা একগুয়ে হওয়ার এবং ভারতের একতরফা সিদ্ধান্ত সম্ভবত কাজ না করার পিছনে তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথম কারণ পরিচিতির সাথে সম্পৃক্ত। কাশ্মীর ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের অসম্পূর্ণ কাজের প্রতিনিধিত্ব করে, যে বিভক্তির ফলে পাকিস্তানের জন্ম হয়েছিল। একদিকে, ভারতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের অস্তিত্ব উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বদেশ হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মূল যৌক্তিকতার সাথে বিরোধপূর্ণ। অন্যদিকে ভারত একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি হারিয়ে ফেললে তার সেক্যুলার পরিচিতি হুমকির মধ্যে পড়বে, এবং ১৮০ মিলিয়ন মুসলমানের অবস্থান নিয়ে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হবে।
কাশ্মীর এসকল দ্বন্দ্বের যোগসূত্রে অবস্থান করছে। কারণ অন্যান্য প্রিন্সলি স্টেটের মতোই, কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু তখন ভারতের সাথে একীভূত হয়ে যায় নি। ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার সময় কাশ্মীর প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং যোগাযোগ ব্যতীত অন্য সব ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছিল। ১৯৫৪ সালে ভারতের সংবিধানে সংযুক্ত ৩৫এ ধারার অধীনে কাশ্মীরের নাগরিকগণ আরো কিছু অতিরিক্ত বিশেষ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন, এর মধ্যে সম্পত্তির মালিকানা ও সরকারি চাকরি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ছিল।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের ছোটখাট ঝামেলা বাধানোর ইচ্ছা আছে, অন্ততপক্ষে ভবিষ্যতে হলেও। তবে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ হলে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কেও পাকিস্তান সচেতন রয়েছে। ভারত জানে যে, হয়তো যুদ্ধের ময়দানে পাকিস্তানকে হারাতে পারবে, কিন্তু পরবর্তীতে সীমান্তে আক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানোর  মতো যথেষ্ট ক্ষমতা তার নেই। এই সামরিক ভারসাম্য প্রাকৃতিকভাবেই চুড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে এক ধরনের স্থিতাবস্থা তৈরি করে রেখেছে।
সর্বশেষ কারণ, ভারত কার্যত নিজের তৈরি নীতি নির্ধারণী ফাঁদে পড়ে গেছে। ভারতীয় ভোটারদের নিকট তাদের সরকার দাবি করছে যে, আসলে কোন ঝামেলাই নেই। সরকারের দাবি, কাশ্মীর ভারতের অখণ্ড অংশ, তারা এ বিষয়ে বেশ জোর দিয়েছে, তাই কোন আলোচনারই দরকার নাই।  
দুনিয়াবাসীর নিকট ভারতীয় নেতারা পাকিস্তানের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি আঙুল তুলছেন, বলছেন, পাকিস্তানের সমর্থনে বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠী ভারতে সন্ত্রাসী হামলা করছে, এবং এই ইস্যুতে আলোচনাকে আন্তর্জাতিকীকরণের  যে কোন প্রচেষ্টাকে তারা প্রত্যাখ্যান করছেন। ৩৭০ বাতিলের ঘোষণার ঠিক এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প যখন কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতা করার কথা বলেছিলেন, মোদী সরাসরি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন, বরাবরে মতো সেই পুরনো বুলি আউড়িয়ে বলেছেন, কাশ্মীর ইস্যুতে যে কোন আলোচনায় কেবল মাত্র ভারত এবং পাকিস্তানই সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে, আর কেউ নয়।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত মূল লেখাটির শিরোনাম Indias Bad Bet in Kashmir। লেখক রমেশ ঠাকুর জাতিসংঘের সাবেক সহকারী মহাসচিব এবং অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্রফোর্ড স্কুল অব পাবলিক পলিসির এমেরিটার অধ্যাপক। ভাষান্তর কর্তৃক নিবন্ধটির প্রথম  অংশ বাংলায় অনূদিত এবং সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত



নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়, আল জাজিরা ইংরেজি:
ভারতের সাধারণ নির্বাচনের আগের সপ্তাহের জনমত জরিপেই দেখা গিয়েছিল, স্বচ্ছ নির্বাচন হলেও নরেন্দ্র মোদির আবার প্রধানমন্ত্রী বিজয়ী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের সাথে সামরিক উত্তেজনার পর থেকে তিনি সামরিক জাতীয়তাবাদের চূড়ায় আরোহণ করছিলেন।
তবু কেউ কেউ আশা করছিলেন শেষ পর্যন্ত হয়তো স্রোত বিরোধীদের দিকে ঘোরতে পারে। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ২৩ মে প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফল এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তার বিশ্বস্ত সহযোগী ও দলীয় প্রধান অমিত শাহের নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়েও ভালো হয়েছে: সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে তারা পেয়েছেন তিন শতাধিক আসন।
বিজেপি তাদের জোটের অন্যান্য দলকে সাথে নিয়ে জিতেছে ৩৫৩ আসন, এর ফলে গত কয়েক দশকের মধ্যে মোদিই হতে যাচ্ছেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি এক মেয়াদ সম্পূর্ণ করে আরেক বার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকারে ফিরছেন।
নির্বাচনী বিজয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদী শুধু আরেক মেয়াদ ক্ষমতাই নিশ্চিত করেন নি (আবারও তিনি তার জোটসঙ্গীদেরকে খুব কমই গুরুত্ব দিবেন), বরং সেই সাথে তিনি তাঁর হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিয়ে এগুনোর পক্ষে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সমর্থনও পেয়েছেন।
ঠিক এই জায়গাতেই ভবিষ্যতে ভারতের জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে ভয়ের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
গত মার্চে বিজেপির গেরুয়া পোশাকধারী আইন প্রণেতাদের একজন হিন্দু ডানপন্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সাক্ষী মহারাজ একটি ভীতিকর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেন, “মোদী একটি সুনামির নাম, যা পুরো দেশকে জাগিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই নির্বাচর সম্পন্ন হওয়ার পর ২০২৪ সালে আর কোন নির্বাচন হবে না।”
অনেকে এই কথার অর্থ তুলেছেন এভাবে যে আগামী পাঁচ বছরে মোদী তার ক্ষমতা এমনভাবে শক্তিশালী করবেন যে অন্য কোন রাজনৈতিক শক্তিই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হবে না। এই বক্তব্য এই ভয় তৈরি করছে যে বিজেপি হয়তো সংসদীয় ব্যবস্থাকে অনির্বাচিত ব্যবস্থা দিয়ে পরিবর্তিত করার জন্য আইনে পরিবর্তন আনার কথা বিবেচনা করতে পারে।
যদিও মহারাজের বক্তব্যকে বিজেপির বেশির ভাগ নেতা বিচ্ছিন্ন অসংলগ্ন বক্তব্য হিসেবে দেখাচ্ছেন, তবু এই বক্তব্য শাসক দলের সুদূরপ্রসারী উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়।
ঠিক এইখানে ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটা যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়, এবং এর পিছনে কমপক্ষে তিনটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মোদী এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে তিনি হিন্দু কট্টর ডানপন্থাকে বাধা দেবেন না। বিজেপি মহারাজ এবং তার মতো অসংলগ্ন মন্তব্য করার প্রবণতা আছে এমন অনেককেই পুনরায় মনোয়ন প্রদান তো করেছেই, উপরন্তু এমন একজন প্রার্থীকেও নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছে, যিনি বর্তমানে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ মোকাবেলা করছেন।
প্রজ্ঞা ঠাকুর, যিনি ২০০৮ সালের মালেগাও বোমা হামলার জন্য অভিযুক্ত, মধ্যপ্রদেশের নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন, তিনিই প্রথম ভারতীয় সাংসদ, যিনি “সন্ত্রাস” হিসেবে অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় সংসদে একটি আসন নিশ্চিত করেছেন নিজের জন্য। দেশব্যাপী ক্ষোভ সত্ত্বেও মোদীসহ বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাকে মনোনয়ন প্রদানের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
প্রজ্ঞা ঠাকুর মহাত্মা গান্ধীর ডানপন্থী ঘাতকের গুণগান করে বিজেপি নেতৃত্বকে বিব্রত করতে শুরু করেছেন, আগামী দিনে মোদীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তিনি প্রজ্ঞাকে দল থেকে বহিষ্কার করবেন কি করবেন না। তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বুঝা যাবে যে, দলের নেতৃত্ব বিভক্ত কণ্ঠে কথা বলে এবং বিজেপি তাদের দ্বিতীয় মেয়াদেও কট্টর ডানপন্থার পক্ষে সমর্থন অব্যহত রাখবে।
মোদীর বিজয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার দ্বিতীয় কারণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা সংরক্ষণের ব্যাপারে বিজেপির অতীত রেকর্ড খুব একটা ভালো নয়। প্রথম মেয়াদে বিজেপি বিচার বিভাগ ও আইন বাস্তবায়নের বিষয়ে বহুবার নাক গলিয়েছে। বিচারকগণ এবং তদন্তকারীরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতীয় গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়ের তৃতীয় কারণ হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাথে মোদীর আদর্শিক সম্পর্ক, যে সংঘ কিনা আবার বিজেপির আদর্শিক উৎসও বটে। মোদী নিজেও বহু বছর এই সংঘের সদস্য ছিলেন। আরএসএস যে মূলনীতি মেনে চলে তা হলো “এক চালক অনুবর্তীত্ব”, সংস্কৃত এ কথাটির অর্থ “এক নেতার অনুসরণ”, এই সংঘ গণতান্ত্রিক মূলনীতি পরিহার করে চলে।
মোদী নিজেও আরএসএসের আদর্শিক গুরু দীনদয়াল উপাধ্যায়ের অনুসারী, যার তত্ত্বগ্রন্থ “অখণ্ড মানবতা”, বিজেপির দার্শনিক গাইডবুকসমূহের একটি। এই অভিসন্ধর্ভে উপাধ্যায় জাতীয়তাবাদের পশ্চিমা ধারণা, পশ্চিমা সেক্যুলারিজম ও পশ্চিমা গণতন্ত্রের ভারতীয়করণের উপর জোর দিয়েছেন”। যদিও তিনি ভারতীয় গণতন্ত্রের রূপরেখার মধ্যে রাজনৈতিক আলাপকে সমর্থন করেছেন, লিখেছেন, “আমরা যদি এটাকে আরেক কট্টরপন্থায় নিয়ে যাই, তবে সেটা হয়তো সমস্যা বলে প্রতীয়মান হতে পারে।”
উপরের সব কয়টি কারণ হিন্দু কট্টর ডানপন্থার সমর্থন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসকরণ এবং অগণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি আনুগত্য  মোদীর দ্বিতীয় মেয়াদে দেশকে এক জাতির কর্তৃত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী।
খুব স্বাভাবিকভাবেই, বিজেপি মোসলমানদেরকে রাজনৈতিক স্পেস কিংবা প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে না। বিজেপির কৌশল হলো মোসলমানদেরকে রাজনৈতিকভাবে এড়িয়ে চলা এবং স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদেরকে স্বীকার না করা।

মোদী যেহেতু তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে গঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী নীতি নিয়ে এগুচ্ছেন, বহুজাতিক রাষ্ট্র ভারত ক্রমবর্ধমান হারে বিভক্ত হতে থাকবে। পুরো দেশের উপর সংখ্যা গরিষ্ঠ হিন্দুদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিজেপি দুনিয়ার সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষষ্ট্রের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে ফেলবে।
________________________________

লেখক দিল্লী ভিত্তিক লেখক ও সাংবাদিক। তার বিশেষ আগ্রহের বিষয় হলো হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতে “Should we fear for India's democracy?” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ভাষান্তর কর্তৃক গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু অনূদিত।


অদিতি শ্রীরাম, নিউ ইয়র্ক টাইমস:

রিভার অব ফায়ার (মূল উর্দু: আগ কা দরিয়া, অর্থাৎ আগুনের নদী)
কুররাতু আইন হায়দর রচিত

গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান ভিত্তিক এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশমীরে ৪০ জন সৈন্য হত্যার দায় স্বীকার করেছে। উভয় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ সামরিক শক্তি দিয়ে এ ঘটনার জবাব দিয়েছে, পুরো বিশ্ব তুমুল উত্তেজনায় অবস্থা ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেছে। এরকম উত্তেজনা ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পর থেকেই সীমান্তে অনিঃশেষ বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

এ কারণেই, কুররাতু আইনের আগ কা দরিয়া ২০১৯ সালে ঠিক তেমন প্রাসঙ্গিক, যেরকম প্রাসঙ্গিক ছিল যখন লেখিকা এই বইটি লিখেছিলেন ১৯৫৯ সালে। বইটি মূলত উর্দু, পরে ১৯৯৮ সালে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

খুব সোজা করে বললে বইটি মূলত দেশভাগ সম্পর্কে দেশভাগের আগে-পরে এদেশের মানুষের জীবন সম্পর্কে। কিন্তু হায়দার (মৃ. ২০০৭) এই একক বিষয়টিকে একটি চক্রাকার ঘটনায় (সাইক্লিকাল ফেনোমেনা) রূপান্তরিত করেছেন। যুগের পর যুগ নানা ফাটলকে সহ্য করে ইতিহাস নিজে বার বার ফিরে আসে, যতক্ষণ না পাঠক চুড়ান্ত ফাটলের কথা বুঝতে পারেন, এক দেশ ভেঙে দুই দেশ হয়ে যায় যদিও দেশটির চরিত্রে কোন বিভক্তি আসে না।

আগ কা দরিয়া”তে উপমহাদেশের ২,০০০ বছরের ইতিহাসের উপর সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে, ইতিহাসের নানা পাহাড়-উপত্যকায় আমাদেরকে ঘুরিয়ে আনা হয়েছে। বইটিতে অনেকগুলো নাম, দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম, উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে রীতিমতো তথ্যের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছে। যখনই সে বন্যার পানি গড়িয়ে যায়, হায়দারের চরিত্রগুলো স্মৃতিকাতরতায় ভুগতে থাকে, আরেক বার পানি আসলে তৃপ্ত হওয়ার আশা নিয়ে বসে থাকে। এরকম কালোচিত ভাষ্য উপস্থাপনের জন্য এ বইয়ে উদ্ভাবনী লিখন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। এতো বেশি পরিমাণে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে লেখার সময় হায়দার সাহিত্যের প্রচলিত রীতি-নীতি ও তার পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি নিঃসংকোচে বারবার তার চরিত্রগুলোকে এবং সেগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে পুনর্গঠন করেছেন, ক্লাউড আটলাস চলচ্চিত্রে যেরকম দেখা যেতো। গৌতম নামের এক বৈদিক পণ্ডিত উপন্যাসের প্রথম দিকে একজন তরুণ বাঙালি হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের চাকরিতে প্রবেশ করেন, এবং এরপর আবার ১৯৪০ এর দিকে লখনৌতে একদল ছাত্রের অংশ হিসেবে তার দেখা মিলে। তার চরিত্রটি চম্পা নামের এক নারী চরিত্রের সাথে প্রথম প্রেমে পড়ে তৃতীয় পৃষ্ঠায়, এবং ৩৪৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত প্রেমে পড়তেই থাকে। চম্পার নামটি এসেছে মূলত একটি ফুল থেকে। চম্পা চরিত্রটি যতবার মুকুলিত হয়ে আবার নির্জীব হয়ে পড়ে, প্রত্যেক বারই বইটিতে নতুন কোন ঐতিহাসিক যুগের প্রসঙ্গ চলে আসে।

যে বিষয়টি হায়দারের বইটি উপভোগ করাকে কষ্টকর বানিয়ে ফেলেছে, তা হলো তিনি তাঁর পাঠকদেরকে শ্বাস গ্রহণ করার সময় পর্যন্ত দেন নি। কখনো দেখা গেছে, এক অধ্যায়ে ১০০ বছর অতিক্রম করেছেন, আবার কখনো এক লাইনেই এরকম সময় অতিক্রম করেছেন। গ্রুপ সংলাপগুলো বন্ধুদের চায়ের আড্ডা না হয়ে একদম সিরিয়াস নাটকের সংলাপের মতো হয়ে গেছে। চিঠি ও আত্মকথনসমূহ অতিরিক্ত বাগাড়ম্বরপূর্ণ।

রিভার অব ফায়ার”কে হায়দার আগ কা দরিয়ার অনুবাদের বদলে ট্রান্সক্রিয়েশন বলেছেন, এখানে তিনি তার নিজের গল্প বলার পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। একটি চরিত্র তার পরিবারের ইতিহাস রোমন্থন করতে গিয়ে বলছেন, “আমি কীভাবে শুরু করতে পারি?এরপর বলছেন, “আমি জানি না, কোন চরিত্রগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোথা থেকে এই গল্প শুরু হয়েছিল? পরিবেশ কী ছিল? গল্পের নায়িকা কে?”

রিভার অব ফায়ার”এ সময় চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। যদিও এটা পাঠকদের জন্য পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দপূর্ণ নয়, তবে সবকিছুকে পূর্ব পরিচিত মনে হওয়ার বিভ্রান্ত সুর আলোচ্য বিষয়ের জন্য যথাযথ ছিল। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কটা চলমান আছে: আশঙ্কাজনক; পুনরাবৃত্তিমূলক এবং এই দৃশ্যের কোন সমাপ্তি নাই।
________________________________

গ্রন্থ সমালোচনাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে “An Urdu Epic Puts Indias Partition Into Historical Perspective” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখক অদিতি শ্রীরাম দিল্লীর নিকটবর্তী আশোক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

এপ্রিলের ১১ তারিখ থেকে শুরু হওয়া ভারতীয় নির্বাচন চলবে ১৯ মে পর্যন্ত। আর সে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হবে ২৩ মে। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নির্বাচনী উৎসব। ভারতীয় নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চিত্র নিয়ে আল জাজিরা ইংরেজি কয়েকটি চমৎকার তথ্যচিত্র তৈরি করেছে। ভাষান্তরের পাঠকদের জন্য সেসকল তথ্যচিত্রের বাংলা সংস্করণ তৈরি করা হলো

এক নজরে ২০১৯ সালের ভারতীয় নির্বাচন


ভারতীয় সংসদের কাঠামো ও নির্বাচন প্রক্রিয়া

কোন দফায় কত তারিখ কতটি সংসদীয় আসনে নির্বাচন হবে...
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলের সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণ নাম ও তাদের প্রতীক
________________________________

তথ্যচিত্রগুলো আল জাজিরা ইংরেজির “India elections: All you need to know” শীর্ষক নিবন্ধ থেকে সংগৃহীত ও অনূদিত। 


প্রতিবেশী ভারতে নির্বাচনী প্রচারণা এখন তুঙ্গে। সেই সাথে তুঙ্গে ভুয়া খবর তৈরির প্রতিযোগিতাও। এ নিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়াতে প্রকাশিত একটি কলামের অনুবাদ আজ থাকছে আপনাদের জন্য। কলাম বলতে ঠিক কলাম নয়, মূলত একটি সাক্ষাৎকার, এবং অতি অবশ্যই... ... ... ভুয়া! চলুন, সাক্ষাৎকারটা পড়ে ফেলি



জাগ সুরাইয়া, টাইমস অব ইন্ডিয়া:
নির্বাচনপূর্ব প্রচারণা সর্বোচ্চ গতিতে চলছে, ফলে আরেক বিশেষ উৎপাদন শিল্পেও নব-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে, সে শিল্পটি হলো: মিথ্যা সংবাদ তৈরিকরণ। ভুয়া খবরের চাহিদা এখন এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেনেজমেন্টের মতো একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সেটার নাম: ইঞ্জিনিয়াস ইনস্টিটিউট অব মিসইনফর্ম্যাশন, এ প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো শিক্ষার্থীদেরকে ভুয়া খবর তৈরি করার প্রশিক্ষণ দেওয়া।
জুগুলার ভেইন (কলামের নাম অনুবাদক) এ ইনস্টিটিউটের ডিন ডক্টর নকল বাজের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলো। ডক্টর নকল বাজ তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেক বুক  প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেটি প্রতিদিন ৩০,৭১৩,৫৬৮ বার ভিজিট হয়ে থাকে।

জুগুলার ভেইন:  ড. নকল বাজ, আমাকে বলুন, আপনি কীভাবে জনসাধারণকে আশ্বস্ত করেন যে আপনার তৈরি ভুয়া খবরটি আসলে সঠিক খবর?
ড. নকল বাজ: খুবই সহজ। আপনি সংবাদের শুরুতে লিখে দেবেন ‘উচ্চ পর্যায়ের সরকারি সূত্র অনুসারে’।

জু.ভে:  উচ্চ পর্যায়ের সরকারি সূত্রকে দিয়ে আপনি কীভাবে আপনার খবরটি সত্যায়িত করেন?
ড. নকল:  সহজ বিষয়। আপনি একটা বড় মই নিয়ে সেটার উপর সরকারি ক্যান্টিনের চা-বালককে আরোহণ করিয়ে তাকে কিছু ঘোষ-টোস দিয়ে আপনি যে ভুয়া খবরটি ছড়াতে চাচ্ছেন, সেটি তাকে দিয়ে বলিয়ে নিন। ব্যস, আপনার খবরটি ‘উচ্চ পর্যায়ের সরকারি সূত্র’ কর্তৃক সত্যায়িত হয়ে গেলো।

জু.ভে.:  বাহ্! আর কিছু?
ড. নকল:  হ্যাঁ। আপনি সবসময়ই বলতে পারেন ‘নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুসারে’। তারপর আপনি এমন একজনকে খোঁজে নিন, মিথ্যা বলা যার অভ্যাস, এবং সবসময় যিনি মিথ্যা বলার ব্যাপারে সবসময়ই নির্ভরযোগ্য, তিনিই আপনার নির্ভরযোগ্য (reliable) সূত্র অথবা বলতে পারেন ‘re-lie-ableসূত্র, মানে পুনঃমিথ্যার উপযুক্ত সূত্র আরকি।

জু.ভে.:   চমৎকার। মিথ্যা খবরকে সত্য বানানোর আর কোন উপায় আছে?
ড. নকল:  অবশ্যই আছে। আপনি আপনার খবরে বিশেষণ জুড়ে দিতে পারেনি ‘একজন বিশেষজ্ঞের মতে’, তবে তিনি কোন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ সেটা উল্লেখ করার দরকার নাই। আমি সাধারণত আমার দাদিমাকে আমার ভুয়া খবরের উৎস বানাই। তিনি সবচেয়ে ভালো সুজির হালুয়া তৈরি বিশেষজ্ঞ এমন হালুয়া বানাতে পারেন, খাইলে বুঝবেন!

জু.ভে:  সুন্দর। কিন্তু এখন যে আপনি কীভাবে ভুয়া খবরকে আসল খবর বানান, সেটা ফাঁস করে দিলেন, আপনার কি ভয় হয় না যে আমি সবকিছু সবাইকে জানিয়ে দেব?
ড. নকল:  যা খুশি করুন। আমি বলবো যে আপনি আমার সম্পর্কে যা লিখছেন সব ভুয়া, এবং আমার দাবি প্রমাণের জন্য আমি আমার দাদিমার কাছে ফিরে যাব ...


সতর্কীকরণ: এটি শুধুমাত্র পাঠকদের একটু হাসানোর জন্য লেখা। কোন বাস্তব ঘটনা বা চরিত্রের সাথে এর কোন ধরণের সাদৃশ্য পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয়!
________________________________

সাক্ষাৎকারটি টাইমস অব ইন্ডিয়ায় “Lets fake it: How to turn nakli news into asli news in three simple steps 😜শিরোনামে প্রকাশিত।


শশী থারুর, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ভারত সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কাজেই এ মহাযজ্ঞের আকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়া কোনভাবেই উচিত নয়, কারণ এটিকে আখ্যায়িত করা হয়ে “মানবিক ব্যবস্থাপনায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঘটনা” হিসেবে। ১১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ২৩ মে শেষ হতে যাওয়া এই নির্বাচনে ৯০০ মিলিয়ন উপযুক্ত ভোটার (যাদের মধ্যে ১৫ মিলিয়ন হলেন প্রথম বারের ভোটার) পাঁচ শতাধিক রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্বকারী প্রায় ১০,০০০ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন, যারা লোক সভার ৫৪৫টি আসনের জন্য লড়ছেন। ভারতের প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনই পূর্ববর্তী নির্বাচনের রেকর্ড ভঙ্গ করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ইভেন্টের স্বীকৃতি লাভ করে। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, পূর্বের ১৬ টি লোকসভা নির্বাচনের কোনটিই এবারের নির্বাচনের মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
নির্বাচন এপ্রিলের ১১ তারিখ থেকে মে মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত মোট সাত দফায় অনুষ্ঠিত হবে এবং ২৩ মে’র মধ্যে সকল ব্যালট গণনা করা হবে। উত্তর প্রদেশের (এ রাজ্য থেকে লোক সভায় ৮০জন সাংসদ নির্বাচিত হয়ে থাকেন) মতো বড় বড় রাজ্যগুলোর নির্বাচন প্রত্যেক দফায়ই অনুষ্ঠিত হবে, অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচন এক দিনেই সমাপ্ত হবে। আমার নিজের সংসদীয় আসন তিরুবন্তপুরম, দক্ষিণাঞ্চলীয় কেরালা রাজ্যের রাজধানী, যেখানে আমি তৃতীয় বারের মতো ভোট প্রার্থনা করছি, সেখানে তৃতীয় দফায় ২৩ এপ্রিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, এ দিনে ১৪ টি রাজ্যের আরো ১১৪টি আসনের নির্বাচন হবে।
এই মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ভারতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) ১ মিলিয়ন ভোট পোলিং কেন্দ্র এবং ২.৩৩ মিলিয়ন ব্যালট ইউনিট স্থাপন করবে। নির্বাচন কমিশন ১১ মিলিয়ন কর্মী নিয়োগ করবে (যাদের অনেককেই বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে ধার নেওয়া হবে), তারা সর্বশেষ ভোটার অবধি পৌছার জন্য বাস-ট্রেন থেকে শুরু করে হাতি কিংবা উট পর্যন্ত যে কোন যোগাযোগ মাধ্যমে সফর করবেন। ইসিআইর নিজস্ব সিদ্ধান্ত, কোন ভোটারকে ভোটেকেন্দ্রে পৌছার জন্য দুই কিলোমিটারের বেশি দূর যেতে হবে না, এটির ফলে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। গত নির্বাচনে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের একটি বনে একজন আবাসিক ভোটারের জন্য একটি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করতে হয়েছিল। আরেকটি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করতে হয়েছিল হিমালয় পাহাড়ে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৪,৫০০ মিটার (১৫,০০০ ফুট) উপরে, যা কিনা পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভোট কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।
ভারতীয় গণতন্ত্রের এই পঞ্চবার্ষিকী উৎসবের উদ্দীপনা, খরচা ও অন্যান্য সকল পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও, ভোটারদের অংশগ্রহণ মূল উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে। ১৯৫২ সালের পর থেকে হিসেব করলে ২০১৪ সালের নির্বাচনসমূহে সবচেয়ে বেশি ভোটার অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু সেটাও ছিল মোট ভোটারের মাত্র ৬৬.৪ শতাংশ। আমি একটি অনানুষ্ঠানিক টুইটার জরিপে এরকম ফলাফলই পেয়েছি, মাত্র ১৫,০০০ হাজার অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাত্র ৬৬% অংশগ্রহণকারী বলেছেন যে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য তারা নিবন্ধিত হয়েছেন, এবং তারা ভোট দিতেও আগ্রহী।
এ বিষয়টি উদ্বেগজনক। সচেতনভাবে ভোট দান প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে ভারতের মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশই নিজেদের অজান্তে দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণে নিজেদের দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকছেন এবং এ অসংখ্যাটি অনেক বেশি হওয়াতে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই।
গত পাঁচ বছরে ভারতে প্রচুর পরিমাণে সরকারের ভূল নীতি ও বায়বীয় বক্তৃতা সামনে এসেছে। আচ্ছে দিন (ভালো দিন) এবং একটি নতুন ভারত সম্পর্কে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সকল বড় বড় কথা সত্ত্বেও, করুণ বাস্তবতা হলো: নয়া দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন সাধারণ মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সাম্প্রতিক রাজ্য সভার নির্বাচনসমূহের ফলাফলে দেখা যায়, জনগণ বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করছে, তা থেকে এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যায়।
দেশের বর্তমান অবস্থায় ভোটারদের অসন্তুষ্টিতে বিস্মিত হওয়ার কোন কারণ নেই। দেশ জুড়ে কৃষি দুর্ভোগ বিরাট আকার ধারণ করেছে: রেকর্ড সংখ্যক কৃষক আত্মত্যা করছেন, কৃষকরা দেশজুড়ে তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার কর্তৃক গৃহীত অনুপযুক্ত উদ্যোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। একই ভাবে, একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে যে, বেকারত্ব ৪৫ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবস্থায় পৌছেছে, সে প্রতিবেদন ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সরকার যে আপ্তবাক্য প্রতিনিয়ত জপ করছে, সেটি উল্টো সরকারি জিডিপি বৃদ্ধির পরিসংখ্যানের প্রতি এক ধরনের অবিশ্বাস প্রবণতার ইন্ধন জোগাচ্ছে। ২০১৬ সালে মুদ্রারহিতকরণ পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া এবং এর অদক্ষ বাস্তবায়নের ফলে সৃষ্ট অসুবিধার পর অর্থনীতি এমন এক গোলক ধাঁধায় প্রবেশ করেছে যে কোন ধরনের তথ্য-উপাত্তের ছল-চাতুরিই বিজেপিকেআরেক বারের জন্য সুযোগ করে দেবে না।
সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে এবং ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য সর্বশেষ বাজেটে অনেকগুলো অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে এর মধ্যে রয়েছে কৃষকদের জন্য আয় সহায়তা প্রকল্প এবং কর থেকে অব্যহতি প্রাপ্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি ইত্যাদি। কিন্তু জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য এগুলো খুবই অল্প, আর উদ্যোগ নিতে দেরিও হয়ে গেছে প্রচুর।
কাজেই এখন বিজেপি পুলওয়ামাতে সংগঠিত জয়শ-এ-মোহাম্মদের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলাকে (যে হামলায় ৪০ জন ভারতী আধা সামরিক সৈন্য নিহত হয়েছেন এবং জয়শের মূল ভিত্তিভূমি পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে) পুঁজি করে নিজেকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে কার্যকর রক্ষাকারী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে। দায়িত্ব পালনে নিজেদের ব্যর্থতা থেকে ভোটারদের দৃষ্টি সরানোর অসম্ভব প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিজেপি আসন্ন নির্বাচনকে একটি খাকি গণভোটে রূপান্তরিত করার আশা করছে। যাতে দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রতিদিনের ভীতিকে আড়াল করে দেবে সীমান্তের সহিংসতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা।
ভারতীয় ভোটারদেরকে অবশ্যই দুটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর মাঝে একটি সিদ্ধান্ত অবশ্যই লোক সভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব কে করবেন, সেটা ঠিক করা। কিন্তু ভোটারদেরকে তার চেয়েও মৌলিক যে সিদ্ধান্তটি নিতে হবে, তা হলো: তারা কি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত চায়, যেটি আশাকে ধারণ করবে, নাকি তার বিভিক্ত ভারত চায়, যেটি ভীতি ছড়াবে?
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “A Battle for Indias Soul” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। লেখক কংগ্রেস নেতা এবং ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত।



অবিনাশ গদবলে, এশিয়া টাইমস:
আগে থেকেই যেমনটা আশা করা হচ্ছিল, চীন আবারো জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে ভেটো দিয়ে জাতিসংঘের নিষিদ্ধ তালিকায় মাসুদ আযহারকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে একটি রেজুলেশন আটকিয়ে দিয়েছে। নিকট অতীতে এরকম “টেকনিক্যাল হোল্ড” হিসেবে চীনের দেওয়া ভেটোসমূহের মধ্যে এটি চতুর্থ। চীনের এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় যে, সন্ত্রাস ভারতের নিজস্ব জাতীয় সমস্যা এবং চীনের বৈশ্বিক “সন্ত্রাস” নীতি ও তার দক্ষিণ এশিয়া নীতির ফারাক এখনো বহাল আছে।
তাছাড়াও, এমনকি ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশমীরের পুলওয়ামার সন্ত্রাসী হামলা, যাতে প্রায় ৪১ জন মারা গেছেন, তাতেও ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে চীনের অবস্থানে কোন কার্যকর পরিবর্তন আসে নি। এটা থেকে মনে হয় যে উদীয়মান বিশ্ব শক্তি হিসেবে চীনের দায়িত্বশীলতার তুলনায় পাকিস্তানের সাথে “সাগরের চেয়েও গভীর” সম্পর্কই চীনের জাতীয় স্বার্থে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাপী দীর্ঘকাল ধরে চলা সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ”র সময়ে ভারত সুযোগ কাজে লাগাতে পারে নি। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ সালের হামলার ফলাফলস্বরূপ আমেরিকা তার শত্রু-মিত্রদের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক তৈরি করতে “সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ” পরিভাষাটি চালু করেছিলো। ভারত এ যুদ্ধকে বিবেচনা করেছিলো আফগান ও ইরাকে বাস্তব ও কল্পিত শত্রুদের বিরুদ্ধে আমেরিকার লড়াই হিসেবে। এ যুদ্ধ চলাকালে আমেরিকা পাকিস্তানকে ন্যাটোর বাইরের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করার নীতি অব্যহত রেখেছিল। এমনকি পাকিস্তান আমেরিকার তরফ থেকে ভালো রকমের সহযোগিতাও পেয়েছিল, সেসকল সহযোগিতার কিছু অংশ ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃতও হয়েছে, যেমন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সাম্প্রতিকইবমান হামলাতেও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নির্মিত এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হয়েছে।
এখন চীন আছে পাকিস্তানের পাশে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) মাধ্যমে অর্থই নতুন সম্পর্কের মূল কারণ, যেটি কিনা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মূল ফ্ল্যাগশিপ। চীন কর্তৃক প্রতিশ্রুতিকৃত ৬২ মিলিয়ন ডলার হয়তো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দেবে না, কিন্তু এটি পাকিস্তানকে নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কে নতুন বোধ তৈরি করে দেবে। পাকিস্তানের জন্য, কোন বড় শক্তির খদ্দের রাষ্ট্র হয়েও যে সেখান থেকে ফায়দা হাসিল করার সক্ষমতা যে পাকিস্তানের আছে, সিপিইসি তার উদাহরণ। আর চীনের জন্য, সিপিইসি এমন এক জাদুর গুলি, যেটা সে শুধু পাকিস্তানেই তার স্বার্থ হাসিলে সহযোগিতা করবে না, বরং আফগানিস্তান, ভারত সাগর, ইরান এবং অভ্যন্তরীণভাবে জিনজিয়াঙেও নিজ স্বার্থ হাসিল করতে সহযোগিতা করবে।
দিল্লিতে অনেকেই বিশ্বাস করছিলেন যে, জাতিসংঘের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সে সহসভাপতি হতে চীনকে ভারত যে সহযোগিতা করেছিলো, সেটা মাসুদ আযহারের বিষয়ে চীনের অবস্থান পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে। যাই হোক, এটা এখন স্পষ্ট যে বাস্তবে এরকম হয় নি। ভারতের তরফ থেকে যে ইস্যুতে সবচেয়ে ভালো রকমের দর-কষাকষি চীন আশা করেছিলো, সেটি হলো বিআরআইতে অবশেষে ভারতের যোগদানের ইচ্ছা। কিন্তু ভারত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিআরআই বিরোধীদের পতাকাবাহী হিসেবে তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন। শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, উগান্ডা এবং এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করছে বলে মনে হচ্ছে। কাজেই এই ভিত্তিতে “কোন কিছুর বিনিময়ে অন্য কোন কিছু দাবি করাটা” বাস্তবে অসম্ভব।
তাহলে বর্তমান অবস্থায় ভারতের হাতে বিকল্প কী আছে? ভারতের দিক থেকে একটা বাস্তববাদী জায়গা থেকে যুক্তি দেখানো হতে পারে যে, চীনের আরেকটি ভেটো দানের নীতি জয়শ-এ-মোহাম্মদের বালাকোট ক্যাম্পে ভারতের অগ্রীম প্রতিরক্ষামূলক হামলাকে ন্যায্য প্রমাণ করে। কাউকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার বা নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জাতিসংঘের যে প্রক্রিয়াটি রয়েছে তা আসলে ভেঙে পড়েছে এবং কেবলমাত্র বড় শক্তিধরদের স্বার্থ রক্ষা করছে।  

________________________________

এশিয়া টাইমসে “Depth of Chinas ties with Pakistan costs Indiaশিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধের আংশিক বাংলা অনুবাদ। ছবি: এশিয়া টাইমস থেকে সংগৃহীত।



রবার্ট ফিস্ক, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট:
প্রথম যখন আমি খবর শুন, আমি ভেবেছিলাম এটা মনে হয় গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলার খবর। অথবা সিরিয়ার কোন খবর হবে বোধ হয়। এ খবরের প্রথম অংশ ছিল: একটি “সন্ত্রাসী ক্যাম্পে” বিমান হামলা, “একটি নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে, অনেক “সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। একটি সেনাবাহিনী তার সৈন্যদের উপর "সন্ত্রাসী হামলার" প্রতিশোধ নিচ্ছিল, এমনটাই বলা হচ্ছিল।
এক ইসলামি জিহাদি গোষ্ঠীর মূল ঘাটি ধ্বংস করা হয়েছেএরপর আমি শুনতে পেলাম বালাকোট শহরের নাম, এবং বুঝতে পারলাম ঘটনাটি গাজায় নয়, সিরিয়াতেও নয়, এমনকি লেবাননেও নয়, বরং পাকিস্তানে ঘটেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, কীভাবে কেউ ভারতকে পাকিস্তানের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে?
ভালো কথা, এই ধারণাকে ফ্যাকাশে করে ফেলার দরকার নেই। তেল আবিবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আর নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আড়াই হাজার মাইলের দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও এদের উভয়ের কাজে একই রকম ছাপ পাওয়ার পিছনে একটা কারণ আছে।
কয়েক মাস ধরে এভাবেই ইসরায়েল ভারতের বিজেপি সরকারকে সাথে নিয়ে একটি অঘোষিত, অজ্ঞাত, অস্বীকৃত, অনানুষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিকভাবে ভয়ঙ্কর “ইসলাম বিরোধী” জোট গড়ে তুলছে, যার ফলে ভারত এখন ইসরায়েলের অস্ত্র বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।
সুতরাং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জয়শ-এ-মোহাম্মদের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে হামলায় ইসরায়েল কর্তৃক নির্মিত স্পাইস-২০০ “স্মার্ট বম্বস” ব্যবহার করার বিষয়টি যে জোরে-সুরে জানাচ্ছিল, তা কোন আকস্মিক ঘটনা নয়।
এরকম লক্ষ্যে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের আত্মশ্লাঘার মতোই ভারতও আত্মশ্লাঘা অনুভব করছে। কাজেই তাদের সামরিক সাফল্যের চেয়ে কল্পনাই বেশি কাজ করছে। কাজেই ইসরায়েল কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ও সরবরাহকৃত জিপিএস নিয়ন্ত্রিত বোমা দ্বারা “৩০০-৪০০” সন্ত্রাসী নির্মূল থেকে বিষয়টি কয়েকটি গাছ-পাথর নির্মূলে পরিণত হবে সম্ভবত।
কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরে জয়শ-ই-মোহাম্মদ কর্তৃক প্রচণ্ড অ্যাম্বুশ কোন অবাস্তব ঘটনা নয়, এবং সেই অ্যাম্বুশে ৪০ ভারতীয় সৈন্য নিহত হওয়াটাও কোন অবাস্তব বিষয় নয়। অন্তত একটি ভারতীয় বিমান যে গত সপ্তাহে ভূপাতিত হয়েছে, সেটাও কোন অবাস্তব ঘটনা নয়।
২০১৭ সালে ভারত ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের খদ্দের, ভারতের কাছ থেকে ইসরায়েল বিমান প্রতিরক্ষা, রাডার সিস্টেম, গোলাবারুদ, বিমান বাহিনীর গোলাবারুদ প্রভৃতি খাতে প্রায় ৫৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আদায় করে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের আক্রমণের সময় পরীক্ষা করা হয়।
ইসরায়েল নিজে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নিকট অব্যাহতভাবে ট্যাংক, অস্ত্র নৌকা প্রভৃতি বিক্রির বিষয়ে একটি অজুহাত দাঁড় করাতে চাচ্ছে, যেখানে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমারা অবরোধ আরোপ করতে চাচ্ছে, রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের নির্মূল করার অভিযোগে। কিন্তু ভারতের সাথে ইসরায়েলের অস্ত্র ব্যবসা বৈধ, উভয়পক্ষই ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে ব্যবসা করছে।
ইসরায়েল নেগেভ মরুভূমিতে তাদের নিজেদের বিশাল কমান্ডো আর ভারতের প্রশিক্ষণার্থী কমান্ডোদেরকে মিশিয়ে রেখেছে। এই অভিজ্ঞতাও ইসরায়েল অর্জন করেছে গাজা এবং অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে।
৪৫টি ভারতীয় সামরিক প্রতিনিধি দলের অংশ অন্তত ১৬ জন ভারতীয় “গারুদ” কমান্ডো একটা সময় ধরে ইসরায়েলের নেভাতিম ও পালমাচিম এয়ার বেজে ছিল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেন ইয়ামিন নেতিনিয়াহু গত বছর তার প্রথম ভারত সফরে ২০০৮ সালে ইসলামি জঙ্গীদের মুম্বাই হামলার কথা স্মরণ করেন, যে হামলায় ১৭০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলো। “ভারতীয় ও ইসরায়েলিরা সন্ত্রাসী হামলার কষ্ট খুব ভালো করে জানে,” তিনি মোদিকে বলেন। নেতিনিয়াহু আরো বলেন, “ আমরা ভয়ানক মুম্বাই হামলার কথা স্মরণ করি। আমরা দাঁত কামড়ে ধরে লড়াই করি, কখনোই হাল ছাড়ি না।” বিজেপির বক্তব্যও একই রকম ছিল।  
যদিও অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক সতর্ক করে করে বলেছিলেন, ডানপন্থী জায়নবাদ এবং মোদির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জাতীয়তাবাদ কখনোই দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে পারে না, যেখানে উভয় দেশই যদিও ভিন্ন উপায়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অতীতে লড়াই করেছে।

ব্রাসেলস ভিত্তিক গবেষক শাইরি মালহত্রা, যার গবেষণাকর্ম ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজে প্রকাশিত হয়েছে, তিনি উল্লেখ করেছেন যে ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের (মূল নিবন্ধে পাকিস্তান বলা হয়েছে, তবে বাস্তবে বাংলাদেশ হবে) পর ভারতে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস, যাদের সংখ্যা ১৮০ মিলিয়নেরও বেশি। গত বছর তিনি লিখেন, “ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কও মূলত ক্ষমতাসীন বিজেপি-লিকুদ পার্টির আদর্শিক মিলের পরিপ্রেক্ষিতেই তৈরি হচ্ছে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা “ঐতিহাসিকভাবে মুসলমানদের হাতে হিন্দুদের নির্যাতিত হওয়ার বয়ান” তৈরি করেছে, যা সেসকল হিন্দুদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় ধারণা, যারা দেশ ভাগ ও তার পরবর্তী পাকিস্তানের সাথে চলমান খারাপ সম্পর্কের কথা মনে রাখে।
আসলে হারেৎজে মালহত্রা যেমনটা উল্লেখ করেছেন, “ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ভক্ত গোষ্ঠী ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে, যারা প্রাথমিকভাবে ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরায়েলিদের আচরণ এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কারণে ইসরায়েলকে ভালোবাসে।
মালহত্রা কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভিভেক দেহেজিয়ার প্রস্তাবের নিন্দা করেন, ভিভেক ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি “ত্রিপক্ষীয়” জোটের প্রস্তাব করেন, কারণ (তার মতে) এ তিনটি দেশই “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ দ্বারা আক্রান্ত।”
বাস্তবে ২০১৬ সালের শেষ অবধি ভারত থেকে মাত্র ২৩ জন আইসিসের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য দেশ ত্যাগ করেছেন, যেখানে বেলজিয়ামে মাত্র অর্ধ মিলিয়ন মুসলমান জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও আইসিসে সে দেশ থেকে প্রায় ৫০০ যোদ্ধা যোগ দিয়েছে।
মালহত্রা তাই মনে করেন, ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক তথাকথিত আদর্শ ভিত্তিক না হয়ে প্রায়োগিক হওয়া উচিত।
কিন্তু জায়নবাদী জাতীয়তাবাদ হিন্দু জাতীয়তাবাদের সাথে মিলবে না, এমনটা আশা করা কঠিন, যেখানে ইসরায়েল ভারতের জন্য প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করছে, তন্মধ্যে সর্বশেষ অস্ত্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ইসামপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। তার উপর ভারত-ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক চলে আসছে ১৯৯২ সাল থেকে।
________________________________

নিবন্ধটি লিখেছেন বিখ্যাত মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। যুক্তরাজ্যের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা থেকে ভাষান্তর নিবন্ধটির গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ অনুবাদ করেছে। ছবি পাকিস্তানের দ্য ডন পত্রিকা থেকে সংগৃহীত।

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.