Articles by "ভারত"

ভারত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের পর নয়াদিল্লিতে আইনটির সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যকার সংঘর্ষের পর পুড়ে ধ্বংস হওয়া আবাসিক এলাকা ও দোকানপাটের দিকে তাকিয়ে আছেন এক বাসিন্দা। সাজ্জাদ হুসাইন/এএফপি

আল জাজিরা ইংরেজি:
নয়াদিল্লিতে তিন দিনের সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত ও ১৮৯ জন আহত হয়েছেন। হাসপাতালে গুরুতর আহতদের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, তাতে নিহতের সংখ্য আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। ঘটনাক্রমে এ ঘটনাটি ভারতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের সময়কালেই ঘটেছে।
নয়া নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত মুসলমানদের উপর হিন্দুদের আক্রমণের পর থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সমালোচকরা বলছেন, এতে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থানের লঙ্ঘন হয়েছে।
বুধবারেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া এলাকাগুলোতে উত্তেজনা বিরাজ করছিল, বেশির ভাগ দোকান-পাট এবং স্কুল বন্ধ ছিল। মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল নেতৃত্বাধীন দিল্লি সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানিয়েছে, যেহেতু মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে খোদ পুলিশের বিরুদ্ধে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় সহিংসতা এড়াতে জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করে উলটো তিনদিন ধরে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে ব্যস্ত থাকায়ে তিনি সমালোচিত হচ্ছেন। 

১. 
দিল্লিতে সংঘর্ষের পর পুড়িয়ে দেওয়া গাড়ি দেখছে শিশুরা। রূপক দে চৌধুরী / রয়টার্স

২. 
মঙ্গলবার সহিংস আন্দোলনকারীদের আগুনে চান্দবাগের একটি পুড়ে যাওয়া চাকার বাজারে হাঁটছে এক অগ্নিনির্বাপণ কর্মী। আদনান আবিদি / রয়টার্স

৩. 
দাঙ্গাকবলিত এলাকায় একটি অবস্থান ধর্মঘট চলাকালে জনৈক মহিলা এক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে কথা বলছেন। দানিশ সিদ্দিকি / রয়টার্স

৪. 
ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা একটি দোকান বন্ধ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। রাজেশ কুমার সিংহ / এপি ফটোজ

৫. 
পুলিশি প্রহরায় নয়াদিল্লির দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকা ছাড়ছে এক পরিবার। মনীষ স্বরূপ / এপি ফটোজ

৬. 
মঙ্গলবারে অগ্নিসংযোগকৃত একটি চাকার দোকানে আগুন নেবানোর সময় উদ্ধারকারী  গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েক জন অগ্নিনির্বাপণকর্মী। প্রকাশ সিংহ / এএফপি

৭. 
পুড়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ দেখছে লোকজন। সাজ্জাদ হুসাইন / এএফপি

৮. 
পুড়ে যাওয়া একটি মসজিদ থেকে উদ্ধারকৃত পবিত্র কুরআনের কপিসমূহ দাফন করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সাজ্জাদ হুসাইন / এএফপি

৯. 
আশোকনগরে পুড়ে যাওয়া একটি মসজিদ ও দোকানপাটের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক লোক মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। সাজ্জাদ হুসাইন / এএফপি

––––––––––––––––––––––––––––––––
দিল্লিতে সংগঠিত ভয়াবহ সহিংসতার ছবি ও ক্যাপশন আল জাজিরা ইংরেজি থেকে সংগৃহীত।



আসিম আলী, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত মঙ্গলবার দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বড় ধরনের পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ট সহযোগী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হিন্দু জাতীয়তাবাদকে সামনে রেখে বিভেদমূলক সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালিয়েছিলেন, মুসলমানদেরকে দেশের জন্য ভয়ঙ্কর এবং আম আদমি পার্টি (আপ) ও দলটির নেতৃবৃন্দকে দেশদ্রোহী হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন।
তবু দিল্লির ৭০ আসনের মধ্যে মোদি ও অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন বিজেপি জিতেছে মাত্র আটটি আসনে, আর ২০১৫ সাল থেকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বাধীন আপ জিতেঝে ৬২ আসন।
দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কর্মী থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া কেজরিওয়াল মূলত তাঁর দলের অবদানের বিষয়কে সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়েছিলেন পাবলিক হাসপাতাল পরিষেবায় যে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা ও বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ এবং দিল্লির বিদ্যুতের মূল্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি যা করেছেন, সেসবের ভিত্তিতেই প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেজরিওয়ালের অবদানের কারণে দিল্লি তাঁকে বেছে নিয়েছে। অথচ বিজেপি পুরো শহর মোদীর ছবি দিয়ে মুড়িয়ে ফেলেছে, কিন্তু কেজরিওয়াল বা তাঁর দলের প্রার্থীদের তুলনায় যোগ্যতর কোন প্রার্থীকে তারা দেখাতে পারেনি।
মোদী এবং তার দল হয়তো একটি নির্বাচনে হেরেছে মাত্র, কিন্তু আদর্শিক যুদ্ধে তাঁরা জিতে গেছে। নির্বাচনী রাজনীতিতে তারা এ কথাটি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে যে, ভারতে নির্বাচনে জিততে হলে এখন আর নাগরিক সমতা এবং ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকারের পক্ষে কিংবা সহিংসতা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কথা বলে পার পাওয়া যাবে না।
দিল্লির নির্বাচন এমন এক সময়ে হয়েছে যখন পুরো ভারতজুড়ে গত ডিসেম্বরে মোদী সরকার কর্তৃক পাসকৃত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, যেটি ধর্মকে নাগরিকত্বের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। নতুন আইন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের সৃষ্টি করে এবং ভারতকে কর্তৃত্ববাদী হিন্দ জাতিতে রূপান্তরিত করার হিন্দু জাতীয়তাবাদী অ্যাজেন্ডা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে নেয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জোর দিয়ে বলেছেন যে, নতুন নাগরিকত্ব আইনের পর জাতীয় নাগরিকপুঞ্জি বা এনআরসি প্রণয়ন করা হবে, তখন নাগরিকদেরকে নিজেদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণে কাগজপত্র জমা দিতে হবে। ভারতের মুসলমানগণ ও উদারতাবাদীদের আশঙ্কা এনআরসি মুসলমানদের নাগরিকত্ব বাতিলের একটি সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
গত দুই মাস ধরে নাগরিকত্ব আইন ও আসন্ন এনআরসির বিরুদ্ধে আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে দরিদ্র মুসলিম বসতি অবধি, দূর সীমান্তের রাজ্য থেকে তারকাখচিত বলিউড অবধি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ মোদী সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দিল্লির পুলিশ জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার শিক্ষার্থীদের উপর সহিংস আক্রমণ চালায়, যে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রচুর মুসলিম শিক্ষার্থী রয়েছে। এ ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন মুসলিম বসতি শাহীনবাগের শ্রমিক শ্রেণির নারীরা নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা বন্ধ করে ফেলেন। রাস্তায় একটি তাঁবু স্থাপন করা হয় এবং আন্দোলনটি দ্রুতই বেপরোয়া হয়ে পড়ে।
দ্রুতই আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, নাগরিকত্ব আইনবিরোধী সব ধরনের লোকজন শাহীনবাগে এসে সংহতি প্রকাশ করেন। তীব্র শীতের দুটি মাস কেটে গেছে; কিন্তু নারীরা শীত ও হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের আক্রমণ সত্ত্বেও তাদের আন্দোল অব্যহত রাখেন।
দিল্লির নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে মোদী সাহেবের দল শাহীন বাগকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে এবং আন্দোলনকারীদের মুসলমানিত্বের উপর জোর দিয়ে নগরীর হিন্দুদেরকে ভীত করে তুলতে চেষ্টা করে। ইসলামোফোবিয়ার বয়ান মোদী সাহেবের ভারতে স্বাভাবিক হয়ে গেছে, কিন্তু দিল্লির প্রচারণা সেটিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। শাহ সাহেব, যিনি কিনা বিজেপির সভাপতিও বটেন, তিনি সমর্থকদের নিকট যে সুরটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটি হলো ইভিএমে বিজেপির প্রতীকের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সেটি শাহীন বাগের আন্দোলনকারীরা (যাদের বেশির ভাগ মুসলিম) আরো উদ্দীপ্ত হবে।
দিল্লির একটি মিছিলে শাহ সাহেবের সহকর্মী ও ভারতের অর্থপ্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর এক ভয়াবহ স্লোগান শুরু করেন: “এরা জাতির বিশ্বাসঘাতক, এদের গুলি কর!তার কিছুদিন পর দুই হিন্দু জাতীয়তাবাদী জামিয়া মিল্লিয়ার ছাত্র আন্দোলন ও শাহিনবাগে গুলি করে।
মোদী সাহেবের দলের আরেক সংসদ সদস্য পরবেশ বর্ম শাহীন বাগের আন্দোলনকারীদেরকে খুনি এবং ধর্ষক আখ্যায়িত করে হিন্দুদেরকে ভয় দেখিয়ে বলেন: “তারা আপনাদের ঘরে প্রবেশ করবে, আপনাদের বোন এবং কন্যাদেরকে ধর্ষণ করবে এবং তাদেরকে হত্যা করবে। এখনো সময় আছে। এরপর আর মোদীজি এবং অমিত শাহ আপনাদেরকে রক্ষা করতে আসবেন না।” দলটির অন্য নেতারা শাহিনবাগকে পাকিস্তানের সাথে তুলনা করেন এবং দিল্লি নির্বাচনকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার প্রতিযোগিতা হিসেবে চিত্রায়িত করেন।
কেজরিওয়াল সাহেব নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, এটিকে তিনি অর্থনীতিতে মোদী সাহেবের ব্যর্থতা থেকে জনগণের নজর অন্য দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বয়ান এড়িয়ে গেছেন এবং মুসলমানদের উপর আক্রমণের বিষয়টিও উপেক্ষা করেছেন।
পুলিশ যখন জামিয়া মিল্লিয়াতে ঢুকে ছাত্রদের উপর আক্রমণ করলো, কেজরিওয়াল সাহেব কয়েক দিন ধরে এ বিষয়ে নীরবতা পালন করেন। তাঁকে যখন দিল্লির আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো, তিনি ঘোষণা করেন দিল্লি পুলিশ যদি কেন্দ্রী সরকারের অধীনে না হয়ে তাঁর সরকারের অধীনে থাকতো, তাহলে তিনি দুই ঘণ্টার মধ্যে শাহিনবাগের রাস্তা পরিস্কার করতেন।
নিজের হিন্দুত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি জনসম্মুখে হিন্দু ধর্মীয় প্রার্থনা করেন, এবং নির্বাচনে বিজয়ের ভাষণের পরপর একটি মন্দিরে গমণ করেন। আসলে তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের নির্ধারণ করে দেওয়া সীমার ভিতরে থেকে কাজ করেছেন এবং তাদের রাজনীতিরই তুলনামূলক শিথিল সংস্করণকে নিজের জন্য গ্রহণ করেছেন।
দিল্লি নির্বাচন থেকে বুঝা যায়, ভারত এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে আদর্শিক পরিভাষা ও রাজনীতির ভাষা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা নির্ধারিত। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কোন না কোন ভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও উগ্রদেশপ্রেমের যে কোন এক রূপকে ধারণ করতে হবে, যার মূল নজির পেশ করেছেন মোদী সাহেব।
মোদীর ঐকমত্য এ কথা নিশ্চিত করেছে যে ভারতে মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে শুধুই শক্তিহীন নয়, বরং অদৃশ্যও বটে। স্বাধীনতার তেয়াত্তর বছর পর এখনো ভারতের মুসলমানরা সমান নাগরিকত্বের জন্য লড়াই করছে। আমরা এখন চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সমতা অর্জনের জন্য নয়, বরং শুধু আইনি সমতা অর্জনের জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করে চলছি।
নয়া নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন মূলত আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হওয়া কিংবা নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কারই প্রকাশ। নির্বাচনে বেশির ভাগ নাগরিক যেখানে তাদের বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভোট দেয়, ভারতীয় মুসলমানরা সেখানে কেবল নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ভোট দেয়। কেজরিওয়াল সাহেব এবং তাঁর দল আপ মুসলমানদের উদ্বেগের বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দিল্লির মুসলমানরা গণহারে তাঁর দলকে সমর্থন দিয়েছে, কারণ এই দলটি সক্রিয়ভাবে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায় না।
মোদী সাহেবের দলে দিল্লিতে পরাজয়কে তার হিন্দু কর্তৃত্ববাদী আদর্শের পরাজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করলে সেটি গুরুতর ভুল ব্যাখ্যা হবে। সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুসারে, দিল্লির চার-পঞ্চমাংশ ভোটারই মোদী সাহেবকে সমর্থন করেন এবং তিন-চতুর্থাংশ ভোটার তাঁর কেন্দ্রী সরকারের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
কেজরিওয়াল সাহেব যেভাবে সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গী হিন্দু জাতীয়তাবাদকে এড়িয়ে গিয়ে দিল্লি মতো একটি ছোট শহুরে রাজ্যে শুধুমাত্র সুশাসন ও পরিষেবা সরবরাহ নিশ্চিত করে বিজয়ী হয়েছেন, সেটা দিল্লির বাইরে সম্ভব কিনা তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিজেপি যেটির নির্বাচনী শাখা) একক লক্ষ্য হলো: হিন্দ কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা। এই মূল লক্ষ্যের বিষয়ে মোদী ও তাঁর দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মুরোদ আছে, বর্তমানে এমন কোন রাজনীতিবিদও নেই। মোদী সাহেব ও তাঁর দল হয়তো একটা নির্বাচনে হেরেছে, কিন্তু আদর্শিক যুদ্ধে তারাই জিতেছে।
––––––––––––––––––––––
লেখক নয়া দিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চে কর্মরত আছেন। নিবন্ধটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে “Modi Lost in Delhi. It Doesnt Matter.” শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। ছবি নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।


আইলা আহমাদ, আল জাজিরা ইংরেজি:
প্রতি বছর ভারত শাসিত কাশমিরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাবর্ষের শুরুতে প্রত্যাশা করে, বছর হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হবে, কিছুটা স্বাভাবিক হবে আমরা যখন ক্লাসরুমে যাই, তখন আমাদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা থাকে প্রতিটি মিনিটকে কাজে লাগানোর, যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু অর্জন করার, কারণ আমরা কখনোই জানি না যে পরের দিন আমরা আবার স্কুলে ফিরে আসতে পারবো কি না
সব কিছুর পরও, অনিঃশেষ এই সহিংসতা আর নিপীড়নকে ধন্যবাদ জানাতে হয়, কারণ  আমাদের খুব কমই স্কুলেযাওয়া লাগে আমরা বছরের বেশির ভাগ দিনই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাই না, যেমন বিশ্বের অন্য যে কোন স্থানে বসবাসরত আমাদের সমবয়সীরা পেয়ে থাকে
২০১৯ সালের মার্চে আমি যখন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করি, আমি তখনো আরেকটু ভালো পরিস্থিতির আশা করছিলাম আমি স্কুলে ফিরতে পেরে খুশি ছিলাম, কিন্তু ভয়ে ছিলাম যে কোন সময় উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আমাদের শিক্ষাবর্ষ সংক্ষিপ্ত হয়ে যেতে পারে আমার বন্ধুরা আমার মতই স্নায়ুচাপে ভুগছিল এই কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে অনেক সময় বলতাম, আরেকটিবিরতিহয়তো শিগগিরই শুরু হতে পারে
কয়েক মাসের মধ্যেই আমাদের হাস্যরসই বাস্তবে পরিণত হলো
আগস্টের তারিখ আমাদের জীববিজ্ঞান পরীক্ষা ছিল আমার মনে হচ্ছিল আমার পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই, তাই আগের রাতে দোয়া করছিলাম যেন এমন কিছু ঘটে, যাকে পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়, কিংবা বাতিল হলে আরো ভালো হয় অবশ্যই, কি হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই ছিল না যদি জানতাম, তাহলে সেটা থামানোর জন্য আমি দরকার হলে ১০০টা পরীক্ষা দিতেও রাজি থাকতাম
পরের দিন সকালে আমার বাবা আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন এবং জানালেন যে ভারতীয় সরকার ৩৭০ ধারা বাতিল করেছে সংবিধানের এই ধারাতে আমাদের অঞ্চলের বিশেষ মর্যাদার স্বীকৃতি এবং জনমিতি সংরক্ষণের নিশ্চয়তা ছিল
দিন ঠিক কি করেছিলাম, পুরোপুরি মনে করতে পারছি না যদ্দুর মনে পড়ে, ভাবছিলাম: “আমাদের এখন কি হতে যাচ্ছে?” পরের দিনগুলোতে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যেকে যার যার ধারণা উপস্থাপন করলো প্রতিটি ধারণা তার আগেরটার চেয়ে ভয়াবহ ছিল খুব কাছের প্রতিবেশী ছাড়া আর কারো সাথে অবশ্য ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও আলোচনা করতে পারছিলাম না, কারণ ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ফোনের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছে, সেই সাথে কার্ফিউ জারি করা হয়েছে
আমি নিজেকে বলছিলামশুধু ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষা করোমুসলমানদের ছুটির দিন ঈদ এই ঘটরার এক সপ্তাহের মধ্যে উদযাপিত হবে, আর আমার ধারণা ছিল এই সময়টা পার হলে ভারত শাসিত কাশমিরের জীবনযাত্রা হয়তোস্বাভাবিকহবে, অথবা অন্ততপক্ষে সামরিক শাসনের আওতায় স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হতে পারে, এমন একটা পরিস্থিতি হবে
কিন্তু আমি ভুল ছিলাম
ঈদ এসে চলে গেলো, কিন্তু পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হলো না
আমার ধারণা, ১৭ বছর বয়সী একজন দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হওয়া পৃথিবীর অন্যত্র এতো সহজ নয় অন্য যে কোন জায়গায় তাদেরকে ভাবতে হয় ভালো ফলাফল সম্পর্কে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান নিশ্চিত করা সম্পর্কে তাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়, দ্বাদশ শ্রেণির ফলাফল পরবর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে, যা কিনা ভবিষ্যতের উপরও প্রভাব ফেলবে আমি জানি এসবই হচ্ছে আমার বয়সী তরুণদের সাধারণ চিন্তার বিষয় কিন্তু গত বছর ভারত শাসিত কাশমিরে আমার উপর আরেকটি চাপ সংযোজিত হয়েছে, সেটা হলো নিজের ঘরে বন্দী হওয়ার চাপ
আমি পড়তে চাইতাম, কিন্তু অবরোধের কারণে আমার জন্য এটি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লো স্কুলগুলো বন্ধ ছিল, টিউশন সেন্টারসমূহে তালা দেওয়া ছিল, এবং অবশ্যই, অনলাইনে পড়াশুনার সুযোগও ছিল না পুরোপুরি ব্ল্যাকআউটকে ধন্যবাদ, আমি এমনকি আমার শিক্ষকদের নিকট দিকনির্দেশন চাইতে পারিনি, কিংবা কোন বন্ধুর কাছে সহযোগিতাও চাইতে পারিনি
তাছাড়াও, আমি আমার বন্ধুদের নিয়ে চিন্তিত ছিলাম আমি জানতাম না তারা ঠিক আছে কি না, তাদের কেউ গ্রেফতার হয়েছে কিনা, কিংবা কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে কি না
আমার মা-বাবাও ভোগান্তিতে পড়েছিলেন আমি তাদেরকে এর আগে কখনো এতোটা বিধ্বস্ত আর এতোটা চাপের মুখোমুখি দেখিনি তারা শুধু আমাদের চারপাশের ঘটনাগুলো নিয়েই চিন্তিত ছিলেন না, বরং আমার ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত ছিলেন তারা আমার পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য এতোটাই মরিয়া ছিলেন যে, আমাকে পড়াশুনায় সাহায্য করার জন্য কোন প্রতিবেশী শিক্ষক পাওয়া যায় কিনা, খোঁজছিলেন
তারা আমার ভাইয়ের সাথেও যোগাযোগ করতে পারছিলেন না, যিনি তখন দিল্লিতে পড়াশুনা করছিলেন মাঝেমধ্যে যখন তার সাথে যোগাযোগের সুযোগ হতো, তখন বলতেন, তিনিও পড়াশুনায় মনযোগ দিতে পারছেন না, কারণ বাড়িতে তার পরিবারের সদস্যদের ভাগ্যে কি আছে সে সম্পর্কে তারা কোন ধারণা ছিল না
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমি আমাদের বাসার সামনের ফটক খোলার শব্দ শুনলাম, তারপর পরিচিত আওয়াজ পেলাম জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আমার এক বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে, প্রায় দুই মাস ধরে যার সাথে আমার কোন যোগাযোগ নাই  আমি খালি পায়ে দৌড়ে বাইরে গেলাম তারা আমাকে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে পলেছিল, কারণ আমাদের স্কুল আভ্যন্তরীণ পরীক্ষাগুলো চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে উল্লেখ্য এই পরীক্ষাগুলো আমাদের চুড়ান্ত পরীক্ষায় অবদান রাখতে পারে
এরপর অক্টোবরে স্কুল শিক্ষা বোর্ড ঘোষণা দিল, ভারত শাসিত কাশমিরের স্কুলগুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা হবে, তবে সিলেবাসে কোন ধরনের শিথিলতা থাকবে না তার মানে যদিও আমাদের স্কুল আগস্টের অবরোধের পূর্বে মাত্র ৩০ শতাংশ সিলেবাস পূর্ণ করতে পেরেছে, কিন্তু নভেম্বরে আমাদের পরীক্ষা হবে পুরো সিলেবাসের উপর
আমার রাগ হচ্ছিল, এবং মন খারাপ হচ্ছিল
স্পষ্টতই যারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের কাছে আমরা পাশ করতে পারবো কিনা সেটার কোন গুরুত্ব ছিল না আমরা কোন কিছু শিখতে পেরেছি কিনা সেটাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না তাদের একমাত্র উদ্বেগের বিষয় ছিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তারা চাচ্ছিলেন প্রত্যেকে যেন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, যাতে তারা সংবাদমাধ্যমে প্রচার করতে পারেন, ভারত শাসিত কাশমিরের সব কিছুস্বাভাবিকহয়ে গেছে
সংক্ষিপ্ত সময়ে পুরো সিলেবাস আয়ত্ত করা চেষ্টা ছাড়া আমার আসলে তখন আর কিছুই করার ছিল না
পরীক্ষা আগের এক মাস আমি আমার দাদির বাসায় ছিলাম, যাতে আমার পড়াশুনায় কোন ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে সময় এতোই কম ছিল যে আমি পরীক্ষার আগের দিনও নতুন কিছু অধ্যায় পড়েছিলাম
প্রথম পরীক্ষার দিন রাস্তায় খুব  অল্পসংখ্যক বাস ছিল যেহেতু সবাই ব্যক্তিগত পরিবহন ব্যবহার  করতে বাধ্য হয়েছিল, তাই ট্রাফিক জ্যাম ছিল খুব বেশি, ফলে অনেকেই সময় মতো পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌছাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ আবারও এই সমস্যার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলো না কাউকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়নি, অথচ কোন কোন শিক্ষার্থী আধা ঘণ্টা দেরিতে পরীক্ষা শুরু করতে বাধ্য হয়েছিল
আমরা সকলের অকৃতকার্য হওয়াটা নির্ধারিতই ছিল বলা চলে, কিন্তু কেউই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি
পরবর্তী দিনগুলোতেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি এর মধ্যে আবার তুষারপাত শুরু হয়েছিল, এবং এক সপ্তাহ যাবত বিদ্যুৎ ছিল না আবহাওয়া এতোই ঠাণ্ডা ছিল যে কলম ধরে রাখাও কঠিন হতো
আমি যখন সব কিছুর প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করলাম, তখন আমার বাবা এমন একটি কথা বলেছিলেন যা আমি কখনোই ভুলবো না: “এতে অভ্যস্থ হও, কারণ এখন থেকে সব কিছু এরকমই হবে
এতো কিছুর পরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু করেছি কর্তৃপক্ষ আমাদের পার্ফরম্যান্স কিংবা আমরা যে সকল বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হয়েছিলাম, সে সব সম্পর্কে কিছু না বললেও পরীক্ষায় উপস্থিতির উচ্চহার নিয়ে বড়াই করেছিল
কর্তৃপক্ষের চোখে আমরা, কাশমিরি শিক্ষার্থীর স্বাভাবিকতার প্রহেলিকা বাঁচিয়ে রাখার সরঞ্জাম ছাড়া আর কিছুই নই তারা আমাদের শিক্ষা, আমাদের কল্যাণ কিংবা ভবিষ্যৎকে পাত্তা দেয় না তারা কেবল আমাদেরকে পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করে আমাদেরকে, এবং পৃথিবীবাসীকে বুঝাতে চায় যে আমরা শিক্ষা পাচ্ছি কিন্তু আমরা আমাদের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন তারা যাকেস্বাভাবিকবলে বিক্রি করতে চায়, তা যে আসলে কি, সেটা আমরা ভালো করেই জানি
কিন্তু আমাদের সামনের সকল বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমরা আমাদের শক্তি এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন আমরা জানি যে তারা যাই করুক না কেন, এই সত্যকে বদলাতে পারবে না যে, আমরাই এই ভূমির ভবিষ্যৎ
–––––––––––––––––––––––––––––
লেখিকা এক জন কাশমিরি শিক্ষার্থী সে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চায় এই নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতেMy struggle for an education in Indian-administered Kashmirশিরোনামে প্রকাশিত ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.