ফ্রান্সিসকো টর, ওয়াশিংটন পোস্ট:
ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি যারা পর্যবেক্ষণ করছেন তারা দেশটির দীর্ঘমেয়াদী “পতন” সম্পর্কে কথাবার্তা বলছেন। তারা মূলত ‘পতন’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করছেন, এর দ্বারা তারা বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত পরিসংখ্যান, যেমন তেল উৎপাদনের পরিমাণের দ্রুত অবনমন, শিশু মৃত্যুহার বৃদ্ধি, আকাশছোয়া দ্রব্যমূল্য ইত্যাদি বোঝাতে চাচ্ছেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে “পতন” আক্ষরিক অর্থেই “পতন”র দিকে মোড় নিচ্ছে, কারণ দেশব্যাপী বিদ্যুৎহীনতা (ব্ল্যাক আউট) দেশটিকে নিশ্চল করে ফেলেছে। বিদ্যুৎ না থাকার ফলে একবিংশ শতাব্দির জীবনশৈলীর একেবারে মৌলিক বিষয়গুলো মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
এমনিতেই গুরুতর মানবিক সংকটে ক্লান্ত একটি দেশের বৈদ্যুতিক গ্রিডের পতন চুড়ান্ত বিপর্যয়ের রূপ ধারণ করেছে। ভেনিজুয়েলাবাসী এমনিতেই দীর্ঘকাল ধরে ক্ষুধার্ত, একটি বড় সংখ্যক মানুষ জানাচ্ছেন যে তাদের শরীরের ওজন কমেছে, কারণ তারা পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। খাবারের এরকম স্বল্প সরবরাহ থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ না থাকাটা শুধু সামান্য কোন অসুবিধা নয়: এ পরিস্থিতিতে খাবার ফ্রিজে রাখতে না পারলে জীবন হুমকির মুখে পড়বে।
দেশটির বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সংবাদসমূহ খুবেই মর্মভেদী। খুব কম হাসপাতালেই জেনারেটর কাজ করছে, এবং বলতে গেলে কোন হাসপাতালেরই কয়েক দিন ধরে জেনারেটর দিয়ে পুরো হাসপাতাল চালানোর সক্ষমতা নেই। একটি শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একজন সেবিকা হস্তচালিত পাম্প ব্যবহার করছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার কিডনি ডায়ালিসিসের রোগী সেবাগ্রহণ করতে না পারার দরুণ ধীরে ধীরে মর্মান্তিক মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন।
অর্থনীতি একেবারেই চলছে না। অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভেনিজুয়েলায় ক্রমশ কাগজের মুদ্রার ব্যবহার কমে যাচ্ছে: ভেনিজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় বড় গোষ্ঠীগুলোর বিলসমূহের সাথে কোনভাবেই সামঞ্জস্য রক্ষা পারছে না। ফলে বেশির ভাগ বড় অংকের টাকা আদান-প্রদান ইলেক্ট্রনিক উপায়ে হচ্ছে, কয়েক বছর ধরে ডেবিট কার্ড ও ভেনমো-জাতীয় আদান-প্রদান টাকা আদায়ের একমাত্র কার্যকর উপায়ে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ না থাকার ফলে, আক্ষরিক অর্থেই টাকার নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক কার্যক্রম অব্যহত রাখার একমাত্র বাস্তব উপায় হলো বৈদেশিক মুদ্রায় আদান-প্রদান করা। প্রধানত মার্কিন ডলার ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে ইউরো এবং কম্বোডিয়ান পেসো অথবা অন্য যেকোন মুদ্রাও ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা বেশির ভাগ ভেনিজুয়েলাবাসীর নাগালের মধ্যে নেই।
এবং সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থাও একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ বর্তমানে বেশির ভাগ ল্যান্ডফোন, সেলুলার ও ইন্টারনেট কানেকশন অকার্যকর হয়ে গেছে। কারাকাসের লোকজন এদিক-সেদিক গাড়ি চালাতে থাকে মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাওয়ার আশায়। কখনো, খুব ব্যতিক্রম হিসেবে, যদি নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় তবে বিদেশে অবস্থানরত আত্মীয়স্বজনদেরকে এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপস মেসেজ পাঠানোর জন্য অনেকগুলো গাড়ি নিয়ে লোকজন একত্রিত হয়।
বেশির ভাগ মানুষের নিকট বহির্বিশ্বের যেন কোন অস্তিত্বই নেই। সরকার স্বাধীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, মাদুরো সরকার বিদ্যুৎ সংকটের জন্য মার্কিন নাশকতাকে দায়ী করছে।
মিলিয়ন মিলিয়ন ভেনিজুয়েলান, যারা দেশটির অসংখ্য অব্যবস্থার কারণে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, গত কয়েক দিনের অভিজ্ঞতার ভয়াবহতায় তাদের চুল খাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড়। অনেকের জন্যই দেশে অবস্থানরত তাদের ভালোবাসার মানুষটির সাথে যোগাযোগ করা একেবারেই অসম্ভব। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দেখা দিয়েছে, কারণ বেশির ভাগ পরিবারের উপার্জনক্ষম তরুণ সদস্যটি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, যাতে বিদেশে ভালো চাকুরি করে দেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যদের নিকট টাকা পাঠাতে পারেন। তার মানে দেশে যারা রয়ে গেছেন, তাদের বেশির ভাগই দুর্বল: বৃদ্ধ, অসুস্থ ও শিশু। বিদ্যুৎহীনতা তাদেরকে দুই ধরনের বিপদে ফেলেছে, তাদের পরিবারের সক্ষম মানুষটি তাদেরকে সাহায্য করার জন্য পাশে নেই, আবার বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বিদেশ থেকে পরিবারের সদস্যদের জন্য টাকা পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না।
বিষয়টি একটু স্পষ্ট করা দরকার, মার্কিন নাশকতার অভিযোগের আসলে গ্রহণযোগ্যতার অভাাব রয়েছে। কারণ ভেনিজুয়েলার বৈদ্যুতিক গ্রিড প্রায় এক দশক থেকে ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা অতিরিক্ত হওয়ার কারণে ছোট ছোট শহরসমূহে গত কয়েক বছর ধরে প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ছয় থেকে আট ঘণ্টার লোডশিডিং তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তবে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ ফিরে আসতো।
কিন্তু ব্ল্যাক আউটের পরিস্থিতি পুরো ভিন্ন। কী হয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আমরা পাই নি, তবে কিছু সূত্রে জানা যায় যে, বৈদেশিক ক্ষেপণাস্ত্র কোন একটি হাই ভোল্টেস প্রধান লাইন বন্ধ করে ফেলেছে, যার ফলে পুরো সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলাফলস্বরূপ শুধু স্থানীয় পর্যায়ে ব্ল্যাক আউট হয় নি, বরং সারা দেশের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সপ্তাহান্তে কারকাসের কিছু অংশে কিছু বৈদ্যুতিক সেবা পুনরায় চালু করা হলেও সেটা একবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য করা হয়েছে।
কেন? কারণ গত ১২ বছরে সরকার গ্রিড মাটির নিচ দিয়ে স্থাপন করেছে। সকল কোম্পানি জাতীয়করণের পর সরকার পাওয়ার স্টেশন ও ট্রান্সমিশন লাইন রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ করা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে ধীরে ধীরে গ্রিডগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ভেনিজুয়েলার প্রকৌশলীরা সতর্ক করছিলেন জরুরি ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না করলে এরকম কোন কিছু ঘটতে পারে।  
এখন সেটা ঘটেছে। এবং এর ফলে আক্ষরিক অর্থেই ভেনিজুয়েলার পতন হয়েছে, যেটা কয়েক দিন আগেও অকল্পনীয় ছিল।
________________________________

নিবন্ধটি ওয়াশিংটন পোস্টে “Venezuela is truly on the verge of collapseশিরোনামে প্রকাশিত হয়। ছবি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে সংগৃহীত।