Articles by "মধ্যপ্রাচ্য"

মধ্যপ্রাচ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান


দাউদ কুত্তাব, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
অদ্ভুত এক নির্বাচনী প্রচারণায় গরম হয়ে আছে ইসরায়েলের রাজনীতির মাঠ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথা ফিলিস্তিনি অঞ্চলের ভূমি দখল এর কোন আলেচনাই নেই নির্বাচনী মাঠে। প্রার্থীরা তার বদলে ফিলিস্তিনিদের উপর কে কার থেকে বেশি কঠোর হতে পারবেন, সে প্রতিযোগিতায় মত্ত।
সবচেয়ে বড় হুমকিটি আসছে নেতিনিয়াহুর তরফ থেকে। শঠতা, ঘোষ গ্রহণ আর বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের মধ্য দিয়েই যেহেতু তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের জন্য লড়ে যাচ্ছেন, ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে তার বিশাল ক্ষমতার (তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন) অপব্যবহার করে হয়তো ইসরায়েলে অভ্যন্তরে এবং আশেপাশে উত্তেজনা বৃদ্ধি করবেন।
এসব আশঙ্কা নিরসন দূরে থাক, তিনি উল্টা এগুলোর পিছনে আরো ইন্ধন জোগাচ্ছিলেন। তিনি আবারো ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান জেরুজালেমের আল হারাম আল শরিফ/আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের বাব আল রাহমাহ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ‍উল্লেখ্য যে এই প্রাঙ্গণটি ইউনেস্কর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, মুসলমানরা ১৪ শত বছরেরও বেশি সময় এটির প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছে।
বাব আল রাহমাহ বন্ধ করার কোন আইনসঙ্গত কারণ নেই। ভবনটি ২০০৩ সালে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছিল, কারণ এটি ইসলামিক হেরিটেজ কমিটির প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। এই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন কট্টর ইসলামি শায়খ (এবং ইসরায়েলের নাগরিক) রায়েদ সালাহ। কিন্তু এই কারণটি এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়: সালাহ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আল আকসায় পা রাখেন নি, এবং ইসলামিক হেরিটেজ কমিটি বহু আগেই ভেঙে গেছে।
এতদসত্ত্বেও নেতিনিয়াহুর জন্য যে কোন অযৌক্তিক অজুহাতই যথেষ্ট। তার চরমপন্থী অনুসারীরা চায় ইসরায়েল বাব আল-রাহমার স্থানে সিনেগাগ নির্মাণের জন্য এক ধাপ এগিয়ে যাক। নেতিনিয়াহু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারের নিকট তার রাজনৈতিক পুঁজি বৃদ্ধির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এসকল চরমপন্থীর দাবি নীরবে মেনে নিচ্ছেন। একই কারণে নেতিনিয়াহু অন্যান্য এলাকাসমূহে যেমন গাজা, দক্ষিণ লেবানন অথবা ইরান কিংবা সিরিয়ায় ইরান সমর্থিত বাহিনীর সাথে সঙ্ঘাত সৃষ্টি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক বলে মনে করছেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে নেতিনিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী লেফট্যানেন্ট জেনারেল বেনি গ্যান্টজ মোটেও পছন্দসই বিকল্প নন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল বেনি একটি ডানপন্থী জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি এর আগে তার ফিলিস্তিন বিদ্বেষের প্রমাণ দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ ২০১৪ সালের ঘটনা বলা যেতে পারে, তার সেনাপতিত্বে একটি অভিযানে আইডিএফ গাজার বিভিন্ন অংশকে “প্রস্তর যুগে ফেরত” পাঠিয়েছিল। সে অভিযানে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মারা গেছে, আহত হয়েছে এবং গৃহহারা হয়েছে।
এরপর রয়েছে সম্প্রতি গঠিত হায়ামিন হেহাদাশ পার্টি, যেটির নেতৃত্ব আছেন যথাক্রমে বিদায়ী শিক্ষা ও বিচার মন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও আয়েলেত শাকেদ। বেনেট ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি দখলিকৃত পশ্চিমতীরের ৬০ শতাংশেরও বেশি ইসরায়েলের অন্তর্ভূক্ত করতে চান। শাকেদও পশ্চিম তীরের বেশির ভাগ অংশ দখল অন্তর্ভূক্ত চান। এবং, সম্ভাব্য বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমের উপর এক অদ্ভুত আক্রমণ করে তিনি সম্প্রতি “ফ্যাসিজম” পার্ফিউমের একটি বিদ্রূপাত্মক বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি ঘোষণা করেছেন যে “তার নিকট এটির ঘ্রাণ গণতন্ত্রের মতো মনে হচ্ছে।”
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান দলসমূহ যে সকল কাজ করতে অনিচ্ছুক, সেগুলো তাদের জানা আছে বলেই মনে হচ্ছে, সেগুলো হলো: দখলদারিত্বের অবসান, জেরুজালেম ভাগকরণ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের স্বদেশপ্রত্যাবর্তনের অধিকার।
বল এখন এমন লোকদের নিকট, যাদের কেউই সংকটের সমাধান চায় না। সর্বোপরি সরকারের নীতি যখন তাদের নির্বাচনী প্রচারণার অঙ্গীকার থেকে আলাদা হয়, এবং আগ্রাসী উচ্চাভিলাসের মাধ্যমে একটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়, তখন এমনকি এরকম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিলেও তার হাত বাধা থাকে।
প্রায় চার মিলিয়ন ফিলিস্তিনির উপর দখলদারিত্বের অবসানে শুধু ইসরায়েলি নেতারাই যে অনিচ্ছুক, তা নয়। ট্রাম্প সাহেবের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রও তাদের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে গাজা, পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমির নামের সাথে পাঁচ দশক থেকে লেগে থাকা “দখলীকৃত” আখ্যাটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন দাবি করছে এসব অঞ্চল শুধুমাত্র ইসরায়েল “নিয়ন্ত্রিত” (দখলীকৃত নয়)। যুক্তরাষ্ট্রের এই মনোভাব ইসরায়েলি নেতাদের সমস্যা সমাধানের ইচ্ছাকে আরো দুর্বল করবে। ইসরায়েল কর্তৃক গোলান মালভূমি নিজেদের ভূখণ্ডে সংযুক্ত করাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো জোরপূর্বক জমি দখলকে বৈধতা দিলেন।
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন জনগণকে যুদ্ধ ও শান্তির মধ্য থেকে যে কোন একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া দরকার ছিল। তার বদলে ইসরায়েলিরা যুদ্ধ এবং আরো বেশি যুদ্ধ, দখলদারিত্ব এবং আরো বেশি দখলদারিত্বের মধ্য থেকে যে কোন একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, এমনকি যদিও প্রার্থীরা এই পরিভাষাগুলোর ব্যবহার এড়িয়ে চলছেন। এবং এখনো এই বাস্তবতা বিদ্যমান যে, দুই-রাষ্ট্র সমাধান কিংবা একই রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি, যেখানে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবে, এ দুই সমাধানের কোন একটি ছাড়া এ অঞ্চল সহিংসতার বেড়াজালে আবদ্ধ থাকবে।  
________________________________

নিবন্ধটির লেখক প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রেস ফ্রিডম কমিটির প্রধান। নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “No Country for Palestinians” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত।

প্রেসিডেন্ট এরদোগান। নির্বাচনে প্রার্থী না হয়েও তিনিই এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র ছিলেন। 

এমরে গোনেন, ডেইলি সাবাহ:
গণতন্ত্রে পৌর বা নগর নির্বাচন সাধারণত দুই ধরনের ভূমিকা পালন করে। প্রথমত, এসকল নির্বাচনে স্থানীয় সরকার সম্পর্কে ভোটারদের চাহিদা এবং উপলব্ধি প্রতিফলিত হয়, পাশাপাশি জাতীয় সরকারের এক ধরনের অ্যাসিড টেস্টও হয়ে যায়। এ জন্য ভোটাররা এ ধরনের নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সরকারকে কড়া সংকেত দেন।
১৯৮০ সালের পূর্ব পর্যন্ত তুরস্কে স্থানীয় সরকারের সত্যিকারের কোন গুরুত্ব ছিল না, কেননা সেসময় পৌরসভার বাজেট ছিল মারাত্মক কম। ফলে কোন পৌরসভা গুরুত্বপূর্ণ কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইলে অর্থায়ন পাওয়ার স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক রাখতে হতো। তুর্কি অর্থনীতিতে উদারনীতি অবলম্বনের শুরু হওয়ার পর থেকে স্থানীয় সরকারের আর্থিক রাজস্ব অধিকার দৃঢ়করণের মাধ্যমে এ অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।
বর্তমানে তুরস্কে স্থানীয় সরকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বড় বড় মহানগরীগুলোর সরাসরি রাজস্বের পরিমাণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ হওয়াই এই গুরুত্বের কারণ নয়, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নের কারণে এ নির্বাচনের গুরুত্ব বর্তমানে অনেক বেশি। ইস্তাম্বুল একা দেশের মোট জিডিপির ৩১ শতাংশেরও বেশি উৎপাদন করে। পশ্চিমাঞ্চলীয় এবং উপকূলীয় এলাকা মধ্য আনাতোলিয়া ও পূর্বাঞ্চলীয় তুরস্কের তুলনায় অনেক বেশি ধনী। অসামঞ্জস্যের নজির হিসেবে এটুকু তথ্যই যথেষ্ট।
জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট পার্টি (একে পার্টি) সরকার ২০০২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সুষ্ঠুভাবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার কারণে নির্বাচনে এক ধরনের সুবিধা ভোগ করে আসছে। শুধুমাত্র ২০০৯ সালের নির্বাচনে তারা এ সুবিধা পায়নি, কেননা সে নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পরপর। সেসময় নির্বাচনে একে পার্টি ৩৯ শতাংশের কম জনসমর্থন পেলেও বড় বড় মহানগরগুলো ঠিকই তাদের অধীনে থেকে যায়।
এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীরতর এবং এর থেকে পুনরুদ্ধারে অনেক বেশি সময় লাগতে পারে, সম্ভবত এটি বিরোধী দলকে নতুন প্রেরণা জুগিয়েছে। নির্বাচনপূর্ব কয়েকটি জনমত জরিপে এবার বিরোধীদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভোট বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, আবার অন্যগুলোতে স্থিতাবস্থা বজায় থাকার কথাই দেখানো হয়েছে।
একেপির পৌর নির্বাচনের প্রার্থীদের ক্যাম্পেইন মোটামোটি দৃশ্যমানই ছিল, প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েব এরদোগান নিজে পুরো ক্যাম্পেইনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সম্ভবত কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এ নির্বাচনে সত্যিকারের অসুবিধা তৈরি করতে পারে, এ বিষয়টি বুঝতে পেরেই তিনি নির্বাচনে “টিকে থাকার” প্রশ্নটি তৈরি করেছিলেন। এ জন্য এবারের নির্বাচনী বিতর্ককে নিজের আত্মবিশ্বাসের নির্বাচেন রূপান্তর করে তিনি পতন আটকাতে চেয়েছিলেন এবং অনেকটা সফলও হয়েছেন।
পয়লা অনুমানে মনে হয় তার কৌশল সফল হয়েছে। হয়তো তিনি যতটা আশা করেছিলেন ততটা সফলতা আসেনি, তবে ভোটের হিসেবে একেপি এবং জোট শরিক এমএইচপি খুব একটা লোকসানের মুখোমুখি হয়নি। বিরোধীদ দল রিপাব্লিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি)র প্রত্যাশিত ভূমিধ্বস বিজয় অর্জিত হয়নি। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ উন্নত শহরগুলোতে বিরোধীরাই জিতেছে।
ইজমিরে কখনোই একে পার্টি জিতে নি, কিন্তু এবার রাজধানী আঙ্কারাও বিরোধী দলের হাতে চলে গেলো। ইস্তাম্বুল মহানগর ১৯৯৪ সালে এরদোগান মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই একে পার্টির হাতে ছিল, তবে এবার জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল যে এখানে একেপি হুমকির মুখে আছে। এখন দেখা যাচ্ছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিনালি য়িলদিরিম ইস্তাম্বুলের মেয়র হতে যাচ্ছেন। (তিনি ক্ষমতাসীন একেপির প্রার্থী ছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচিত হতে পারেন নি, একেবারে সামান্য ভোটের ব্যবধানে বিরোধী দলীয় প্রার্থীর নিকট পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ৪৮.৫১% ভোট, বিরোধী দলীয় প্রার্থী সেখানে পেয়েছেন ৪৮.৭৯% ভোট! অনুবাদক)
এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন একে পার্টি নেতৃত্বাধীন জোট ও সিএইচপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোটের মধ্যে এক ধরনের ড্র হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এরদোগান এই প্রতিযোগিতায় তার সকল সম্ভাব্যতাকে কাজে লাগিয়েছেন, তার মুখ রক্ষা হয়েছে, এবং সম্ভবত তিনি আরো খারাপ ফলাফল আটকাতে সক্ষম হয়েছেন। ক্ষমতাসীন একে পার্টির কতিপয় সাবেক নেতাদের সমন্বেয়ে একটি “নতুন” দল গঠনের গুজব সম্ভবত হাওয়া হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি এই নির্বাচনকে তাদের ভালো রকমের বিজয় বলে ঘোষণা করবে। আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণার পর যদি বড় ধরনের কোন বিস্ময়কর কিছু যদি না ঘটে, তবে এই নির্বাচনের ফলাফলে প্রেসিডেন্ট এরদোগানের নীতির খুব একটা ক্ষতি হবে না।
________________________________

লেখাটি তুরস্কের ডেইলি সাবাহের অনলাইন সংস্করণে “The meaning of the 2019 election results” শিরোনামে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত। ছবি উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত।




বারাক বারফি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
গত মাসে মিসরের সংসদে সংবিধান সংশোধনের একটি খসড়া সিংহভাগ সংসদ সদস্যের অনুমোদন পেয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসির ২০৩৪ সাল অবধি ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বও এই সংশোধনীর পক্ষে, কারণ এতে মিসরে এক ধরনের স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় থাকবে, আর তাদের মহালাভজনক অস্ত্রের বাজারও থাকবে ঠিকটাক মতো।
সংশোধনটি অনুমোদন করেছেন ৫৯৬ জন সাংসদের মধ্যে ৪৮৫ জন। এতে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ৪ বছর থেকে ছয় বছর করা হয়েছে, আর সিসিকে অতিরিক্ত আরো দুই বার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য সিসির বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালে। এখন এ খসড়া সংশোধন বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্তটিকে গণভোট দ্বারা অনুমোদিত করতে হবে।
সিসি যে প্রেসিডেন্ট পদে থেকে যেতে চাচ্ছেন, তা মোটেও বিস্ময়কর কিছু নয়। ক্ষমতা নিশ্চিত করার স্বার্থে ক্ষমতা গ্রহণের সময় তিনি কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন তিনি “কর্তৃত্বের জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী” নন। তিনি শপথ করেছিলেন, “আমি সংবিধানে কোন সংশোধন আনতে যাবো না। ... আইন ও সংবিধান অনুমোদিত সময়সীমার পর কেউই প্রেসিডেন্টের আসনে থাকবে না।” ঠিক যেমনিভাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসনি মোবারক ১৯৮১ সালে সংসদে তার প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, “খোদাই জানেন, আমি কখনোই এই কাজের স্বপ্ন দেখি নি।” অবশেষে ৩০ বছর ২০১১ সালের আরব বসন্তে তিনি তার অবস্থান থেকে অপসারিত হয়েছিলেন!
ফেরাউনদের রাজ্যে রাষ্ট্রপতিরা সাধারণত বিভিন্ন পৌরাাণিক কাহিনী দ্বারা এতোটাই বিমোহিত হন, যে তারা শাসন করার ব্যাপারে তাদের দীর্ঘ মেয়াদী, সদানির্ভুল (তাদের কল্পনায়), এমনকি প্রায় ঐশ্বরিক অধিকারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হোসনি মোবারক ২০০৩ সালের মধ্যভাগে তার এই মনোভাব দেখিয়েছিলেন। যখন তাকে একজন লেখক প্রশ্ন করেছিলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমষ ঠেকানোর জন্য সৌদি আরব ইরাকি স্বৈর শাসক সাদ্দাম হোসনের পদত্যাগ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে কি না, তখন তিনি বলেছিলেন “অসম্ভব!” মোবারক সেদিন ঘোষণা দিয়েছিলেন, “কোন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারে না!”
ঠিক একইভাবে সিসির ফাঁস হওয়া এক অদ্ভুত রেকর্ডিংএ তিনি ঘোষণা করেন যে স্বপ্নে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত তাকে জানিয়েছেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন। অন্য আরেকটি স্বপ্নতে তিনি একটি ধ্বনি শুনতে পান, যেটি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, “আমরা তোমাকে এমন কিছু দান করবো, যা আমরা কাউকেই দান করি নি।”
পশ্চিমারা হয়তো এসব দাবিকে উপহাস করবেন, কিন্তু মিসরিরা এগুলোকে বেশ গুরুত্বের সাথে নেয়। (আসলেই? আমার তো মনে হয় ভাড়াটে ভাড়রাই কেবল গুরুত্বের সাথে নেয়, এবং সেটাই ফলাও করে প্রচার করা হয়!-অনুবাদক।) ইহুদি ও ইসলামি মতবাদে স্বপ্নকে নবুওতের নিম্নস্তর বলে বিবেচনা করা হয়। (সত্য বটে ইসলামে এরকম কথা আছে, তবে সেটা এতো সাদামাটা নয়, যেভাবে লেখক বলছেন।অনুবাদক) বাইবেলের আদিপুস্তকে আছে, ইউসুফ আ. ফারাওর স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা করে মিসরকে খরা ও দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করেছিলেন। (কুরআন শরিফেও এই ঘটনা আছে। কিন্তু ইহুদি কিংবা মোসলমান কারো নিকটই নবি কর্তৃক স্বপ্নের ব্যাখ্যা আর সিসির দাবিকৃত স্বপ্ন সমান গুরুত্ববহ হওয়ার কথা নয়।অনুবাদক)
তবে সিসির ঘোষণা দেওয়ার সময়টা স্বপ্ন দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুসারেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১১ সালের বিদ্রোহ পরবর্তী আর্থসামাজিক অস্থিতিশীলতা অবশেষে হ্রাস পেয়েছে। অনেক বছর পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে (যদি এটিই সবকিছু হয়ে থাকে।) গত জুনে শেষ হওয়া অর্থ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.৩%।
তাছাড়া আইএমএফ ঘোষিত কঠোর মিতব্যয়িতা কর্মসূচি এনার্জি ও খাদ্যখাতে ভর্তুকি কমানোর কর্মসূচি, এমনকি যদি আয় কমে যায় তাহলেও চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছাচ্ছে। অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসার ফলে অর্থনৈতিক আন্দোলনও হ্রাস পাচ্ছে। ইতোমধ্যে শ্রমিক ও ছাত্র আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা এবং আন্দোলনের প্রতি সমাজের অন্যান্য অংশের সমর্থনের অভাবের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। যদিও মিসরের ক্ষমতা কাঠামো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়, তবে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কোন ধরনের অভিযোগহীনতা থেকে মনে হয় যে পর্দার আড়ালে সিসি ঠিকই তার অবস্থান শক্তিশালী করছেন।
________________________________

শাইমা আব্দুল হাদি, আল আহরাম:

বুধবারে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের একটি ভবনে সংগঠিত অগ্নিকাণ্ডে সত্তুর জন নিহত ও আরো অসংখ্য লোক আহত হওয়ার সংবাদে শোক প্রকাশ করেছে মিসরের আল আযহার আশ শরীফ (আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়)।

পাশাপাশি আল আযহার বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশি জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে এবং মহান আল্লাহর নিকট নিহতদের পরিবারবর্গের জন্য ধৈর্য ও আহতদের আশু নিরাময় প্রার্থনা করেছে।

________________________________


সংবাদটি মিসরি প্রভাবশালী পত্রিকা আল আহরামসহ বিভিন্ন মিসরি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত।


আব্দুল্লাহ আল-আমাদি, আল জাজিরা:
যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পো এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা জন বল্টনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অ্যাজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নে যথাসম্ভব বেশি বৈশ্বিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়।
ওয়াশিংটন যেসকল অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তন্মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইরানকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের খনিসমূহের আশেপাশে তাদের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা দৃঢ়করণ, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত মিত্র ইসরায়েলের সাথে আরব বিশ্বের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে ইসরায়েলের নিরাপত্তা জোরদার করা ইত্যাদি।
ইরানের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা দেখে বিস্মিত হওয়ার কিংবা হচকচিয়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই, কারণ এটি তাদের অনেক পুরনো কৌশল বা স্ট্রাটেজি, যা কারো কাছেই গোপন নয়। অনুরূপভাবে আরবদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতিনিয়াহুর প্রচেষ্টাও বিস্ময়কর কোন কিছু নয়।
কিন্তু গত সপ্তাহে ওয়ারসাওতে অনুষ্ঠিত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিষয়ক সম্মেলনে যে বিষয়টি আসলেই বিস্ময়কর, সেটা হচ্ছে দখলদার ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের তাড়াহুড়া।
মিসর, সিরিয়া, জর্দান প্রভৃতি দেশ কেন এতো তাড়াহুড়ো করছে ইসরায়েলের নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে, সেটা উপলব্ধি করার জন্য অনেক চিন্তা-ভাবনা দরকার। কারণ প্রকাশ্যে এরকম আগ্রহসহকারে নৈকট্য অর্জনের পিছনে কোন যৌক্তিক কারণ খোঁজে পাওয়া যায় না, যেখানে দীর্ঘদিন তাদের সম্পর্ক ছিল একেবারে গোপনীয়।
ওয়াশিংটন ভালো করেই উপসাগরীয় অঞ্চলে তার স্বার্থ সম্পর্কে জানে, এমনকি সে উপসাগরের কাছাকাছি থাকতে চায়। যদিও পুরো বিশ্ব জুড়ে ওয়াশিংটনের স্বার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু উপসাগরে যে পদ্ধতিতে স্বার্থ আদায় করে, অন্য কোথাও সেভাবে করে না।
হ্যাঁ, ওয়াশিংটনের পক্ষে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই স্বার্থ হাসিল করা সম্ভব, এর জন্য এ অঞ্চলের দেশসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করা কিংবা এক দেশের বিরুদ্ধে আরেক দেশকে উসকিয়ে দেওয়ার দরকার হবে না।
কিন্তু ওয়ারসাওতে যা হয়ে গেলো, সেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পর্ক স্থাপনের মৌলিক নিয়ম-নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ এখানে ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অন্যান্য দেশসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছে, তার সাথে ছিল তার মিত্র ইসরায়েল। এমনকি ইরানকে এ অঞ্চলে শান্তি স্থাপনের পয়লা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেই সাথে ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যে সকল উদ্যোগ নেওয়া হবে, সেগুলোকেও বৈধতা দিতে চেয়েছে, চাই সেটা আমেরিকা কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ হোক, কিংবা নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ হোক।
কিন্তু মার্কিন পক্ষের তুলনায় ইউরোপীয় পক্ষ এক্ষেত্রে অধিক সতর্ক, বিচক্ষণ ও আগ্রহী ছিল। ইউরোপীয়দের লক্ষ্য অনেক গভীরে। তাদের কার্যক্রম মার্কিনদের দ্রুতগতির কার্যক্রমের তুলনায় অনেক বেশি শান্ত-শিষ্ট।
সম্মেলনটির দুর্বলতা হলো আমেরিকানরা তাদের প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি, পাশাপাশি নেতিনিয়াহুর উপস্থিতি সেখানে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে পড়েছিল। নেতিনিয়াহু সাহেব কেবল ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্যই উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি সম্মেলনের উপস্থিত কারো সাথে কিংবা সেখানে উপস্থি গণমাধ্যমের সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি।
আমরা যদি আরেক বার সম্মেলনের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী দৃশ্যে ফিরে যাই, অর্থাৎ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে উপসাগরীয়দের তাড়াহুড়োর বিষয়ে ফিরে যাই, তাহলে অবশ্যই বুঝতে পারি নেতিনিয়াহু এটা নিয়ে গর্ব করবেন এবং এটাকে নিজের সাফল্য হিসেবে গণ্য করবেন। প্রকাশ্যে উপসাগরীয় নেতাদের সাথে ঘোষণা করার মাধ্যমে এবং বাণিজ্যিক, আকাশ যোগাযোগ ও অন্যান্য বিষয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ঘোষণার মাধ্যমে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো ফিলিস্তিনিদের সাথে পরবর্তী ঝামেলাসমূহে ইসরায়েল আরো শক্তিশালী হবে, এবং মার্কিন শতাব্দির সেরা বন্দোবস্ত ঘোষণার পথ সুগম হবে, এটি ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার, সেটা খুব শিগগিরই সম্পন্ন হবে।
 এসকল অর্জনের ভিত্তিতে বলা যায় এ সম্মেলনে ফায়দা হাসিলকারী একমাত্র পক্ষ হচ্ছে ইসরায়েল। এটাকে শুধুমাত্র নেতিনিয়াহুর সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে, কারণ এই মুহূর্তে আমরা চিন্তা করছি ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য তাড়াহুড়োকারীরা আসলে ঠিক কী অর্জন করলেন, বা তাদের পক্ষে ঠিক কী অর্জন করা সম্ভব হবে। অথচ এই সময়টাতে উপসাগরীয়দর জন্য ওয়ারসাওয়ে হাজিরা দেওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি ছিল উপসাগরীয় কোন দেশের রাজধানীতে ইরানের সাথে বৈঠকে বসে পারস্পরিক সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা এ ধরনের কোন মধ্যস্থ বা পর্যবেক্ষকে উপস্থিতি ছাড়াই।
এ অঞ্চলে ইরানের ভৌগলিক গুরুত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, বরং যেটা পরিবর্তন করা সম্ভব এবং পরিবর্তন করা দরকারও, সেটা হলো ইরানের সাথে সম্পর্কের ধরন এব আচরণের পদ্ধতি পরিবর্তন করা।
ইরানকে আলোচনা-সংলাপের বিদ্যাপীঠ হিসেবে তুলনা করা যায়, কারণ ইরানের সাথে আলোচনা করে ধোঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই, যেমনটা উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার সাথে সম্ভাবনা আছে। আর গত তিন দশকে আরব সাগরে তারা যা কিছু্ অর্জন করেছে, সেটা এ অঞ্চলের মূল নিয়ন্তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের বিচক্ষণতা ও ধীরস্থিরতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। আর তারা প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে, চাই সেটা উপসাগরে হোক, কিংবা অন্য কোন অঞ্চলে হোক। যেখানে কিনা অনেকগুলো দেশ তাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো, কৌশলের অভাব আর বৈদেশিক শক্তিসমূহের উপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
কখন উপসাগরীয়দের নিজস্ব আঞ্চলিক নীতি তৈরি হবে, যাতে হাজার হাজার মাইল দূরের কারো স্বার্থের উপর উপসাগরীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে? উপসাগরীয়দের নিজেদের শত্রু চেনার সময় কী হয়েছে? তারা কি নিজেদের শত্রুকে নিজেরাই চিনতে পারছে, যাকে বাইরের কেউ চিনবে না?
উপরের প্রশ্নগুলো নিছক কোন প্রত্যাশা নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে এগুলোর প্রতি নজর দেওয়া খুবই জরুরি। বিদেশী মার্কিনদের দ্বারা আরো বেশি ভয়-ভীতির মুখোমুখি হওয়ার পূর্বেই এটা বেশি জরুরি, এবং মার্কিনিদের পাশাপাশি হয়তো আরো বেশি বিদেশি ইসরায়েলের ভয়-ভীতিরও মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে!
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা আরবির অনলাইন সংস্করণে هل اكتشف الخليجيون عدوهم في وارسو؟ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত।



রামযি বারুদ ও রুমানা রুবিও, আল জাজিরা:
 “জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের সবকিছুই ইসরায়েলি দখলদারদের লক্ষ্যবস্তু।” গত ২৯ জানুয়ারি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী সংস্থা ডক্টর্স উইদাউট বর্ডার্স’র সাথে এক সাক্ষাতে কথাগুলো বলছিলেন জেরুজালেমের গ্রিক অর্থডক্স চার্চের আর্চবিশপ আতাল্লাহ হান্না।
 “ইসলামি ও খ্রিষ্টান পবিত্র নিদর্শনসমূহ তাদের লক্ষ্যবস্তু, কারণ তারা আমাদের শহরকে পাল্টে ফেলতে চায়, আরব ও ফিলিস্তিনি অস্তিত্বকে কোনঠাসা করতে চায়।” একথা গুলোও যোগ করেন আর্চ বিশপ।
হান্না ইসরায়েলের ইহুদিকরণ স্কিমের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সংগ্রামের অন্যতম অগ্রদূত। জেরুজালেম যে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু, তার এই বর্ণনা নিঃসন্দেহে সঠিক। তবে তার চেয়ে কঠিন সত্য হলো শুধুমাত্র পবিত্র শহর নয়, বরং পুরো ফিলিস্তিনকে ফিলিস্তিনি চরিত্র থেকে বিচ্যুত করার একটা সুপরিকল্পিত কার্যক্রম চলছে।
কয়েকদিন পর এই খ্রিষ্টান নেতা মন্তব্য করেন যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গালিল সাগরের পশ্চিম উপকূলে টিবেরিয়াস শহরের ঐতিহাসিক আল-বাহর মাসজিদে খনন কার্য  চালিয়েছে। এ স্থানে ইসরায়েল একটি যাদুঘর বানাতে চাই। ইতোঃপূর্বেও ইসরায়েল ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ মুছে ফেলতে এরকম কাজ বহুবার করেছে।

একটি ‘উদ্ভাবিত জনগোষ্ঠী’:

ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক অধিকার অস্বীকার করার শেকড় ইহুদিবাদী আদর্শের গভীরে প্রোথিত। প্রকৃতপক্ষে একদম শুরুর দিকে ইহুদিবাদীরা প্রচার করেছিলো যে ইসরায়েল একটি সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্য বঞ্চিত স্থান, যেটি পুষ্পশোভিত হওয়ার জন্য ইহুদিবাদী অগ্রদূতদের অপেক্ষা করছে।
আসলে ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য ফিলিস্তিন সম্পর্কে “ভূমিহীন মানবগোষ্ঠীর জন্য জনমানবহীন ভূমি” জাতীয় মিথ প্রচার করাটা আসলে ইহুদিবাদীদের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলের নেতারা একথাটি কখনোই গোপন করেন নি যে এটিই তাদের আসল উদ্দেশ্য। “এখানে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী ছিল, তারা নিজেদেরকে ফিলিস্তিনি মনে করতো, আমরা এসে তাদেরকে তাদের দেশ থেকে বের করে দিলাম এবং তাদের দেশটি দখল করে নিলাম। কখনোই তাদের অস্তিত্ব ছিল না। এরকম একটা বিষয় খুব কঠিন কিছু নয়।” ইসরায়েলের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেইর (১৯৬৯-১৯৭৪) ১৯৬৯ সালে সানডে টাইমসের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে এরকম খোলামেলা কথা বলেন।
ফিলিস্তিনিরা আসলে নির্দি্টি জাতীয়তা বোধ সম্পন্ন জনগোষ্ঠী নয়, ইহুদিবাদীদের এমন একটি ধারণা এখনো বিদ্যমান আছে এবং এ ধারণাটি ইসরায়েলের সীমা অতিক্রম করে এর বাইরেও বিস্তার লাভ করেছে। মার্কিন অ্যাভানজেলিকাল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনেকেই এই মতের ঘোর সমর্থক, যা অনেক মার্কিন নেতা প্রকাশ্যে প্রচার করেন। উদাহরণস্বরূপ ২০১১ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী নিউট গিংরিচ একটি ইহুদিবাদী চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে ফিলিস্তিনিরা “একটি উদ্ভাবিত জনগোষ্ঠী ছিল।
এ ধারণার বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে যেকোন ইহুদিবাদী স্থাপনা প্রতিষ্ঠা, সেটা শহর, বসতি, ফাঁড়ি সড়ক কিংবা শিল্প, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং অন্য যে কোন কিছুর উপাদানই হোক না কেন, ফিলিস্তিনিদের শহর, রাস্তা, গ্রাম, বাড়িঘর, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করার সাথে একই সমান্তরালে চলতে থাকবে।

ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলা:

২-১৮ সালের ১৯ জুলাই ইসরায়েলের সংসত নেসেটে “জাতি-রাষ্ট্র বিল” পাশ করার মাধ্যমে  আসলে জাতি বিদ্বেষের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করা হয়েছে, ইসরায়েলকে ইহুদি জনগোষ্ঠীর জাতীয় মাতৃভূমি আখ্যায়িত করার মাধ্যমে এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী, তাদের ইতিহাস ও ভাষাকে কোণঠাসা করার মাধ্যমে। তবে এই বিল মূলত কয়েক দশক ধরে চলে আসা ইহুদিবাদীদের প্রচেষ্টার ফলাফল।
 উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ আমলে ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অঞ্চল, শহর ও গ্রামের আরবি নাম ব্যবহার করতো, যার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭,০০০। অন্যদিকে হিব্রু নাম ছিল মাত্র ২০০ টি, অধিকাংশই ইহুদি বসতি, এরমধ্যে ইহুদিবাদী আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত নতুন কয়েকটি বসতিও ছিল। এটা সেসময়ে (১৯২০ এর দশকে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে) ফিলিস্তিনে জনসংখ্যার বণ্টন ও ভূমির মালিকানার একটি নির্দেশক। সেসময় নবাগত বসতি স্থাপনকারীদের সহ মোট ইহুদি জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১১ ভাগ।
যাই হোক, ফিলিস্তিনি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাদ বাকি আরব জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই ফিলিস্তিন “পুনরুদ্ধারের” নামে একটি অসাধু অভিযান শুরু হয়।
১৯৪৮ সালে প্রথম ইসরায়েলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী য়িৎযাক গ্রুয়েনবামের নিকট প্রেরিত একটি চিঠিতে লেখা ছিল, “প্রচলিত নামসমূহকে নতুন নাম দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা আবশ্যিক। আমাদের পুরনো দিনকে নবায়ন করতে হলে এবং চমৎকার জনগোষ্ঠী নিয়ে বসবাস করতে হলে যার শিকড় আমাদের দেশের মাটিতে প্রোথিত আমাদেরকে অবশ্যই দেশের মানচিত্রের মৌলিক হিব্রুকরণ শুরু করতে হবে।”
এরপরই সরকার একটি কমিশন তৈরি করে তাদেরকে ফিলিস্তিনি সবকিছুর নয়া নামকরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যাতে শহর, গ্রাম ও অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের ভৌগলিক এলাকায় নতুন রাষ্ট্রের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৭ সালে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার লেখা আরেক চিঠিতে নাকবার সময় দখলকৃত ফিলিস্তিনি ঘর-বাড়িসমূহ ধ্বংস করার কাজের গতি বাড়ানোর জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে অনুরোধ করে। এই কর্মকর্তা লিখেন- “আরব গ্রাম ও এলাকাগুলোর ধ্বংসাবশেষ এবং ১৯৪৮ সাল থেকে খালি পড়ে থাকা বাড়িগুলো ক্ষতির কারণ হতে পারে, এর ফলে রাজনৈতিক খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই এসকল বাড়ি ঘর ভেঙে সাফ করে দেওয়া উচিত।”
ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করা এবং তাদের মাতৃভূমির ইতিহাস থেকে তাদেরকে বের করে দেওয়াটা ইসরায়েলের সার্বক্ষণিক কৌশলসমূহের একটি।
ইসরায়েলি পণ্ডিত মাওজ আজারয়াহু ও আর্নন গোলান তাদের "(Re)naming the Landscape: the Formation of the Hebrew Map of Israel" (ভূচিত্রের [পুনঃ]নামকরণ: হিব্রু মানচিত্র গঠন) শীর্ষক গবেষণা পত্রে লিখেন- “ ‘ইসরায়েলকে হিব্রুকরণ’ আধুনিক ইহুদিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত হিব্রুকরণ বলতে বুঝায় (ইহুদি) জাতি গঠন প্রকল্পের সহায়ক হিসেবে ইহুদিবাদের (জায়নিজম) নিজ দায়িত্বে ও সহযোগিতায়া হিব্রু ভাষার পুনরুজ্জীবন ঘটানো।”
এটি ইসরায়েলের জন্য যেমন সত্যি, ঠিক তেমনি অন্যান্য উপনিবেশ স্থাপনকারীদের ক্ষেত্রেও সমান সত্যি। এবং অন্যান্য বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদী শক্তির মতোই, ইসরায়েল বিভিন্ন স্থান, স্থানের নাম এবং উপনিবেশকৃত অঞ্চলের জনগণের মধ্যকার গুরুত্বপূীর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন।
যেমনটা কানাডিয়ান ইতিহাসবিদ কালেইঘ ব্রাডলি তার সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন: “স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য স্থানের নামসমূহ স্মৃতি জাগিয়ে তোলার যন্ত্ররূপে কাজ করে। এই নামগুলো মানুষের মনে ইতিহাস, আধ্যাত্মিক ও পরিবেশগত জ্ঞান এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাকে মূর্ত করে তোলে। এছাড়াও জায়গার নাম দেশের অভ্যন্তর ও বহির্বিশ্বের মধ্যে এক ধরনের সীমান্ত হিসেবে কাজ করে।”
ফিলিস্তিনি জায়গাসমূহের নাম বদল, ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী স্থানসমূহের ধ্বংসসাধন, ফিলিস্তিনি সংস্কৃতিকে নিজেদের দাবি করা, আরবি ভাষাকে অবমূল্যায়ন করা এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সাংষ্কৃতিক অবদান মুছে ফেলার ইহুদিবাদী প্রচেষ্টা ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান আছে।
অতিসম্প্রতি ইসরায়েল তাদের সহিংস সামরিক শক্তি শুধুমাত্র ফিলিস্তিনি মানুষ হত্যার জন্যই কাজে লাগাচ্ছে না, বরং তাদের সাংস্কৃতিক নিদর্শনাবলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয় ধ্বংস করার জন্যও তাদের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিনি দাপ্তরিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৪ সালে ৫১ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ৭৩টি মসজিদ ধ্বংস করেছে।
এর মধ্যে কিছু মসজিদের স্থাপনা এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো, যেমন জাবালিয়ার আল-ওমারি মসজিদ। এই মসজিদটি ১৩৬৫ খিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে নির্মিত হয়, এবং ফিলিস্তিনিদের আশার প্রতীক ও অতীত ঐশ্বর্যের স্মারক হিসেবে কাজ করতো।
এছাড়াও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদের উপর চাপ বৃদ্ধি করে। দেশটি হারাম আল-শরিফ প্রাঙ্গনে চরমপন্থী ইহুদিবাদী সংগঠন টেম্পল মাউন্ট ফেইথফুলের জোরপূর্বক অনুপ্রবেশে সহযোগিতা করছে, উল্লেখ্য হারাম আল-শরিফে আল-আকসা অবস্থিত। এই চরমপন্থী গোষ্ঠী ঘোষণা করেছে যে তারা টেম্পর মাউন্টে তৃতীয় উপাসনালয় নির্মাণের জন্য আল-আকসা ধ্বংস করতে আগ্রহী, স্পষ্টতই ইসরায়েল সরকারও এরকমটাই চায়।
এছাড়াও নাবলুস, আল খালি (হেব্রন), আরিয়া (জেরিচো), ইয়াফফা (জাফা), হাইফা এবং আরো অনেক ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামে বিভিন্ন সময়ে আক্রমণ করা হয়েছে।
তা সত্ত্বেও, এতো ধ্বংস সাধনের পরও, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, ইসরায়েল এখনো তার অতীত এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে।

ফিলিস্তিনি সুমুদ

খ্যাতনামা ইসরায়েলি ঐতিহাসিক বেনি মরিস ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ’র সাথে একটি সাক্ষাৎকারে তার দেশের ভয়ানক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এই স্থানটি মধ্যপ্রাচ্যের আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে বিস্ফোরিত হবে। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাথে সহিংসতা বাড়তে থাকবে আরবরা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দাবি জানাবে। ইহুদিরা বিশাল আরব ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছোট্ট সংখ্যালঘু হয়ে থাকবে, যেমনটা যখন তারা আরব দেশসমূহে বসবাস স্থাপন করেছিলো তখন ছিল।”  তিনি আরো যোগ করেন: “আগামী তিরিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তারা (আরবরা) আমাদেরকে (ইহুদিদেরকে) যেকোন উপায়ে অতিক্রম করবে।”
কথাগুলো তিনি দেশবাসীর মধ্যে বিদ্যমান ভয়কে কাজে লাগানোর জন্য এই মন্তব্য করেছেন, নাকি সত্যিকার অর্থে তার বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। হয়তো ইসরায়েলিরা যে তাড়াহুড়ো করে ফিলিস্তিনি পরিচিতির বিরুদ্ধে কাজ করছে, ফিলিস্তিনি সংস্কৃতির উপর আঘাত হানছে, ইহুদি বসতির বিস্তার ঘটাচ্ছে, রাস্তার নাম পাল্টাচ্ছে, আরবি ভাষাকে অবজ্ঞা করছে, অথবা আর্চবিশপ হান্নার ভাষায় বলা যায় “ফিলিস্তিনি সবকিছুকেই লক্ষ্য বানাচ্ছে”, এসব কার্যক্রমের ব্যাখ্যা করেছেন তিনি এই বক্তেব্যে।
কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণীর অনুরূপ আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী কর্তৃক “নিপীড়িত সংখ্যালঘুদেরকে” “নির্বিচারে হত্যার” কারণে ইসরায়েল রাষ্ট্র ধ্বংস হবে না। বরং ধ্বংস হবে ইসরায়েলিদের বেপরোয়া কার্যক্রমের কারণে। ইহুদিবাদীদের আগেও ফিলিস্তিনে অনেক আক্রমণকারীরা এসেছিল। তাদের অনেকে পালিয়ে গেছে, কিন্তু অন্যরা ফিলিস্তিনের বৈচিত্রপূর্ণ সমাজের সাথে মিশে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে।
ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমির সাথে তাদের যে সম্পর্ক, সেটা সহিংসতা, নেসেটে পাশ করা আইন কিংবা সেনা-শাসন দ্বারা নির্ধারণ কিংবা বাতিল করা যাবে না, ইসরায়েলিরা এই সত্যটাকে স্বীকার করছে না। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের উপর আগ্রাসন যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের জাতীয়তাবোধ ততই শক্তিশালী হচ্ছে। মরহুম ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ তার “পরিচয়পত্র” কবিতায় ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের স্পৃহাকে চমৎকার চিত্রায়িত করেছিলেন:
আমি এক উপাধিহীন নাম, এক ভূখণ্ডে সহিষ্ণু, সেখানে যা আছে তা নিয়েই, যেখানে সবাই বসবাস করে ক্রোধের বিস্ফোরণ নিয়ে, আমার শেকড় প্রোথিত হয়েছে সময়ের জন্মের আগে, ইতিহাসের সূচনারও পূর্বে, জলপাই আর সাইপ্রাস গাছের জন্মের ও পূর্বে, এমনকি ঘাস ফোটারও পূর্বে।
প্রথম দিককার ইহুদিবাদীরা ভুল ছিল। ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস, রাস্তার নাম পরিবর্তন আর মসজিদ-গীর্জা ধ্বংস করে একটি জাতির স্বাতন্ত্র্যবোধকে, পরিচিতি জ্ঞানকে ধ্বংস করা যায় না।
ফিলিস্তিনি সুমুদ (দৃঢ়তা) ইসরায়েলের যে কোন, এবং সকল সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠেছে। আর এই দৃঢ়তাই কেবল মরিসের ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণিত করবে। ফিলিস্তিনিদের বিশাল সাগর দখলদারদের গ্রাস করে ফেলবে। ‍
________________________________

লেখক পরিচিতি: রামযি বারুদ একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কলামিস্ট। রুমানা একজন ফ্রিল্যান্সার লেখিকা। তাদের লেখা এই নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজির অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। মূল নিবন্ধের শিরোনাম: Israel's Judaisation of Palestine is failing.


সিসি মুরসির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অভ্যুত্থান করেন
সিসি মুরসির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অভ্যুত্থান করেন
আল জাজিরা আরবি:
মিসরের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া বিপ্লবের সাড়ে পাঁচ বছর পর কায়রোতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত আন প্যাটারসন ওয়াশিংটনে এক আলোচনা সভায় বসেছিলেন, সে অভিজ্ঞতার শিক্ষণীয় দিকগুলো আলোচনা করার জন্য।
প্যাটারসন প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন নীতি স্পষ্ট করেন, আর তা হচ্ছে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক। অর্থাৎ ওয়াশিংটন প্রথমেই মিসরে এমন অবস্থা নিশ্চিত করতে চায়, যা দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন “মিসরে আমাদের নীতি খুবই স্পষ্ট ছিল, এতে কোন দ্বিধা ছিল না।” তিনি আরো যোগ করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক ছিল ইসরায়েলের সাথে মিসরের সম্পর্ক। আর এই নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ঘোষিত অন্য কোন নীতির সাথে বিরোধপূর্ণ হলে এই নীতিই অগ্রাধিকার পেতো। যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সহযোগীতা করার নীতির কথা বলা যেতে পারে।
এই সুস্পষ্ট স্ট্রাটেজি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পয়েন্টের একটি, মিসর সম্পর্কে প্যাটারসনের পুরো আলোচনা বুঝতে হলে যেগুলো প্রথমে বুঝতে হবে। গত বৃহষ্পতিবারে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেস কর্তৃক আয়োজিত “আট বছর পর আরব বিদ্রোহ” শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব আলোচনা করেন।
সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আলোচনার দ্বিতীয় পয়েন্টটি মিসরীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকার সাথে সম্পৃক্ত।  তিনি বলেন, “হুসনি মোবারককে যে অপসারণ করেছিল, মুহাম্মাদ মুরসিকেও সেই অপসারণ করেছে।” সেই সাথে তিনি যোগ করেন, “কেউ যদি সিসিকে অপসারণ করে, তবে তা একমাত্র মিসরীয় সেনাবাহিনীই করবে।” এরপর তিনি বলেন, “এটি কোন গণতান্ত্রিক কার্যক্রম ছিল না।”
তৃতীয়  পয়েন্টটি হলো পাশ্চাত্যের ভূমিকা সম্পর্কে। রাষ্ট্রদূত বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু শক্তি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ফলে যে ‘অপ্রিয়’ ফলাফল হতে পারে, সেটিকে গুরুত্ব দেয়নি।’ অপ্রিয় দ্বারা মূলত ১৫ জানুয়ারি ২০১১ সালের বিপ্লবের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ইখওয়ানের উত্থানের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি।
প্যাটারসন আরো বলেন, “শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট ছিল যে ইখওয়ান নির্বাচনে ভালো করবে।” সালাফি আন্দোলনের উত্থানের ফলে অনেকের বিস্ময়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথাটি বলেন।
এরপর রাষ্ট্রদূত মার্কিন “অনুসঙ্গসমূহ” সম্পর্কে এবং এগুলো কীভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন রক্ষা করতে এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আবদুল ফাত্তাহ সিসির অভ্যুত্থান ঠেকাতে ব্যর্থ হলো, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রাষ্ট্রদূত তার আলোচনায় এটিকে অভ্যুত্থান বলতে দ্বিধাবোধ করেন নি।  

হারিয়ে যাওয়া উপসাগরীয় পর্ব:

মার্কিন এই কূটনীতিবিদ বলেন, অভ্যুত্থানের ফলে মার্কিন উদ্দেশ্য শতভাগ পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মুরসিকে অপসারণের বিষয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের ভূমিকা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের নিকট মারাত্মক “তথ্য বৈসাদৃশ্য” (ইনফর্ম্যাশন গ্যাপ) ছিল। এছাড়াও তিনি ইঙ্গিত করেন যে, সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এই অভ্যুত্থানে সালাফিদের ভূমিকা মার্কিনদের নিকট স্পষ্ট ছিল না।
প্যাটার্সনের বক্তব্যে অভ্যুত্থানে উপসাগরীয় অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ভূমিকার কথা উত্থিত হয়, ওয়াশিংটনের নিকট এসকল দেশ নিছক দর্শকের ভূমিকায় ছিল এমন একটা চিত্র ফুটে ওঠে, সেই সাথে সেই কঠিন দিনসমূহে যা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে অনেক প্রশ্নও উত্থাপিত হয়। সম্ভবত অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর অন্যান্য মার্কিন সূত্রে বর্ণিত বিভিন্ন কথোপকথন ও বিভিন্ন দলিলে প্রকাশিত হয়েছে।
আর এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় মার্কিন দলিল সম্ভবত মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড কিরকপ্যাট্রিক রচিত “Into the Hands of Soldiers... ... Freedom and Chaos in Egypt and the Middle East” গ্রন্থটি। এই বইটির সারসংক্ষেপ নিউ ইয়র্ক টাইমসে ২০১৮ সালের জুলাই মাসের ২৭ তারিখ প্রকাশিত হয়।
ডেভিড কিরকপ্যাট্রিক তার বইয়ে যেসকল দলিল ও তথ্য-প্রমাণাদি সংকলন করেছেন, সেগুলোর আলোকে প্যাটরসনের অভিজ্ঞতা পাঠ করলে অনেকগুলো উপসংহারে উপনীত হওয়া সম্ভব। তন্মধ্যে একটা হলো, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা “আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার পালাবদল”র পক্ষে তার অবস্থান সম্পর্কে দৃঢ়তা প্রকাশ করলেও তার প্রশাসনে দায়িত্বশীলগণ ছিল বিভিন্ন অঙ্গনের, আর তাই ২০১৩ সালে মিসরে তারা অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করেনি।
কিরকপ্যাট্রিক তার বইয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হ্যাগেলের বিষয়ে দলিল উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন সূত্র অনুসারে জানা যায়, রিপাবলিকান দলের প্রবীণ এই নেতা, যিনি ওবামার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন, তিনিও তার রাষ্ট্রপতির লক্ষ্য অনুসারে কাজ করেন নি।
দুই হাজার ষোল সালে মার্কিন সাংবাদিককে হেগেল তার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে তার নিকট সৌদি, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের নিকট থেকে অভিযোগ আসে। সাবেক এই মন্ত্রী আরো বলেন, আমিরাতের “ডি ফ্যাক্টো শাসক” আবু ধাবির যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন যায়েদ ইখওয়ান সম্পর্কে বলেন, “আমাদের এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সবচেয়ে ভংঙ্কর বিপদ হচ্ছে ইখওয়ানুল মুসলিমন।”
কাজেই, মিসরের অভ্যুত্থানে সৌদি ও আমিরাতের ভূমিকা সম্পর্কে আমেরিকা কোন কিছু না জাানাটা অস্বাভাবিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত যেমনটা দাবি করেছেন তার সর্বশেষ বক্তব্যে। বিশেষত যখন জানা যায় যে, সেখানে কতিপয় মার্কিন দায়িত্বশীল এবং মুহাম্মাদ বিন যায়েদের মতো ব্যক্তিত্ব ও ইসরায়েলের মতো একটি পক্ষের যৌথ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল।  
এসকল মার্কিন দায়িত্বশীলদের মধ্যে আছেন জেনারেল মাইকের ফ্লিন, যিনি সে সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদ এজেন্সির প্রধান ছিলেন, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন ও রাশিয়ার মধ্যকার অনুমিত গোপন চুক্তির বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি।
অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে জেনারেল ফ্লিন মিসরের রাজধানী কায়রো সফর করেন, মিসরীয় জেনারেলদের সাথে মুরসির বিষয়ে কথা বলার উদ্দেশ্যে। কিরকপ্যাট্রিক বলেন, জেনারেল ফ্লিন ২০১৬ সালে তাকে জানিয়েছিলেন যে ইখওয়ানুল মুসলিমীন আর আল কায়েদা “একই আদর্শ”র অনুসারী।

মুরসির প্রতি মার্কিন বিদ্বেষ:

এমনকি বেসামরিক মার্কিন দায়িত্বশীলদের মধ্যেও অভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান ও নিদর্শনাদি বিদ্যমান ছিল। এর মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরিও আছেন, যিনি রাষ্ট্রদূত প্যাটারসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছিলেন।
জন কেরি ২০১৩ সালের মার্চে কায়রো সফর করেন, এবং মুরসি ও সিসির সাথে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন। কিরকপ্যাট্রিক কর্তৃক সংকলিত তথ্য-উপাত্ত অনুসারে, দুটি সাক্ষাৎ ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্যে। কেরি মিসরের সেসময়ের রাষ্ট্রপতিকে অপছন্দ করেন এবং তাকে মার্কিন সাহায্যের অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করেন।
কিন্তু তিনি সিসির সাথে সাক্ষাৎ শেষে সন্তুষ্টচিত্তে বেরিয়ে আসেন। কেরি সাংবাদিক কিরকপ্যাট্রিকের নিকট বর্ণনা করেন, সিসি সেদিন তাকে বলেছিলেন, “আমি আমার দেশকে অজ্ঞাত পরিস্থিতির দিকে ছেড়ে দেব না।” সেসময়েই মার্কিন মন্ত্রী বুঝতে পারেন যে মুরসির সময় শেষ হয়ে এসেছে।
আর যখন জন কেরির প্রতিনিধি আন প্যাটারসন কায়রোতে মিসরীয়দেরকে নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বলছিলেন, এবং ফলাফল জানা নেই এমন কোন আন্দোলনের দিকে এগুতে নিষেধ করেছিলেন, ঠিক সেই সময় প্রায় প্রতিদিন চাক হেগেল সিসির সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করছিলেন।
কিরকপ্যাট্রিক বলেন, হোয়াইট হাউস হেগেলকে সিসির সাথে কথা বলার জন্য এমন সব পয়েন্ট বাতলিয়ে দিচ্ছিল, যাতে সিসিকে এই মর্মে সতর্ক করা হয় যে মিসরে অভ্যুত্থান হলে ওয়াশিংটন কঠোর শাস্তি দেবে। কিন্তু হেগেল সিসির নিকট “সম্পূর্ণ” ভিন্ন বার্তা পৌছাচ্ছিলেন।

হটলাইন:

হটল সিসিকে বলেন, “আমি কায়রোতে বসবাস করি না, বরং আপনিই কায়রোতে বসবাস করেন। কাজেই আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনারই, আপনার দেশ রক্ষা করার দায়িত্ব আপনারই।” আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মর্তা বলেন, হোয়াইট হাউস চাচ্ছিল, হেগেল যেন সিসিকে জানিয়ে দেন, “গণতন্ত্রই গুরুত্বপূর্ণ”, কিন্তু হেগেল যে বার্তা পাঠাচ্ছিলেন, তা হলো: “আমরা ভালো সম্পর্ক চাই।”
হয়তো হেগেল ও সিসির মধ্যকার গোপন হটলাইন সম্পর্কে প্যাটারসন জানতেন না, কিন্তু সর্বাবস্থায় তিনি সিসি সম্পর্কে তো জানতেন। আর এটা বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের আলোচনায়ও স্পষ্টই বোঝা যায়।
প্যাটরসন মিসরের বর্তমান শাসক সিসি সম্পর্কে যা জানেন, তার সব কিছুই স্পষ্ট করেন নি, কিন্তু তিনি বলেছেন যে তিনি জানতেন মুরসি যখন সিসিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন তখন তিনি যতটুকু চিবুতে পারেন, তার চেয়ে বড় গ্রাস গ্রহণ করতেন। আর তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি কয়েক বার সিসির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
রাষ্ট্রদূত মনে করততেন, এই ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মুরসির নাই। মুরসি সম্পর্কে তিনি বলেন, “মুরসি কট্টর ইসলামপন্থী, এটা তার ভুল নয়, বরং তিনি কি করেছিলেন, তা তিনি ভালোভাবে জানতেন না। আর যখন চাপ বৃদ্ধি পেতো, তখন ভেঙে পড়তেন, বিশেষত তার বিচ্ছিন্ন উপদেষ্টাদের কারণে। সত্যি বলতে কী, তার উপদেষ্টাদের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। মার্কিন প্রশাসনের অনেকেই তার প্রতি বিরক্ত ছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন দাম্ভিক ও বিচ্ছিন্ন।
প্যাটারসন বলেন, “বর্তমানে এটি সুস্পষ্ট যে আরব বসন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এটি আরবের বাস্তবতা বদলে দিয়েছে।” (সংক্ষেপিত)
________________________________

প্রতিবেদনটি আল জাজিরা আরবিতেمصر والسيسي ومرسي.. المشهد الأخير بعين السفيرة الأميركية” শিরোনামে ১৭ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত, ছবি আল জাজিরা থেকে সংগৃহীত।



আনাদুলু এজেন্সি:
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে ওসমানি (অটোমান) সাম্রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির পর তাঁকে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। সে হিসেবে তুরস্ক এবার তার ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছে।
আবদুল হামিদ চতুর্ত্রিংশ ওসমানি খলিফা, তিনিই সাম্রাজ্যে সর্বশেষ শক্তিশালী খলিফা। তিনি এমন অনেক কাজে সফল হয়েছিলেন, যেগুলো আরব ও মুসলিম উম্মাহকে একত্রিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
তেত্রিশ বছরব্যাপী সুদীর্ঘ শাসনামলে তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার মাঝে অন্যতম হলো: ইহুদিবাদী শক্তির প্রতিরোধ; যারা কিনা ফিলিস্তিন দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তাঁর আরো দুটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো হেজাজ রেলওয়ে এবং প্যান ইসলামিজম প্রতিষ্ঠা; এর মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আরব ও মুসলিম জাতিকে একীভূতকরণ এবং পশ্চিমা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। উল্লেখ্য সেসময়েই পশ্চিমারা আরব ও মুসলিম বিশ্বের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে শুরু করেছিলো।
বায়তুল মাকদিস:
যে সকল ওসমানি সুলতান ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবদান রেখেছিলেন, সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। তিনি ইহুদিবাদী শক্তির মোকাবেলা করেছিলেন, যারা সে সময় ফিলিস্তিন দখলের অপচেষ্টা করছিলো।
সুলতান আবদুল হামিদ ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসী হওয়া ও জেরুজালেমে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করে প্রথম আইন প্রণয়ন করেন।
সে সময়, সেই আঠারো শতকে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে তাদের বসতি স্থাপনের বিনিময়ে ওসমানি সাম্রাজ্যের সকল ঋণ পরিশোধ করার প্রস্তাব পেশ করেছিলো। আবদুল হামিদ তাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
আনাদুলের ওসমানি ইতিহাসের অধ্যাপক মুহাম্মাদ হরব বলেন:  “সুলতান আবদুল হামিদ ১৮৯০ সালের ২৮ জুন ওসমানি ভূখণ্ডে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করতে নিষেধ করে এবং তাদেরকে তারা যে দেশ থেকে এসেছে সেখানে ফেরত পাঠাতে নির্দেশ দিয়ে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন।
তিনি আরো যোগ করেন: “ইহুদিরা এই প্রস্তাব (সাম্রাজ্যের ঋণ পরিশোধের প্রস্তাব) পেশ করলে সুলতান আবদুল হামিদ নিজেকে সংবরণ করতে পারেন নি, ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তাঁর দরবার হতে থিওডর হেরযল এবং প্রধান ইহুদি রাব্বিকে বহিষ্কার করেন (ইহুদিদের পক্ষ থেকে এরা দুজনেই প্রস্তাবটি পেশ করেছিলো)”
 এরপর তিনি লিখেন: “ওয়াশিংটন, বার্লিন, ভিয়েনা, লন্ডন ও প্যারিসের ওসমানি রাষ্ট্রদূতদেরকে নির্দেশ প্রদান করা হয়, যেন তারা জায়নবাদী আন্দোলনের গতিবিধি ও তাদের সম্পর্কে প্রতিবেদন যথাশিঘ্রই সুলতান আবদুল হামিদের নিকট প্রেরণ করেন।”
ইহুদিদের অভিবাসন থেকে রক্ষা করতে আবদুল হামিদ ১৮৭৬ সালে “ওসমানি ভূমি স্মারক” (مذكرة الأراضي العثمانية) শীর্ষক একটি আইনি স্মারক প্রকাশ করেন।
এই স্মারক অনুসারে, সুলতান ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমি, বিশেষত ফিলিস্তিনি ভূমি ইহুদিদের নিকট বিক্রি করতে নিষেধ করেন। এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট প্রস্তুত করেন। এছাড়া ফিলিস্তিন ভ্রমণে আগ্রহী ইহুদিদের জন্য সংক্ষিপ্ত সময় নির্দিষ্ট করে দেন।
হেরযল যখন বুঝতে পারলেন, ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী লক্ষ্যপূরণে সবচেয়ে বড় বাধা সুলতান আবদুল হামিদ, তখন তাকে সন্তুষ্ট করতে এবং ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করতে তিনি কূটনৈতিক উপায়ের আশ্রয় নিতে শুরু করেন।
পুরনো স্বপ্ন:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘণ্টা যখন বেজে ওঠে, তারও আগে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলকে ভালোভাবে ইস্তাম্বুলের সাথে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষা খাত এবং যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেলিগ্রাফ এবং রেললাইন। এই সংযুক্তি স্থাপনের ফলে রেল লাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হজযাত্রীদের চলাচল সহজ হয়।
সেসময় হজযাত্রীরা ইস্তাম্বুল থেকে গজে যেতে হলে দুই মাসের কষ্টকর ভ্রমণের মাধ্যমে যেতে হতো, বিভিন্ন কাফেলার সঙ্গী হয়ে। এর মধ্যে আবার বেদুইনদের দ্বারা ডাকাতির শিকার হওয়ার ভয়ও ছিল।
শুরুতে ”হেজাজ রেলওয়ে” প্রকল্পের খরচ ধরা হয়ছিলো চার মিলিয়ন ওসমানি লিরা, ওসমানি সাম্রাজ্যের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিলো না, আবার ইউরোপীয় ঋণ পাওয়াও সম্ভব ছিলো না। ফলে দান-খয়রাতের মাধ্যমে অর্থ জমানো শুরু হয়, সুলতান নিজেই দান করা শুরু করেন। এরপর শাসক পরিবার, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে জনসাধারণও বড় অংকের দান করেন এই প্রকল্পের জন্য।
প্রকিল্পটি শেষ করতে মোট খরচ হয় সাড়ে তিন মিলিয়ন লিরা। ইউরোপীয় কোম্পানীগুলো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যে পরিমাণ টাকা চেয়েছিলো, তার চেয়ে অনেক কম খরচ হয়।
“হেজাজ রেলওয়ে” ইস্তাম্বুলকে দামেশক হয়ে মক্কা শরিফ, মদিনা শরিফ ও ইয়েমেনের সাথে সংযুক্ত করে। ১৯০০ সালে দামেশক থেকে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। চার বছর পর ৪৬০ কি.মি রেল লাইন তৈরি হয়। তখন জর্দানের মআন শহর পর্যন্ত রেললাইন পৌছে। একইভাবে ফিলিস্তিনের হিফা শহরও সংযুক্ত হয় ইস্তাম্বুলের সাথে। ১৯০৮ সালে রেললাইন মদিনা শরিফ পৌছে, সে বছরই রেললাইনের উদ্বোধন হয়, রেললাইনটির দৈর্ঘ হয় মোট ১৪৬৪ কি.মি।
১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট প্রথম রেল যাত্রা শুরু করে। সে রেলগাড়িতে ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও অতিথিবৃন্দ ছিলেন। ট্রেন যাত্রা শুরু করে ইস্তাম্বুল থেকে, দামেশক হয়ে মদিনা শরিফ পৌছে। ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কি.মি গতিতে ট্রেন চলে, সেসময়ের জন্য এটা অনেক ভালো গতিবেগ ছিলো। নামাজ আদায় কিংবা পাথেয় সংগ্রহ করা ছাড়া ট্রেন থামে নি। মদিনা শরিফ পৌছতে সেবার তিন দিন সময় লেগেছিলো।
এই প্রকল্পের আওতায় ২৬৬৬টি সেতু, সাতটি লোহার সেতু, ৯৬টি রেলস্টেশন, ৩৭টি পানির ট্যাংক, ২টি হাসপাতাল এবং ৩টি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করা হয়।
রেললাইন উদ্বোধনের পর থেকে হিফা ও দামেশকের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান ও যাত্রীদের আসা-যাওয়া হতে লাগলো দৈনিক, আর দামেশক ও মদিনার মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান ও যাত্রীদের যাতায়তে সময় লাগতো তিন দিন। হজের মৌসুমে সফর মাসের শেষ অবধি মদিনা ও দামেশকের মধ্যে তিনটি বিশেষ ট্রেন দেওয়া হতো। অধ্যাপক হরব তার বইয়ে লিখেন, সুলতান বলেছিলেন “নিশ্চয় হেজাজ রেলওয়ে আমার পুরনো স্বপ্ন।
মুসলমানদের একীভূতকরণ:
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন অংশকে “প্যান-ইসলামিজম” এর মাধ্যমে একীভূত করতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যেমে তিনি ইহুদিবাদী ও ফ্রিম্যাসনরি আন্দোলনকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন।
আন্তরর্জাতিক রাজনীতিতে প্যান ইসলামিজমের আবির্ভাব হয় আবদুল হামিদ ক্ষমতায় আসার পর। এর উদ্দেশ্য ছিল চিন, ভারত, মধ্য আফ্রিকা থেকে শুরু করে সব জায়গার মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা।
অধ্যাপক মুহাম্মাদ হরব বলেন, “প্যান ইসলামিজমের চিন্তা ছিল মূলত অনেকগুলো লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলা করা, যারা ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রশাসন ও রাজনীতির গভীরে প্রবেশ করে ফেলেছিলো, এছাড়া আকেটি উদ্দেশ্য ছিল রুশ ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের সম্মুখে মুসলিম বিশ্বকে একত্রিত করা।
সুলতান আবদুল হামিদের আমলে প্যান ইসলামিজমের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনসমূহের মধ্যে ছিল হেজাজ রেলওয়ে প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার প্রসার, উলামাদের সহযোগিতা, আলেম-উলামা ও সুফি-সাধকদের গুরুত্ব প্রদান, পাশ্চাত্য চাল-চলন ও চিন্তা-চেতনার প্রতিরোধ, ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমিতে পাশ্চাত্য পরিকল্পনার (মূলত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আবাসন স্থাপন) প্রতিরোধ।
দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৮৪২ সালে ইস্তাম্বুলে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর ইন্তেকাল হয় ১৯১৮ সালে। তিনি ৩৪ তম ওসমানি খলিফা, সালতানাত ও খেলাফতকে একীভূতকারী ওসমানিদের মধ্যে তিনি ২৬ তম, আর সমগ্র ইসলামের ইতিহাসে তিনি ১১৩তম খলিফা।
আবদুল হামিদ সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুদক্ষ ওসমানি সুলতান হিসেবে পরিচিত, তার সময়ে শিল্প খাতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন হয়েছে, এর বাইরে অনেক রাষ্ট্রীয় ঝামেলার মুখোমুখি তো হতেই হয়েছে। তাকে ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমির ব্যাপারে আগ্রহী শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।
________________________________

এই প্রবন্ধটি সর্বশেষ প্রকৃত ওসমানি শাসক আবদুল হামিদের ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে টার্কপ্রেস, আনাদুল অ্যাজেন্সিসহ বিভিন্ন তুর্কি মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। ছবিসংগ্রহ ও ভাষান্তর করা হয়েছে টার্কপ্রেস থেকে।




ড. হুসাইন দাকিল, আল জাজিরা ব্লগ:
সর্বশেষ অটোম্যান (ওসমানী) সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের মৃত্যুবার্ষিকী সামনে এসেছে। সুলতান যখন ১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রোগ শয্যায় বসে ছিলেন, স্ত্রী-সন্তানদের সাথে কফি পান করেছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্তে বিদায় নিতে নিতে তাদেরকে তিনি বলছিলেন, আল্লাহ স্বাক্ষী, আমি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন আর আমার দেশ ও জাতির কল্যাণের উদ্দেশ্য ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনি, কোন কাজে এগিয়ে যাই নি। সুলতানা তখন তার প্রশংসা করে বলেন, আমরা আপনার ধর্ম, দেশ ও জাতির প্রতি আপনার ভালোবাসার সাক্ষ্য দিচ্ছি। এরপর তাঁর হাত থেকে কফির কাপ পড়ে যায়, তাঁর আত্মা পরপারে পাড়ি জমায়। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৮৪২ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুলের “জুরাগান প্রাসাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুলতান আবদুল মাজিদ, মা তিরমিজকান কাদিন। সুলতানের মা ৩৩ বছর বয়সে মারা যান, যখন তার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। তিনি তার সৎ মা পেরেস্তু কাদিনের নিকট লালিত-পালিত হত। সারা জীবন তিনি তাঁর সৎমায়ের কথা মনে রেখেছেন, এবং ৩৪ বছর বয়সে তিনি ক্ষমতায় আরোহণ করার পর তাকে “সুলতানা মা” উপাধিতে ভূষিত করেছেন। তিনি যখন ১৮৭৬ সালের ৩১ আগস্ট ক্ষমতা লাভ করেন, তখন সাম্রাজ্য ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পার করছিলো।
সাম্রাজ্যকে এই দুরবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য সব কিছু করা সত্ত্বেও তিনি অনেক অপবাদ এবং ইতিহাস বিকৃতির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো তিনি আরব বিপ্লব এবং এই বিপ্লবের নেতাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, এবং ইংরেজদেরকে মিসরে প্রবেশ ও মিসর দখল করার অনুমতি দিয়েছেন।  আসল ঘটনা হলো, বলা হয়ে থাকে ১৮৮২ সালে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ একটি ফরমান জারি করেন, যাতে আহমদ উরাবি একজন অবাধ্য এবং তিনি আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেছেন বলে গণ্য করা হয়েছে। ফলে অনেক মানুষ মনে করে যে এই ফরমানে ইংরেজদের মিসর দখলকে সমর্থন করা হয়েছে। একই সাথে আরেক দল মানুষ মনে করেন এই ফরমান জারি করা হয়েছিলো মিসরের কল্যাণার্থে। কাজেই, আসল ঘটনা কী?
প্রকৃত সত্য হলো এই যে, মুহাম্মাদ আলি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিসর অটোম্যান (ওসমানি) সাম্রাজ্য থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলো। তার পরবর্তীদের সময়ে এই বিচ্ছেদ আরো পাকাপোক্ত হয়, যারা কিনা মিসরে বিদেশী মুদ্রার অনুপ্রবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই সময়টাতে অটোম্যান সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায়। ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তখন জোটবদ্ধ হচ্ছিলো অটোম্যান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে, ভাগ-বাটোরা করে নেওয়ার চেষ্টাও করছিলো। কিন্তু সুলতান আবদুল হামিদের আমলের আরম্ভ হওয়ার সাথে সাথে মিসরে দখলদারির বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্থান হয়। এই আন্দোলন ইসমাইল পাশাকে সরকার পরিবর্তন, সংসদ নির্বাচন ও ১৮৭৯ সালের সংবিধান প্রকাশ প্রভৃতি দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়। ফলে আবদুল হামিদ এই আন্দোলন থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, এবং সমর্থন প্রদান করেন। তারাও আবদুল হামিদের সমর্থন থেকে সুবিধা নেয়, এবং এ সমর্থনকে তাদের আন্দোলনের বৈধতার প্রমাণ বলে মনে করে।
তাওফিক পাশার আমলে যখন আন্দোলন আরো তুঙ্গে ওঠে, সুলতান আবদুল হামিদ তখন মিসরি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অটোম্যান প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। মিসরি প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন, মাহমুদ সামি আল-বারুদি, শাইখুল আযহার (আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান) শাইখ মুহাম্মদ আল-ইনবাই, নকিব আল-আশরাফ প্রমুখ। ইউরোপীয়রা সুলতানের এই ভূমিকাকে ভালোভাবে নেয়নি। ফ্রান্স ও ব্রিটেন আলেক্সান্দ্রিয়ার অভিমুখে দুটো যুদ্ধ জাহাজ প্রেরণ করে, এবং অটোম্যান প্রতিনিধি দল মিসর ত্যাগের পূর্ব পর্যন্ত তারা আলেক্সান্দ্রিয়া ত্যাগ করতে অস্বীকার করে। এদিকে বারুদির নেতৃত্বে বিপ্লব একেবারে নিকটবর্তী হয়ে পড়ে, বিপ্লবের প্রতি অটোম্যান সুলতানের সমর্থন-সহায়তাও বাড়তে থাকে, সুলতান বারুদি এবং তৎকালীন যুদ্ধমন্ত্রী উরাবিকে পাশা উপাধি প্রদান করেন। ফলে বিপ্লব থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের জন্য ইউরোপীয়দের পক্ষ থেকে সুলতানের উপর চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু সুলতান এই চাপের মুখে নতি স্বীকার করেন নি, বরং সহায়তা আরো বাড়াতে থাকেন।  এমনকি তারফিক পাশাকে অপসারণ করার জন্যও উরাবি তাকে উৎসাহ প্রদান করেন। তাদের মধ্যকার একটি চিঠিতে এরকম লেখা ছিল: মিসরে কে ক্ষমতায় আছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো মিসরের গভর্নরের চিন্তা-চরিত, উদ্দেশ্য ও গতিবিধি কপটতা মুক্ত হওয়া, যাতে করে তার কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হয় মিসরের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা ও খেলাফতের (অটোমান) সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা।
যাই হোক, সুলতানের নামে উরাবির “অবাধ্যতা” বিষয়ক যে ফরমানটি জারি হয়েছিলো ব্রিটেন কর্তৃক মিসর দখলের ছয় দিন পূর্বে, উরাবি নিজেও সুলতানের নিজের ইচ্ছায় সেটি জারি হয়েছে বলে মনে করেন নি। এমনকি তিনি বলেছিলেন, আমরা যা করেছি, তাতে সুলতানের কখনোই অসম্মতি ছিলো না। সেই সমোঝতার (যেটি অটোম্যান প্রতিনিধি দলের সাথে হয়েছিলো) সময়ও কোন অসম্মতি ছিলো না, এমনকি এখন অবধিও নেই। বরং সুলতান কথায় ও কাজে আমাদের কর্মতৎপরতাকে সমর্থন করেছেন। বলা হয়ে থাকে, সুলতানের ইচ্ছা ব্যাতিরেখে এই ফরমান জারি করার জন্য উরাবি তৎকালীন অটোম্যান প্রধানমন্ত্রী আস সদর আল আজমকে অভিযুক্ত করেন। অন্য আরেক দলের মনে করেন, ফরমানটি আসলেই সুলতারের সিদ্ধান্তেই জারি হয়েছিলো, আর সেটা তিনি জারি করেছিলেন বাধ্য হয়ে, যখন তেল আল কবিরের যুদ্ধে উরাবির বাহিনীর উপর ব্রিটিশ বাহিনীর বিজয় নিকটবর্তী হওয়ার বিষয়টি সুলতান উপলব্ধি করতে পারেন, তখন। তিনি তুলনামুলক কম ক্ষতিকর পরিস্থিতি মেনে নিতে চেয়েছিলেন, যাতে মিসর অটোম্যানদের পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে ব্রিটিশদের একচ্ছত্র শিকারে পরিণত না হয়। সম্ভবত এই মতটি বাস্তবতার সবচেয়ে নিকটবর্তী। এ বিষয়ে উরাবি বলেছিলেন, সম্ভবত এই ফরমানটি পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রকাশ করা হয়েছে।
________________________________
ড. হুসাইন দাকিল প্রাচীন নিদর্শন বিশেষজ্ঞ। তিনি গ্রিক ও রোমান প্রাচীন নিদর্শনের উপর আলেক্সান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। মিসরের বিপ্লবের সাথে সর্বশেষ অটোম্যান সুলতান আবদুল হামিদের সম্পর্ক এবং এ নিয়ে প্রচলিত বিভ্রান্তি সম্পর্কে في ذكرى وفاته.. هل خان السلطان عبد الحميد أحمد عرابي؟!” শীর্ষক তাঁর লেখা নিবন্ধটি আল জাজিরা আরবি ব্লগে প্রকাশিত হয়। ছবি http://www.toraseyat.com থেকে সংগৃহীত।


Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.