Articles by "মধ্যপ্রাচ্য"

মধ্যপ্রাচ্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান



আল জাজিরা:
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত অচলাবস্থার নির্বাচনের পর ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহুকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে এমনটাই জানানো হয়েছে।
গত বুধবারে রাষ্ট্রপতি রিউভেন রিভলিন, নেতানিয়াহু এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের পর ঘোষণাটি এসেছে। বেনি গান্টজ “তীব্র দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এমন এক জন নেতার,নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
ডানপন্থী লিকুদ পার্টির ৬৯ বয়সী নেতা নেতানিয়াহু, যিনি দেশটির সরবচেয়ে দীর্ঘকালীন নেতাও বটে, সরকার গঠনের জন্য তার হাতে ২৮ দিন সময় আছে। অবশ্য দরকার হলে রাষ্টপতির নিকট আরো দুই সপ্তাহ সময় চাইতে পারবেন।
তিনি ব্যর্থ হলে মধ্যপন্থী নীল-সাদা দলের নেতা গান্টজকে সুযোগ দেওয়া হবে।
টেলিভিশনে প্রচারিত মনোনয়ন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রিভলিন নেতানিয়াহুকে বলেন, “মহাশয়, আমি আপনাকে সরকার গঠনের সুযোগ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।”
রিভলিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা নেতানিয়াহু বলেন, সাবেক জেনারেল গান্টজের তুলনায় তার সাফল্যের সম্ভাবনা একটুখানি বেশি।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে এমন একটি পরিস্থিতির কথা কল্পনা করছিলেন, যেখানে তিনি এবং গান্টজ আরেক বার ক্ষমতা ভাগাভাগি করার সুযোগ পাবেন। যখন কিনা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে এসেছিল যে চলমান অচলাবস্থা নিরসনে তৃতীয় আরেকটি নির্বাচন আয়োজন ছাড়া আর কোন উপায় নেই। উল্লেখ্য ইসরায়েলের অনেকেই তৃতীয় নির্বাচন চাচ্ছিলেন।
তিনি বলেছেন, “আমি যদি সফল না হই তাহলে আমি আপনার প্রস্তাব আপনার নিকট ফিরিয়ে দেব, ঈশ্বর, ইসরায়েলের জনগণ এবং আপনার সহযোগিতায় আমরা একটি সম্প্রসারিত জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করবো।”
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতানিয়াহুর সামনে এখনো পঞ্চমবারের মতো সরকার গঠনের কোন স্পষ্ট উপায় নেই। এ বছরে দ্বিতীয় বারের মতো গত ১৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
লিকুদ পার্টি নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলো ১২০ আসনের সংসদে ৬টি আসন কম থাকার কারণে সরকার গঠন করতে পারছে না। নতুন হিসাবনিকাশে লিকুদ পার্টির হাতে আছে ৫৫টি আসন, এর বিপরীতে নীল-সাদা দলের হাতে আছে ৫৪টি আসন।
নেতানিয়াহু ঐক্যের সরকারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের পক্ষ থেকে হুমকি এবং শিগগিরই ট্রাম্পের ঘোষিতব্য “শতাব্দির বন্দোবস্ত” বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পুনর্মিলন দরকার।
ট্রুম্যান ন্যাশনাল নিরাপত্তা প্রকল্পের অংশীদার এলিস জ্যাকবস বলে, রাষ্ট্রপতি নেতানিয়াহুকে দায়িত্ব দিয়েছেন কারণ তার নিকট মনে হয়েছে এটিই সবচেয়ে ভালো উপায়।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এই মুহূর্তে লিকুদ পাার্টির সকল মন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি অনুগত আছেন। কাজেই, নেতানিয়াহু যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হবেন এটি কষ্টকল্পিত হলেও অসম্ভব নয়।”
তিনি আরো যোগ করেন, “রাষ্ট্রপতির পদটি যদিও প্রতীকী, তবু রাষ্ট্রপতি এ বছরের মধ্যে ৩য় নির্বাচন এড়ানোর জন্য তার সাধ্যানুযায়ী সবকিছুই করবেন । আর তিনিও লিকুদ পার্টির সাবেক সদস্য।”

প্রতিবেদনটি আল জাজিরা ইংরেজি থেকে নেওয়া। মূল প্রতিবেদন পড়ুন।


ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বক্তব্য দিচ্ছেন, ছবি: রয়টার্স
ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বক্তব্য দিচ্ছেন, ছবি: রয়টার্স


আল জাজিরা ইংরেজি:
ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রুহানি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণকালে তার দেশএকটি আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে।
১৯৮০’র দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ সূচনার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি টেলিভিশন ব্ক্তৃতায় রুহানি বলেন যে ইরান তেহরানের নেতৃত্বে উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী অঞ্চলের বৈদেশিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই অঞ্চলের দেশ সমূহের প্রতি “বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের হাত” বাড়াবে। উল্লেখ্য হরমুজ প্রণালী পুরো দুনিয়ার তেল শিল্পের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বলে বিবেচিত হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সম্প্রতি এ অঞ্চলে সৈন্য বৃদ্ধির একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় রুহানি উপসাগরীয় অঞ্চলে বৈদেশিক শক্তির উপস্থিতির বিরুদ্ধে হুশিয়ারি ঘোষণা করেন।
রুহানি বলেন, “বিদেশি সামরিক শক্তি আমাদের জনগণ ও অঞ্চলের অনিরাপত্তা এবং সমস্যার কারণ হতে পারে।” উল্লেখ্য রুহানি এই সপ্তাহের শেষের দিকে জাতিসংঘের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য নিউ ইয়র্ক সফর করবেন।
সৌদি তেলক্ষেত্রে হামলা
গত সপ্তাহে সৌদির অন্যতম বৃহৎ দুই তেল স্থাপনায় হামলার পর থেকে এ অঞ্চলে উত্তেজনা নতুস উচ্চতায় পৌছেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব আরামকোতে হামলার পিছনে ইরানকে দায়ী করছে, যদিও ২০১৫ সাল থেকে সৌদি-আমিরাত জোটের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এ হামলার দায় স্বীকার করেছেন।
ইরান এ হামলার সাথে কোন ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করছে।
এ হামলার পর ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা সৌদি ও আমিরাতে অস্ত্র ও কয়েক শত সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের নৌপথ ও প্রধান প্রধান তেল বাণিজ্যপথসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আমিরাত, সৌদি, বাহরাইন, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে একটি নৌ জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
রুহানি তার বক্তব্যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিদেশি শক্তিদের দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন: “তারা যদি আন্তরিক হয়ে থাকে, তবে আমাদের অঞ্চলকে অস্ত্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বানানো তাদের জন্য উচিত হবে না।
তিনি আরো বলেন: “মার্কিনরা অথবা আমাদের শত্রুরা যেখানেই গেছে ... সেখানেই অনিরাপত্তা দেখা দিয়েছে।
“আমরা অন্যদের সীমান্ত লঙ্ঘন করতে যাবো না। একইভাবে অন্য কাউকেও আমাদের সীমান্ত লঙ্ঘন করার সুযোগ দেবো না।”

অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ”
ইরান এবং বিশ্বশক্তিসমূহের মধ্যে ২০১৫ সালে সাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাহার করার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকট দেখা দিয়েছিল, সৌদি আরবে হামলার ফলে সেটি আরো গভীর হয়েছে। এরপর থেকে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞাসমূহ আরোপ করেছে এবং ইরানের তেল রফতানি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।
এর জবাাবে ধীরে ধীরে তেহরান পরমাণু চুক্তির সকল প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত যে কোন ধরনের আলোচনার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করছে।
রুহানি তার বক্তব্যে নিষেধাজ্ঞাগুলোকে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বলে আখ্যায়িত করে বলেন, ইরানের “বিপ্লবী জনগণ” এ সকল হুমকিতে ভীত নয়।
তিনি আরো বলেন, “গত ৪০ বছর ধরে, এবং বিশেষত গত ১০ বছরে আমাদের জনগণ নিষেধাজ্ঞার চাপ সহ্য করতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরো যোগ করেন, “প্রতিরোধ, প্রজ্ঞা ও ঐক্যের মাধ্যমে ... ইরান অবশ্যই এই কঠিন সময় অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।”
________________________________

আল জাজিরা কর্তৃক “Iran to present regional security plan at UNGA: Rouhani” শিরোনামে মূল প্রতিবেদনটি প্রকাশিত। ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।

মিশরে সিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মিছিল
শুক্রবার রাতে মিশরে সিসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের মিছিল...


আল জাজিরা ইংরেজি:
রাষ্ট্রপতি আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার হাজার হাজার গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারী মিশরজুড়ে বিভিন্ন শহরে মিছিল করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায়, বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার গভীর রাতে "জেগে উঠুন, ভয় নেই, সিসিকে অবশ্যই যেতে হবে" এবং "জনগণের দাবি, সরকারের পতন" প্রভৃতি স্লোগান দিচ্ছে।
রাজধানী কায়রো, দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়া এবং সুয়েজে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
সাদা পোশাকধারী সেনা কর্মকর্তারা তাহরির চত্ত্বর অভিমুখী বিক্ষোভকারীদের মোকাবেলা করেন, যে চত্ত্বরে ২০১১ শুরু হওয়া আন্দোলনের ফলে হোসনি মুবারাকের পত ঘটেছিল।
মিশরের অভ্যন্তরে খবর সংগ্রহ আল জাজিরার জন্য নিষিদ্ধ, তবে রাজধানীতে বেশ কয়েকটি গ্রেফতার ও আন্দোলনকারীদের উপর টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে।
স্ব-নির্বাসিত মিশরীয় ব্যবসায়ী ও অভিনেতা মোহাম্মদ আলী রাষ্ট্রপতি এল-সিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনার পর থেকে এই বিক্ষোভগুলি শুরু হয়েছিল, আন্দোলনে জনগণকে রাস্তায় নেমে সিসির অপসারণের দাবি জানিয়েছে। এল-সিসি অভিযোগগুলিকে "মিথ্যা" বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবারে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে আলি বলেন, “সিসি যদি বৃহষ্পতিবারের মধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা না দেন, তবে মিশরীয় জনগণ শুক্রবার চত্ত্বরে বেরিয়ে আসবে
আলি সেপ্টেম্বরের ২ তারিখ প্রথম ভিডিও পোস্ট করা শুরু করেন। তার সর্বশেষ ভিডিওটি লাখ লাখ বার দেখা হয়, এবং এর ফলে তিনি তার মাতৃভূমিতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আন্দোলনের গতি বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষিতে শুক্রবারে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে আলি জনগণকে শক্ত থাকার জন্য এবং অধিকার আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
আলি তার ভিডিও বার্তায় বলেন, আল্লাহ মহান, ইতোমধ্যে যথেষ্ট হয়েছে, আমি মিশরে ফিরতে চাই। আমি মিশর এবং আমার দেশের মানুষদের মিস কির। আল্লাহ আপনাদের সংকল্পকে দৃঢ়তা দান করুন।”
আল জাজিরার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ইহিয়া ঘানেম বলেন, তিনি "স্পষ্টতই" বিশ্বাস করেন যে শুক্রবারের বিক্ষোভ মিশরীয়দের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের আবেগের প্রতিনিধিত্ব করে।
তিনি বলেন, “মিশরে এখন যা চলছে তা আসলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আন্দোলন ... দেশকে স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।”
লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও ওয়াশিংটনস্থ সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির সিনিয়র ফেলো ডালিয়া ফহমি বলছেন, এসকল আন্দোল ২০১১ সালের বিপ্লব থেকে একেবারেই আলাদা।
ফাহমির মতে, যদিও জনগণ যে ভয়ের বাধা অতিক্রম করেছে তা ছিল বিস্ময়কর, তবে এটি প্রত্যাশিত ছিল।
তিনি বলেন, “আমরা যদি আজকের জনগণের দিকে থাকাই, লাখ লাখ মানুষের বয়সের গড় কিন্তু ২৩। এখন এর থেকে আপনি যদি ৮ বাদ দেন, তাহলে বিপ্লবের সময় এদের গড় বয় দাঁড়ায় ১৫ বছল।”
যখন আপনার বেশির ভাগ মানুষ বিপ্লব পরবর্তী ট্রমার স্মৃতির মধ্যে বসবাস করছে না। ফলে এক দল তরুণকে আপনি দেখতে পাবেন, যারা বিভিন্ন ধরনের দাবি-দাওয়া ও বিভিন্ন ধরনের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে আসছে। ফলে আট বছর আগে যারা আন্দোলন করেছিল তারা আর এখন যারা আন্দোলন করছে তারা একেবারেই আলাদা।”
শুক্রবারের আন্দোলন একদম বিরল একটি গণবিক্ষোভ ছিল। ২০১৩ সালে মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মুরসিকে পদচ্যুত করে তারই প্রতিরক্ষামন্ত্রী এল-সিসি রাষ্ট্রপতি হওয়াার পর থেকে সব ধরনের অননুমোদিত বিক্ষোভকে বেআইনি ঘোষণা করেন।
তাৎক্ষণিক মন্তব্যের জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি, ন্যাশনাল টিভি এই ঘটনাসমূহের খবর প্রচার করেনি।
সরকারপন্থী একটি টিভি চ্যানেলের উপস্থাপক অবশ্য বলেছেন যে, আন্দোলনকারীদের ছোট্ট একটি দল মধ্য কায়রোতে সমবেত হয়েছিল সেখান থেকে সরার পূর্বে ভিডিও ও সেলফি তোলার জন্য। আরেকটি সরকারপন্থী চ্যানেলের দাবি, তাহরির স্কোয়ারের আশপাশ এলাকার পরিস্থিতি শান্ত আছে।
২০১৪ সালে সিসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনৈতিক কৃচ্ছসাধন শুরু হয়েছে। মূলত ২০১১ সালের আরব বসন্তের পরের অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উন্নতির জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
জুলাই মাসে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে মিসরে প্রতি তিন জনে এক জন মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে যে, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে সিসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে “তার নিরাপত্তা বাহিনী ভয়-ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা, রাজনৈতিক বিরোধীদের এবং অ্যাক্টিভিস্টদের গ্রেফতারের অভিযান বৃদ্ধি করেছে।”
ইতোঃপূর্বে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা “মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর আক্রমণের” জন্য তাদের “গভীর উদ্বেগ প্রকাশ” করেছেন। তাদের উদ্বেগ প্রকাশের কারণসমূহের মধ্যে ছিল অসংখ্য ওয়েবসাইট ব্লক করা এবং বেআইনিভাবে সাংবাদিক ও বিরোধী মতাবলম্বীদের উপর হামলা চালানো ইত্যাদি।
সূত্র: আল জাজিরা ও অন্যান্য সংবাদ সংস্থা সমূহ
________________________________

আল জাজিরা ইংরেজি কর্তৃক প্রতিবেদনটি “In rare protests, Egyptians demand President el-Sisi's removal” শিরোনামে প্রকাশিত। সংযুক্ত ছবিটি রয়টার্সের ফটো সাংবাদিকের তোলা, যা আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




পশ্চিম তীরে আন্দোলনরত ফিলিস্তিনিরা

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯: ফিলিস্তিনি আন্দোলনকারীরা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে... ইসাম রিমাভি/আনাদুলু অ্যাজেন্সি

রাজা শেহাদেহ, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত সপ্তাহে সংসদীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি যদি পুনরায় নির্বাচিত হন, তবে অধিকৃত পশ্চিম তীরের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকা ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করে নেবেন।
তার এই ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু বেশির ভাগ ফিলিস্তিনির নিকট এই ঘোষণা কোন আলাদা অর্থ বহন করে না। আমরা বছরের পর বছর ধরে সহযোগিতার বিষয়ে বিবৃতি শুনে আসছি, অথচ কিছুই পরিবর্তন হয়নি। অসূরের যে রকম বিস্তৃতি ঘটছে, তাতে আমাদের অনেকেই এখন সোজা সাপ্টা কথা শুনতে পছন্দ করে। হারেৎজের কলামিস্ট গিডেওন লেভি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বিষয়ে সম্প্রতি যেমনটা লিখেছেন, “এ অঞ্চলের বাস্তবতাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দিতে দিন, এ বাস্তবতা আর বেশি দিন লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। সত্য প্রকাশ করার সময় এসেছে।”
ইসরায়েল এমনিতেই পশ্চিম তীর সংযোজন করার সব ফায়দা তুলে নিচ্ছে, এ জন্য এই অঞ্চলে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের দেখভালের কোন দায়-দায়িত্বও নিতে হচ্ছে না।
নেতানিয়াহু সাহেব নির্বাচনের প্রাক্কালে শুধুমাত্র তার ডানপন্থী সমর্থক গোষ্ঠীর মনোরঞ্জনের জন্য এই ওয়াদা দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক সংযোজন আসলে অধিকৃত অঞ্চলে বসবাসরত ইসরায়েলিদের জন্য কোন বাস্তব পরিবর্তন বা অতিরিক্ত সুবিধা বয়ে আনবে না। এখনই ইসরায়েলি সরকার তাদের সাথে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসরতদের মতোই আচরণ করছে, তাদেরকে কর ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাড়ও দিচ্ছে।
মূলত এ কারণেই আমার পরিচিত বহু ফিলিস্তিনি এখন এক রাষ্ট্র সমাধানের কথা ভাবতে শুরু করেছে। কারণ পশ্চিম তীরে এতো বেশি সংখ্যক ইসরায়েলি বসতির উপস্থিতিতে দুই রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়ন করা এখন প্রায় অসম্ভব। বলার অপেক্ষা রাখে না, নেতানিয়াহুর আনুষ্ঠানিক সংযোজন পরিকল্পনাকে মনে মনে অনেক ফিলিস্তিনি এ জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছে, কারণ এর মধ্য দিয়ে এই লক্ষ্যের দিকে এগুচ্ছে।
ইসরায়েল সব সময়ই এই ভূমিই চেয়ে এসেছে তবে এর অধিবাসীদের ছাড়াই। এবং যে এলাকাটি নেতানিয়াহু দখল করার ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা খুব কমই। অধিগ্রহণের জন্য ঘোষিত অঞ্চলের বেশির ভাগ ফিলিস্তিনি ইতোমধ্যে তাদের ভূমি হারিয়েছেন, এবং তারা আর কখনোই এই ভূমি ফেরত পাবেন না। তারা কেবলই ইসরায়েলি দখলদারদের সেবায় শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত থেকে নিন্দিত হবে।
কিন্তু নেতানিয়াহুর এই পদক্ষেপ, অন্ততপক্ষে একটা বিষয় স্পষ্ট করবে: যদি নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি ১৯৯৩ সালের ওসলো চুক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করবে। এই বিষয়টাকে বহু ফিলিস্তিনি সাধুবাদ জানাবে, কারণ অনেকেই এই চুক্তির প্রতি হতাশ। চুক্তি অনুসারে পশ্চিম তীরের বিষয়ে পিএলও এবং ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, নেতানিয়াহুর বর্তমান প্রস্তাবনা স্পষ্টতই সে চুক্তির লঙ্ঘন।
একটা সময় এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষে সমোঝতামুলক শান্তি ও ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা অর্জিত হবে, এরকমটা প্রত্যাশা করা হতো। কিন্তু তার বদলে এই চুক্তির মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েল ফিলিস্তিনের উপর অর্থনৈতিক শোষণ চালিয়ে যাচ্ছে, ফিলিস্তিনের বেশির ভাগ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তাদের সীমান্তের বাইরেও পুরো এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করছে।
১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর আগ পর্যন্ত, যখন তিনি বিরোধী দলে ছিলেন, তখন প্রকাশ্যে অসলো চুক্তির বিরোধিতা করতেন। কয়েক মেয়াদে ইসরায়েলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর নেতানিয়াহু এখন তার সমর্থকদের নিকট দাবি করতেই পারেন যে, তিনি পশ্চিম তীর দখল করার জন্য বিচক্ষণতার সাথে সব কিছু ঠিকটাক মতো করে যাচ্ছেন, পুরোপুরি দখল করার আগ পর্যন্ত। পশ্চিম তীরে অবিরত ইহুদি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে তিনি এ লক্ষকে এগিয়ে নিয়েছেন।
চলতি সপ্তাহের [১৭ সেপ্টেম্বর] নির্বাচনে ফিলিস্তিনিদের খুব একটা আগ্রহ নেই। নৃশংস ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে বসবাস করার অভিজ্ঞতার ফলে, নাকি অর্থনৈতিক দুরবস্থার ফলে এই নির্বাচন নিয়ে তারা অনাগ্রহী, আমি জানি না। যাই হোক না কেন, আমার ধারণা খুব কম ফিলিস্তিনিই মনে করে যে, কে নির্বাচিত হবে তার ফলে তাদের কিছু একটা যায় আসে। কোন প্রার্থীই ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা সম্পর্কে নিজের স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেননি; এ বিষয়গুলো নির্বাচনী ইশতেহারে একেবারেই নেই। প্রায় দেড় বছর আগে গত নির্বাচনের পূর্বেও আমি একই কথা লিখেছিলাম।
যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে চলে আসে, তা হলো ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্ষমতার ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। নেতানিয়াহু সাহেব যখন ঘোষণা করলেন যে তিনি পশ্চিম তীরের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ভূমি দখল করবেন, তখন সবাই জানে যে এটি করার মতো মুরোদ তার আছে। কিন্তু মাহমুদ আব্বাস যখন ঘোষণা দিলেন যে, তিনি ওসলো চুক্তির মাধ্যমে তৈরি বিভক্তি তথাকথিত এ, বি ও সি অঞ্চলবাতিল করবেন। কারণ এর মাধ্যমে ইসরায়েল ষাট ভাগেরও বেশি অঞ্চলে ইসরায়েলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সবাই জানে যে, তার আসলে এমনটা করার কোন ক্ষমতাই নাই।

তার চেয়েও খারাপ বিষয় হলো, নেতানিয়াহু যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটি বাস্তবায়ন এবং তারপর সকল নিন্দা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যথষ্ট পরিমাণ বিচক্ষণ একজন নেতা। খুব সম্ভব তিনি তার এ পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গাইবেন যেড এটি তার দেশের নিরাপত্তার জন্য জরুরি ছিল। সম্প্রতি তিনি তার এক ফেসবুক পোস্টে তার ভোটারদেরকে বলেছেন, আরবরা “আমাদের নারী, শিশু, পুরুষ, সকলকে ধ্বংস করতে চায়।” (পরবর্তীতে ফেসবুক তার অ্যাকউন্টের কিছু ফিচার স্থগিত করেছিল, কোম্পানির হেট-স্পিচ নীতিমালা লঙ্ঘনের শাস্তি স্বরূপ।) কাজেই নেতানিয়াহু পুনরায় নির্বাচিত হলে আমাদের দুই জাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুবই কম।
আবার, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সাবেক সামরিক বাহিনীর প্রধান বেনি গান্টজও ফিলিস্তিনিদের জন্য খুব ভালো বিকল্প নয়। তিনি গত সপ্তাহে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো ইসরায়েল।” যেন ইসরায়েলে আরবরা ইসরায়েলিদের সমান মর্যাদা পাচ্ছে এবং আরবদের জন্য দ্বিতীয় সর্বোত্তম স্থান হলো পশ্চিম তীর” যেন ফিলিস্তিনি অথবা অন্য যে কোন মানুষের জন্য অর্ধ শতক ধরে বিদেশিদের দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাস করাটা খুব সুখকর অভিজ্ঞতা আরকি। সত্যের অপলাপ কতটুকু গভীর হতে পারে?!
নেতানিয়াহু একটা নির্লজ্জ। গান্টজ একটা অন্ধ। ফিলিস্তিনিরা এই নির্বাচন নিয়ে কোন আশার আলো দেখছে না। কীভাবে দেখতে পারে?
________________________________

লেখাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের মন্তব্য বিভাগে Israel Wants Palestines Land, but Not Its People শিরোনামে প্রকাশিত। ছবি সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



জাসমিন এম. এল গামাল, প্রজেক্টি সিন্ডিকেট:
ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে বহুপাক্ষিক ঐক্যের চর্চা হয় প্রধানত দুইটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এদের একটা হচ্ছে আরব লীগ, যা আরব বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি বড় জোট। আরেক প্রতিষ্ঠান হলো গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি), যা মুখ্যত অর্থনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়েই কাজ করে। এ দুটি সংস্থার ইতিহাস, গুরুত্বের জায়গা ও সদস্যপদ এসব জায়গায় অনেক পার্থক্য আছে ঠিকই, তবে দুটি সংস্থাই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আরব বিশ্বের ঐক্যবদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দূরে সরিয়ে রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ ইসরায়েলের বিরোধিতার মতো ইস্যুর কথা বলা যেতে পারে।
গত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত আরব দেশগুলোকে একটি সাধারণ অবস্থানে নিয়ে এসেছিল, তারা সকলেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় থেকে আরব দেশগুলোর সামনে তিনটি বিরোধপূর্ণ বিষয় চলে এসেছে, এগুলো হলো- ক. ইরানভীতি; খ. আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান; এবং গ. রাজনৈতিক ইসলামের (কিংবা ইসলামিজমের) উত্থান।
এই বিষয়গুলোর উত্থান আরব বিশ্বের ঐতিহ্যগত জোটগুলোকে ছিন্ন করে ফেলেছে, এবং এ অঞ্চলের বহুপাক্ষিক সহযোগিতামূলক পরিস্থিতি একেবারে শিথিল করে ফেলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের, কিংবা আরো স্পষ্ট করে বললে যুক্তরাষ্টের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে।
প্রথমত, সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব ও সক্রিয়তাকে নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গুরুতর হুমকি বলে মনে করে। একদিকে সৌদি-আমিরাত, আরেক দিকে ইরান এরকম একটা ক্রমবর্ধমান শত্রুতা উভয়পক্ষের ঐতিহ্যগত বিরোধী শক্তি ইসরায়েলের বিরোধিতাকে ভালোই ধাক্কা দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, অনেকগুলো আরব সরকার ইসরায়েলের সাথে অভূতপূর্ব সম্পর্ত জোরদার করার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র ইরানের হুমকি প্রতিহত করার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে আরব-ইসরায়েল এই সহযোগিতামূলক কার্যক্রম চলছিলো পর্দার আড়ালে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন ইরান বিরোধী” ওয়ার্সাও সম্মেলনে এই কার্যক্রম হঠাৎ জনম্মুখে চলে আসে, বরং বলা চলে বিস্ফোরিত হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু এই সম্মেলনে আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে সম্মেলনের প্রশংসা করেন। এই সম্পর্ক দিনে দিনে আরো শক্ত হতে থাকবে, কেননা সৌদি এবং ইরানের কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং প্রক্সি যুদ্ধে মুখোমুখি অবস্থান এখনো চলমান আছে।
দ্বিতীয়ত, সিরিয়া ও লিবিয়ায় সহিংস সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জিহাদি সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে, মিসর, তিউনিসিয়া, জর্দান এবং আরো কয়েকটি দেশে বিভিন্ন হামলায় জিহাদিরা জড়িয়ে পড়ে, এবং এর ফলে আরব লীগের দেশসমূহ একে অপরের বিরুদ্ধে চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, লিবিয়ার তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার আল গাদ্দাফী ২০১১ সালের শুরুর দিকে একটি জনপ্রিয় আন্দোলন দমন করেছিলেন, তখন আরব লীগ লিবিয়ার সদস্যপদ স্থগিত করে, এবং পরবর্তীতে ঐ বছরই আরব লীগ সক্রিয়ভাবে ন্যাটো ও লিবিয়ান বিদ্রোহী কর্তৃক গাদ্দাফীর উচ্ছেদে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দেয়।
এরপরই, সিরীয় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসীদেরকে সক্রিয় করার পিছনে ভূমিকা রাখার জন্য অভিযুক্ত করা হলো, এবং সিরিয়াকে বহিষ্কার করা হলো। এখন সিরিয়ার সদস্যতার বিষয়ে আরবলীগ দ্বিধাবিভক্ত। অনেকগুলো সুন্নী রাষ্ট্র খুব কড়া বিরোধিতা করছে। তাদের কথা হলো, আসাদ ইরানকে এ অঞ্চলে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করার এবং লেবাননের হেযবুল্লাহর মতো শিয়া মিলিশিয়াগুলোকে শক্তিশালী করার সুযোগ করে দিয়েছেন, যা তাদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য ইরাকি ও তিউনিসিয়ান সরকার সিরিয়াকে পুনরায় লীগে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছে।
সবশেষে, আরব বসন্তের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান আঞ্চলিক বিভক্তিকে আরো জোরদার করেছে। ইসলামিস্টদের উত্থানের উদাহরণ হিসেবে মিসর ও তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোতে নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয়ের কথা বলা যেতে পারে। ইসলামপন্থীদের উত্থানের ভয়ে মিসর, সৌদি এবং আমিরাতি শাসকগোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো সংগঠনগুলোর উত্থান ঠেকাতে সমন্বিত ও নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এই প্রচেষ্টার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো, ২০১৩তে মিসরের প্রথম  নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুরসিকে সেনাবাহিনী কর্তৃক জোরপূর্বক উচ্ছেদের ঘটনা, যিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য ছিলেন। আরব দেশগুলো মুরসিকে উচ্ছেদ করার বিষয়েও বিভক্ত ছিল, সৌদি-আমিরাত জোট এর সমর্থনে থাকলেও কাতার প্রবল বিরোধিতা করেছিল।
এই তিনটি বিষয় যে শুধু আরবলীগকে ধ্বংস করেছে, তা নয়, বরং অর্থনৈতিক জোট জিসিসিকেও শেষ করে দিয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, সৌদি, বাহরাইন, আমিরাত এবং জিসিসির বাইরের মিসর ২০১৭ সাল থেকে কাতারের উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। তাদের অভিযোগ, কাতার সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করছে এবং তার রাজধানী দোহাকে এ অঞ্চলের বিতাড়িত ইসলামিস্টদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। তুরস্ক ও ইরানের সাথে কাতারের ঘনিষ্ট সম্পর্কও আঞ্চলিক উত্তেজনার আরেক কারণ।
কাকতালীয়ভাবে, আরবের ঐতিহ্যবাহী বহুপাক্ষিক সম্পর্কের পতনের সাথে সাথে ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিও পরিবর্তিত হয়েছে। ট্রাম্পের পূর্বসূরী বারাক ওবামা বহুপাক্ষিক সম্পর্ক ও জোট গঠনে গুরুত্ব দিতেন, যার কারণে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি ও লিবিয়াতে ন্যাটোর নেতৃত্বে সামরিকস অভিযান সম্ভব হয়েছিল। ঠিক তার বিপরীতে, ট্রাম্প বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর নেতিবাচক মনোভাব নিঃসঙ্কোচে প্রকাশ করছেন এবং সমমনা অংশীদারদে সাথে (এবং একইভাবে শত্রুদের সাথেও) দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এছাড়াও তার প্রবল ইরান বিরোধী অবস্থানের দরুণ যুক্তরাষ্ট্র এখন মধ্যপ্রাচ্যে পুরোপুরি ইরান বিরোধী ব্লকের সদস্যতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই হাবভাবের দরুণ আরব সরকারসমূহ আরব লীগ এবং জিসিসির মাধ্যমে বিস্তৃত সহযোগিতামূলক জোট না করে বিশেষ বিশেষ আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে নিজেদের মূল স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপেক্ষাকৃত সংকোচিত পরিমণ্ডলে সহযোগিতামূলক জোট গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে ফেলছে। আরব ঐক্যের ক্ষীণ সম্ভাবনা আরো ক্ষীণতর হয়ে পড়ছে।
________________________________

প্রবন্ধটি Is Arab Unity Dead? শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশিত। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।




মার্ক লিওনার্ড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
ফ্রান্সের বিয়ারিতজ শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের আগে সবার আগ্রহের বিষয় ছিল, কার পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড় বিঘ্নতা আসছে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের, নাকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পক্ষ থেকে? যদিও সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এমন একজন, যার উপস্থিতিই আদতে প্রত্যাশিত ছিল না, তিনি: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ।
যদিও এই সম্মেলনে গণমাধ্যমের চোখ ছিল বাণিজ্য যুদ্ধ, আমাজনের আগুন এবং বিপজ্জনক “চুক্তিবিহীন” ব্রেক্সিটের উপর, তবে সবচেয়ে ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে সম্ভবত ইরানের বিষয়ে। ইরানের সাথে হওয়া ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ভাগ্য দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হচ্ছে কিনা সেটা যেমন নির্ধারণ করতে পারে, তেমনি পশ্চিমা রাজনৈতিক জোট টিকে থাকবে কিনা, তাও নির্ধারণ করতে পারে।
বিয়ারিতজে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈরিতা নিরসনের উদ্যোগের সূচনা করেছেন। এবং সাম্প্রতিক দিনগুলিতে ইরান নাটকের মূল খেলোয়াড়রা সকলেই পিছনের দিকে ফিরছেন। যুক্তরাজ্য জিব্রাল্টার থেকে আটককৃত ইরানের ট্যাংকার (গ্রেস ১) ছেড়ে দিয়েছে। এবং, আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সাহেব ইরানের রাষ্ট্রপতি হাসান রোহানির সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, এমনকি তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইরানের স্বল্পমেয়াদি “লাইন অব ক্রেডিট অথবা লোন” পাওয়ার বিষয়েও তিনি আপত্তি করবেন না।
তবু অনেকগুলো বিষয় উত্তেজনা নিরসনের উদ্যোগকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। প্রথমেই, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো মনে করে যে ইরানের (এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের) উপর যত বেশি চাপ প্রয়োগ করা হবে, ততই ভালো হবে। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে চান, এবং তিনি মনে করেন, ইউরোপীয় সহযোগিতার পথ বন্ধ করার মাধ্যমেই এটি করতে হবে। তিনি এবং অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সাথে ইউরোপের ঐক্য নষ্ট করতে সব উপায় অবলম্বন করবেন, এবং স্পষ্টতই তারা সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করবেন যুক্তরাজ্যের উপর। আরো জঘন্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কেউ এবং মধ্যপ্রাচ্যেরও কেউ কেউ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি ইরানকে সামরিক বিভ্রান্তিতে ফেলার জন্য ফাঁদ বানাতে চায়।
ইরানি কট্টরপন্থীদের নিয়েও সমস্যা আছে। তাদের অনেকেই মনে করেন, পারমাণবিক চুক্তি থেকে তারা কিছু্ই পাননি, এবং তাদের মতে উদ্দেশ্য সাধনের উপায়টিই বড় ঝামেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে ইরানি নেতারাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বিরোধী কাজে উৎসাহী হয়ে পড়েছে, শুধু যে হরমুজে ব্রিটিশ ট্যাংকার দখল করেছে, সেটিই্ এ ধরনের একমাত্র কাজ নয়। (ইউরোপে ইরানেরও পছন্দের ক্ষেত্র যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রেরই মতো।)
ইরানের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাব ইসরায়েলেরও উদ্বেগ বৃদ্ধি করছে, যার ফলে ইরাকে তারা ইরানের সম্পত্তিসমূহকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। (ইতিমধ্যে সিরিয়ায় ইরানি বাহিনীর উপর হামলা শুরু করে দিয়েছে।)
বোধগম্য কারণেই ইরান ইনসটেক্স উদ্বোধনে ইউরোপের ধীর গতির কারণে হতাশ হয়ে পড়েছে। ইনসটেক্স মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইউরোপ-ইরান বাণিজ্য সম্ভব করে তোলার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু ইরানের যারা দাবি করছেন যে, তারা ইউরোপ থেকে কিছুই পাননি, তারা একেবারেই ভুল দাবি করছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি তাদের বর্তমান অবস্থান পরিত্যাগ করে ইরানকে চেপে ধরার ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিত, তাহলে তারা পার্থক্যটা স্পষ্টতই বুঝতে পারতেন। আসলে তীব্রতাবৃদ্ধির নীতি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ইরান নৈতিক উচ্চ অবস্থান হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, একই ভাবে তারা সেই সকল ইউরোপীয়দের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি নিচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-নীতি থেকে ভিন্ন ইরান নীতি মানতে চাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপকে পাত্তা না দিয়ে চুক্তির বিষয়ে ইরানকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপ যে সক্ষমতা দেখিয়েছে, তা অনেককে বিস্মিত করেছে। এমনকি বলতে গেলে ব্রিটিশ সরকারও ইইউর সাথেই আছে এ বিষয়ে। কিন্তু এটা পরিবর্তন হতে পারে। ইরান যদি ব্রিটেনের আরেকটি জাহাজ আটক করে, এবং ব্রিটিশ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখে, তাহলে এর ফলে জনসন ইইউ’র সঙ্গত্যাগ করে ট্রাম্পের সাথে যোগ দিতে পারে।
এই ঝুঁকি সত্ত্বেও হতাশার বিষয় হলো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য পারস্য উপসাগরে একটি যৌথ ইউরোপীয় মিশন চালু করতে পারেনি, যাতে তাদের যে কারো উপর আক্রমণ হলে সেটি সকলের উপর আক্রমণ বলে গণ্য হতে পারে। যুক্তরাজ্য যদি ইরান ইস্যুতে ইইউ’র পথ থেকে সরে যায়, তাহলে পরবর্তী কট্টরপন্থীদের (ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র- দুই দেশেরই) লক্ষ্যবস্তু হবে জার্মানকে সরানো। একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে, সেখানে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চলে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
এসকল ঝুঁকি ভালো মতন মোকাবেলা করার জন্যে ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে বলেছিলেন যে, ইরান যদি আরেকবার তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম হ্রাস করার মাধ্যমে চুক্তিতে আসতে রাজি হয় এবং পাশ্চাত্যের সাথে আলোচনার দুয়ার খোলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প যেন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। ... ... এই ক্ষেত্রে স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প আমেরিকার অনন্তকালব্যাপী এবং বিদেশে অযৌক্তিক অভিযানসমূহ যুদ্ধসমূহ সমাপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ইউরোপীয়দেরকেও অবশ্যই ইরানকে বুঝাতে হবে, যেন সে নিজের ক্ষমতাকে অতিমাত্রায় বড় করে না দেখে। একটি নতুন ক্রেডিট লাইনের বিষয়ে ম্যাক্রোঁর প্রস্তাব হয়তো ইরানের মধ্যপন্থীদের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে, কিন্তু ইউরোপীয়রা যদি ইনসটেক্স চালু করতে এবং চালাতে সক্ষম না হয়, তবে ইরানিদের নিকট তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ হয়ে যাবে। সর্বাবস্থায়, লক্ষ্য হওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অবধি ইরানকে নীরব থাকতে উৎসাহিত করা। ইউরোপেরে উচিত ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করা, তবে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করতে হবে, যে ইউরোপীয় স্বার্থে ইরান যদি আর কোন আক্রমণ করে, তাহলে ইইউ হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের মতোই নিয়ন্ত্রণ কৌশল অবলম্বন করতে বাধ্য হবে।
সর্বোপরি, পারস্য উপসাগরে ইউরোপের তীক্ষ্ম নজরদারি রাখা দরকার। এমনকি তারা যদি যুক্ত নৌশক্তি সংগঠিত নাও করে, তাদের উচিত হবে উত্তেজনা হ্রাসে কাজ করা, যদি যুক্তরাষ্ট্র অথবা ইরান কোন সম্মুখ দ্বন্দ্বের জন্য প্ররোচিত করতে চায়। ইরানকে সাথে নিয়ে নৌ-মহড়ার আয়োজন করা এক্ষেত্রে চমৎকার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারে।
বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই কৌশল মাথায় রেখেই সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছেন ম্যাক্রোঁ। কৌশলটি সফল হলে ট্রাম্পের আমলে বিয়ারিতজ সম্মেলনই হবে প্রথম সফল জি৭ সম্মেলন। (সেটা ট্রাম্প জানুন কিংবা নাই জানুন।)

________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে Will the Iran Conflict Break the West? শিরোনামে প্রকাশিত। লেখক মার্ক লিওনার্ড বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় কাউন্সিলের পরিচালক। সংযুক্ত ছবিটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



জনাথন কুত্তাব, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
বিদেশ-নীতি বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সব চেয়ে জঘন্য সিদ্ধান্ত কোনটি? প্যারিস পরিবেশ চুক্তি প্রত্যাহার করে নেওয়াটা খারাপ ছিল। ২০১৫ সালের ইরান পরমাণু সমোঝতা থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তরাষ্ট্র এই সংকেত দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ববর্তী প্রশাসনের স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহের বিষয়ে শ্রদ্ধাশীল নয়। অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকার কর্তৃক সফলভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে যে হুমকি দেওয়া হয়েছে, তা বিশ্ব ব্যবস্থা ও বিশ্ব শান্তির জন্য ভয়াবহ ফল বয়ে আনতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। মার্চের পঁচিশ তারিখ গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের প্রতি স্বীকৃতি দিয়ে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রচলিত শিষ্টাচারের অন্যতম একটি মূলনীতি জোরপূর্বক কোন অঞ্চল দখলের অগ্রহণযোগ্যতাকে পরিত্যাগ করেছেন, অথচ এই মূলনীতিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করছে। ইসরায়েলের এই দখলদারিত্বের প্রতি ট্রাম্পের স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের জন্য এক ভয়ানক নজির স্থাপন করেছে।
১৯৪৫ সালের পর থেকে বিশ্বের সকল দেশ কোন দেশ কর্তৃক তার দূর্বল প্রতিবেশীদের উপর হামলা ও দখলদারিত্বকে নিরুৎসাহিত করতে সর্বসম্মতিক্রমে জোরপূর্বক রাষ্ট্রের সীমা বৃদ্ধিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই মূলনীতি লঙ্ঘন করে যে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে (যেমন কুয়েতে ইরাকের আক্রমণ, উকরাইনে রাশিয়া এবং পূর্ব জেরুজালেম ও গোলানে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব) সারা দুনিয়া সেটার নিন্দা করেছে।
১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্যের ছয় দিনের যুদ্ধের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৪২ নং রেজুলেশনের প্রস্তাবনায় এই মূলনীতিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল, এই যুদ্ধে ইসরায়েল সিরিয়ার নিকট থেকে গোলান মালভূমি দখল করে। মধ্য নব্বই থেকে এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও অন্যতম অপরিহার্য মূলনীতি।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করতে বলছেন যে ইসরায়েল একটি “আত্মরক্ষামূলক” যুদ্ধে গোলান মালভূমি দখল করেছে। তাছাড়া তারা আরো বলছেন, সিরিয়া একটি গৃহযুদ্ধে লিপ্ত, এবং দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদ এই ভূমি ফেরত পাওয়ার অধিকার রাখেন না।
কিন্তু আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের যুক্তি আসলে ধোপে টিকে না। অনেক পশ্চিমা সরকার, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এবং আইন বিশেষজ্ঞরা কয়েকজন ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞসহ বলছেন জোরপূর্বক কোন এলাকা দখল করাকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্ম যুদ্ধের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
তার মূল কারণ হলো যে কোন যুদ্ধে দুই পক্ষ দাবি করতেই পারে যে তারা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করছে। যেমন ছয় দিনের যুদ্ধ সম্পর্কে ইসরায়েল এ কথা মেনে নিচ্ছে যে সাতষট্টির জুন মাসে আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ শুরু করেছে, কারণ হিসেবে বলছে তারা মিসরের পক্ষ থেকে হামলার ভয় করছিল, অন্যদিকে আরবরা এর বিরোধিতা করে সাধারণত বলে যে ঐ সংঘাতটি ছিল তাদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন।
গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে ট্রাম্পের স্বীকৃতি ইতোমধ্যে একটি অস্থিতিশীল প্রভাব ফেলেছে। গোলানের বিষয়ে সিদ্ধান্তের পর নেতানিয়াহু ওয়াশিংটন থেকে ফিরেই পশ্চিম তীর দখলের কথা বলতে শুরু করেছেন। এরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সেটা দুই-রাষ্ট্র সমাধানের ভিত্তিতে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিবে।
তাছাড়া ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত অন্যান্য রাষ্ট্রকেও তাদের প্রতিবেশীদের সাথে বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে বিরোধ জোরপূর্বক সমাধান করার বিষয়ে এক ধরনের সবুজ সংকেত প্রদান করে। যুদ্ধের মাধ্যমে দখলিকৃত ভূমি যদি আইনসম্মত হয়, তাহলে রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া দখল, ইয়েমেনের কিছু অংশে সৌদির দাবি, কিংবা কুয়েতকে ইরাক কর্তৃক তাদের ১৯তম জেলা দাবি করার বিষয়কে আরো শক্ত করে তুলবে। আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের আরো অনেক দেশ প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন অংশ জোরপূর্বক দখল করতে প্রলুব্ধ হবে, যে সকল অঞ্চলে তাদের কোন ধরনের ঐতিহাসিক বা জাতিগত দাবি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের দখলাদারিত্বের স্বীকৃতি সেখানকার সিরীয় জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক আইনী আশ্রয়কে বিপন্ন করবে। এ সকল আইনের মধ্যে রয়েছে ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন, যার মূল লক্ষ্য হলো শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং দখলদার বাহিনী তাদের ভূমি ছেড়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যুদ্ধাবস্থায় সামরিক দখলের অধীনে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অংশত, এই কনভেনশন দখলদার কর্তৃক তাদের বেসামরিক নাগরিকদেরকে দখলিকৃত ভূমিতে স্থানান্তরিত করতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে (এ কারণে ইসরায়েলি বসতি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ)। দখলিকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরায়েলি স্থাপনার সম্পর্কে ২০০৩ সাধে আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিসের দেওয়া একটি সিদ্ধান্তে এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাছাড়াও কোন দখলদার শক্তি দখলিকৃত দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসৃষ্ট সম্পদ, এবং অন্যান্য সম্পত্তি বৈধভাবে গ্রহণ করতে পারে না। আর দখলিকৃত ভূমি দেশের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ।
কয়েক দশক ধরে ডেমক্র্যাটিক ও রিপাব্লিকান প্রশাসনসমূহ ইসরায়েলের প্রতি তাদের সব ধরনের সমর্থন সত্ত্বেও পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের একতরফা পদক্ষেপসমূহকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল। তারা জেনেভা কনভেনশনের আইনসমূহ প্রয়োগের ব্যাপারেও জোর দিচ্ছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বেপরোয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ কাল থেকে চলে আসা নীতির বিপরীতে চলছেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলি অবৈধ দখলদারিত্বের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করেছে, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তিকরণকে স্বীকৃতি দিয়েছে, এবং পশ্চিম তীর দখল করার বিষয়ে নেতানিয়াহুর পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা করতে অস্বীকার করছে।
আমেরিকা যে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তি পরিকল্পনার প্রস্তুতির কথা বলছিল, ট্রাম্পের পদক্ষেপ সে পরিকল্পনাকে সত্যিকার অর্থে কোন সহযোগিতা করবে না বললেই চলে। আর গোলান মালভূমির বিষয়ে তার এই হঠকারিতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেও সীমাবদ্ধ থাকবে না। ট্রাম্পে জঘন্যতম বিদেশ-নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ফলাফল সম্ভবত এখনো সামনে আসেনি, তবে আসার অপেক্ষায় আছে।
________________________________

লেখক ফিলিস্তিনের রামাল্লা ভিত্তিক স্বাধীন মানবাধিকার সংগঠন আল-হক’র সহপ্রতিষ্ঠাতা। এই নিবন্ধটি “The Heights of Trumps Recklessness” শিরোনামে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে প্রকাশ হয়েছে। ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত।



ফাওয়াজ . গের্জেস, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:

একটি তিক্ত নির্বাচনী প্রচারাভিযানের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনইয়ামিন নেতানিয়াহু শান্তিবাদী নেতার চেয়ে আধিপত্যবাদী নেতা হিসেবেই তার নিজের অবস্থানটাকে সুরক্ষিত করেছেন গত এক দশক ধরে তিনি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কোন ধরনের সমন্বয় সাধনের সম্ভাবনাকে একেবারে ধ্বংস করে দিয়েছেন, এমনকি অভ্যন্তরীণ বিষয়েও ইসরায়েলকে গভীরভাবে বিভক্ত করে ফেলেছেন

মধ্যপ্রাচ্যে যারা শান্তি প্রত্যাশা করেন, তাদের প্রত্যেকেরই নেতানিয়াহুর এ রকম নীতির ধারাবাহিকতার ব্যাপারে গভীরভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া উচিত, সকল নীতির ফলাফল আগামী কয়েক দশক ধরে অনুভব করতে হবে অধিকৃত অঞ্চলসমূহকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করা, আরব ইসরায়েলিদেরকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং নিষ্ঠুরভাবে ফিলিস্তিনি জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ প্রভৃতি নীতি ইসরায়েল এবং তার প্রতিবেশীদের মধ্যে চিরস্থায়ী সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এমনকি আরো আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, সাংস্কৃতিক যুদ্ধ নিয়ে নেতানিয়াহুর বাগাড়ম্বর ভূমির মালিকানার সংঘাতকেসভ্যতার সংঘাতেরূপান্তরিত করতে পারে যা সব পক্ষের চরমপন্থীদেরকে আরো উৎসাহ প্রদান করবে

নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে একটি একচোখা গণতন্ত্রে পরিণত করছেন  ভীতি বর্ণবাদ ছড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ইহুদি সম্প্রদায় ইসরায়েলি আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে স্থায়ী বিরোধ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন উল্লেখ্য ইসরায়েলি আরব সম্প্রদায় দেশের মোট জনসংখ্যার ২০% (এদের মধ্যে মুসলিম খৃষ্টান উভয় ধর্মের মানুষই আছেন, তবে বেশির ভাগই মুসলিম। -অনুবাদক)

উদাহরণস্বরূপ গতবছর নেতানিয়াহু একটিজাতিরাষ্ট্র আইনকরেছেন, যা ইহুদিদেরকে আত্মনির্ভরশীলতারএককঅধিকার প্রদান করে, এবং একইভাবে আরব ইসরায়েলিদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে ইসরায়েলি অভিনেতা রোতেম সেলা এই আইনের সমালোচনা করলে নেতানিয়াহু তার জবাবে বলেছিলেনজাতি রাষ্ট্র, তবে সকল নাগরিকের জন্য নয়, বরং শুধু ইহুদিদের জন্যএই প্রকাশ্য শত্রুতার পর, ২০১৫ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচনে আরব ইসরায়েলিদের উপস্থিতি ১৫ শতাংশ কম ছিল, তা খুব বেশি বিস্ময়কর কিছু নয় যখন আপনার দেশের প্রধানমন্ত্রী কোন ধরনের শর্ত ছাড়াই আপনাকে দেশের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ে সমান মর্যাদার অধিকারী নয় বলে ঘোষণা করেন, তখন সে দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণটাকে নিরর্থক বিষয় মনে হতেই পারে  

দেশের ভিতরে গণতন্ত্র হ্রাসের পাশাপাশি, নেতানিয়াহু শান্তি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করেছেন এবং ইসরায়েলের দীর্ঘ মেয়াদি নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছেন যদিও তিনি ইসরায়েলকে নিরাপদ শক্তিশালী করার ব্যাপারে প্রায়ই আত্মশ্লাঘায় ভোগেন, কিন্তু তার কাছে নিরাপত্তার মানে এতোটাই সংকীর্ণ স্বল্পমেয়াদি যে কার্যত এটা অর্থহীনই তার সকল পদক্ষেপই স্বল্পকালীন হিসাব নিকাশ ক্ষমতার ভারসাম্য ঠিক রাখাকে কেন্দ্র করে, এর বিনিময়ে তিনি প্রকৃত শান্তিকে বলি দিচ্ছেন শক্তিশালী আরব মিত্ররা ইসরায়েলকে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা দেবে না শুধুমাত্র আরব বিশ্বের জনগণের সাথে শান্তি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ইসরায়েল দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে তবে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার স্বার্থে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে আরব জনগণের সাথে, স্বৈরশাসকদের সাথে নয়

শেষমেশ তখনই সত্যিকারের নিরাপত্তা অর্জিত হবে, যখন ইসরায়েলিরা এবং ফিলিস্তিনিরা তাদের মধ্যকার শতাব্দি-প্রাচীন সংঘাত নিরসনের পথ খোঁজে পাবে, এবং পাশাপাশি বসবাস করতে রাজি হবে, সেটা দুই রাষ্ট্রেই হোক, আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই হোক এছাড়া আর কোন টেকসই সমাধান নেই যতদিন অবধি ফিলিস্তিনিরা নির্যাতিত হতে থাকবে, এবং তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রে অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে, ততদিন অবধি সংঘাত চলতে থাকবে

এছাড়াও, গত ১৩ বছরে নেতানিয়াহু অধিকৃত পশ্চিম তীর পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রবল উদ্যোমে সমর্থন দিয়ে গেছেন তিনি ভালো করে জানেন যে এসকল বসতি স্থায়ী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পথে প্রত্যক্ষরূপে কঠিন বাধা হয়ে দাঁড়াবে

তাছাড়া সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি পুনঃনির্বাচিত হলেপুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণকরার মাধ্যমে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করবেন তার কথাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার পশ্চিম তীরকে অন্তর্ভুক্তকরণের প্রতিশ্রুতি তার দীর্ঘ দিন ধরে দুই-রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধিতা করার ইতিহাসের সাথে সামঞ্জস্যশীল নতুন করে নির্বাচিত হয়ে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেবের নিঃশর্ত সমর্থন নিয়ে তিনি কল্যাণার্থে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি শান্তির প্রত্যাশাকে কফিনে ঢুকাতে এখন আরো বেশি সাহসী ভূমিকা পালন করবেন

নেতানিয়াহুর গৃহীত পদক্ষেপসমূহ যত বেপরোয়াই হোক না কেন, তাকে খুব বড় ধরনের কোন বাধার মুখোমুখি হতে হবে না ইসরায়েলের মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তি নাটকীয়ভাবে ডানে চলে এসেছে, আর তার নিজের জোট কট্টর জাতীয়তাবাদী দলগুলো নিয়ে গঠিত, যেগুলো ফিলিস্তিনি ভূমি ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য চাপ দিচ্ছে তিনি এখন হয়তো নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নিজেকে বাঁচানোর স্বার্থে তাদের দাবি সমূহকে আইনি প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত করবেন

বারাক ওবামা যেখানে নেতানিয়াহুর চরমপন্থী প্রবণতাকে দমন করে রেখেছিলেন, ট্রাম্প সাহেব সেখানে তাকে আরো সাহস যোগাচ্ছেন নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে সহযোগিতা করার নিয়তেই ট্রাম্প সাহেব সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছেন পরে গর্বভরে বলেছিলেন, তিনি তার জামাতা জারেদ কুশনারের নিকট থেকে ইতিহাসেরদ্রুতপাঠ গ্রহণের পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন এরপর সিএনএন যখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে জিজ্ঞেস করলো, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত শান্তি পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্থ করবে বলে আপনি মনে করেন নি না, পম্পেও সাহেব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেনআমি এরকম মনে করি না

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই জবাব থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে নেতানিয়াহুকে পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করা হবে এবং ট্রাম্প প্রশাসন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারি আাহ্বান জানাবে না তার মানে শান্তি প্রক্রিয়া শেষ, নেতানিয়াহুই বিজয়ী স্পষ্টতই, ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু একই রাজনৈতিক মুদ্রার দুই পিঠ তারা তাদের রক্ষণশীল গণভিত্তির সন্তুষ্টি অর্জনের স্বার্থে যে কোন কিছু করতে পারেন, ভুল না সঠিক সে প্রশ্ন তাদের হিসাবে থাকবে না  

ফিলিস্তিনিদের বাদ দেওয়া হয়েছে ফিলিস্তিনের নেতৃত্ব অতি মাত্রায় দুর্বল বিভক্ত, তাদের পক্ষে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব বসতি সম্প্রসারণ প্রতিহত করা সম্ভব নয় সৌদি আরব অন্যান্য প্রভাবশালী আরব রাষ্ট্রসমূহ, যারা এক সময় ফিলিস্তিনিদের সমর্থন যুগিয়েছিল, এখন তাদের ইসরায়েল নীতিতে ফিলিস্তিনের বদলে ইরান বেশি গুরুত্ব পায়

এরপরও সংঘাত এখনো অনিবার্য নয়, এমনকি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সমস্যা অবশেষে সমাধান হতেও পারে কিন্তু সেটা হতে হলে অবশ্যই দুই পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন দরকার অঞ্চলে ইসরায়েলে সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং মধ্য প্রাচ্যের প্রতিবেশীদের সাথে ইসরায়েলের প্রকাশ্য মিলন সব সময়ই ফিলিস্তিনিদের সাথে সমন্বয় সাধনের উপর শর্তযুক্ত থাকবে

ফিলিস্তিনিদের সাথে বোঝাপড়ায় আসার ব্যাপারে নেতানিয়াহু কোন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না তার বর্ণবাদী নীতি এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি বর্বরতা বিভক্তিকে আরো গভীর করবে, সেতুবন্ধন তৈরি করবে না তিনি যে পথে আছেন, কেবল যুদ্ধ আর আরো অনেক দুর্ভোগের মাধ্যমেই সে পথের সমাপ্তি হতে পারে
________________________________

লেখক লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স অ্যান্ড পলিটিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটেNetanyahu Means Warশিরোনামে প্রকাশিত হয় ছবি: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.