. আজিম ইবরাহিম, আল আরাবিয়া:
মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত অধ্যাপক ইয়াংঘি লি গত মিয়ানমারের সেনাপ্রধান জ্যেষ্ঠ জেনারেল মিং আং হ্লিয়াং-এর বিচারের আহ্বান জানিয়েছেনরোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বেসামরিক নেতা অং সান সু কি অধ্যাপক লি মিয়ানমার প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনকালে এই বক্তব্য প্রদান করেন উল্লেখ্য কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে বর্তমানে . মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে
যদিও অধ্যাপক লি এই প্রথমবার প্রকাশ্যে সেনাপ্রধানের বিচারের আহ্বান জানিয়েছেন, তবে গতবছর জাতিসংঘের তদন্ত মিশনও একই সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেছিলো ব্যাপক বিস্তারিত তদন্তের পর তারা জানিয়েছিলোজেনোসাইডের উদ্দেশ্যেগণহত্যা গণধর্ষণের সামরিক ক্যাম্পেইন চালানোর অপরাধে মিয়ানমারের সিনিয়র জেনারেলদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে   
জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাসমূহের সাথে অন্যতম সিনিয়র এই মানবাধিকার কর্মকর্তারও প্রকাশ্যে গণহত্যার বিচার দাবি করার পার আমরা এসকল জেনারেলদের বিষয়ে কী আশা করতে পারি?
গণহত্যার এসকল খলনায়কদের বাস্তব বিচারের পথ অনেক দীর্ঘ অনিশ্চিত চিন জাতিসংঘের নিরাপত্তা বিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে দেশিটির দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে বিচার আটকে ফেলতে পারে অবশ্য তারপরও মিয়ানমারের সহযোগিতায় জাতিসংঘের প্রতিবেদনে চিহ্নিত কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিচার হতে পারে যেমনটা যুগোশ্লোভিয়ায় হয়েছিলো অন্য কথায়, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতা অং সান সু কির সহযোগিতায় বিচার পরিচালিত হতে পারে
কিন্তু তিনি কী করবেন? জাতিসংঘের প্রতিবেদনে তিনি তো অপরাধের সাথে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন নিরাপত্তা বিষয়ে তার বেসামরিক সরকারের কোন কর্তৃত্ব নেই সামরিক বাহিনীকে তাদের কর্মকাণ্ড স্থগিত করা, কিংবা কর্মপন্থা পরিবর্তন করার জন্য নির্দেশ দেওয়ার অধিকার সরকারের নেই যদিও রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভৃতি বেসামরিক বিষয়ে সামরিক বাহিনীরও কিছুটা ক্ষমতা আছে এবং বেসামরিক সরকার, সুকিসহ সবাই, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অভিযানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে তারা এই ইস্যুতে তদন্ত করতে জাতিসংঘের বিভিন্ন অ্যাজেন্সিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহকে বাধা দিচ্ছে, এবং উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের বক্তব্যকে সমর্থন করে রোহিঙ্গাদেরকে তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করার বৈধতা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে
 গতবছর রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ অনেকটা থমকে গেছে একটা ভীতির কারণে। ভীতিটা হলো, যদি সুকিকে এই ইস্যুতে বেকায়দায় ফেলা হয়, তাহলে সামরিক জান্তা হয়তো আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে। রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে অবিরাম ঢুকছিল, পশ্চিমারা তখন আশা করছিলো, সু কি হয়তো নিজের ইমেজ ঠিক রাখার জন্য হলেও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য কোন পথ খোঁজে বের করবেন, রোহিঙ্গাদের পক্ষে অবস্থান করবেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সদস্য মিচ ম্যাককোনেলের মতো অনেক নেতা আছেন, যারা মিয়ানমারে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার স্বার্থে সু কিকে সমর্থন করতেন, এখনও তারা এই অবস্থানেই আছেন।
নোবেল লরিয়েট সু কি, আসলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে ছিলেন এমন ধারণার উপর ভিত্তি করে ধৈর্যের, গণগহত্যার মুখে ধৈর্য ধরার কথা বলেন। তবে এর পক্ষে প্রমাণ খুব কমই আছে, যেখানে তিনি নিজেই বৌদ্ধ রাষ্ট্রকে মেনে নিচ্ছেন। সত্যিই যদি তিনি নির্যাতিত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে থাকতেন, তবে সেটা প্রমাণ করার সময় এখনই।
অং সান সুকিকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া উচিত, যাতে তিনি নিজেকে এবং তার দেশকে কলংক মুক্ত করতে পারেন এবং বিশ্ব মানবাধিকারের আইকন হিসেবে প্রমাণ করতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে শোধরানোর জন্য তার আসলে কী করা উচিত, সে পথ এখনই তার সামনে খোলা আছে। প্রয়াত কফি আনানের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘের তদন্ত কমিটির গত বছর প্রকাশিত চুড়ান্ত প্রতিবেদনে সে উপায় বাতলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুকি যেন কফি আনানের পরামর্শ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেন, রোহিঙ্গাদের জন্য এতোটুকুই জরুরি। এর মাঝে তাদের পূর্ণ নাগরিকত্বের অনুমোদন দানের বিষয়টিও আছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসনের বিষয়টি দেখাশুনা করার জন্য অবশ্যই জাতিসংঘের সংস্থাসমূহকে পূর্ণ প্রবেশাধিকার দিতে হবে।  এবং এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সকল সামরিক কর্মকর্তাকে অবশ্যই বহিষ্কার করতে হবে, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচারের নিশ্চয়তাও দিতে হবে।
 অবশেষে গণহত্যার বিষয়টি স্বীকৃতি পেয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিংবা মিয়ানমারের বেসামরিক সরকার এখন আর বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে পারবে না। এখন অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, সেই সাথে গণহত্যায় জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সু কিকে এখন সামরিক বাহিনীর উপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, গণহত্যায় জড়িত অপরাধীদেরকে বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সহযোগিতা করতে হবে, অথবা গণহত্যার সহায়তাকারী হিসেবে তাকে নিজেকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
________________________________
আজিম ইবরাহিম সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির ফেলো এবং ইউএস আর্মি ওয়ার কলেজের স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের খণ্ডকালীন গবেষণা অধ্যাপক। ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি তার পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ‘How likely are Myanmars generals to face prosecution for genocide?শিরোনামে আর-আরাবিয়াতে তার লেখাটি প্রকাশিত হয় ২৬ শে জানুয়ারিতে।