অদিতি শ্রীরাম, নিউ ইয়র্ক টাইমস:

রিভার অব ফায়ার (মূল উর্দু: আগ কা দরিয়া, অর্থাৎ আগুনের নদী)
কুররাতু আইন হায়দর রচিত

গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান ভিত্তিক এক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশমীরে ৪০ জন সৈন্য হত্যার দায় স্বীকার করেছে। উভয় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ সামরিক শক্তি দিয়ে এ ঘটনার জবাব দিয়েছে, পুরো বিশ্ব তুমুল উত্তেজনায় অবস্থা ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেছে। এরকম উত্তেজনা ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হওয়ার পর থেকেই সীমান্তে অনিঃশেষ বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

এ কারণেই, কুররাতু আইনের আগ কা দরিয়া ২০১৯ সালে ঠিক তেমন প্রাসঙ্গিক, যেরকম প্রাসঙ্গিক ছিল যখন লেখিকা এই বইটি লিখেছিলেন ১৯৫৯ সালে। বইটি মূলত উর্দু, পরে ১৯৯৮ সালে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

খুব সোজা করে বললে বইটি মূলত দেশভাগ সম্পর্কে দেশভাগের আগে-পরে এদেশের মানুষের জীবন সম্পর্কে। কিন্তু হায়দার (মৃ. ২০০৭) এই একক বিষয়টিকে একটি চক্রাকার ঘটনায় (সাইক্লিকাল ফেনোমেনা) রূপান্তরিত করেছেন। যুগের পর যুগ নানা ফাটলকে সহ্য করে ইতিহাস নিজে বার বার ফিরে আসে, যতক্ষণ না পাঠক চুড়ান্ত ফাটলের কথা বুঝতে পারেন, এক দেশ ভেঙে দুই দেশ হয়ে যায় যদিও দেশটির চরিত্রে কোন বিভক্তি আসে না।

আগ কা দরিয়া”তে উপমহাদেশের ২,০০০ বছরের ইতিহাসের উপর সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে, ইতিহাসের নানা পাহাড়-উপত্যকায় আমাদেরকে ঘুরিয়ে আনা হয়েছে। বইটিতে অনেকগুলো নাম, দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম, উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে রীতিমতো তথ্যের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছে। যখনই সে বন্যার পানি গড়িয়ে যায়, হায়দারের চরিত্রগুলো স্মৃতিকাতরতায় ভুগতে থাকে, আরেক বার পানি আসলে তৃপ্ত হওয়ার আশা নিয়ে বসে থাকে। এরকম কালোচিত ভাষ্য উপস্থাপনের জন্য এ বইয়ে উদ্ভাবনী লিখন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে। এতো বেশি পরিমাণে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে লেখার সময় হায়দার সাহিত্যের প্রচলিত রীতি-নীতি ও তার পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি নিঃসংকোচে বারবার তার চরিত্রগুলোকে এবং সেগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে পুনর্গঠন করেছেন, ক্লাউড আটলাস চলচ্চিত্রে যেরকম দেখা যেতো। গৌতম নামের এক বৈদিক পণ্ডিত উপন্যাসের প্রথম দিকে একজন তরুণ বাঙালি হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের চাকরিতে প্রবেশ করেন, এবং এরপর আবার ১৯৪০ এর দিকে লখনৌতে একদল ছাত্রের অংশ হিসেবে তার দেখা মিলে। তার চরিত্রটি চম্পা নামের এক নারী চরিত্রের সাথে প্রথম প্রেমে পড়ে তৃতীয় পৃষ্ঠায়, এবং ৩৪৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত প্রেমে পড়তেই থাকে। চম্পার নামটি এসেছে মূলত একটি ফুল থেকে। চম্পা চরিত্রটি যতবার মুকুলিত হয়ে আবার নির্জীব হয়ে পড়ে, প্রত্যেক বারই বইটিতে নতুন কোন ঐতিহাসিক যুগের প্রসঙ্গ চলে আসে।

যে বিষয়টি হায়দারের বইটি উপভোগ করাকে কষ্টকর বানিয়ে ফেলেছে, তা হলো তিনি তাঁর পাঠকদেরকে শ্বাস গ্রহণ করার সময় পর্যন্ত দেন নি। কখনো দেখা গেছে, এক অধ্যায়ে ১০০ বছর অতিক্রম করেছেন, আবার কখনো এক লাইনেই এরকম সময় অতিক্রম করেছেন। গ্রুপ সংলাপগুলো বন্ধুদের চায়ের আড্ডা না হয়ে একদম সিরিয়াস নাটকের সংলাপের মতো হয়ে গেছে। চিঠি ও আত্মকথনসমূহ অতিরিক্ত বাগাড়ম্বরপূর্ণ।

রিভার অব ফায়ার”কে হায়দার আগ কা দরিয়ার অনুবাদের বদলে ট্রান্সক্রিয়েশন বলেছেন, এখানে তিনি তার নিজের গল্প বলার পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। একটি চরিত্র তার পরিবারের ইতিহাস রোমন্থন করতে গিয়ে বলছেন, “আমি কীভাবে শুরু করতে পারি?এরপর বলছেন, “আমি জানি না, কোন চরিত্রগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোথা থেকে এই গল্প শুরু হয়েছিল? পরিবেশ কী ছিল? গল্পের নায়িকা কে?”

রিভার অব ফায়ার”এ সময় চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। যদিও এটা পাঠকদের জন্য পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দপূর্ণ নয়, তবে সবকিছুকে পূর্ব পরিচিত মনে হওয়ার বিভ্রান্ত সুর আলোচ্য বিষয়ের জন্য যথাযথ ছিল। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কটা চলমান আছে: আশঙ্কাজনক; পুনরাবৃত্তিমূলক এবং এই দৃশ্যের কোন সমাপ্তি নাই।
________________________________

গ্রন্থ সমালোচনাটি নিউ ইয়র্ক টাইমসে “An Urdu Epic Puts Indias Partition Into Historical Perspective” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখক অদিতি শ্রীরাম দিল্লীর নিকটবর্তী আশোক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।