Latest Post



মাইকেল শাফি, যাহরা মালিক, আযহার ফারুক, দ্য গার্ডিয়ান:
বিতর্কিত কাশমিরের আকাশসীমায় বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের আকাশ সীমায় প্রবেশের চেষ্টা করা দুটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান গুলি করে ফেলে দিয়েছে পাকিস্তান, এতজন ভারতীয় পাইলটকে গ্রেপ্তারও করেছে।
প্রায় পঞ্চাশ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ভারত কর্তৃক পাকিস্তানে হামলা করার একদিন পর পাকিস্তান এ হামলা করে। পারমাণবিক শক্তিধর এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ১৯৯৯ সালে হিমালয়ে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর দক্ষিণ এশিয়ায় এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংকট।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে ভারতও বুধবারে কাশমিরের নিয়ন্ত্রণ রেখার পাকিস্তানি অংশে পাকিস্তানের একটি এফ-১৬ যুদ্ধ বিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে।
পাকিস্তান লাহোর, ইসলামাবাদ ও অন্যান্য শহরে অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল স্থগিত রেখেছে। অন্তত একটি ভারতীয় বেসরকারী এয়ারলাইনার স্বীকার করেছে যে উত্তর ভারতের বিমান পথ বন্ধ আছে, অমৃতসর, শ্রীনগর, চণ্ডীগড় ও জম্মুতে বিমান চলাচল স্থগিত আছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার সকালে একটি বিবৃতিতে বলেছে, তারা ভারতীয় আকাশ সীমায় প্রবেশ না করেই কাশমিরে নিয়ন্ত্রণ রেখায় “বেসামরিক লক্ষ্যে” আক্রমণ করেছে, “আত্মরক্ষার অধিকার, ইচ্ছা ও সক্ষমতা” প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে।
“আমাদের উত্তেজনা বৃদ্ধির কোন ইচ্ছা নেই, তবে তা করতে বাধ্য করা হলে আমরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছি।” দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ ফায়সাল বলেছেন।
জনৈক জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান সীমান্তবর্তী রাজৌরি জেলার তিনটি জনশূণ্য গ্রাম নদিয়ান, লাম ও ঝংগরে বিমান সকাল সাড়ে দশটার পর বিমান হামলা চালানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ভারতীয় বিমান বাহিনী কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়।
প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে বুদগামে একটি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত হয়, তবে এই ঘটনার সাথে তা সম্পৃক্ত কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গাফুর জানান, ভারতীয় যুদ্ধবিমান এই হামলায় সাড়া দিয়ে নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করেছিলো, তন্মধ্যে দুটি বিমান গুলিতে ভূপাতিত হয়েছে। একটি যুদ্ধবিমান পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশমিরে ভূপাতিত হয়, অন্যটি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশমিরে ভূপাতিত হয়। একজন ভারতীয় পাইলট সৈন্যদের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। একটি টুইটে তিনি এসব কথা জানান।
মঙ্গলবারের হামলার পর থেকে ভারত সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে, কেননা ইসলামাবাদ একটি সারপ্রাইজআক্রমণের কথা বলেছে।
বিতর্কিত কাশমিরের রাজধানী শ্রীনগরের আকাশে মঙ্গলবার রাত জুড়ে যুদ্ধবিমান টহল দেয়, কারণ কয়েক শত মাইল দূরে কাশমির নিয়ন্ত্রণ রেখায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে মর্টারের গুলি বিনিময় হচ্ছিল।
মোটা দাগে ভারতকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পো একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। এতে তিনি ভারত কর্তৃক প্রতিবেশী দেশের সীমান্তের পাঁচ মাইল ভিতরের হামলাকে “জঙ্গী বিরোধী অভিযান” বলে আখ্যায়িত করেন, এবং পাকিস্তানকে “তার মাটিতে সক্রিয় জঙ্গীগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অর্থবহ ব্যবস্থা গ্রহণের” জন্য আহ্বান জানান।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। মঙ্গলবার ভোরে ভারত আসলে কীসের উপর হামলা চালিয়েছিলো? যদি তারা আদৌ কোন কিছুর উপর হামলা চালায় আরকি। উভয় দেশ স্বীকার করছে যে ভারত অন্ততপক্ষে বালাকোটের কয়েক মাইল অভ্যন্তরে হামলা চালিয়েছে। বালাকোট সীমান্ত থেকে পাঁচ মাইল অভ্যন্তরে একটি ছোট পাকিস্তানি শহর। কিন্তু হিসাব বলছে অন্য কথা।
ভারত দাবি করছে, তারা একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে, এবং জয়শ-এ-মোহাম্মদীর “বড় সংখ্যক” যোদ্ধাদেরকে হত্যা করেছে। যে জঙ্গী গোষ্ঠীটি ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশমিরে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে, যে হামলায় ৪০ জন আধা সামরিক সৈন্য নিহত হয়েছে।
পাকিস্তান বলছে, তারা পৌছার আগেই ভারত বালাকোটে আঘাত হানে, এবং একটি খোলা মাঠে চার থেকে পাঁচটি বোমা নিক্ষেপ করে আবার পালিয়ে ফিরে যায়।
গত বুধবার সকালে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ জোর দিয়ে বলেন ধরনের হামলার লক্ষ্য পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ছিল না
তিনি বলেন, “কোন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয় নি। অগ্রীম এই হামলার সীমিত উদ্দেশ্য ছিল জয়শ এ মোহাম্মদীর জঙ্গী গোষ্ঠীর অবকাঠামোসমূহের বিরুদ্ধে হামলা করা, ভারতে আরেকটি জঙ্গী হামলা অগ্রীম প্রতিহত করার জন্য।
তিনি আরো যোগ করেন, “ভারত এ অবস্থায় আর উত্তেজনা বৃদ্ধি করতে চায় না, ভারত দায়িত্ব ও সংযম সহকারে কাজ চালিয়ে যাবে।”
বুধবার বিকালে পাকিস্তান একটি যৌথ সংসদীয় অধিবেশন সম্পন্ন করে, এর আগে জাতীয় কমান্ড অথরিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র দেখভাল করা।
মঙ্গলবার রাতে গাফুর বলেন, “এখন তোমাদের পালা অপেক্ষা করো আর আমাদের সারপ্রাইজের জন্য প্রস্তুত হও।”
উভয় সেনাবাহিনীই একে অপরকে কাশমির নিয়ন্ত্রণরেখায় গ্রামসমূহের উপর এবং প্রতিপক্ষ সেনাবাহিনীরেউপর গোলা বর্ষণের অভিযোগ করছে।
জনৈক পাকিস্তানি কর্মকর্তা এপিকে জানান, ভারতের মর্টার হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা কোনো হতাহতের খবর দেন নি, তবে কামালকোটও কালগোসহ বিভিন্ন গ্রামে হামলা করার অভিযোগ করেছেন।
________________________________


নিবন্ধটি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত। ছবি গার্ডিয়ান থেকে সংগৃহীত।



শাইমা আব্দুল হাদি, আল আহরাম:

বুধবারে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরের একটি ভবনে সংগঠিত অগ্নিকাণ্ডে সত্তুর জন নিহত ও আরো অসংখ্য লোক আহত হওয়ার সংবাদে শোক প্রকাশ করেছে মিসরের আল আযহার আশ শরীফ (আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়)।

পাশাপাশি আল আযহার বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশি জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে এবং মহান আল্লাহর নিকট নিহতদের পরিবারবর্গের জন্য ধৈর্য ও আহতদের আশু নিরাময় প্রার্থনা করেছে।

________________________________


সংবাদটি মিসরি প্রভাবশালী পত্রিকা আল আহরামসহ বিভিন্ন মিসরি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত।


আব্দুল্লাহ আল-আমাদি, আল জাজিরা:
যুক্তরাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্পো এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা জন বল্টনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অ্যাজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নে যথাসম্ভব বেশি বৈশ্বিক সমর্থন আদায় করা সম্ভব হয়।
ওয়াশিংটন যেসকল অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তন্মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ইরানকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলের খনিসমূহের আশেপাশে তাদের অস্তিত্ব ও কার্যকারিতা দৃঢ়করণ, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত মিত্র ইসরায়েলের সাথে আরব বিশ্বের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে ইসরায়েলের নিরাপত্তা জোরদার করা ইত্যাদি।
ইরানের বিরুদ্ধে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা দেখে বিস্মিত হওয়ার কিংবা হচকচিয়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই, কারণ এটি তাদের অনেক পুরনো কৌশল বা স্ট্রাটেজি, যা কারো কাছেই গোপন নয়। অনুরূপভাবে আরবদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতিনিয়াহুর প্রচেষ্টাও বিস্ময়কর কোন কিছু নয়।
কিন্তু গত সপ্তাহে ওয়ারসাওতে অনুষ্ঠিত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিষয়ক সম্মেলনে যে বিষয়টি আসলেই বিস্ময়কর, সেটা হচ্ছে দখলদার ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের তাড়াহুড়া।
মিসর, সিরিয়া, জর্দান প্রভৃতি দেশ কেন এতো তাড়াহুড়ো করছে ইসরায়েলের নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে, সেটা উপলব্ধি করার জন্য অনেক চিন্তা-ভাবনা দরকার। কারণ প্রকাশ্যে এরকম আগ্রহসহকারে নৈকট্য অর্জনের পিছনে কোন যৌক্তিক কারণ খোঁজে পাওয়া যায় না, যেখানে দীর্ঘদিন তাদের সম্পর্ক ছিল একেবারে গোপনীয়।
ওয়াশিংটন ভালো করেই উপসাগরীয় অঞ্চলে তার স্বার্থ সম্পর্কে জানে, এমনকি সে উপসাগরের কাছাকাছি থাকতে চায়। যদিও পুরো বিশ্ব জুড়ে ওয়াশিংটনের স্বার্থ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু উপসাগরে যে পদ্ধতিতে স্বার্থ আদায় করে, অন্য কোথাও সেভাবে করে না।
হ্যাঁ, ওয়াশিংটনের পক্ষে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশসমূহের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমেই স্বার্থ হাসিল করা সম্ভব, এর জন্য এ অঞ্চলের দেশসমূহের পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করা কিংবা এক দেশের বিরুদ্ধে আরেক দেশকে উসকিয়ে দেওয়ার দরকার হবে না।
কিন্তু ওয়ারসাওতে যা হয়ে গেলো, সেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পর্ক স্থাপনের মৌলিক নিয়ম-নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ এখানে ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে অন্যান্য দেশসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছে, তার সাথে ছিল তার মিত্র ইসরায়েল। এমনকি ইরানকে এ অঞ্চলে শান্তি স্থাপনের পয়লা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেই সাথে ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে যে সকল উদ্যোগ নেওয়া হবে, সেগুলোকেও বৈধতা দিতে চেয়েছে, চাই সেটা আমেরিকা কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ হোক, কিংবা নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ হোক।
কিন্তু মার্কিন পক্ষের তুলনায় ইউরোপীয় পক্ষ এক্ষেত্রে অধিক সতর্ক, বিচক্ষণ ও আগ্রহী ছিল। ইউরোপীয়দের লক্ষ্য অনেক গভীরে। তাদের কার্যক্রম মার্কিনদের দ্রুতগতির কার্যক্রমের তুলনায় অনেক বেশি শান্ত-শিষ্ট।
সম্মেলনটির দুর্বলতা হলো আমেরিকানরা তাদের প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি, পাশাপাশি নেতিনিয়াহুর উপস্থিতি সেখানে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে পড়েছিল। নেতিনিয়াহু সাহেব কেবল ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্যই উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি সম্মেলনের উপস্থিত কারো সাথে কিংবা সেখানে উপস্থি গণমাধ্যমের সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি।
আমরা যদি আরেক বার সম্মেলনের সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী দৃশ্যে ফিরে যাই, অর্থাৎ ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে উপসাগরীয়দের তাড়াহুড়োর বিষয়ে ফিরে যাই, তাহলে অবশ্যই বুঝতে পারি নেতিনিয়াহু এটা নিয়ে গর্ব করবেন এবং এটাকে নিজের সাফল্য হিসেবে গণ্য করবেন। প্রকাশ্যে উপসাগরীয় নেতাদের সাথে ঘোষণা করার মাধ্যমে এবং বাণিজ্যিক, আকাশ যোগাযোগ ও অন্যান্য বিষয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ঘোষণার মাধ্যমে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় তা হলো ফিলিস্তিনিদের সাথে পরবর্তী ঝামেলাসমূহে ইসরায়েল আরো শক্তিশালী হবে, এবং মার্কিন শতাব্দির সেরা বন্দোবস্ত ঘোষণার পথ সুগম হবে, এটি ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় যা যা করা দরকার, সেটা খুব শিগগিরই সম্পন্ন হবে।
 এসকল অর্জনের ভিত্তিতে বলা যায় এ সম্মেলনে ফায়দা হাসিলকারী একমাত্র পক্ষ হচ্ছে ইসরায়েল। এটাকে শুধুমাত্র নেতিনিয়াহুর সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে, কারণ এই মুহূর্তে আমরা চিন্তা করছি ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য তাড়াহুড়োকারীরা আসলে ঠিক কী অর্জন করলেন, বা তাদের পক্ষে ঠিক কী অর্জন করা সম্ভব হবে। অথচ এই সময়টাতে উপসাগরীয়দর জন্য ওয়ারসাওয়ে হাজিরা দেওয়ার চেয়ে বেশি জরুরি ছিল উপসাগরীয় কোন দেশের রাজধানীতে ইরানের সাথে বৈঠকে বসে পারস্পরিক সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজা, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা এ ধরনের কোন মধ্যস্থ বা পর্যবেক্ষকে উপস্থিতি ছাড়াই।
এ অঞ্চলে ইরানের ভৌগলিক গুরুত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, বরং যেটা পরিবর্তন করা সম্ভব এবং পরিবর্তন করা দরকারও, সেটা হলো ইরানের সাথে সম্পর্কের ধরন এব আচরণের পদ্ধতি পরিবর্তন করা।
ইরানকে আলোচনা-সংলাপের বিদ্যাপীঠ হিসেবে তুলনা করা যায়, কারণ ইরানের সাথে আলোচনা করে ধোঁকা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই, যেমনটা উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার সাথে সম্ভাবনা আছে। আর গত তিন দশকে আরব সাগরে তারা যা কিছু্ অর্জন করেছে, সেটা এ অঞ্চলের মূল নিয়ন্তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের বিচক্ষণতা ও ধীরস্থিরতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। আর তারা প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে, চাই সেটা উপসাগরে হোক, কিংবা অন্য কোন অঞ্চলে হোক। যেখানে কিনা অনেকগুলো দেশ তাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো, কৌশলের অভাব আর বৈদেশিক শক্তিসমূহের উপর নির্ভরশীলতার কারণে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
কখন উপসাগরীয়দের নিজস্ব আঞ্চলিক নীতি তৈরি হবে, যাতে হাজার হাজার মাইল দূরের কারো স্বার্থের উপর উপসাগরীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হবে? উপসাগরীয়দের নিজেদের শত্রু চেনার সময় কী হয়েছে? তারা কি নিজেদের শত্রুকে নিজেরাই চিনতে পারছে, যাকে বাইরের কেউ চিনবে না?
উপরের প্রশ্নগুলো নিছক কোন প্রত্যাশা নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে এগুলোর প্রতি নজর দেওয়া খুবই জরুরি। বিদেশী মার্কিনদের দ্বারা আরো বেশি ভয়-ভীতির মুখোমুখি হওয়ার পূর্বেই এটা বেশি জরুরি, এবং মার্কিনিদের পাশাপাশি হয়তো আরো বেশি বিদেশি ইসরায়েলের ভয়-ভীতিরও মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আছে!
________________________________

নিবন্ধটি আল জাজিরা আরবির অনলাইন সংস্করণে هل اكتشف الخليجيون عدوهم في وارسو؟ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত।



রামযি বারুদ ও রুমানা রুবিও, আল জাজিরা:
 “জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের সবকিছুই ইসরায়েলি দখলদারদের লক্ষ্যবস্তু।” গত ২৯ জানুয়ারি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী সংস্থা ডক্টর্স উইদাউট বর্ডার্স’র সাথে এক সাক্ষাতে কথাগুলো বলছিলেন জেরুজালেমের গ্রিক অর্থডক্স চার্চের আর্চবিশপ আতাল্লাহ হান্না।
 “ইসলামি ও খ্রিষ্টান পবিত্র নিদর্শনসমূহ তাদের লক্ষ্যবস্তু, কারণ তারা আমাদের শহরকে পাল্টে ফেলতে চায়, আরব ও ফিলিস্তিনি অস্তিত্বকে কোনঠাসা করতে চায়।” একথা গুলোও যোগ করেন আর্চ বিশপ।
হান্না ইসরায়েলের ইহুদিকরণ স্কিমের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সংগ্রামের অন্যতম অগ্রদূত। জেরুজালেম যে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু, তার এই বর্ণনা নিঃসন্দেহে সঠিক। তবে তার চেয়ে কঠিন সত্য হলো শুধুমাত্র পবিত্র শহর নয়, বরং পুরো ফিলিস্তিনকে ফিলিস্তিনি চরিত্র থেকে বিচ্যুত করার একটা সুপরিকল্পিত কার্যক্রম চলছে।
কয়েকদিন পর এই খ্রিষ্টান নেতা মন্তব্য করেন যে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ গালিল সাগরের পশ্চিম উপকূলে টিবেরিয়াস শহরের ঐতিহাসিক আল-বাহর মাসজিদে খনন কার্য  চালিয়েছে। এ স্থানে ইসরায়েল একটি যাদুঘর বানাতে চাই। ইতোঃপূর্বেও ইসরায়েল ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ মুছে ফেলতে এরকম কাজ বহুবার করেছে।

একটি ‘উদ্ভাবিত জনগোষ্ঠী’:

ইসরায়েল কর্তৃক ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক অধিকার অস্বীকার করার শেকড় ইহুদিবাদী আদর্শের গভীরে প্রোথিত। প্রকৃতপক্ষে একদম শুরুর দিকে ইহুদিবাদীরা প্রচার করেছিলো যে ইসরায়েল একটি সংস্কৃতি কিংবা ঐতিহ্য বঞ্চিত স্থান, যেটি পুষ্পশোভিত হওয়ার জন্য ইহুদিবাদী অগ্রদূতদের অপেক্ষা করছে।
আসলে ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব মুছে ফেলার জন্য ফিলিস্তিন সম্পর্কে “ভূমিহীন মানবগোষ্ঠীর জন্য জনমানবহীন ভূমি” জাতীয় মিথ প্রচার করাটা আসলে ইহুদিবাদীদের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলের নেতারা একথাটি কখনোই গোপন করেন নি যে এটিই তাদের আসল উদ্দেশ্য। “এখানে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী ছিল, তারা নিজেদেরকে ফিলিস্তিনি মনে করতো, আমরা এসে তাদেরকে তাদের দেশ থেকে বের করে দিলাম এবং তাদের দেশটি দখল করে নিলাম। কখনোই তাদের অস্তিত্ব ছিল না। এরকম একটা বিষয় খুব কঠিন কিছু নয়।” ইসরায়েলের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেইর (১৯৬৯-১৯৭৪) ১৯৬৯ সালে সানডে টাইমসের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে এরকম খোলামেলা কথা বলেন।
ফিলিস্তিনিরা আসলে নির্দি্টি জাতীয়তা বোধ সম্পন্ন জনগোষ্ঠী নয়, ইহুদিবাদীদের এমন একটি ধারণা এখনো বিদ্যমান আছে এবং এ ধারণাটি ইসরায়েলের সীমা অতিক্রম করে এর বাইরেও বিস্তার লাভ করেছে। মার্কিন অ্যাভানজেলিকাল খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনেকেই এই মতের ঘোর সমর্থক, যা অনেক মার্কিন নেতা প্রকাশ্যে প্রচার করেন। উদাহরণস্বরূপ ২০১১ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী নিউট গিংরিচ একটি ইহুদিবাদী চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে ফিলিস্তিনিরা “একটি উদ্ভাবিত জনগোষ্ঠী ছিল।
এ ধারণার বাস্তব প্রয়োগ হচ্ছে যেকোন ইহুদিবাদী স্থাপনা প্রতিষ্ঠা, সেটা শহর, বসতি, ফাঁড়ি সড়ক কিংবা শিল্প, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং অন্য যে কোন কিছুর উপাদানই হোক না কেন, ফিলিস্তিনিদের শহর, রাস্তা, গ্রাম, বাড়িঘর, সংস্কৃতি, ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করার সাথে একই সমান্তরালে চলতে থাকবে।

ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব মুছে ফেলা:

২-১৮ সালের ১৯ জুলাই ইসরায়েলের সংসত নেসেটে “জাতি-রাষ্ট্র বিল” পাশ করার মাধ্যমে  আসলে জাতি বিদ্বেষের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করা হয়েছে, ইসরায়েলকে ইহুদি জনগোষ্ঠীর জাতীয় মাতৃভূমি আখ্যায়িত করার মাধ্যমে এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী, তাদের ইতিহাস ও ভাষাকে কোণঠাসা করার মাধ্যমে। তবে এই বিল মূলত কয়েক দশক ধরে চলে আসা ইহুদিবাদীদের প্রচেষ্টার ফলাফল।
 উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ আমলে ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অঞ্চল, শহর ও গ্রামের আরবি নাম ব্যবহার করতো, যার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৭,০০০। অন্যদিকে হিব্রু নাম ছিল মাত্র ২০০ টি, অধিকাংশই ইহুদি বসতি, এরমধ্যে ইহুদিবাদী আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত নতুন কয়েকটি বসতিও ছিল। এটা সেসময়ে (১৯২০ এর দশকে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে) ফিলিস্তিনে জনসংখ্যার বণ্টন ও ভূমির মালিকানার একটি নির্দেশক। সেসময় নবাগত বসতি স্থাপনকারীদের সহ মোট ইহুদি জনসংখ্যা ছিল শতকরা ১১ ভাগ।
যাই হোক, ফিলিস্তিনি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাদ বাকি আরব জনগোষ্ঠীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই ফিলিস্তিন “পুনরুদ্ধারের” নামে একটি অসাধু অভিযান শুরু হয়।
১৯৪৮ সালে প্রথম ইসরায়েলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী য়িৎযাক গ্রুয়েনবামের নিকট প্রেরিত একটি চিঠিতে লেখা ছিল, “প্রচলিত নামসমূহকে নতুন নাম দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা আবশ্যিক। আমাদের পুরনো দিনকে নবায়ন করতে হলে এবং চমৎকার জনগোষ্ঠী নিয়ে বসবাস করতে হলে যার শিকড় আমাদের দেশের মাটিতে প্রোথিত আমাদেরকে অবশ্যই দেশের মানচিত্রের মৌলিক হিব্রুকরণ শুরু করতে হবে।”
এরপরই সরকার একটি কমিশন তৈরি করে তাদেরকে ফিলিস্তিনি সবকিছুর নয়া নামকরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যাতে শহর, গ্রাম ও অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের ভৌগলিক এলাকায় নতুন রাষ্ট্রের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৫৭ সালে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার লেখা আরেক চিঠিতে নাকবার সময় দখলকৃত ফিলিস্তিনি ঘর-বাড়িসমূহ ধ্বংস করার কাজের গতি বাড়ানোর জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে অনুরোধ করে। এই কর্মকর্তা লিখেন- “আরব গ্রাম ও এলাকাগুলোর ধ্বংসাবশেষ এবং ১৯৪৮ সাল থেকে খালি পড়ে থাকা বাড়িগুলো ক্ষতির কারণ হতে পারে, এর ফলে রাজনৈতিক খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই এসকল বাড়ি ঘর ভেঙে সাফ করে দেওয়া উচিত।”
ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করা এবং তাদের মাতৃভূমির ইতিহাস থেকে তাদেরকে বের করে দেওয়াটা ইসরায়েলের সার্বক্ষণিক কৌশলসমূহের একটি।
ইসরায়েলি পণ্ডিত মাওজ আজারয়াহু ও আর্নন গোলান তাদের "(Re)naming the Landscape: the Formation of the Hebrew Map of Israel" (ভূচিত্রের [পুনঃ]নামকরণ: হিব্রু মানচিত্র গঠন) শীর্ষক গবেষণা পত্রে লিখেন- “ ‘ইসরায়েলকে হিব্রুকরণ’ আধুনিক ইহুদিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলে বিবেচনা করা হয়। সাধারণত হিব্রুকরণ বলতে বুঝায় (ইহুদি) জাতি গঠন প্রকল্পের সহায়ক হিসেবে ইহুদিবাদের (জায়নিজম) নিজ দায়িত্বে ও সহযোগিতায়া হিব্রু ভাষার পুনরুজ্জীবন ঘটানো।”
এটি ইসরায়েলের জন্য যেমন সত্যি, ঠিক তেমনি অন্যান্য উপনিবেশ স্থাপনকারীদের ক্ষেত্রেও সমান সত্যি। এবং অন্যান্য বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদী শক্তির মতোই, ইসরায়েল বিভিন্ন স্থান, স্থানের নাম এবং উপনিবেশকৃত অঞ্চলের জনগণের মধ্যকার গুরুত্বপূীর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন।
যেমনটা কানাডিয়ান ইতিহাসবিদ কালেইঘ ব্রাডলি তার সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন: “স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য স্থানের নামসমূহ স্মৃতি জাগিয়ে তোলার যন্ত্ররূপে কাজ করে। এই নামগুলো মানুষের মনে ইতিহাস, আধ্যাত্মিক ও পরিবেশগত জ্ঞান এবং ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাকে মূর্ত করে তোলে। এছাড়াও জায়গার নাম দেশের অভ্যন্তর ও বহির্বিশ্বের মধ্যে এক ধরনের সীমান্ত হিসেবে কাজ করে।”
ফিলিস্তিনি জায়গাসমূহের নাম বদল, ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী স্থানসমূহের ধ্বংসসাধন, ফিলিস্তিনি সংস্কৃতিকে নিজেদের দাবি করা, আরবি ভাষাকে অবমূল্যায়ন করা এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর সাংষ্কৃতিক অবদান মুছে ফেলার ইহুদিবাদী প্রচেষ্টা ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান আছে।
অতিসম্প্রতি ইসরায়েল তাদের সহিংস সামরিক শক্তি শুধুমাত্র ফিলিস্তিনি মানুষ হত্যার জন্যই কাজে লাগাচ্ছে না, বরং তাদের সাংস্কৃতিক নিদর্শনাবলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয় ধ্বংস করার জন্যও তাদের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করছে। ফিলিস্তিনি দাপ্তরিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৪ সালে ৫১ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে ৭৩টি মসজিদ ধ্বংস করেছে।
এর মধ্যে কিছু মসজিদের স্থাপনা এক হাজার বছরেরও বেশি পুরনো, যেমন জাবালিয়ার আল-ওমারি মসজিদ। এই মসজিদটি ১৩৬৫ খিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে নির্মিত হয়, এবং ফিলিস্তিনিদের আশার প্রতীক ও অতীত ঐশ্বর্যের স্মারক হিসেবে কাজ করতো।
এছাড়াও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান আল-আকসা মসজিদের উপর চাপ বৃদ্ধি করে। দেশটি হারাম আল-শরিফ প্রাঙ্গনে চরমপন্থী ইহুদিবাদী সংগঠন টেম্পল মাউন্ট ফেইথফুলের জোরপূর্বক অনুপ্রবেশে সহযোগিতা করছে, উল্লেখ্য হারাম আল-শরিফে আল-আকসা অবস্থিত। এই চরমপন্থী গোষ্ঠী ঘোষণা করেছে যে তারা টেম্পর মাউন্টে তৃতীয় উপাসনালয় নির্মাণের জন্য আল-আকসা ধ্বংস করতে আগ্রহী, স্পষ্টতই ইসরায়েল সরকারও এরকমটাই চায়।
এছাড়াও নাবলুস, আল খালি (হেব্রন), আরিয়া (জেরিচো), ইয়াফফা (জাফা), হাইফা এবং আরো অনেক ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামে বিভিন্ন সময়ে আক্রমণ করা হয়েছে।
তা সত্ত্বেও, এতো ধ্বংস সাধনের পরও, বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, ইসরায়েল এখনো তার অতীত এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছে।

ফিলিস্তিনি সুমুদ

খ্যাতনামা ইসরায়েলি ঐতিহাসিক বেনি মরিস ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ’র সাথে একটি সাক্ষাৎকারে তার দেশের ভয়ানক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেন।
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “এই স্থানটি মধ্যপ্রাচ্যের আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে বিস্ফোরিত হবে। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাথে সহিংসতা বাড়তে থাকবে আরবরা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দাবি জানাবে। ইহুদিরা বিশাল আরব ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছোট্ট সংখ্যালঘু হয়ে থাকবে, যেমনটা যখন তারা আরব দেশসমূহে বসবাস স্থাপন করেছিলো তখন ছিল।”  তিনি আরো যোগ করেন: “আগামী তিরিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে তারা (আরবরা) আমাদেরকে (ইহুদিদেরকে) যেকোন উপায়ে অতিক্রম করবে।”
কথাগুলো তিনি দেশবাসীর মধ্যে বিদ্যমান ভয়কে কাজে লাগানোর জন্য এই মন্তব্য করেছেন, নাকি সত্যিকার অর্থে তার বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। হয়তো ইসরায়েলিরা যে তাড়াহুড়ো করে ফিলিস্তিনি পরিচিতির বিরুদ্ধে কাজ করছে, ফিলিস্তিনি সংস্কৃতির উপর আঘাত হানছে, ইহুদি বসতির বিস্তার ঘটাচ্ছে, রাস্তার নাম পাল্টাচ্ছে, আরবি ভাষাকে অবজ্ঞা করছে, অথবা আর্চবিশপ হান্নার ভাষায় বলা যায় “ফিলিস্তিনি সবকিছুকেই লক্ষ্য বানাচ্ছে”, এসব কার্যক্রমের ব্যাখ্যা করেছেন তিনি এই বক্তেব্যে।
কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণীর অনুরূপ আরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী কর্তৃক “নিপীড়িত সংখ্যালঘুদেরকে” “নির্বিচারে হত্যার” কারণে ইসরায়েল রাষ্ট্র ধ্বংস হবে না। বরং ধ্বংস হবে ইসরায়েলিদের বেপরোয়া কার্যক্রমের কারণে। ইহুদিবাদীদের আগেও ফিলিস্তিনে অনেক আক্রমণকারীরা এসেছিল। তাদের অনেকে পালিয়ে গেছে, কিন্তু অন্যরা ফিলিস্তিনের বৈচিত্রপূর্ণ সমাজের সাথে মিশে স্বাভাবিকভাবে মিশে গেছে।
ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূমির সাথে তাদের যে সম্পর্ক, সেটা সহিংসতা, নেসেটে পাশ করা আইন কিংবা সেনা-শাসন দ্বারা নির্ধারণ কিংবা বাতিল করা যাবে না, ইসরায়েলিরা এই সত্যটাকে স্বীকার করছে না। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের উপর আগ্রাসন যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের জাতীয়তাবোধ ততই শক্তিশালী হচ্ছে। মরহুম ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ তার “পরিচয়পত্র” কবিতায় ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের স্পৃহাকে চমৎকার চিত্রায়িত করেছিলেন:
আমি এক উপাধিহীন নাম, এক ভূখণ্ডে সহিষ্ণু, সেখানে যা আছে তা নিয়েই, যেখানে সবাই বসবাস করে ক্রোধের বিস্ফোরণ নিয়ে, আমার শেকড় প্রোথিত হয়েছে সময়ের জন্মের আগে, ইতিহাসের সূচনারও পূর্বে, জলপাই আর সাইপ্রাস গাছের জন্মের ও পূর্বে, এমনকি ঘাস ফোটারও পূর্বে।
প্রথম দিককার ইহুদিবাদীরা ভুল ছিল। ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস, রাস্তার নাম পরিবর্তন আর মসজিদ-গীর্জা ধ্বংস করে একটি জাতির স্বাতন্ত্র্যবোধকে, পরিচিতি জ্ঞানকে ধ্বংস করা যায় না।
ফিলিস্তিনি সুমুদ (দৃঢ়তা) ইসরায়েলের যে কোন, এবং সকল সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠেছে। আর এই দৃঢ়তাই কেবল মরিসের ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য প্রমাণিত করবে। ফিলিস্তিনিদের বিশাল সাগর দখলদারদের গ্রাস করে ফেলবে। ‍
________________________________

লেখক পরিচিতি: রামযি বারুদ একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কলামিস্ট। রুমানা একজন ফ্রিল্যান্সার লেখিকা। তাদের লেখা এই নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজির অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। মূল নিবন্ধের শিরোনাম: Israel's Judaisation of Palestine is failing.


সিসি মুরসির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অভ্যুত্থান করেন
সিসি মুরসির বিরুদ্ধে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অভ্যুত্থান করেন
আল জাজিরা আরবি:
মিসরের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া বিপ্লবের সাড়ে পাঁচ বছর পর কায়রোতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত আন প্যাটারসন ওয়াশিংটনে এক আলোচনা সভায় বসেছিলেন, সে অভিজ্ঞতার শিক্ষণীয় দিকগুলো আলোচনা করার জন্য।
প্যাটারসন প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রের মার্কিন নীতি স্পষ্ট করেন, আর তা হচ্ছে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক। অর্থাৎ ওয়াশিংটন প্রথমেই মিসরে এমন অবস্থা নিশ্চিত করতে চায়, যা দখলদার রাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত বলেন “মিসরে আমাদের নীতি খুবই স্পষ্ট ছিল, এতে কোন দ্বিধা ছিল না।” তিনি আরো যোগ করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক ছিল ইসরায়েলের সাথে মিসরের সম্পর্ক। আর এই নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ঘোষিত অন্য কোন নীতির সাথে বিরোধপূর্ণ হলে এই নীতিই অগ্রাধিকার পেতো। যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সহযোগীতা করার নীতির কথা বলা যেতে পারে।
এই সুস্পষ্ট স্ট্রাটেজি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পয়েন্টের একটি, মিসর সম্পর্কে প্যাটারসনের পুরো আলোচনা বুঝতে হলে যেগুলো প্রথমে বুঝতে হবে। গত বৃহষ্পতিবারে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেস কর্তৃক আয়োজিত “আট বছর পর আরব বিদ্রোহ” শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব আলোচনা করেন।
সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আলোচনার দ্বিতীয় পয়েন্টটি মিসরীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকার সাথে সম্পৃক্ত।  তিনি বলেন, “হুসনি মোবারককে যে অপসারণ করেছিল, মুহাম্মাদ মুরসিকেও সেই অপসারণ করেছে।” সেই সাথে তিনি যোগ করেন, “কেউ যদি সিসিকে অপসারণ করে, তবে তা একমাত্র মিসরীয় সেনাবাহিনীই করবে।” এরপর তিনি বলেন, “এটি কোন গণতান্ত্রিক কার্যক্রম ছিল না।”
তৃতীয়  পয়েন্টটি হলো পাশ্চাত্যের ভূমিকা সম্পর্কে। রাষ্ট্রদূত বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কিছু শক্তি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির ফলে যে ‘অপ্রিয়’ ফলাফল হতে পারে, সেটিকে গুরুত্ব দেয়নি।’ অপ্রিয় দ্বারা মূলত ১৫ জানুয়ারি ২০১১ সালের বিপ্লবের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ইখওয়ানের উত্থানের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি।
প্যাটারসন আরো বলেন, “শুরু থেকেই এটা স্পষ্ট ছিল যে ইখওয়ান নির্বাচনে ভালো করবে।” সালাফি আন্দোলনের উত্থানের ফলে অনেকের বিস্ময়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি এ কথাটি বলেন।
এরপর রাষ্ট্রদূত মার্কিন “অনুসঙ্গসমূহ” সম্পর্কে এবং এগুলো কীভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন রক্ষা করতে এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আবদুল ফাত্তাহ সিসির অভ্যুত্থান ঠেকাতে ব্যর্থ হলো, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রাষ্ট্রদূত তার আলোচনায় এটিকে অভ্যুত্থান বলতে দ্বিধাবোধ করেন নি।  

হারিয়ে যাওয়া উপসাগরীয় পর্ব:

মার্কিন এই কূটনীতিবিদ বলেন, অভ্যুত্থানের ফলে মার্কিন উদ্দেশ্য শতভাগ পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মুরসিকে অপসারণের বিষয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের ভূমিকা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের নিকট মারাত্মক “তথ্য বৈসাদৃশ্য” (ইনফর্ম্যাশন গ্যাপ) ছিল। এছাড়াও তিনি ইঙ্গিত করেন যে, সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কারণে এই অভ্যুত্থানে সালাফিদের ভূমিকা মার্কিনদের নিকট স্পষ্ট ছিল না।
প্যাটার্সনের বক্তব্যে অভ্যুত্থানে উপসাগরীয় অঞ্চলের হারিয়ে যাওয়া ভূমিকার কথা উত্থিত হয়, ওয়াশিংটনের নিকট এসকল দেশ নিছক দর্শকের ভূমিকায় ছিল এমন একটা চিত্র ফুটে ওঠে, সেই সাথে সেই কঠিন দিনসমূহে যা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে অনেক প্রশ্নও উত্থাপিত হয়। সম্ভবত অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর অন্যান্য মার্কিন সূত্রে বর্ণিত বিভিন্ন কথোপকথন ও বিভিন্ন দলিলে প্রকাশিত হয়েছে।
আর এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় মার্কিন দলিল সম্ভবত মার্কিন সাংবাদিক ডেভিড কিরকপ্যাট্রিক রচিত “Into the Hands of Soldiers... ... Freedom and Chaos in Egypt and the Middle East” গ্রন্থটি। এই বইটির সারসংক্ষেপ নিউ ইয়র্ক টাইমসে ২০১৮ সালের জুলাই মাসের ২৭ তারিখ প্রকাশিত হয়।
ডেভিড কিরকপ্যাট্রিক তার বইয়ে যেসকল দলিল ও তথ্য-প্রমাণাদি সংকলন করেছেন, সেগুলোর আলোকে প্যাটরসনের অভিজ্ঞতা পাঠ করলে অনেকগুলো উপসংহারে উপনীত হওয়া সম্ভব। তন্মধ্যে একটা হলো, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা “আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার পালাবদল”র পক্ষে তার অবস্থান সম্পর্কে দৃঢ়তা প্রকাশ করলেও তার প্রশাসনে দায়িত্বশীলগণ ছিল বিভিন্ন অঙ্গনের, আর তাই ২০১৩ সালে মিসরে তারা অভিন্ন লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করেনি।
কিরকপ্যাট্রিক তার বইয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হ্যাগেলের বিষয়ে দলিল উপস্থাপন করেন। বিভিন্ন সূত্র অনুসারে জানা যায়, রিপাবলিকান দলের প্রবীণ এই নেতা, যিনি ওবামার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন, তিনিও তার রাষ্ট্রপতির লক্ষ্য অনুসারে কাজ করেন নি।
দুই হাজার ষোল সালে মার্কিন সাংবাদিককে হেগেল তার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে তার নিকট সৌদি, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের নিকট থেকে অভিযোগ আসে। সাবেক এই মন্ত্রী আরো বলেন, আমিরাতের “ডি ফ্যাক্টো শাসক” আবু ধাবির যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন যায়েদ ইখওয়ান সম্পর্কে বলেন, “আমাদের এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সবচেয়ে ভংঙ্কর বিপদ হচ্ছে ইখওয়ানুল মুসলিমন।”
কাজেই, মিসরের অভ্যুত্থানে সৌদি ও আমিরাতের ভূমিকা সম্পর্কে আমেরিকা কোন কিছু না জাানাটা অস্বাভাবিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত যেমনটা দাবি করেছেন তার সর্বশেষ বক্তব্যে। বিশেষত যখন জানা যায় যে, সেখানে কতিপয় মার্কিন দায়িত্বশীল এবং মুহাম্মাদ বিন যায়েদের মতো ব্যক্তিত্ব ও ইসরায়েলের মতো একটি পক্ষের যৌথ লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল।  
এসকল মার্কিন দায়িত্বশীলদের মধ্যে আছেন জেনারেল মাইকের ফ্লিন, যিনি সে সময় মার্কিন প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংবাদ এজেন্সির প্রধান ছিলেন, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী ক্যাম্পেইন ও রাশিয়ার মধ্যকার অনুমিত গোপন চুক্তির বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তি।
অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগে জেনারেল ফ্লিন মিসরের রাজধানী কায়রো সফর করেন, মিসরীয় জেনারেলদের সাথে মুরসির বিষয়ে কথা বলার উদ্দেশ্যে। কিরকপ্যাট্রিক বলেন, জেনারেল ফ্লিন ২০১৬ সালে তাকে জানিয়েছিলেন যে ইখওয়ানুল মুসলিমীন আর আল কায়েদা “একই আদর্শ”র অনুসারী।

মুরসির প্রতি মার্কিন বিদ্বেষ:

এমনকি বেসামরিক মার্কিন দায়িত্বশীলদের মধ্যেও অভ্যুত্থানের পক্ষে অবস্থান ও নিদর্শনাদি বিদ্যমান ছিল। এর মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরিও আছেন, যিনি রাষ্ট্রদূত প্যাটারসনের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ছিলেন।
জন কেরি ২০১৩ সালের মার্চে কায়রো সফর করেন, এবং মুরসি ও সিসির সাথে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করেন। কিরকপ্যাট্রিক কর্তৃক সংকলিত তথ্য-উপাত্ত অনুসারে, দুটি সাক্ষাৎ ছিল ভিন্ন উদ্দেশ্যে। কেরি মিসরের সেসময়ের রাষ্ট্রপতিকে অপছন্দ করেন এবং তাকে মার্কিন সাহায্যের অনুপযুক্ত বলে বিবেচনা করেন।
কিন্তু তিনি সিসির সাথে সাক্ষাৎ শেষে সন্তুষ্টচিত্তে বেরিয়ে আসেন। কেরি সাংবাদিক কিরকপ্যাট্রিকের নিকট বর্ণনা করেন, সিসি সেদিন তাকে বলেছিলেন, “আমি আমার দেশকে অজ্ঞাত পরিস্থিতির দিকে ছেড়ে দেব না।” সেসময়েই মার্কিন মন্ত্রী বুঝতে পারেন যে মুরসির সময় শেষ হয়ে এসেছে।
আর যখন জন কেরির প্রতিনিধি আন প্যাটারসন কায়রোতে মিসরীয়দেরকে নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বলছিলেন, এবং ফলাফল জানা নেই এমন কোন আন্দোলনের দিকে এগুতে নিষেধ করেছিলেন, ঠিক সেই সময় প্রায় প্রতিদিন চাক হেগেল সিসির সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করছিলেন।
কিরকপ্যাট্রিক বলেন, হোয়াইট হাউস হেগেলকে সিসির সাথে কথা বলার জন্য এমন সব পয়েন্ট বাতলিয়ে দিচ্ছিল, যাতে সিসিকে এই মর্মে সতর্ক করা হয় যে মিসরে অভ্যুত্থান হলে ওয়াশিংটন কঠোর শাস্তি দেবে। কিন্তু হেগেল সিসির নিকট “সম্পূর্ণ” ভিন্ন বার্তা পৌছাচ্ছিলেন।

হটলাইন:

হটল সিসিকে বলেন, “আমি কায়রোতে বসবাস করি না, বরং আপনিই কায়রোতে বসবাস করেন। কাজেই আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনারই, আপনার দেশ রক্ষা করার দায়িত্ব আপনারই।” আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মর্তা বলেন, হোয়াইট হাউস চাচ্ছিল, হেগেল যেন সিসিকে জানিয়ে দেন, “গণতন্ত্রই গুরুত্বপূর্ণ”, কিন্তু হেগেল যে বার্তা পাঠাচ্ছিলেন, তা হলো: “আমরা ভালো সম্পর্ক চাই।”
হয়তো হেগেল ও সিসির মধ্যকার গোপন হটলাইন সম্পর্কে প্যাটারসন জানতেন না, কিন্তু সর্বাবস্থায় তিনি সিসি সম্পর্কে তো জানতেন। আর এটা বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের আলোচনায়ও স্পষ্টই বোঝা যায়।
প্যাটরসন মিসরের বর্তমান শাসক সিসি সম্পর্কে যা জানেন, তার সব কিছুই স্পষ্ট করেন নি, কিন্তু তিনি বলেছেন যে তিনি জানতেন মুরসি যখন সিসিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নিযুক্ত করেছিলেন তখন তিনি যতটুকু চিবুতে পারেন, তার চেয়ে বড় গ্রাস গ্রহণ করতেন। আর তিনি এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি কয়েক বার সিসির সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
রাষ্ট্রদূত মনে করততেন, এই ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মুরসির নাই। মুরসি সম্পর্কে তিনি বলেন, “মুরসি কট্টর ইসলামপন্থী, এটা তার ভুল নয়, বরং তিনি কি করেছিলেন, তা তিনি ভালোভাবে জানতেন না। আর যখন চাপ বৃদ্ধি পেতো, তখন ভেঙে পড়তেন, বিশেষত তার বিচ্ছিন্ন উপদেষ্টাদের কারণে। সত্যি বলতে কী, তার উপদেষ্টাদের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। মার্কিন প্রশাসনের অনেকেই তার প্রতি বিরক্ত ছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন দাম্ভিক ও বিচ্ছিন্ন।
প্যাটারসন বলেন, “বর্তমানে এটি সুস্পষ্ট যে আরব বসন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এটি আরবের বাস্তবতা বদলে দিয়েছে।” (সংক্ষেপিত)
________________________________

প্রতিবেদনটি আল জাজিরা আরবিতেمصر والسيسي ومرسي.. المشهد الأخير بعين السفيرة الأميركية” শিরোনামে ১৭ ফ্রেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত, ছবি আল জাজিরা থেকে সংগৃহীত।


সম্পাদকীয় বোর্ড, নিউ ইয়র্ক টাইমস:
গত গ্রীস্মে সুপ্রিম কোর্ট যখন ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষকে অন্ধ সমর্থ করছিলো, বিচারপতি সোনিয়া সটমেয়র তখন সে আদালতে ভিন্নমত পোষণ করে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক সংবিধানের “ধর্ম সহনশীলতার মূলনীতির” ক্ষতি সাধন করছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, এর মাধ্যমে আদালত আমাদের দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরকে এই বার্তা দিচ্ছেন যে তারা বহিরাগত, আমাদের রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের পূর্ণ সদস্য নন।”
পরবর্তীতে গত মঙ্গলবারে আদালত আবারো একই বার্তা প্রদান করেন। এবার ডমিনেক হাকিম মার্সেলে রে নামক এক মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি, যিনি ১৯৯৫ সালে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষা করছেন, তার ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটে।
একদিন আগে একটি আপিল আদালত হাকিমের মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন স্থগিত করেছিলেন, কারণ হলম্যার কারেকশনাল ফ্যাসিলিটি (যেখানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা) সরকার কর্তৃক ধর্মীয় পক্ষপাতিত্বের বিরুদ্ধে সংবিধানের নিষেধাজ্ঞা লংঘন করছে কি না, তা যাচাই করার জন্য বিচারকরা সময় চাচ্ছিলেন।  
হাকিম তার মৃত্যুর সময় পাশে একজন ইমামকে চেয়েছিলেন। কিন্তু হলম্যানে অপরাধীদের মৃত্যুপূর্ব প্রার্থনার জন্য শুধুমাত্র একজন খ্রিষ্টান ধর্মযাজককে নিয়োগ দিয়েছে। এবং কারাকর্মরকর্তারা বলেছেন যে, হাকিমের মৃত্যুদণ্ডে বাস্তবায়নের সময় তার পাশে একজন ইমাম থাকার অনুমতি দেওয়াটা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ঐ আসামি দাবি করেছিলেন যে, তার মৃত্যুর সময় ইমামের বদলে খ্রিষ্টান যাজককে রাখাটা স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চিার অধিকারের লঙ্ঘন।
৫ বরাম ৪ ভোটে উচ্চাদালত গত বৃহষ্পতিবার মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের অনুমতি দেয়। কারা ইমাম ইউসুফ গ্লাসের পেছন থেকে মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন দেখতে পান।
সুপ্রিম কোর্টের আরো পাঁচ সদস্য হাকিমের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। তারা তাদের আদেশে বলেন তার উচিত ছিল আরো আগে তার ধর্মীয় উদ্বেগের কথাটি জানানো।
বিচারপতি এলেনা কাগান তার আপত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারিকদের সিদ্ধান্ত “গভীরভাবে ভুল” বলে আখ্যায়িত করেন।  
তিনি লিখেন, “এই নীতির আলোকে একজন খ্রিষ্টান বন্দী মৃত্যুদণ্ডের সময় তার শেস প্রার্থনার জন্য নিজ ধর্মের যাজক পাবে, কিন্তু বন্দী যদি অন্য ধর্মের হয়, তা সে মুসলিম, ইহুদি বা অন্য যে কোন ধর্মের হোক, তাহলে সে তার ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে পাশে পাবে না তার মৃত্যুর সময়। এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার বিপক্ষে যায়।”
তিনি আরো যোগ করেন যে “হাকিম একটি শক্তিশালী দাবি উপস্থাপন করেছিলেন যে, তাকে যখন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে তখন তার ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘিত হবে।”
এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট মুসলমানদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে নৈতিক ব্যর্থতাকে এই ঘটনার সাথে মিশিয়ে ফেলেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলমানরা বঞ্চিত হয়েছে। রাত ১০:১২তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর আসামি আইনজীবী স্পেন্সার বলেন, “তিনি তার শেষ মুহূর্তে সমান আচরণ প্রত্যাশা করেছিলেন”
________________________________

লেখাটি ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে নিউ ইয়র্ক টাইমসের অনলাইন সংস্করণে Is Religious Freedom forChristians Only? শিরোনামে সম্পাদকীয় নিবন্ধ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ছবি নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে সংগৃহীত।



আনাদুলু এজেন্সি:
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদকে ওসমানি (অটোমান) সাম্রাজ্যের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১৯১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির পর তাঁকে সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। সে হিসেবে তুরস্ক এবার তার ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকী পালন করছে।
আবদুল হামিদ চতুর্ত্রিংশ ওসমানি খলিফা, তিনিই সাম্রাজ্যে সর্বশেষ শক্তিশালী খলিফা। তিনি এমন অনেক কাজে সফল হয়েছিলেন, যেগুলো আরব ও মুসলিম উম্মাহকে একত্রিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
তেত্রিশ বছরব্যাপী সুদীর্ঘ শাসনামলে তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, তার মাঝে অন্যতম হলো: ইহুদিবাদী শক্তির প্রতিরোধ; যারা কিনা ফিলিস্তিন দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তাঁর আরো দুটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো হেজাজ রেলওয়ে এবং প্যান ইসলামিজম প্রতিষ্ঠা; এর মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আরব ও মুসলিম জাতিকে একীভূতকরণ এবং পশ্চিমা দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। উল্লেখ্য সেসময়েই পশ্চিমারা আরব ও মুসলিম বিশ্বের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে শুরু করেছিলো।
বায়তুল মাকদিস:
যে সকল ওসমানি সুলতান ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবদান রেখেছিলেন, সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। তিনি ইহুদিবাদী শক্তির মোকাবেলা করেছিলেন, যারা সে সময় ফিলিস্তিন দখলের অপচেষ্টা করছিলো।
সুলতান আবদুল হামিদ ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসী হওয়া ও জেরুজালেমে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করে প্রথম আইন প্রণয়ন করেন।
সে সময়, সেই আঠারো শতকে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে তাদের বসতি স্থাপনের বিনিময়ে ওসমানি সাম্রাজ্যের সকল ঋণ পরিশোধ করার প্রস্তাব পেশ করেছিলো। আবদুল হামিদ তাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
আনাদুলের ওসমানি ইতিহাসের অধ্যাপক মুহাম্মাদ হরব বলেন:  “সুলতান আবদুল হামিদ ১৮৯০ সালের ২৮ জুন ওসমানি ভূখণ্ডে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করতে নিষেধ করে এবং তাদেরকে তারা যে দেশ থেকে এসেছে সেখানে ফেরত পাঠাতে নির্দেশ দিয়ে রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন।
তিনি আরো যোগ করেন: “ইহুদিরা এই প্রস্তাব (সাম্রাজ্যের ঋণ পরিশোধের প্রস্তাব) পেশ করলে সুলতান আবদুল হামিদ নিজেকে সংবরণ করতে পারেন নি, ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি তাঁর দরবার হতে থিওডর হেরযল এবং প্রধান ইহুদি রাব্বিকে বহিষ্কার করেন (ইহুদিদের পক্ষ থেকে এরা দুজনেই প্রস্তাবটি পেশ করেছিলো)”
 এরপর তিনি লিখেন: “ওয়াশিংটন, বার্লিন, ভিয়েনা, লন্ডন ও প্যারিসের ওসমানি রাষ্ট্রদূতদেরকে নির্দেশ প্রদান করা হয়, যেন তারা জায়নবাদী আন্দোলনের গতিবিধি ও তাদের সম্পর্কে প্রতিবেদন যথাশিঘ্রই সুলতান আবদুল হামিদের নিকট প্রেরণ করেন।”
ইহুদিদের অভিবাসন থেকে রক্ষা করতে আবদুল হামিদ ১৮৭৬ সালে “ওসমানি ভূমি স্মারক” (مذكرة الأراضي العثمانية) শীর্ষক একটি আইনি স্মারক প্রকাশ করেন।
এই স্মারক অনুসারে, সুলতান ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমি, বিশেষত ফিলিস্তিনি ভূমি ইহুদিদের নিকট বিক্রি করতে নিষেধ করেন। এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট প্রস্তুত করেন। এছাড়া ফিলিস্তিন ভ্রমণে আগ্রহী ইহুদিদের জন্য সংক্ষিপ্ত সময় নির্দিষ্ট করে দেন।
হেরযল যখন বুঝতে পারলেন, ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী লক্ষ্যপূরণে সবচেয়ে বড় বাধা সুলতান আবদুল হামিদ, তখন তাকে সন্তুষ্ট করতে এবং ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করতে তিনি কূটনৈতিক উপায়ের আশ্রয় নিতে শুরু করেন।
পুরনো স্বপ্ন:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘণ্টা যখন বেজে ওঠে, তারও আগে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলকে ভালোভাবে ইস্তাম্বুলের সাথে সংযুক্ত করার চেষ্টা করেন।
তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষা খাত এবং যোগাযোগ ও পরিবহন খাতে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো টেলিগ্রাফ এবং রেললাইন। এই সংযুক্তি স্থাপনের ফলে রেল লাইনের পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হয়, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হজযাত্রীদের চলাচল সহজ হয়।
সেসময় হজযাত্রীরা ইস্তাম্বুল থেকে গজে যেতে হলে দুই মাসের কষ্টকর ভ্রমণের মাধ্যমে যেতে হতো, বিভিন্ন কাফেলার সঙ্গী হয়ে। এর মধ্যে আবার বেদুইনদের দ্বারা ডাকাতির শিকার হওয়ার ভয়ও ছিল।
শুরুতে ”হেজাজ রেলওয়ে” প্রকল্পের খরচ ধরা হয়ছিলো চার মিলিয়ন ওসমানি লিরা, ওসমানি সাম্রাজ্যের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিলো না, আবার ইউরোপীয় ঋণ পাওয়াও সম্ভব ছিলো না। ফলে দান-খয়রাতের মাধ্যমে অর্থ জমানো শুরু হয়, সুলতান নিজেই দান করা শুরু করেন। এরপর শাসক পরিবার, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে জনসাধারণও বড় অংকের দান করেন এই প্রকল্পের জন্য।
প্রকিল্পটি শেষ করতে মোট খরচ হয় সাড়ে তিন মিলিয়ন লিরা। ইউরোপীয় কোম্পানীগুলো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যে পরিমাণ টাকা চেয়েছিলো, তার চেয়ে অনেক কম খরচ হয়।
“হেজাজ রেলওয়ে” ইস্তাম্বুলকে দামেশক হয়ে মক্কা শরিফ, মদিনা শরিফ ও ইয়েমেনের সাথে সংযুক্ত করে। ১৯০০ সালে দামেশক থেকে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। চার বছর পর ৪৬০ কি.মি রেল লাইন তৈরি হয়। তখন জর্দানের মআন শহর পর্যন্ত রেললাইন পৌছে। একইভাবে ফিলিস্তিনের হিফা শহরও সংযুক্ত হয় ইস্তাম্বুলের সাথে। ১৯০৮ সালে রেললাইন মদিনা শরিফ পৌছে, সে বছরই রেললাইনের উদ্বোধন হয়, রেললাইনটির দৈর্ঘ হয় মোট ১৪৬৪ কি.মি।
১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট প্রথম রেল যাত্রা শুরু করে। সে রেলগাড়িতে ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি, দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও অতিথিবৃন্দ ছিলেন। ট্রেন যাত্রা শুরু করে ইস্তাম্বুল থেকে, দামেশক হয়ে মদিনা শরিফ পৌছে। ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কি.মি গতিতে ট্রেন চলে, সেসময়ের জন্য এটা অনেক ভালো গতিবেগ ছিলো। নামাজ আদায় কিংবা পাথেয় সংগ্রহ করা ছাড়া ট্রেন থামে নি। মদিনা শরিফ পৌছতে সেবার তিন দিন সময় লেগেছিলো।
এই প্রকল্পের আওতায় ২৬৬৬টি সেতু, সাতটি লোহার সেতু, ৯৬টি রেলস্টেশন, ৩৭টি পানির ট্যাংক, ২টি হাসপাতাল এবং ৩টি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করা হয়।
রেললাইন উদ্বোধনের পর থেকে হিফা ও দামেশকের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান ও যাত্রীদের আসা-যাওয়া হতে লাগলো দৈনিক, আর দামেশক ও মদিনার মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান ও যাত্রীদের যাতায়তে সময় লাগতো তিন দিন। হজের মৌসুমে সফর মাসের শেষ অবধি মদিনা ও দামেশকের মধ্যে তিনটি বিশেষ ট্রেন দেওয়া হতো। অধ্যাপক হরব তার বইয়ে লিখেন, সুলতান বলেছিলেন “নিশ্চয় হেজাজ রেলওয়ে আমার পুরনো স্বপ্ন।
মুসলমানদের একীভূতকরণ:
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ মুসলিম উম্মাহর বিভিন্ন অংশকে “প্যান-ইসলামিজম” এর মাধ্যমে একীভূত করতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যেমে তিনি ইহুদিবাদী ও ফ্রিম্যাসনরি আন্দোলনকে প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন।
আন্তরর্জাতিক রাজনীতিতে প্যান ইসলামিজমের আবির্ভাব হয় আবদুল হামিদ ক্ষমতায় আসার পর। এর উদ্দেশ্য ছিল চিন, ভারত, মধ্য আফ্রিকা থেকে শুরু করে সব জায়গার মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা।
অধ্যাপক মুহাম্মাদ হরব বলেন, “প্যান ইসলামিজমের চিন্তা ছিল মূলত অনেকগুলো লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইসলামের শত্রুদের মোকাবেলা করা, যারা ওসমানি সাম্রাজ্যের প্রশাসন ও রাজনীতির গভীরে প্রবেশ করে ফেলেছিলো, এছাড়া আকেটি উদ্দেশ্য ছিল রুশ ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের সম্মুখে মুসলিম বিশ্বকে একত্রিত করা।
সুলতান আবদুল হামিদের আমলে প্যান ইসলামিজমের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনসমূহের মধ্যে ছিল হেজাজ রেলওয়ে প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার প্রসার, উলামাদের সহযোগিতা, আলেম-উলামা ও সুফি-সাধকদের গুরুত্ব প্রদান, পাশ্চাত্য চাল-চলন ও চিন্তা-চেতনার প্রতিরোধ, ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমিতে পাশ্চাত্য পরিকল্পনার (মূলত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আবাসন স্থাপন) প্রতিরোধ।
দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ১৮৪২ সালে ইস্তাম্বুলে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর ইন্তেকাল হয় ১৯১৮ সালে। তিনি ৩৪ তম ওসমানি খলিফা, সালতানাত ও খেলাফতকে একীভূতকারী ওসমানিদের মধ্যে তিনি ২৬ তম, আর সমগ্র ইসলামের ইতিহাসে তিনি ১১৩তম খলিফা।
আবদুল হামিদ সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুদক্ষ ওসমানি সুলতান হিসেবে পরিচিত, তার সময়ে শিল্প খাতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন হয়েছে, এর বাইরে অনেক রাষ্ট্রীয় ঝামেলার মুখোমুখি তো হতেই হয়েছে। তাকে ওসমানি সাম্রাজ্যের ভূমির ব্যাপারে আগ্রহী শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।
________________________________

এই প্রবন্ধটি সর্বশেষ প্রকৃত ওসমানি শাসক আবদুল হামিদের ১০১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে টার্কপ্রেস, আনাদুল অ্যাজেন্সিসহ বিভিন্ন তুর্কি মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। ছবিসংগ্রহ ও ভাষান্তর করা হয়েছে টার্কপ্রেস থেকে।


Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.