Latest Post



অবিনাশ গদবলে, এশিয়া টাইমস:
আগে থেকেই যেমনটা আশা করা হচ্ছিল, চীন আবারো জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে ভেটো দিয়ে জাতিসংঘের নিষিদ্ধ তালিকায় মাসুদ আযহারকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে একটি রেজুলেশন আটকিয়ে দিয়েছে। নিকট অতীতে এরকম “টেকনিক্যাল হোল্ড” হিসেবে চীনের দেওয়া ভেটোসমূহের মধ্যে এটি চতুর্থ। চীনের এই পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায় যে, সন্ত্রাস ভারতের নিজস্ব জাতীয় সমস্যা এবং চীনের বৈশ্বিক “সন্ত্রাস” নীতি ও তার দক্ষিণ এশিয়া নীতির ফারাক এখনো বহাল আছে।
তাছাড়াও, এমনকি ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশমীরের পুলওয়ামার সন্ত্রাসী হামলা, যাতে প্রায় ৪১ জন মারা গেছেন, তাতেও ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে চীনের অবস্থানে কোন কার্যকর পরিবর্তন আসে নি। এটা থেকে মনে হয় যে উদীয়মান বিশ্ব শক্তি হিসেবে চীনের দায়িত্বশীলতার তুলনায় পাকিস্তানের সাথে “সাগরের চেয়েও গভীর” সম্পর্কই চীনের জাতীয় স্বার্থে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাপী দীর্ঘকাল ধরে চলা সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ”র সময়ে ভারত সুযোগ কাজে লাগাতে পারে নি। ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১ সালের হামলার ফলাফলস্বরূপ আমেরিকা তার শত্রু-মিত্রদের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক তৈরি করতে “সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ” পরিভাষাটি চালু করেছিলো। ভারত এ যুদ্ধকে বিবেচনা করেছিলো আফগান ও ইরাকে বাস্তব ও কল্পিত শত্রুদের বিরুদ্ধে আমেরিকার লড়াই হিসেবে। এ যুদ্ধ চলাকালে আমেরিকা পাকিস্তানকে ন্যাটোর বাইরের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে ব্যবহার করার নীতি অব্যহত রেখেছিল। এমনকি পাকিস্তান আমেরিকার তরফ থেকে ভালো রকমের সহযোগিতাও পেয়েছিল, সেসকল সহযোগিতার কিছু অংশ ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহৃতও হয়েছে, যেমন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সাম্প্রতিকইবমান হামলাতেও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নির্মিত এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হয়েছে।
এখন চীন আছে পাকিস্তানের পাশে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) মাধ্যমে অর্থই নতুন সম্পর্কের মূল কারণ, যেটি কিনা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মূল ফ্ল্যাগশিপ। চীন কর্তৃক প্রতিশ্রুতিকৃত ৬২ মিলিয়ন ডলার হয়তো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দেবে না, কিন্তু এটি পাকিস্তানকে নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কে নতুন বোধ তৈরি করে দেবে। পাকিস্তানের জন্য, কোন বড় শক্তির খদ্দের রাষ্ট্র হয়েও যে সেখান থেকে ফায়দা হাসিল করার সক্ষমতা যে পাকিস্তানের আছে, সিপিইসি তার উদাহরণ। আর চীনের জন্য, সিপিইসি এমন এক জাদুর গুলি, যেটা সে শুধু পাকিস্তানেই তার স্বার্থ হাসিলে সহযোগিতা করবে না, বরং আফগানিস্তান, ভারত সাগর, ইরান এবং অভ্যন্তরীণভাবে জিনজিয়াঙেও নিজ স্বার্থ হাসিল করতে সহযোগিতা করবে।
দিল্লিতে অনেকেই বিশ্বাস করছিলেন যে, জাতিসংঘের ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সে সহসভাপতি হতে চীনকে ভারত যে সহযোগিতা করেছিলো, সেটা মাসুদ আযহারের বিষয়ে চীনের অবস্থান পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে। যাই হোক, এটা এখন স্পষ্ট যে বাস্তবে এরকম হয় নি। ভারতের তরফ থেকে যে ইস্যুতে সবচেয়ে ভালো রকমের দর-কষাকষি চীন আশা করেছিলো, সেটি হলো বিআরআইতে অবশেষে ভারতের যোগদানের ইচ্ছা। কিন্তু ভারত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিআরআই বিরোধীদের পতাকাবাহী হিসেবে তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন। শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, উগান্ডা এবং এশিয়া ও আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ভারতের অবস্থানকে সমর্থন করছে বলে মনে হচ্ছে। কাজেই এই ভিত্তিতে “কোন কিছুর বিনিময়ে অন্য কোন কিছু দাবি করাটা” বাস্তবে অসম্ভব।
তাহলে বর্তমান অবস্থায় ভারতের হাতে বিকল্প কী আছে? ভারতের দিক থেকে একটা বাস্তববাদী জায়গা থেকে যুক্তি দেখানো হতে পারে যে, চীনের আরেকটি ভেটো দানের নীতি জয়শ-এ-মোহাম্মদের বালাকোট ক্যাম্পে ভারতের অগ্রীম প্রতিরক্ষামূলক হামলাকে ন্যায্য প্রমাণ করে। কাউকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়ার বা নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে জাতিসংঘের যে প্রক্রিয়াটি রয়েছে তা আসলে ভেঙে পড়েছে এবং কেবলমাত্র বড় শক্তিধরদের স্বার্থ রক্ষা করছে।  

________________________________

এশিয়া টাইমসে “Depth of Chinas ties with Pakistan costs Indiaশিরোনামে প্রকাশিত নিবন্ধের আংশিক বাংলা অনুবাদ। ছবি: এশিয়া টাইমস থেকে সংগৃহীত।



মিনজিন পেই, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাটিকে নয়া ঠাণ্ডা যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করাটা সুবিধাজনক। এখনো এই ঠাণ্ডা যুদ্ধের বাস্তবতা যদিও পুরোপুরি বোধগম্য নয়, তবে সুস্পষ্ট একটি বিষয়কে অস্পষ্ট রাখার কোন মানে নেই, তা হলো এই ঠাণ্ডা যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের ঠাণ্ডা যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিংশ শতাব্দির ঠাণ্ডা যুদ্ধ দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোটের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থা তৈরি করেছিল। তার বিপরীতে মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমন দুটি অর্থনীতি মুখোমুখি হয়েছে, যে দুটি অর্থনীতি একে অপরের সাথে খুব ঘনিষ্টভাবে জড়িত, আবার বাকি বিশ্বের সাথেও উভয় অর্থনীতিরই রয়েছে ঘনিষ্ট সম্পর্ক। এজন্য বর্তমান ঠাণ্ডা যুদ্ধের চুড়ান্ত লড়াইটা দক্ষিণ চীন সাগর বা তাইওয়ানে না হয়ে বরং অর্থনৈতিক (বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ প্রভৃতি) ক্ষেত্রেই হবে।
কয়েকজন মার্কিন কৌশলগত চিন্তাবিদ স্বীকার করে নিয়েছেন, এবং এখন যুক্তি দেখাচ্ছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ঠাণ্ডা যুদ্ধে জিততে চায়, তবে অবশ্যই চীনের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে হবে, এবং অন্যান্য মিত্রদেরকেও এমনটি করার জন্য চাপ দিতে হবে। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক যুদ্ধ যেভাবে চলছে, তাতে এটা করার তুলনায় বলা অনেক সহজ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উক্তি “জয় করা সহজ”-এর বিপরীতে এ যুদ্ধে ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, কাজেই উত্তেজনা বৃদ্ধির আগে ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার চিন্তা করা দরকার।
যদি যুক্তরাষ্ট্র তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে অর্থনৈতিক বিচ্ছেদের খরচা বহন করার জন্য লড়াই করেও, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মিত্রই এরকম করতে চাইবে না। তার কারণ তারা চীনের তরফ থেকে এই মুহূর্তে কোন ধরনের নিরাপত্তা হুমকি অনুভব করছে না। চায়না টেলিকম জায়ান্ট হুওয়াওয়ের বিরুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসী অবস্থানের বিষয়ে মিত্রদের সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে নীরবতার বিষয়টি তো স্পষ্টই।
এখন পর্যন্ত চীন বিরোধী ক্যাম্পেইনের আওতায় কানাডাতে হুওয়াওয়ের সিইও মেং ওয়ানজাহু কারাবন্দী হয়েছেন এবং কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা ও মার্কিন প্রযুক্তি চুরির অভিযোগে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন তার মিত্রদের আরো আহ্বান জানিয়েছেন যাতে হুওয়াওয়েকে ওয়্যারলেস মিত্রদেশগুলোর ওয়্যারলেস কম্যুনিকেশন নেটওয়ার্কের বাইরে রাখা হয়। অথচ এই হুওয়াওয়েই পরবর্তী প্রজন্মের ৫জি মোবাইল টেকনলোজির বৈশ্বিক নেতৃত্বদানকারী প্রতিষ্ঠান।
পশ্চিমা দেশগুলোতে ৫জি নেটওয়ার্ক প্রস্তুতের দায়িত্ব হুওয়াওয়ের উপর ন্যস্ত করার বিরোধিতার বিষয়টি বেশ শক্তিশালী। চীনা কোম্পানিগুলোর উপর চীনের অবাধ ক্ষমতা রয়েছে। হুওয়াওয়ের ৫জি প্রযুক্তিও এর বাইরে নয়। ফলে এক্ষেত্রে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রশ্ন রয়েছে। যেসকল দেশ ৫জি প্রযুক্তির ব্যয়বহুল সরঞ্জামাদি ক্রয় করার সামর্থ রাখে না (এবং চীনা আধিপত্য নিয়ে তাদের খুব একটা উদ্বেগ নেই), তারা হয়তো এ ঝুঁকি নিতেই পারে। কিন্তু আমেরিকার ধনী মিত্রদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এরকম নয়।
এখন অবধি অস্ট্রেলিয়া আর নিউ জিল্যান্ডই কেবল হুওয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করার মার্কিন দাবির প্রতি সম্মতি জানিয়েছে। যেখানে কিনা কানাডা তাদের সাথে যোগ দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা করছে, ইউরোপীয় দেশসমূহ ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্পর্ধা দেখাচ্ছে, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা হয়তো হুওয়াওয়েকে তাদের ৫জি নেটওয়ার্ক নির্মাণের কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ দিতে পারে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতও হুওয়াওয়েকে বের করে দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মানতে চাচ্ছে না।
নিরাপত্তাজনিত জটিলতা সত্ত্বেও হুওয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করলে ৫জি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি ও উল্লেখযোগ্য বিলম্ব হতে পারে। এখনো যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদেরকে দোদুল্যমান মিত্রদেরকে এই বিলম্ব বা ব্যয়বৃদ্ধির জন্য কোন ক্ষতিপূরণ কিংবা পুরস্কার দেওয়ার আশ্বাস দেয় নি।
নয়া ঠাণ্ডা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে যে সকল বিষয় মোকাবেলা করতে হবে, এগুলো তার মধ্যে অন্যতমযদিও এখনো আমেরিকাই এখনও উপরের দিকে চলে আসার সুযোগ বেশি, কিন্ত বিজয়ী হওয়াটা খুব সস্তা হবে নাএই লড়াইয়ে ভালো অবস্থায় থাকতে হলে চায়নাকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা খুবই প্রয়োজনীয়কিন্তু এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু নিজের ব্যয়টাই যে বহন করতে হবে, বিষয়টা কিন্তু তা নয়। বরং তার মিত্রদের ব্যয়বৃদ্ধির ক্ষতিপূরণও দিতে হবে তাকেই। আর না হলে মিত্ররা তার কথা শুনবে কেন?
বিজয় যে খুব দ্রুত চলে আসবে, তা কিন্তু নয়। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের বিরুদ্ধে স্বল্পকালী সাফল্য অর্জনের জেদ ধরে রাখে, তাহলে তো নয়ই। স্বল্পকালীন সাফল্য অর্জনের প্রচেষ্টার উদাহরণ হিসেবে বলা যায় বিশাল পরিমাণের সয়াবিন ও নানা এনার্জি পণ্য ক্রয় করতে চাপ প্রয়োগ করে চীনের অঙ্গীকার আদায়। এসব পদক্ষেপ পদ্ধতিগত পরিবর্তনে বাধার সৃষ্টি করবে, যে ধরনের পরিবর্তন হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেরকে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে সহযোগিতা করতে পারতো। এরকম সুবিধাবাদিতা চীনকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সদিচ্ছার বিষয়ে মিত্রদেরকে সন্দেহে ফেলে দেবে, তাদের মনে এই ভয় ঢুকে পড়তে পারে যে তারা কোন ফায়দা ছাড়া অযথাই স্বল্পকালীন উচ্চব্যয়ের বোঁঝা নিজেদের কাঁধে চাপাচ্ছে।
এর মাঝে ট্রাম্প প্রশাসন আবার তার মিত্রদের অর্থনৈতিক স্বার্থের ব্যাপারে কম গুরুত্ব দিচ্ছে, যা কথা-বার্তায় স্পষ্ট হয়ে পড়ছে। স্টিল এবং অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে যে শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন, এর ফলে প্রধানত মার্কিন মিত্ররাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এখন আরো বেশি করার ভয় দেখাচ্ছে, ইউরোপীয় ও জাপানি অটোমোবাইলের উপরও শুল্ক বৃদ্ধির কথা বলছে। ট্রাম্প তার মিত্রদের নিকট থেকে দাবি করতে চাচ্ছেন যে মিত্রদেশে স্থাপিত মার্কিন সামরিক ঘাটির জন্য সেসকল দেশকে পূর্ণ খরচ এবং তার সাতে আরো ৫০% খরচ প্রদান করতে হবে।
ট্রাম্পের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে শুধু মিত্রদের প্রতি বিশ্বস্থতারই অভাব নয়, বরং তার টেকসই পরিকল্পনারও অভাব রয়েছে, আমেরিকার নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির কথা বাদই দিন। স্মর্তব্য যে, ট্রাম্প সাহেব হোয়াইট হাউসে প্রবেশের সাথে সাথেই ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারিত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। এটি একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, যেটি বিশেষত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে গঠিত।
চীনের বিরুদ্ধে নয়া ঠাণ্ডা যুদ্ধ কোন আদর্শ, এমনকি কোন যুদ্ধাস্ত্র দিয়েও জয় করা যাবে না, বরং েএর জন্য অর্থনৈতিক বিস্তার প্রয়োজন, যা ভূরাজনৈতিক লড়াইর কাজ দেবে। আর এখানে শুধুমাত্র আমেরিকার ইচ্ছা অনুসারে কাউকে অস্ত্রসজ্জিত করাটাও যুদ্ধ জয়ের কৌশল হবে না। এ চিন্তা থেকে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের মিত্রদের উপর নানা ধরনের বোঝা আরোপ করে নিজেকে কার্যকররূপে নিরস্ত্রীকরণ করছে।
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “The High Costs of the New Cold War” শিরোনামে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত, ছবি প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে সংগৃহীত। লেখক ক্ল্যারমন্ট ম্যাককেনা কলেজের অধ্যাপক, এবং মার্কিন-চীন সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ।



মেহদি হাসান, দ্য ইন্টারসেপ্ট:
একটা প্রশ্ন কয়েক মাস থেকে আমাকে ভাবাচ্ছে, ট্রাম্প ২০২০ সালের নভেম্বরে যদি পরাজিত হন, অথবা তার আগে অভিশংসনের মুখোমুখি হন, কিন্তু গদি ছাড়তে অস্বীকার করেন, তাহলে কী হবে?
গত সপ্তাহে আমরা আবিষ্কার করলাম যে এই প্রশ্নটি ট্রাম্পের সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবীকেও ভাবাচ্ছে। মাইকেল কোহেন সাহেব হাউস অভারসাইট কমিটিতে তার সমাপনী মন্তব্যে অপ্রত্যাশিত এই বিষয়টি সামনে আনেন: “আমি আশঙ্কা করছি, যদি তিনি (ট্রাম্প) ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে যান, তাহলে কখনোই শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর হবে না। আর এ কারণেই আমি আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।”
একটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার, সেই ১৮০১ সালে প্রথম এক দল থেকে আরেক দলের হাতে ক্ষমতার হাতবদলের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে সবসময়ই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর বিপরীত কোন নজির নেই। এক্ষেত্রে ১৮৭৭ সালের বিষয়টি স্মরণ করা যেতে পারে, এবং অবশ্যই ২০০০ সালের জর্জ ডব্ল্যু বুশ বনাম আল গোরের বিষয়টিও স্মরণীয়, সবসময়ই নির্ধারিত প্রক্রিয়া ঠিকটাক মতো কাজ করেছে। এমনকি রিচার্ড নিক্সনের কথাও যদি বলা হয়, যার সাথে ট্রাম্পকে প্রায়ই তুলনা করা হয়, ডেমক্র্যাটদের তরফ থেকে ভোট কারচুপির অসংখ্য অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ছিল, তা সত্ত্বেও পরাজিত হওয়ার পর তিনি জন এফ. কেনেডিকে মেনে নিয়েছিলেন। তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে বলেছিলেন, “আমাদের ক্যাম্পেইন যত কঠিনই হোক না কেন, নির্বাচনের ফলাফল যত কাছাকাছিই হোক না কেন, যারা পরাজিতে হয়, তারা রায় মেনে নেয়, এবং যারা বিজয়ী হয়েছে তাদেরকে সহযোগিতা করে।১৯৮১ সালে রোনাল্ড রিগ্যানের নিকট “নিয়মানুসারে কর্তৃত্ব হস্তান্তর” করা যুক্তরাষ্ট্রে একটি অলৌকিক বিষয়ই ছিল, বলা চলে।
যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ তম রাষ্ট্রপতি এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনৈতিক, আইনী অথবা সাংবিধানিক কোন নিয়ম-কানুনের প্রতি তার কোন ভ্রুক্ষেপ নাই; তার এক মাত্র চিন্তা হলো সব কিছুর বিনিময়ে হলেও বিজয়ী হওয়া, জিতে আসা। ২০১৬ সালে যখন তিনি নির্বাচনী দৌড়ে ছিলেন, তখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ফলাফল যাই হোক সেটা মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করতে তিনি অস্বীকার করেন। বিজয়ের পরও তিনি ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেন, “যদি মিলিয়ন মিলিয়ন অবৈধ ভোটের হিসাব বাদ দেওয়া হয় তাহলে আমি কিন্তু পপুলার ভোটেও জিতেছি।”  ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি হাস্যকরভাবে দাবি করেন যে, রিবাপব্লিকানরা হেরেছে “সম্ভাব্য অবৈধ ভোটসমূহের” কারণে, অনেকেই তাদের পোশাক পরিবর্তন করে একাধিকবার ভোট দিয়েছে, এবং ফ্লোরিডার সিনেট ও গভর্নর নির্বাচনে ডেমক্র্যাটরা “চুরির” চেষ্টা করেছে বলে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করেন তিনি।
ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ইতোমধ্যে সূচনা করেছেন। একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আইন, প্রথা ও নিয়ম-কানুন লঙ্ঘন করেছেন, তিনি যে সংবিধানের আর্টিকেল ২, সেকশন ১ এর প্রতি একই আচরণ করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? (যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংক্রান্ত বিধি-বিধান আছে-অনুবাদক)
এই দৃশ্যটি কল্পনা করুন: ৩ নভেম্বর, ২০২০ সালের সকালে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে ট্রাম্প ডেমক্র্যাটিক প্রার্থীর (সে যেই হোক) নিকট পপুলার এবং ইলেক্টরাল কলেজ ভোট, উভয়টিতে হেরে গেছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিজয়ী প্রার্থীকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে বরং তার সমর্থকদের সমাবেশে অংশ নিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে বসলেন, এবং জনতার উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমরা যা দেখছ, এবং যা পড়ছ, বাস্তবে তা হয়নি,” জোর গলায় বলে উঠলেন “ফেক নিউজ”, এবং দাবি করলেন যে, “মিলিয়ন মিলিয়ন” মানুষ ডেমক্র্যাটদের জন্য অবৈধভাবে ভোট দিয়েছে। তিনি একটি “ডিপ স্টেট” অভ্যুত্থানকে দোষারোপ করলেন, এবং “সহিংসতার” জন্য সতর্কতা জারি করলেন।
আপনি কি আসলেই মনে করেন, এটা সম্ভব নয়? এই সম্ভাব্য দৃশ্যকল্পটি কি আমাদেরকে ভীত করে তুলে না?
সব কিছুর পর, ইনি এমন একজন মানুষ যিনি ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর কিন্তু পপুলার ভোটে পরাজিত হওয়াটাকে মেনে নেন নি। তাহলে আমরা কীভাবে ধারণা করবো যে তিনি যে নির্বাচনে পরাজিত হবেন, সে নির্বাচনের ফলাফল তিনি মেনে নেবেন? এমনকি মঙ্গলবারেও কেলিঘ মেকইনানি, ট্রাম্পের আগামী নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের প্রেস সচিব একটা বিবৃতি টুইট করেছেন, “হতাশ ডেমক্র্যাটরা জানে, তারা ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হারাতে পারবে না... বৈধভাবে তাদের জেতার সুযোগ একেবারে শূন্য।”

কেন এই দুশ্চিন্তা

মনে রাখা দরকার, ট্রাম্প ২০২০ সালের নির্বাচনে অন্যায় আপত্তি তুলতে পারেন এবং পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করতে পারেন, এবং এসব করেও পার পেয়ে যাবেন বলে ধারণা করতে পারেন, এ ধারণার পিছনে অনেকগুলো কারণ আছে।
প্রথমেই তার ব্যক্তিত্বের কথা চলে আসে। ট্রাম্প একজন মারাত্মক নার্সিসিস্ট (আত্মপ্রেমী), যিনি শুধু নিজেকে গুরুত্ব দেন, সবার এবং সবকিছুর উপর নিজেকে অগ্রাধিকার দেন। মর্যাদা ও অবস্থান রক্ষার স্বার্থে নিজের প্রেসিডেনশিয়াল ক্ষমতার ব্যবহার ও অপব্যবহার করা তার কাছে “খুবই লোভনীয়” মনে হতে পারে, ইয়ালে স্কুল অব মেডিসিনের ফরেন্সিক মনোবিজ্ঞানী ও ২০১৭ সালে প্রকাশিত The Dangerous Case of Donald Trump: 27 Psychiatrists and Mental Health Experts Assess a President.বইয়ের সম্পাদক অধ্যাপক ব্যান্ডি লির উদ্ধৃতি দিয়ে এমনটা বলা যায়।
অধ্যাপক লি গতমাসে আমার পডকাস্টে বলেন, “যখন আপনি চরম পর্যায়ের “আত্মপ্রেম” (নার্সিজম)-এ ভুগবেন, তখন এটার বিপদ হলো অপমানের সম্ভাবনা দেখা দিলে খুব দ্রুত সহিংসতার আশ্রয় নিতে পারেন, চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন, এমনকি প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগও করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, পদ থেকে সরে গেলে তার জেল হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এখন অবধি তিনি বিচার বিভাগ দ্বারা সুরক্ষিত আছেন। বিচার বিভাগের নির্দেশনা অনুসারে, দায়িত্বরত প্রেসিডেন্ট অভিযুক্ত হতে পারেন না। বুঝতে পেরেছেন? দায়িত্বরত প্রেসিডেন্টের কথা বলা হয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্টের কথা বলা হয়নি। ট্রাম্পের সমর্থক ক্রিস ক্রিস্টি গত সপ্তাহে সিএনএনকে যেমনটা বলেছেন, নিউ ইয়র্কের দক্ষিণাঞ্চলের প্রসিকিউটররা “প্রেসিডেন্ট যখন অফিস ছাড়বেন তখন তার বিরুদ্ধে” মামলা তৈরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাহলে তিনি কেন অফিস ছাড়তে রাজি হবেন?
তৃতীয়ত, ট্রাম্পের এমন অনেক বন্ধু-বান্ধব আছেন যারা তাকে পদে বহাল থাকতে এবং লড়াই চালিয়ে যেতে জোর গলায় উৎসাহ দিবেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অভিশংসনের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে ট্রাম্পের বন্ধু রোগার স্টোন জবাব দিয়েছিলেন, “আপনি দেশে তীব্র সহিংসতা দেখতে পাবেন, এবং এমন বিদ্রোহ দেখতে পাবেন, যা ইতোপূর্বে কখনোই দেখেন নি।”
২০১৭ সালের ডিসম্বরে স্টোন এবং তার সহকর্মী কট্টর-ডান ষড়যন্ত্র-তাত্ত্বিক অ্যালেক্স জনস যার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশংসা করে বলেছিলেন “চমৎকার” নিজেদের একটি ভিডিও ধারণ করেন এবং সেটি জনের ইউটিউব চ্যানেলে সেটি পোস্ট করেন, যেটি শিরোনাম ছিল: “ট্রাম্প অফিস থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরের গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রোগার স্টোন: লাইভ অটো গানফায়ার।” (Roger Stone Prepares For Civil War After Trump Is Removed From Office: LIVE AUTO GUNFIRE.)
ফক্স নিউজের ব্যাপারে কী বলবেন? আমরা জানি, কট্টর ডান ক্যাবল নেটওয়ার্ক এই রাষ্ট্রপতির উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ভক্সের একটি শিরোনাম উদ্ধৃত করা যেতে পারে “ফক্স নিইজ সরকার-বন্ধ (শাট ডাউন) দাবি করলো, এবং সেটা পেলোও।” ফক্স-এর উপস্থাপকরা অভিযোগ তুলেছেন যে “ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতিত্ব ধ্বংস” করতে “ডিপ স্টেট”  ষড়যন্ত্র হচ্ছে; তারা বলছে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে; এবং বিচার বিভাগকে “হাতকড়া পরানোর” পরামর্শ দিচ্ছে। কেন তারা ট্রাম্পের নিকট নির্বাচনের ফলাফল গ্রাহ্য না করার দাবি তুলবে না এবং তাদের দর্শকদেরকে (পরাজিত) প্রেসিডেন্টকে ফিরিয়ে আনতে বলবে না?
আমরা কি রিপাব্লিকান কংগ্রেস সদস্যদের উপর এই আস্থা রাখতে পারি যে তারা তাদের মেরুদণ্ড পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবেন এবং ট্রাম্পকে জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করবেন? এতোটা হাস্যস্পদ হবেন না।
রিপাব্লিকান ভোটারদের হাল কী? ভালো কথা, তাদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ (৭৫ শতাংশ) মিডিয়ায় ট্রাম্পের উপর আস্থা রাখেন, যেখানে শতকরা ৫২ ভাগ ২০২০ সালের নির্বাচন স্থগিত করার পক্ষে।
জেনারেলরা কি পদক্ষেপ নিবেন? সম্ভবত। কিন্তু সিক্রেট সার্ভিসের প্রতিক্রিয়া আসলে কী হবে?
 আর ডেমক্র্যাটরাই বা কী করবে, যদি ট্রাম্প সাহেব নির্বাচনের পরের কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস ধরে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে তার রাষ্ট্রপতির পদ ব্যবহার করে প্রপাগান্ডা ছড়াতে থাকেন, এবং “ডিপ স্টেট” ও অবৈধ অভিবাসীদের অবৈধ ভোট সম্পর্কে মিথ্যার বেসতি ছড়িয়ে দিতে থাকেন?  শীর্ষস্থানীয় মিডিয়াগুলো কী করবে, তারা কী উভয় কূল রাখার চেষ্টা করবে? অপেক্ষমান গপ (গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি, রিপাব্লিকান পার্টিকে এ নামে অভিহিত করা হয়, ট্রাম্প এই দল থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।-অনুবাদক) স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সাহস কি তাদের আছে?
এই কয়েকটি প্রশ্ন অন্ততপক্ষে এখনই উত্থাপিত হওয়া দরকার এমনকি যদিও এসকল প্রশ্নের কোন সুস্পষ্ট উত্তর হয়তো এখনো পাওয়া যাবে না। আমাদের উচিত কোহেন সাহেবের কথা শুনা। এটা কোন চুক্তি নয়, আর এমনটা বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই যে ট্রাম্প পরাজিত হলে তিনি নীরবে প্রস্থান করবেন। বরং উল্টো একথা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে তিনি ও তার মিত্ররা মিলে হিস্টিরিয়ার সৃষ্টি, এমনকি সহিংসতাও করতে পারেন।যারা অন্য কোন কিছু কল্পনা করছেন, তারা আসলে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
________________________________

মেহদি হাসান বিখ্যাত সাংবাদিক ও করামিস্ট, সম্প্রতি আল জাজিরার হেড টু হেড অনুষ্ঠানের কারণে তিনি বাংলাদেশে বহুল পরিচিতি লাভ করেছেন। বর্তমান প্রবন্ধটি তিনি দ্য ইন্টারসেপ্ট-এ লিখেছেন। মূল নিবন্ধের শিরোনাম “Yes, Lets Defeat or Impeach Donald Trump. But What IfHe Refuses to Leave the White House?”। নিবন্ধটি দ্য ইন্টারসেপ্টের ওয়েবসাইটে চলতি মার্চ মাসের ৬ তারিখ প্রকাশিত হয়। ছবি: দ্য ইন্টারসেপ্ট থেকে সংগৃহীত। ছবিসূত্র: Dominick Reuter/AFP/Getty Images
লেখকের ইমেইল: mehdi.hasan@theintercept.com
টুইটার: @mehdirhasan


আল জাজিরা আরবি প্রতিবেদন:
আল জাজিরার আফগানিস্তান প্রতিবেদক আফগান তালেবানের একটি সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছেন যে, তালেবান ও মার্কিন প্রতিনিধি খলিল জাদের মধ্যে কাতারের রাজধানী দুহায় অনুষ্ঠিত সংলাপের ষষ্ঠ পর্বের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ।
মঙ্গলবারে শেষ হওয়া মার্কিন-তালেবান আলোজনায় “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এমন বিবৃতি প্রকাশের পর তালেবানের সূত্র থেকে এরকম খবর পাওয়া গেলো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে খোলাসা করা হয়েছে যে চারটি মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ার পরই শান্তিচুক্তি প্রণীত হবে এই চারটি বিষয়ের মধ্যে আছে সন্ত্রাস দমন।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবার্ট প্যালাদিনো বলেন- “তালেবান এ বিষয়ে রাজি হয়েছে যে, উভয় পক্ষ শিগগিরই চারটি ইস্যুসহ শান্তি চুক্তি পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করবে, সে চারটি ইস্যু হলো: সন্ত্রাস দমনের নিশ্চয়তা, সেনা প্রত্যাহার, আফগানিস্তানে অভ্যন্তরীণ সংলাপ, এবং সর্বাত্মক যুদ্ধ বিরতি।
তিনি আরো যোগ করেন যে, মার্কিন প্রতিনিধি খালিল জাদ পরামর্শের জন্য শিগগিরই ওয়াশিংটনে প্রত্যাবর্তন করবেন।

শান্তিচুক্তির শর্ত:

দুই সপ্তাহব্যাপী সংলাপ শেষে খলিল জাদ টুইটারে লিখেন: “দুহায় তালেবানদের সাথে সংলাপের ম্যারাথন দৌড়ের আরেক পর্ব শেষ করলাম। শান্তিচুক্তির শর্তসমূহ ভালোই ছিল। স্পষ্টতই, উভয়পক্ষই যুদ্ধের সমাপ্তি চায়। গ্রহণ-প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও, আমরা বিষয়টাকে সঠিক পথের উপর অবশিষ্ট রেখেছি, এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।”
সংলাপে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। আরেকটি ইস্যু গুরুত্ব পায়, আর তা হলো, তালেগান যে আফগানিস্তানের মাটি ভবিষ্যতে সন্ত্রাসী আক্রমণের জন্য ব্যবহার করতে দেবে না, তার নিশ্চয়তা। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের হামলার পর থেকে এটি আমেরিকার অন্যতম অগ্রাধিকার মূলনীতি।
তালেবানের মুখপাত্র নিশ্চিত করেন, “উভয়পক্ষের মধ্যে অগ্রগতি হয়েছে।” তিনি আরো  যোগ করেন, “বর্তমানে প্রত্যেক পক্ষ আলোচনার অগ্রগতিসমূহ চিহ্নিত করে তাদের নেতৃত্বের নিকট উপস্থাপন করবে, এবং শিগগিরই সংলাপের পরবর্তী পর্বে অংশগ্রহণ করবে।”

ঐকমত্য ও প্রত্যাশা:

যদিও আফগান সরকার এ সংলাপে অংশগ্রহণ করেনি, তবে সরকারের পক্ষ থেকেও অগ্রগতি অর্জনের জন্য আনন্দ প্রকাশ করা হয়েছে।
আফগান রাষ্ট্রপতির মুখপাত্র হারুন শাখানসুরি বলেন “আশা করি, দীর্ঘ কাল থেকে প্রত্যাশিত তালেবানের সাথে যুদ্ধবিরতির জন্য চুক্তির স্বাক্ষী হবো আমরা। আর শিগগিরই তালেবান ও আফগান সরকারের সরাসরি সংলাপ শুরু হওয়ার ব্যাপারেও আমারা আশাবাদী।
তবে তালেবানের মুখপাত্র একটি বিবৃতিতে বলেছেন যে, যুদ্ধ বিরতি কিংবা ভবিষ্যতে কাবুল সরকারের সাথে সংলাপের বিষয়ে কোন ঐকমত্য এখনো হয়নি। উল্লেখ্য সরকারের সাথে সংলাপের বিষয়টি তালেবান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে। তাদের অভিযোগ, এই সরকার ওয়াশিংটনের হাতে “জিম্মি’। (কাজেই সরকারের সাথে সংলাপ নয়, বরং সংলাপ হবে ওয়াশিংটনের সাথে।)
 তালেবান মুখপাত্রের এ কথা মার্কিন প্রতিনিধির কথার সাথে কিছুটা বিরোধপূর্ণ। খলিল জাদ বলেছেন, “সৈন্য প্রত্যাহার ও সন্ত্রাস দমনের বিষয়ে মৌলিক ঐকমত্যের পরপরই, তালেবান ও অন্যান্য আফগান পক্ষ এর মধ্যে সরকারও আছে শিগগিরই নীতিনির্ধারণ ও পূর্ণ যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সংলাপে বসবে।”
 উল্লেখ্য যে, গত মঙ্গলবার বিকেলে সংলাপের যে পর্বটি শেষ হয়েছে, তাতে মোট ষোল দিনে সময় লেগেছে, দুইপক্ষের অবিরত আলোচনার এটিই সর্বোচ্চ সময়সীমা।

________________________________

প্রতিবেদনটি আল জাজিরা আরবিতে “طالبان وواشنطن تتفقان على موعد جولة جديدة للتفاوض بالدوحة” শিরোনামে প্রকাশিত। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত। ছবি আল জাজিরা থেকে সংগৃহীত।



ফ্রান্সিসকো টর, ওয়াশিংটন পোস্ট:
ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি যারা পর্যবেক্ষণ করছেন তারা দেশটির দীর্ঘমেয়াদী “পতন” সম্পর্কে কথাবার্তা বলছেন। তারা মূলত ‘পতন’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করছেন, এর দ্বারা তারা বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত পরিসংখ্যান, যেমন তেল উৎপাদনের পরিমাণের দ্রুত অবনমন, শিশু মৃত্যুহার বৃদ্ধি, আকাশছোয়া দ্রব্যমূল্য ইত্যাদি বোঝাতে চাচ্ছেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে “পতন” আক্ষরিক অর্থেই “পতন”র দিকে মোড় নিচ্ছে, কারণ দেশব্যাপী বিদ্যুৎহীনতা (ব্ল্যাক আউট) দেশটিকে নিশ্চল করে ফেলেছে। বিদ্যুৎ না থাকার ফলে একবিংশ শতাব্দির জীবনশৈলীর একেবারে মৌলিক বিষয়গুলো মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
এমনিতেই গুরুতর মানবিক সংকটে ক্লান্ত একটি দেশের বৈদ্যুতিক গ্রিডের পতন চুড়ান্ত বিপর্যয়ের রূপ ধারণ করেছে। ভেনিজুয়েলাবাসী এমনিতেই দীর্ঘকাল ধরে ক্ষুধার্ত, একটি বড় সংখ্যক মানুষ জানাচ্ছেন যে তাদের শরীরের ওজন কমেছে, কারণ তারা পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। খাবারের এরকম স্বল্প সরবরাহ থাকা অবস্থায় বিদ্যুৎ না থাকাটা শুধু সামান্য কোন অসুবিধা নয়: এ পরিস্থিতিতে খাবার ফ্রিজে রাখতে না পারলে জীবন হুমকির মুখে পড়বে।
দেশটির বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সংবাদসমূহ খুবেই মর্মভেদী। খুব কম হাসপাতালেই জেনারেটর কাজ করছে, এবং বলতে গেলে কোন হাসপাতালেরই কয়েক দিন ধরে জেনারেটর দিয়ে পুরো হাসপাতাল চালানোর সক্ষমতা নেই। একটি শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একজন সেবিকা হস্তচালিত পাম্প ব্যবহার করছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার কিডনি ডায়ালিসিসের রোগী সেবাগ্রহণ করতে না পারার দরুণ ধীরে ধীরে মর্মান্তিক মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন।
অর্থনীতি একেবারেই চলছে না। অতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতির কারণে ভেনিজুয়েলায় ক্রমশ কাগজের মুদ্রার ব্যবহার কমে যাচ্ছে: ভেনিজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় বড় গোষ্ঠীগুলোর বিলসমূহের সাথে কোনভাবেই সামঞ্জস্য রক্ষা পারছে না। ফলে বেশির ভাগ বড় অংকের টাকা আদান-প্রদান ইলেক্ট্রনিক উপায়ে হচ্ছে, কয়েক বছর ধরে ডেবিট কার্ড ও ভেনমো-জাতীয় আদান-প্রদান টাকা আদায়ের একমাত্র কার্যকর উপায়ে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ না থাকার ফলে, আক্ষরিক অর্থেই টাকার নাগাল পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক কার্যক্রম অব্যহত রাখার একমাত্র বাস্তব উপায় হলো বৈদেশিক মুদ্রায় আদান-প্রদান করা। প্রধানত মার্কিন ডলার ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে ইউরো এবং কম্বোডিয়ান পেসো অথবা অন্য যেকোন মুদ্রাও ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা বেশির ভাগ ভেনিজুয়েলাবাসীর নাগালের মধ্যে নেই।
এবং সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থাও একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ বর্তমানে বেশির ভাগ ল্যান্ডফোন, সেলুলার ও ইন্টারনেট কানেকশন অকার্যকর হয়ে গেছে। কারাকাসের লোকজন এদিক-সেদিক গাড়ি চালাতে থাকে মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাওয়ার আশায়। কখনো, খুব ব্যতিক্রম হিসেবে, যদি নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় তবে বিদেশে অবস্থানরত আত্মীয়স্বজনদেরকে এসএমএস ও হোয়াটসঅ্যাপস মেসেজ পাঠানোর জন্য অনেকগুলো গাড়ি নিয়ে লোকজন একত্রিত হয়।
বেশির ভাগ মানুষের নিকট বহির্বিশ্বের যেন কোন অস্তিত্বই নেই। সরকার স্বাধীন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, মাদুরো সরকার বিদ্যুৎ সংকটের জন্য মার্কিন নাশকতাকে দায়ী করছে।
মিলিয়ন মিলিয়ন ভেনিজুয়েলান, যারা দেশটির অসংখ্য অব্যবস্থার কারণে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, গত কয়েক দিনের অভিজ্ঞতার ভয়াবহতায় তাদের চুল খাড়া হয়ে যাওয়ার জোগাড়। অনেকের জন্যই দেশে অবস্থানরত তাদের ভালোবাসার মানুষটির সাথে যোগাযোগ করা একেবারেই অসম্ভব। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দেখা দিয়েছে, কারণ বেশির ভাগ পরিবারের উপার্জনক্ষম তরুণ সদস্যটি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, যাতে বিদেশে ভালো চাকুরি করে দেশে অবস্থানরত পরিবারের সদস্যদের নিকট টাকা পাঠাতে পারেন। তার মানে দেশে যারা রয়ে গেছেন, তাদের বেশির ভাগই দুর্বল: বৃদ্ধ, অসুস্থ ও শিশু। বিদ্যুৎহীনতা তাদেরকে দুই ধরনের বিপদে ফেলেছে, তাদের পরিবারের সক্ষম মানুষটি তাদেরকে সাহায্য করার জন্য পাশে নেই, আবার বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বিদেশ থেকে পরিবারের সদস্যদের জন্য টাকা পাঠানোও সম্ভব হচ্ছে না।
বিষয়টি একটু স্পষ্ট করা দরকার, মার্কিন নাশকতার অভিযোগের আসলে গ্রহণযোগ্যতার অভাাব রয়েছে। কারণ ভেনিজুয়েলার বৈদ্যুতিক গ্রিড প্রায় এক দশক থেকে ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। উৎপাদনের চেয়ে চাহিদা অতিরিক্ত হওয়ার কারণে ছোট ছোট শহরসমূহে গত কয়েক বছর ধরে প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকে না। ছয় থেকে আট ঘণ্টার লোডশিডিং তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। তবে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ ফিরে আসতো।
কিন্তু ব্ল্যাক আউটের পরিস্থিতি পুরো ভিন্ন। কী হয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আমরা পাই নি, তবে কিছু সূত্রে জানা যায় যে, বৈদেশিক ক্ষেপণাস্ত্র কোন একটি হাই ভোল্টেস প্রধান লাইন বন্ধ করে ফেলেছে, যার ফলে পুরো সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলাফলস্বরূপ শুধু স্থানীয় পর্যায়ে ব্ল্যাক আউট হয় নি, বরং সারা দেশের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সপ্তাহান্তে কারকাসের কিছু অংশে কিছু বৈদ্যুতিক সেবা পুনরায় চালু করা হলেও সেটা একবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য করা হয়েছে।
কেন? কারণ গত ১২ বছরে সরকার গ্রিড মাটির নিচ দিয়ে স্থাপন করেছে। সকল কোম্পানি জাতীয়করণের পর সরকার পাওয়ার স্টেশন ও ট্রান্সমিশন লাইন রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ করা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারণে ধীরে ধীরে গ্রিডগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ভেনিজুয়েলার প্রকৌশলীরা সতর্ক করছিলেন জরুরি ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়ার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না করলে এরকম কোন কিছু ঘটতে পারে।  
এখন সেটা ঘটেছে। এবং এর ফলে আক্ষরিক অর্থেই ভেনিজুয়েলার পতন হয়েছে, যেটা কয়েক দিন আগেও অকল্পনীয় ছিল।
________________________________

নিবন্ধটি ওয়াশিংটন পোস্টে “Venezuela is truly on the verge of collapseশিরোনামে প্রকাশিত হয়। ছবি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে সংগৃহীত।




বারাক বারফি, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
গত মাসে মিসরের সংসদে সংবিধান সংশোধনের একটি খসড়া সিংহভাগ সংসদ সদস্যের অনুমোদন পেয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসির ২০৩৪ সাল অবধি ক্ষমতায় থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বও এই সংশোধনীর পক্ষে, কারণ এতে মিসরে এক ধরনের স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় থাকবে, আর তাদের মহালাভজনক অস্ত্রের বাজারও থাকবে ঠিকটাক মতো।
সংশোধনটি অনুমোদন করেছেন ৫৯৬ জন সাংসদের মধ্যে ৪৮৫ জন। এতে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ ৪ বছর থেকে ছয় বছর করা হয়েছে, আর সিসিকে অতিরিক্ত আরো দুই বার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য সিসির বর্তমান মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালে। এখন এ খসড়া সংশোধন বাস্তবায়নের জন্য সিদ্ধান্তটিকে গণভোট দ্বারা অনুমোদিত করতে হবে।
সিসি যে প্রেসিডেন্ট পদে থেকে যেতে চাচ্ছেন, তা মোটেও বিস্ময়কর কিছু নয়। ক্ষমতা নিশ্চিত করার স্বার্থে ক্ষমতা গ্রহণের সময় তিনি কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন তিনি “কর্তৃত্বের জন্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী” নন। তিনি শপথ করেছিলেন, “আমি সংবিধানে কোন সংশোধন আনতে যাবো না। ... আইন ও সংবিধান অনুমোদিত সময়সীমার পর কেউই প্রেসিডেন্টের আসনে থাকবে না।” ঠিক যেমনিভাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসনি মোবারক ১৯৮১ সালে সংসদে তার প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, “খোদাই জানেন, আমি কখনোই এই কাজের স্বপ্ন দেখি নি।” অবশেষে ৩০ বছর ২০১১ সালের আরব বসন্তে তিনি তার অবস্থান থেকে অপসারিত হয়েছিলেন!
ফেরাউনদের রাজ্যে রাষ্ট্রপতিরা সাধারণত বিভিন্ন পৌরাাণিক কাহিনী দ্বারা এতোটাই বিমোহিত হন, যে তারা শাসন করার ব্যাপারে তাদের দীর্ঘ মেয়াদী, সদানির্ভুল (তাদের কল্পনায়), এমনকি প্রায় ঐশ্বরিক অধিকারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, হোসনি মোবারক ২০০৩ সালের মধ্যভাগে তার এই মনোভাব দেখিয়েছিলেন। যখন তাকে একজন লেখক প্রশ্ন করেছিলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন আক্রমষ ঠেকানোর জন্য সৌদি আরব ইরাকি স্বৈর শাসক সাদ্দাম হোসনের পদত্যাগ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে কি না, তখন তিনি বলেছিলেন “অসম্ভব!” মোবারক সেদিন ঘোষণা দিয়েছিলেন, “কোন রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে পারে না!”
ঠিক একইভাবে সিসির ফাঁস হওয়া এক অদ্ভুত রেকর্ডিংএ তিনি ঘোষণা করেন যে স্বপ্নে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত তাকে জানিয়েছেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন। অন্য আরেকটি স্বপ্নতে তিনি একটি ধ্বনি শুনতে পান, যেটি তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো, “আমরা তোমাকে এমন কিছু দান করবো, যা আমরা কাউকেই দান করি নি।”
পশ্চিমারা হয়তো এসব দাবিকে উপহাস করবেন, কিন্তু মিসরিরা এগুলোকে বেশ গুরুত্বের সাথে নেয়। (আসলেই? আমার তো মনে হয় ভাড়াটে ভাড়রাই কেবল গুরুত্বের সাথে নেয়, এবং সেটাই ফলাও করে প্রচার করা হয়!-অনুবাদক।) ইহুদি ও ইসলামি মতবাদে স্বপ্নকে নবুওতের নিম্নস্তর বলে বিবেচনা করা হয়। (সত্য বটে ইসলামে এরকম কথা আছে, তবে সেটা এতো সাদামাটা নয়, যেভাবে লেখক বলছেন।অনুবাদক) বাইবেলের আদিপুস্তকে আছে, ইউসুফ আ. ফারাওর স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা করে মিসরকে খরা ও দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করেছিলেন। (কুরআন শরিফেও এই ঘটনা আছে। কিন্তু ইহুদি কিংবা মোসলমান কারো নিকটই নবি কর্তৃক স্বপ্নের ব্যাখ্যা আর সিসির দাবিকৃত স্বপ্ন সমান গুরুত্ববহ হওয়ার কথা নয়।অনুবাদক)
তবে সিসির ঘোষণা দেওয়ার সময়টা স্বপ্ন দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুসারেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১১ সালের বিদ্রোহ পরবর্তী আর্থসামাজিক অস্থিতিশীলতা অবশেষে হ্রাস পেয়েছে। অনেক বছর পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে (যদি এটিই সবকিছু হয়ে থাকে।) গত জুনে শেষ হওয়া অর্থ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫.৩%।
তাছাড়া আইএমএফ ঘোষিত কঠোর মিতব্যয়িতা কর্মসূচি এনার্জি ও খাদ্যখাতে ভর্তুকি কমানোর কর্মসূচি, এমনকি যদি আয় কমে যায় তাহলেও চুড়ান্ত পর্যায়ে পৌছাচ্ছে। অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসার ফলে অর্থনৈতিক আন্দোলনও হ্রাস পাচ্ছে। ইতোমধ্যে শ্রমিক ও ছাত্র আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোরতা এবং আন্দোলনের প্রতি সমাজের অন্যান্য অংশের সমর্থনের অভাবের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে। যদিও মিসরের ক্ষমতা কাঠামো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়, তবে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর কোন ধরনের অভিযোগহীনতা থেকে মনে হয় যে পর্দার আড়ালে সিসি ঠিকই তার অবস্থান শক্তিশালী করছেন।
________________________________



রবার্ট ফিস্ক, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট:
প্রথম যখন আমি খবর শুন, আমি ভেবেছিলাম এটা মনে হয় গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলার খবর। অথবা সিরিয়ার কোন খবর হবে বোধ হয়। এ খবরের প্রথম অংশ ছিল: একটি “সন্ত্রাসী ক্যাম্পে” বিমান হামলা, “একটি নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে, অনেক “সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। একটি সেনাবাহিনী তার সৈন্যদের উপর "সন্ত্রাসী হামলার" প্রতিশোধ নিচ্ছিল, এমনটাই বলা হচ্ছিল।
এক ইসলামি জিহাদি গোষ্ঠীর মূল ঘাটি ধ্বংস করা হয়েছেএরপর আমি শুনতে পেলাম বালাকোট শহরের নাম, এবং বুঝতে পারলাম ঘটনাটি গাজায় নয়, সিরিয়াতেও নয়, এমনকি লেবাননেও নয়, বরং পাকিস্তানে ঘটেছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, কীভাবে কেউ ভারতকে পাকিস্তানের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে?
ভালো কথা, এই ধারণাকে ফ্যাকাশে করে ফেলার দরকার নেই। তেল আবিবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আর নয়া দিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আড়াই হাজার মাইলের দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও এদের উভয়ের কাজে একই রকম ছাপ পাওয়ার পিছনে একটা কারণ আছে।
কয়েক মাস ধরে এভাবেই ইসরায়েল ভারতের বিজেপি সরকারকে সাথে নিয়ে একটি অঘোষিত, অজ্ঞাত, অস্বীকৃত, অনানুষ্ঠানিক এবং রাজনৈতিকভাবে ভয়ঙ্কর “ইসলাম বিরোধী” জোট গড়ে তুলছে, যার ফলে ভারত এখন ইসরায়েলের অস্ত্র বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।
সুতরাং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জয়শ-এ-মোহাম্মদের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে হামলায় ইসরায়েল কর্তৃক নির্মিত স্পাইস-২০০ “স্মার্ট বম্বস” ব্যবহার করার বিষয়টি যে জোরে-সুরে জানাচ্ছিল, তা কোন আকস্মিক ঘটনা নয়।
এরকম লক্ষ্যে আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের আত্মশ্লাঘার মতোই ভারতও আত্মশ্লাঘা অনুভব করছে। কাজেই তাদের সামরিক সাফল্যের চেয়ে কল্পনাই বেশি কাজ করছে। কাজেই ইসরায়েল কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ও সরবরাহকৃত জিপিএস নিয়ন্ত্রিত বোমা দ্বারা “৩০০-৪০০” সন্ত্রাসী নির্মূল থেকে বিষয়টি কয়েকটি গাছ-পাথর নির্মূলে পরিণত হবে সম্ভবত।
কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরে জয়শ-ই-মোহাম্মদ কর্তৃক প্রচণ্ড অ্যাম্বুশ কোন অবাস্তব ঘটনা নয়, এবং সেই অ্যাম্বুশে ৪০ ভারতীয় সৈন্য নিহত হওয়াটাও কোন অবাস্তব বিষয় নয়। অন্তত একটি ভারতীয় বিমান যে গত সপ্তাহে ভূপাতিত হয়েছে, সেটাও কোন অবাস্তব ঘটনা নয়।
২০১৭ সালে ভারত ছিল ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের খদ্দের, ভারতের কাছ থেকে ইসরায়েল বিমান প্রতিরক্ষা, রাডার সিস্টেম, গোলাবারুদ, বিমান বাহিনীর গোলাবারুদ প্রভৃতি খাতে প্রায় ৫৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আদায় করে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের আক্রমণের সময় পরীক্ষা করা হয়।
ইসরায়েল নিজে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নিকট অব্যাহতভাবে ট্যাংক, অস্ত্র নৌকা প্রভৃতি বিক্রির বিষয়ে একটি অজুহাত দাঁড় করাতে চাচ্ছে, যেখানে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিমারা অবরোধ আরোপ করতে চাচ্ছে, রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের নির্মূল করার অভিযোগে। কিন্তু ভারতের সাথে ইসরায়েলের অস্ত্র ব্যবসা বৈধ, উভয়পক্ষই ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে ব্যবসা করছে।
ইসরায়েল নেগেভ মরুভূমিতে তাদের নিজেদের বিশাল কমান্ডো আর ভারতের প্রশিক্ষণার্থী কমান্ডোদেরকে মিশিয়ে রেখেছে। এই অভিজ্ঞতাও ইসরায়েল অর্জন করেছে গাজা এবং অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে।
৪৫টি ভারতীয় সামরিক প্রতিনিধি দলের অংশ অন্তত ১৬ জন ভারতীয় “গারুদ” কমান্ডো একটা সময় ধরে ইসরায়েলের নেভাতিম ও পালমাচিম এয়ার বেজে ছিল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেন ইয়ামিন নেতিনিয়াহু গত বছর তার প্রথম ভারত সফরে ২০০৮ সালে ইসলামি জঙ্গীদের মুম্বাই হামলার কথা স্মরণ করেন, যে হামলায় ১৭০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছিলো। “ভারতীয় ও ইসরায়েলিরা সন্ত্রাসী হামলার কষ্ট খুব ভালো করে জানে,” তিনি মোদিকে বলেন। নেতিনিয়াহু আরো বলেন, “ আমরা ভয়ানক মুম্বাই হামলার কথা স্মরণ করি। আমরা দাঁত কামড়ে ধরে লড়াই করি, কখনোই হাল ছাড়ি না।” বিজেপির বক্তব্যও একই রকম ছিল।  
যদিও অনেক ভারতীয় বিশ্লেষক সতর্ক করে করে বলেছিলেন, ডানপন্থী জায়নবাদ এবং মোদির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জাতীয়তাবাদ কখনোই দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হতে পারে না, যেখানে উভয় দেশই যদিও ভিন্ন উপায়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অতীতে লড়াই করেছে।

ব্রাসেলস ভিত্তিক গবেষক শাইরি মালহত্রা, যার গবেষণাকর্ম ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজে প্রকাশিত হয়েছে, তিনি উল্লেখ করেছেন যে ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের (মূল নিবন্ধে পাকিস্তান বলা হয়েছে, তবে বাস্তবে বাংলাদেশ হবে) পর ভারতে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস, যাদের সংখ্যা ১৮০ মিলিয়নেরও বেশি। গত বছর তিনি লিখেন, “ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কও মূলত ক্ষমতাসীন বিজেপি-লিকুদ পার্টির আদর্শিক মিলের পরিপ্রেক্ষিতেই তৈরি হচ্ছে।
হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা “ঐতিহাসিকভাবে মুসলমানদের হাতে হিন্দুদের নির্যাতিত হওয়ার বয়ান” তৈরি করেছে, যা সেসকল হিন্দুদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় ধারণা, যারা দেশ ভাগ ও তার পরবর্তী পাকিস্তানের সাথে চলমান খারাপ সম্পর্কের কথা মনে রাখে।
আসলে হারেৎজে মালহত্রা যেমনটা উল্লেখ করেছেন, “ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ভক্ত গোষ্ঠী ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে, যারা প্রাথমিকভাবে ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরায়েলিদের আচরণ এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কারণে ইসরায়েলকে ভালোবাসে।
মালহত্রা কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভিভেক দেহেজিয়ার প্রস্তাবের নিন্দা করেন, ভিভেক ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি “ত্রিপক্ষীয়” জোটের প্রস্তাব করেন, কারণ (তার মতে) এ তিনটি দেশই “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ দ্বারা আক্রান্ত।”
বাস্তবে ২০১৬ সালের শেষ অবধি ভারত থেকে মাত্র ২৩ জন আইসিসের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য দেশ ত্যাগ করেছেন, যেখানে বেলজিয়ামে মাত্র অর্ধ মিলিয়ন মুসলমান জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও আইসিসে সে দেশ থেকে প্রায় ৫০০ যোদ্ধা যোগ দিয়েছে।
মালহত্রা তাই মনে করেন, ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক তথাকথিত আদর্শ ভিত্তিক না হয়ে প্রায়োগিক হওয়া উচিত।
কিন্তু জায়নবাদী জাতীয়তাবাদ হিন্দু জাতীয়তাবাদের সাথে মিলবে না, এমনটা আশা করা কঠিন, যেখানে ইসরায়েল ভারতের জন্য প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করছে, তন্মধ্যে সর্বশেষ অস্ত্র পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ইসামপন্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। তার উপর ভারত-ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক চলে আসছে ১৯৯২ সাল থেকে।
________________________________

নিবন্ধটি লিখেছেন বিখ্যাত মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। যুক্তরাজ্যের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা থেকে ভাষান্তর নিবন্ধটির গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ অনুবাদ করেছে। ছবি পাকিস্তানের দ্য ডন পত্রিকা থেকে সংগৃহীত।

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.