Latest Post



জি ভেরফস্টাড, প্রজেক্ট সিন্ডিকেট:
বিনিয়োগ মূলধন এবং আপাতদৃষ্টিতে লাভজনক ব্যবসায়িক চুক্তি খোঁজার ক্ষেত্রে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবসময় ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের সার্বিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে না বিশেষত চীনের সাথে যেকোন বিষয়ে এটি আরো বেশি হয়ে থাকে যদিও একতরফাভাবে চীনের সাথে এরকম সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজেদেরকে এবং বাদবাকি পুরো ইউরোপকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেয়
একথা সত্যি যে চীনের বিষয়ে ইউরোপের সাধারণ অবস্থা এখনো একেবারেই সীমাবদ্ধ অনিঃশেষ ব্রেক্সিট নাটকের বিভ্রান্তি এবং বিগ টেকের কারণে আরোপিত বিপদসমূহের কারণে ইইউ নেতারা অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এখনো পাচ্ছেন না তা সত্ত্বেও, এপ্রিলের ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে এই মাসে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে চীনের বিষয়ে ইউরোপীয় নেতারা তাদের একটি সাধারণ অবস্থান ব্যক্ত করেছেন, সেখানে তারা চীনা প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (বিআরআই) সমর্থন করার বিষয়ে ইতালি সরকারের সিদ্ধান্তের ঝুঁকির উপর গুরুত্ব দিয়েছেন
এই সতর্কতা আসলে কোন গুরুত্ব পায়নি তার পরের দিনই ইতালির লোকরঞ্জনবাদী জোট সরকার চীনা প্রেসিডেন্ট জিকে রোমে স্বাগত জানায় এবং চীনের সাথে একটি সমোঝতা স্মারক স্বাক্ষর করে কার্যত বাদবাকি ইইউর সাথে ভিন্নমত সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করেই দুঃথজনক বিষয় হলো, একতরফাভাবে ইতালি যে বিআরআইতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা চীনের বিপরীতে শুধু ইইউর সামষ্টিক প্রভাবকেই ক্ষুণ্ন করবে না, বরং এর ফলে ইতালির জনগণও ক্ষতিগ্রস্থ হবে
চীনের নেতৃত্বাধীন অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে স্বাক্ষরকারী প্রথম ইইউ সদস্য দেশ ইতালি নয়; তবে ইতালিই সবচেয়ে বড় ইউরোপীয় অর্থনীতি প্রথম জি- সদস্য দেশ বিষয়ে খুব কম সন্দেহ আছে যে ইতালি সরকারের পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট জি অভ্যুত্থান এবং ইউরোপের বিপদের প্রতিনিধিত্ব করে সর্বোপরি বিআরআই মানবজাতির কল্যাণার্থে গৃহীত কোন দাতব্য উদ্যোগ নয় স্পষ্টতই এটি একটি বিদেশ-নীতি প্রকল্প, যা বিশ্বব্যাপী চীনের অর্থনৈতিক ভূকৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সতর্কবাণী অনুসারে বলা যায়, ইতালি সরকার ইতালির জনগণের কোন উপকার নিশ্চিত না করেই চীনেরপ্রতারণামূলক বিনিয়োগ পদ্ধতিকে বৈধতা প্রদানকরার পথে আছে
জি মার্চ ২২-২৪ তারিখের সফরের সময়টা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় সম্প্রতি ব্রেক্সিটের সময়সীমা বৃদ্ধি করার পূর্বে ২৯ মার্চে যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার কথা ছিল ব্রেক্সিট এবং মে মাসে আসন্ন ইউরোপীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে ইউরোপীয় নেতার পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আছেন ইউরোপীয় সরকারগুলোর নিকট থেকে চীনা বিনিয়োগের (বলা যায়, যা মূলত উচ্চ শর্তসাপেক্ষ ঋণ) প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্য এর চেয়ে ভালো সময় আর হতে পারে না
সৌভাগ্যবশত ইতালি সরকারের অজ্ঞতাসুলভ আচরণের বিপরীতে ফ্রেঞ্চ প্রেসিডেন্ট জি সাথে তার বৈঠকে জার্মান চ্যান্সেলল অ্যাঙ্গেলা মার্কেল এবং ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট জিন-ক্লাউড জাংকারকে সংযুক্ত করেছিলেন অন্যান্য দূরদর্শী চিন্তাসম্পন্ন ইউরোপীয় নেতাদের মতোই তিনি স্বীকার করেছেন যে চীন, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বে ইউরোপ সম্মানের সাথে টিকে থাকতে পারবে শুধুমাত্র যদি ইউরোপের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়
এখনো, ইইউ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট কৌশল না থাকলে, ইউরোপ পরাশক্তিদের ভাগ-করো-জয়-করো কৌশলের নিকট অরক্ষিতই থেকে যাবে, এবং ইউরোপীয়রা বঞ্চিত হবে একটি সামষ্টিক কণ্ঠস্বর থেকে, যেটি কিনা তাদের স্বার্থ দেখাশুনা করবে রাশিয়া যেমন নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যম্যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একের বিরুদ্ধে অপরকে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে, চীনও তেমনি যত বেশি সম্ভব ইউরোপীয় দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করার চেষ্টা করবে এরকম আলোচনার ক্ষেত্রে চীনই সবসময় ভালো অবস্থানে থাকবে
ইইউ কমিশনার গুন্থার ওটিঙ্গার প্রস্তাবিত একটি সম্ভাব্য সমাধান হচ্ছে ইইউতে যে কোন ধরনের চীনা বিনিয়োগের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় কমিশনে ভেটো দেওয়া এই ধারণাটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আলাদাভাবে ইইউ সদস্য দেশগুলোর একতরফা সিদ্ধান্তসমূহ বাকি ইউরোপকে নিরাপত্তা অর্থনীতিবিষয়ক জটিলতায় ফেলে দিতে পারে তাছাড়াও জাতীয় সরকারগুলোর নিজস্ব পদ্ধতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য ইইউর প্রচেষ্টাকে ব্যহত করতে পারে
একটি শক্তিশালী ইইউ-চীন সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্যই ভালো রকমের লাভজনক হতে পারে ইইউ-চীন শীর্ষ সম্মেলনে ২০২০ সালের মধ্যে একটি ইইউ-চীন বিনিয়োগ চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়াটা ইতিবাচকতার স্বাক্ষর হতে পারে। এরকম একটি সমোঝতা হয়তো ইউরোপীয় সংস্থাগুলোর জন্য চীনের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের বাঁধাসমূহ দূর করে এবং বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগকারীদের বিপক্ষে বৈষম্য হ্রাস করে অনেক নতুন নতুন দরজা খোলে দেবে। কিন্তু একইভাবে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে ইউরোপের একটি সাধারণ পদ্ধতি থাকা দরকার, যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়, বিশেষত ৫জি যন্ত্রপাতির (যেগুলোর অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হচ্ছে চীনের হুওয়াওয়ে) বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রমবর্ধমান উচ্চাকাঙ্ক্ষী চীন কর্তৃক আরোপিত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য ইইউ খুবই ধীর গতিতে সচেতন হচ্ছে কিন্তু আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে এখনো আমরা একটি ইউরো-চীন সম্পর্ক বিনির্মাণ করতে সক্ষম হবো, যে সম্পর্কটি ভবিষ্যতে আমাদের সকলের স্বার্থ রক্ষা করবে
________________________________

নিবন্ধটি প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে “Europe MustUnite on China” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। লেখক বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অ্যালায়েন্স অব লিবারেলস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস ফর ইউরোপ গ্রুপ (এএলডিই)’র প্রেসিডেন্ট এবং Europe’s Last Chance: Why the European States Must Form a More Perfect Union গ্রন্থের লেখক।


মেহদি হাসান, দ্য ইন্টারসেপ্ট:
নিউ জিল্যান্ড হামলা, যে হামলায় দুটো মসজিদে অন্তত ৪৯ জন নিহত হয়েছেন, সেটির অভিযুক্ত লোকটির অনলাইন ইশতেহারে আছে
 “এমনকি যদি আগামীকালই সকল অইউরোপীয়দেরকে আমাদের ভূমি থেকে বের করে দেই, তবু ইউরোপীয়রা ধ্বংস এবং চুড়ান্ত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে,” ইশতেহার আরো এগুতে থাকে। “শেষ পর্যন্ত, অবশ্যই আমরা আমাদের ‍উর্বরতার হারকে (প্রজননের) পুনঃস্থাপিত করতে হবে, নয়তো এটিই আমাদেরকে মেরে ফেলবে।”
ঘাতক তার হামলাকে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ হিসেবে উল্লেখপূর্বক ইসলামের প্রতি তার অপছন্দ এবং বিশেষ করে ইসলামি বিশ্বাস গ্রহণের প্রতি তার ঘৃণার কথা উল্লেখ করেছে। সে “শ্বেত গণহত্যার” কথা বলে এবং মুসলমানদেরকে “পাশ্চাত্যে আক্রমণকারী সবচেয়ে ঘৃণ্য গোষ্ঠী” হিসেবে আখ্যায়িত করে।
বেলিংকার্টের রবার্ট ইভান্সের যুক্তি অনুসারে এই ইশতেহারটি একটা ফাঁদ হোক আর যাই হোক, এটির উদ্দেশ্য ট্রল করা, উত্তেজিত করে তোলা, এবং “শিটপোস্টিং” করা হোক কিংবা না হোক, এ কথা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে এটি অবশ্যই একটি ঘৃণায় ভরপুর বার্তা। এটি জঘন্য, চরম আকারে মুসলিম বিদ্বেষী ও অভিবাসী বিদ্বেষী এবং বিকৃতমনস্কতার পরিচায়ক।
কিন্তু এর কোনটাই আকস্মিক ধাক্কা দেওয়ার মতো কিছু নয়। কীভাবে আকস্মিক ধাক্কা লাগার মতো হতে পারে? আপনি কি খেয়াল করছেন না? বেশির ভাগ বাগাড়ম্বর এবং প্রসঙ্গ সরাসরি মূলধারার রাজনীতি ও গণমাধ্যম থেকেই ধার নেওয়া, বিশেষত­­ যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনের কথা বলা যায়।
আমি যখন ইশতেহারটি পড়ছিলাম, তখন উচ্চপর্যায়ের মার্কিন রাজনীতিবিদদের কথা চিন্তা করছিলাম, উদাহরণস্বরূপ মার্কিন রাষ্ট্রপতির কথা বলা যেতে পারে, যিনি বলেছিলেন, “ইসলাম আমাদের ঘৃণা করে,”  মসজিদ থেকে আসা মানুষদের কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন “এরা চোখে ঘৃণা আর মনে মৃত্যু নিয়ে বেরিয়ে আসে,” এবং অভিবাসীদের আগমণকে “আগ্রাসনের” সাথে তুলনা করেছিলেন। কিংবা সিনেটর টেড ক্রুজের কথা বলা যেতে পারে, যিনি “মুসলিম প্রতিবেশীরা চরমপন্থী হয়ে ওঠার আগেই তাদেরকে পাহারা দিতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে” আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথবা সিনেটর মার্কে রুবিও যিনি বলছিলেন, “যে কোন স্থান, সেটা ক্যাফে হোক, রেস্তোরা হোক কিংবা ইন্টারনেট সাইট হোক, সেখান থেকে চরমপন্থী হয়ে থাকলে” তিনি সে জায়গাটি বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে। অথবা সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম, যিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন: “যদি আমাকে একটি মসজিদের উপর নজরদারি করতে হয়, আমি সেটা করবো।” অথবা  সাবেক গভর্নর মাইক হুকাবি, যিনি শুক্রবারে মধ্যপ্রাচ্যর মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসার মুসলমানদেরকে “খাচা থেকে বের হওয়া পশু” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অথবা এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন সাহেবের কথা বলা যায়, যিনি কিনা ২০১৬ সালের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে প্রস্তাব করেছিলেন মুসলিম-আমেরিকান নাগরিকত্ব ভালো ব্যবহার ও আনুগত্যের প্রমাণ পেশ করা শর্তসাপেক্ষ হতে হবে, তার ভাষায়: “যদি তুমি একজন মুসলমান হয়ে থাকো, এবং তুমি আমেরিকাকে ভালোবাস, স্বাধীনতাকে ভালোবাস, সন্ত্রাসকে ঘৃণা কর, তাহলে এখানে অবস্থান করো এবং বিজয়ী হতে আমাদেরকে সাহায্য করো, এবং একসাথে ভবিষ্যৎকে বিনির্মাণ করো।”
যখন আমি অভিযুক্ত ঘাতকের ইশতেহার পড়ছিলাম, আমার মনে পড়ছিলো ডানপন্থী পণ্ডিতরা একই রকম কত বিবৃতি দিয়েছেন এবং সে জন্যে কোন শাস্তির মুখোমুখি হন নি। উদাহরনস্বরূপ, লেখক আন কোল্টার প্রকাশ্যে “পাগড়িধারী” “উষ্ট্রারোহ” ও “জিহাদী বানর” সম্পর্কে কথা বলেছেন, ৯/১১’র তিন দিন পর ঘোষণা দিয়েছিলেন, “আমাদের উচিত তাদের দেশসমূহে আগ্রাসন চালানো, তাদের নেতাদের হত্যা করা, এবং তাদেরকে খৃষ্টান বানানো।” কিংবা ভাষ্যকার বেন শেপিরো, যিনি বিশ্বাস করেন যে, বিশ্বের “সংখ্যাগরিষ্ঠ” মুসলিম জনগোষ্ঠী “চরমপন্থী” এবং দাবি করেন যে “আরবরা বোমা বানাতে আর ময়লার মধ্যে বসবাস করতে পছন্দ করে।” কিংবা ফক্স নিউজের হোস্ট টুকার কার্লসন, যিনি শ্বেত গণহত্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বারবার অযৌক্তিকভাবে আউড়িয়ে নব্য নাৎসীদের সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন, এবং ইরাকিদেরকে “প্রায় নিরক্ষর আদিম বানর” বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিংবা প্রেসিডেন্টের বন্ধু ব্রিগিট গাব্রিয়েল, যিনি মনে করেন যে: “একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিম যে বিশ্বাস করে যে কুরআন আল্লাহর বাণী, যে ইসলামের আনুগত্য করে, এবং প্রতি শুক্রবারে মসজিদে গিয়ে প্রার্থনা করে সে কখনোই মার্কিন ‍যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত নাগরিক হতে পারে না।” কিংবা ব্রেইটবার্ট নিউজের সাবেক এক্সিকিউটিভ চেয়ার ও প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ বেনন, যিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, “ইসলাম শান্তির ধর্ম নয়,” বরং “আনুগত্যের ধর্ম” এবং হুশিয়ারি জারি করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র “ইসলামিক স্টেট অব আমেরিকায়” রূপান্তরিত হতে পারে।
আমি যখন ইশতেহারটি পড়ছিলাম, তখন সেসকল খ্যাতনামা মুক্তমনাদের নাম স্মরণ না করে পারছিলাম না, উদাহরণস্বরূপ নাস্তিক বিজ্ঞানী স্যাম হ্যাসির, যিনি ইসলামকে “খারাপ ধারণাসমূহের মা” খেতাব দিয়েছিলেন, এবং ঘোষণা করেছিলেন যে “আমরা ‘সন্ত্রাসবাদের’ সাথে যুদ্ধ করছি না, আমরা ইসলামের সাথে যুদ্ধ করছি।” কিংবা টিভি হোস্ট বিল মাহের যিনি ইসলামকে “এক মাফিয়া” বলে আখ্যায়িত করেন এবং “সহিংস” মুসলমানদেরকে অভিযুক্ত করেন যে তারা “সেই মরুভূমির জিনিসকে আমাদের বিশ্বে” নিয়ে আসছে। কিংবা লেখক এবং প্রাক্তন মুসলিম আয়ান হিরসি আলি, যিনি দাবি করেন যে ইসলাম “চূর্ণ” হয়ে যাবে এবং মনে করেন ডে “প্রত্যেক নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম, যারা সত্যিকারের ইসলাম চর্চা করতে আগ্রহী, তারা যদি সরাসরি ৯/১১ হামলাকে সমর্থন নাও করেন, অন্ততপক্ষে তারা অবশ্যই এদেরকে সমর্থন করেন।” কিংবা ঔপন্যাসিক মার্টিন অ্যামিস, যিনি একদা বলেছিলেন, “এরকমটি বলার সুনির্দিষ্ট কারণ আছে যে, মুসলিম সম্প্রদায়কে অবশ্যই নিজেদের বাড়ি খোঁজে পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভোগতে হবে। আপনার কি তা মনে হয় না? কোন ধরনের ভোগান্তি? তাদেরকে ভ্রমণ করতে না দেওয়া। নির্বাসনে পাঠানো। স্বাধীনতা হ্রাস করা। যে সকল মানুষকে দেখে মনে হয় যে তারা মধ্যপ্রাচ্য অথবা পাকিস্তান থেকে এসেছে তাদেরকে তল্লাশী করা।”
একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, আমি বলছিনা যে এ ধরনের লোকজন, সে রক্ষণশীল হোক বা উদারপন্থী, রাজনীতিবিদ কিংবা পণ্ডিতই হোক, তারা এ ধরনের জঘন্য অপরাধের জন্য প্রতক্ষরূপে দায়ী। (যদিও অভিযুক্ত হামলাকারী ডোনাল্ড ট্রাম্পের “শ্বেত স্বকীয়তার প্রতীক” হিসেবে প্রশংসা করেছে, এবং দাবি করেছে যে “সব কিছুর উপর যে ব্যক্তিটি আমাকে প্রভাবিত করেছেন তিনি হলেন ক্যান্ডেস ওয়েন্স, একজন “সদা ডানপন্থী” সামাজিক মাধ্যম সুপারস্টার। আবারো, এটি ইচ্ছাকৃত উত্তেজনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হতেও পারে, নাও হতে পারে।)
রক্ষণশীলরা নিজেদের উপদেশ গ্রহণ করার জন্য অনেক দেরি হয়ে কি যায় নি?
এবং আমরা বাকিদের কী অবস্থা? সর্বশেষ নিউ জিল্যান্ডে সংগঠিত ঘৃণ্য নৃশংসতা থেকে আমরা কি শিক্ষা নেব? মসজিদে যখন মুসলিমদের উপর কোন নৃশংস হামলা হবে না, তখনও কি আমরা ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ইচ্ছুক এবং সক্ষম? ক্যাবল নিউজ, কিংবা সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে যখন আমরা মুসলিম বিদ্বেষী বাগাড়ম্বর দেখতে পাই, তখন আমরা সেটাকে জঘন্য হিসেবে আখ্যায়িত করবো তো? নাকি শুধু কোন গণহত্যাকারীর অনলাইন ইশতেহারে এসব কথা দেখলেই কেবল প্রতিবাদ করবো?
আমার সন্দেহ আছে এই বিষয়ে। শুক্রবারে ক্যাম্ব্রিজের অ্যাকাডেমিক প্রিয়ংবদা গোপাল টুইটারে যে পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করেছেন “মানুষ শুধুমাত্র তখনই বর্ণবাদ এবং ইসলামোফোবিয়ার নিন্দা করতে পারে ভীত এবং শঙ্কিত হয়ে যখন এই সমস্যার অংশ হিসেবে প্রচুর রক্ত ঝরে। কারণ অন্য সব সময় তারা এগুলোকে স্বাভাবিকীকরণ ও লঘুকরণে ব্যস্ত থাকে।”
________________________________

আল জাজিরার জনপ্রিয় সাংবাদিক মেহদি হাসান নিবন্ধটির লেখক। তিনি নিয়মিত দ্য ইন্টারসেপ্টে কলাম লিখেন। এটিও সেখানেই লিখেছেন। মূল নিবন্ধের শিরোনাম- “Dont Just Condemn the New Zealand Attacks Politicians and Pundits Must Stop Their Anti-Muslim Rhetoric” (শুধু নিউ জিল্যান্ড হামলার নিন্দা জানিও না    রাজনীতিবিদ ও পণ্ডিতগণকে অবশ্যই মুসলিম বিদ্বেষী বাগাড়ম্বর বন্ধ করতে হবে।)



জেকেরিয়া কুরসুন, ইয়েনি সাফাক:
১২১২ সালের মে মাস। ফ্রেঞ্চ রাজা ফিলিপস সেন্ট ডেনিসে তার সেনাপতিদের সাথে বৈঠক করছিলেন। এমন সময় স্টিফেন অব ওরলিনস নামক এক মেষপালক এসে প্রবেশ করলো। সে ধাপ্পা দিচ্ছিল যে সে জেসাস ক্রাইস্টের বার্তা নিয়ে এসেছে। তাছাড়া সে আলো দাবি করছিল যে সে মেষ পালন করছিল, এমন সময় জেসাস ক্রাইস্ট তার উপর ক্রুসেডারদেরকে উপদেশ দেওয়ার দায়িত্ব আরোপ করেছেন।
গল্পটা বর্ণনা করেছেন রান্সিম্যান, যিনি ক্রুসেডের ইতিহাস গবেষক হিসেবে বেশ নামকরা। কাজেই এটা কোন ফেলনা গল্প নয়।
পাশ্চাত্যের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, “অন্যদের” বিরুদ্ধে শিশুদের উত্তেজিত করে ব্যবহার করার ইতিহাস তাদের অনেক রয়েছে, অথচ তারা কিনা আধুনিক সময়ে এসে নিজেদেরকে সভ্যতার একমাত্র উৎস বলে দাবি করে। সবচেয়ে বেশি জানা ও আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি হলো ক্রুসেড যুদ্ধ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ক্রুসেডগুলোর একটি, যেটি একাদশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপীয় খ্রিষ্টানরা শুরু করেছিলো “জেরুজালেম বাঁচানোর” উদ্দেশ্যে এবং “আনাতোলিয়া থেকে তুর্কিদের হটানোর” উদ্দেশ্যে, সে ক্রুসেডটি হচ্ছে শিশুদের ক্রুসেড, যেটির শুরুর সাথে জড়িত হলো উপরে বর্ণিত গল্পটি।
মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে পরিচালিত চারটি ক্রুসেডের মাধ্যমে ক্রুসেডাররা তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকরা মনে করতো, এই ব্যর্থতার কারণ সৈন্যদের মাত্রাতিরিক্ত পাপ, তারা সেটি ইউরোপজুড়ে প্রচার করতে লাগলো, একই সাথে মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডাও ছড়াতে লাগলো। তাদের বক্তব্যের মূলকথা ছিল জেরুজালেমকে মুসলমানদের হাত থেকে রক্ষা করা, তাদের বিবেচনায় মুসলমানরা ছিল পাষণ্ড। স্টিফেন মেষ পালনের ফাঁকে এরকম এক প্রচারকের দেখা পান, এবং তার দ্বারা আকৃষ্ট হন। তিনি এতোটাই আকৃষ্ট হন যে তিনি বিশ্বাস করতে থাকেন যে তার পাপী পূর্বসুরীরা যা অর্জন করতে পারেনি, তিনি তা অর্জন করতে পারবেন। আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায়, তার মধ্যে নিশ্চিতরূপে এই প্রত্যয় জন্ম নেয়, যে তিনিই পারবেন।
স্টিফেন প্রোপাগান্ডা ছড়াতে শুরু করলেন এবং ঘোষণা দিলেন যে তিনিই শিশুদের নিয়ে গঠিত একটি দলকে নিয়ে খৃষ্ট ধর্মকে রক্ষা করতে যাচ্ছেন। শিশুরাও প্রচারকদের দ্বারা সম্মোহিত হয়ে এরকম একটা আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা বিশ্বাস করতে লাগলো, জুন মাস নাগাদ জেসাসের মুজেজার অংশ হিসেবে সমুদ্র শুকিয়ে তাদের জন্য রাস্তা তৈরি হয়ে যাবে। এটা নিছক কোন গালগল্প নয়। ফ্রান্সের ইতিহাসের সমসাময়িক সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, অনুর্ধ্ব ১২ বছর বয়সী প্রায় ৩০,০০০ ছেলে-মেয়ে ভেন্ডমে একত্রিত হয়। তাদের মধ্যে অনেক গ্রামবাসীও ছিল, জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে তীর্থযাত্রীরাও ছিল, আর অবশ্যই সেসকল প্রচারকদের অনেকেও ছিল।
শিশু ক্রুসেডাররা সকলে পায়ে হেটে দক্ষিণ দিকে রওনা দিলো। তখন খুবই গরম গ্রীস্মকাল চলছিল, ভ্রমণের জন্য খুবই জঘন্য অবস্থা ছিল। শিশুদেরকে বলা হয়েছিল যে সকল এলাকার পাশ দিয়ে তারা যাবে, সেসব এলাকা থেকে কোন মতে খাবারের ব্যবস্থা করে নিতে। কিন্তু দেশে চলমান খরা ও দুর্ভিক্ষের দরুণ তারা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছিল না। তাদের অনেকেই রাস্তায় মারা যায়, এবং তাদের মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অংশটি এক বিকেলে শেষ পর্যন্ত মার্সেলে পৌছায়। মার্সেলের লোকজন তাদের প্রতি খুবই উদারতা প্রদর্শন করে এবং নিজেদের ঘর-বাড়ি শিশুদের জন্য খোলে দেয়। পরের দিন সকালে শিশুদেরকে সমুদ্র সৈকতে নিয়ে যাওয়া হলো মুজেজা দেখানোর জন্য: সমুদ্র শুকিয়ে তাদের জন্য রাস্তা তৈরি হয়ে গেছে! কিন্তু বাস্তবে এমনটি না হওয়াতে তারা বেশ হতাশ হয়ে পড়লো। কিছু বাচ্চারা মনে করলো তারা প্রতারিত হয়েছে এবং স্টিফেনকে দোষারোপ করে তারা দলত্যাগ করলো। অন্যদিকে বিশ্বাসীরা সাগর শুকিয়ে যাওয়ার মুজেজা কখন সংগঠিত হয়, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।
তখন মার্সেলের দুই ব্যবসায়ী ঘোষণা দিলেন যে তারা ইশ্বরের সন্তুষ্টির জন্যে বাচ্চাদেরকে ফিলিস্তিন পৌছিয়ে দেবেন। স্টিফেন এবং অন্যরা বেশ আনন্দচিত্তে এ প্রস্তাবনা গ্রহণ করলেন এবং জাহাজে চড়লেন। যদিও ঐদিনের পর থেকে তারা আর কখনো শিশুদের কথা শুনে নি। মজার বিষয় হলো স্টিফেনের এই গল্পটি জার্মানিতে বেশ প্রভাব ফেললো। স্টিফেনের পর জার্মান তরুণরাও উদ্যোগ গ্রহণ করলো। এবার নিকোলাস নামে এক তরুণ একই রকম বার্তা দিয়ে শিশু সেনাবাহিনী প্রস্তুত করলো এবং ইতালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। এই দলের গড় বয়স আগের দলের তুলনায় বেশি ছিল, মেয়েদের সংখ্যাও এই দলে তুলনামুলক বেশি ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে জার্মানি থেকে রওনা দেওয়া ২০,০০০ শিশুর ভাগ্যে একই পরিণতি ছিল। এসকল প্রতারিত শিশুরা কোনদিন জেরুজালেম পৌছতে পারেনি, বাড়িতেও ফিরতে পারেনি। কয়েক জন যাজক ফিরতে সক্ষম হয়েছিলো, ১৮ বছর পর তারা শিশুদের খবর নিয়ে বাড়ি ফিরে ছিলো। খবর অনুযায়ী, মার্সেলে থেকে রওনা দেওয়া জাহাজগুলো পথিমধ্যে ডুবে যায় এবং হাজার হাজার শিশু ডুবে মরে। হাতে গোণা কয়েকটিন জাহাজ ঝড়ের কবল থেকে বেঁচেছিলো, সেগুলো ফিলিস্তিন যায়নি, বরং আফ্রিকার দিকে গিয়েছে। যারা মারা গিয়েছিল, তারা ছিল সত্যিকার অর্থে সৌভাগ্যবান। কারণ যারা আফ্রিকা পর্যন্ত পৌছেছিল, তাদেরকে তাদের স্বধর্মীরা দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়।
বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস ও অর্থহীন যুদ্ধগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্রুসেড যুদ্ধ, যেটি কিনা শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে চলেছিল। এসকল যুদ্ধ শুধু মুসলিম আর তুর্কিদের ক্ষতি করেনি, বরং ইউরোপ ও খৃষ্ট ধর্মেরও বিশাল ক্ষতি করেছিল। নিষ্ঠুরভাবে ক্রসেডের জন্য প্রেরিত অর্ধ লক্ষাধিক শিশু যদি বেঁচে যেতো, কে জানে, হয়তো আজকের পৃথিবী আরো সুখ-শান্তির আবাস হতে পারতো।
তো, সে ইতিহাসের সাথে আমি কেন এখনকার বিষয়গুলোকে সম্পর্কিত মনে করছি?
নিউ জিল্যান্ডে যে ঘাতক ৫০ জন মুসলিমকে হত্যা করেছে, আরো অনেককে আহত করেছে, তার জীভন বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে বিষয়টি পাওয়া গেছে, সেটা হলো সে তুরস্কে সফর করেছিল। যদিও আমাদের কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই, তবু দাবি করা হয়েছে যে সন্ত্রাসীটি নাকি টোকাটের অন্ধকূপেও গিয়েছিল। যেখানটাতে ড্রাকুলাকে রাখা হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের ভিলেনের জন্য এটি একটি স্বাভাবিক মনোভাব।
ভালো কথা, ড্রাকুলা কে ছিল? অনেক গল্প-সিনেমার চরিত্র, ড্রাকুলা তৃতীয় ভ্লাদ নামে রোমানিয়াার ওয়ালাশিয়া অঞ্চলের সিংহাসনে আরোহণ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে নৃশংসতার জন্যই সে খ্যাত হয়ে আছে। ভ্লাদ, যে ভ্লাদ দ্য ইম্পালার নামেও খ্যাত, সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহের (মেহমেদ-২ দ্যা কনকুয়েরর) শাসনামলে বেঁচে ছিল। গুজব আছে যে মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের নির্দেশে তাকে অন্ধকূপে ফেলা হয়েছিল।
কে জানে, ড্রাকুলার কিংবদন্তিতুল্য চরিত্রই কেন এই সন্ত্রাসীর আদর্শ, কোন কিছু কি চেনা চেনা মনে হচ্ছে?
________________________________

ইয়েনি সাফাক তুরস্কের প্রভাবশালী সরকারপন্থী পত্রিকা। নিবন্ধটি ইয়েনি সাফাকের ইংরেজি সংস্করণে “Child crusaders, Dracula, and the New Zealand mosque shooter” শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ভাষান্তর কর্তৃক অনূদিত। ছবি উইকিমিডিয়া কমন্স থেকে থেকে সংগৃহীত।

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.