Latest Post



হামিদ দাবাশি, আল জাজিরা ইংরেজি:

নিউ ইয়র্কে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭ টায় আমরা সবাই বাসার বারান্দায় কিংবা দরজার বাইরে এসে কড়াই-পাত্র ইত্যাদিতে টুংটাং শব্দ করে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, যাঁরা করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের সেবা ও সুস্থ করে তোলার জন্য নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।

আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ, তাঁরা প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল ও সরঞ্জামাদি নিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এর জন্য দায়ী আমাদের সামরিক সংস্কৃতি। এ কারণে সামরিক সরঞ্জামাদির পিছনে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হলেও স্বাস্থ্য খাতকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে হচ্ছে।

আমরা দুনিয়া জোড়ে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া বিজ্ঞানীদের প্রতিও কৃতজ্ঞ, তাঁরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান সরবরাহ করছেন, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য কোন কোন নীতি বাস্তবায়ন করা দরকার, সরকারসমূহকে সে সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও ভারতের মতো ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্র এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প, জাইর বলসনারো ও নরেন্দ্র মোদীর মতো নেতাদের ভীড়ে যারা কিনা তাদের জনগণের স্বাস্থ্যের চেয়ে অর্থনীতি ও তাদের নিজ আদর্শিক গোষ্ঠীর স্বার্থকে বড় করে দেখছেন  ডব্লিউএইচও ডিরেক্টর-জেনারেল টেড্রস অ্যাডানম অথবা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশিয়াস ডিজিজেস’র ডিরেক্টর অ্যান্থনি ফসির মতো ব্যক্তিত্বরাই প্রশংসা কুড়াচ্ছেন, এবং সুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন।

প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসাকর্মী ও বিজ্ঞানীরাই এই মহামারীতে প্রকৃত বীর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।


বিজ্ঞানের যত সংগ্রাম
চিকিৎসা ব্যক্তিত্ব ও বিজ্ঞানীরা প্রচণ্ড খ্যাতিমান চরিত্র এবং বলা চলে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ফলে বিজ্ঞানকে তার নিজের চ্যালেঞ্জসমূহকেই মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

মহামারীর এই সময়ে বিজ্ঞানীরা ভালো বিজ্ঞান ও খারাপ বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জ্যাকি ফ্লিন মগেনসেন তাঁর সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে লিখেন, “বিজ্ঞানের একটি কুৎসিত, অন্ধকার দিক রয়েছে। এবং করোনা ভাইরাস সেই কুৎসিত দিকটি আমাদের সামনে নিয়ে আসছে।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “এক সময় যেটা ছিল ম্যারাথন দৌড়, এখন সেটা সংকোচিত হয়ে ৪০০-মিটার ড্যাশে পরিণত হয়েছে। গবেষকরা তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশের জন্য দৌড়াচ্ছেন, অ্যাকাডেমিক জার্নাল দৌড়াচ্ছে বেশি করে আর্টিকেল প্রকাশ করার জন্য, আর গণমাধ্যম দৌড়াচ্ছে ভীত ও আগ্রহী জনগণের নিকট নতুন তথ্য পৌছানোর জন্য।” (ফলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় গবেষণা ব্যহত হচ্ছে, সবাই কম সময়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বেশি ফলাফল পেতে চাচ্ছে। অনুবাদক)

জো হামফ্রেইজ সম্প্রতি আইরিশ টাইমসে তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, “করোনা মহামারী শুধুমাত্র আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আঘাত করেনি, এটি আমাদের নীতি-নৈতিকতাকে ধাক্কা দিয়েছে। যে বিষয়গুলোকে আমরা সামাজিকভাবে সহনীয় বলে মনে করি যেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের কর্মীদের নিম্ন আয় এবং হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের বাধা এ বিষয়গুলোই হঠাৎ করে আমাদের নিকট জঘন্য বলে মনে হচ্ছে, এই মহামারীর কালে।”

কিন্তু এই মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কে কথা বলবে? বিজ্ঞানী হিসেবে ডাক্তাররা বলবে, চিন্তকের জায়গা থেকে দার্শনিকরা কথা বলবে, নাকি উভয়েই বলবে, না কেউই কথা বলবে না?

এ ধরনের বিষয় কয়েক প্রজন্ম ধরে বিজ্ঞানের সমাজবিজ্ঞানে (সোশ্যলজি অব সায়েন্স) পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ডিসিপ্লিনের মূল ধারণা হচ্ছে কোন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিই সামাজিক ও রাজনৈতিক কার্যকারণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়, এমনকি ধর্মীয় পক্ষপাত থেকেও পুরোপুরি মুক্ত নয়।

বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের বর্তমান অবস্থানের বিষয়ে আগে থেকে চলে আসা সুস্পষ্ট সমালোচনার মধ্যে কোভিড-১৯’র আবির্ভাব তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় কিছু পর্যবেক্ষণের উদ্ভব ঘটিয়েছে। জানাব গানেশ ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে তার সাম্প্রতিক এক কলামে কলা ও বিজ্ঞানের পার্থক্য সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। কলামটির শিরোনাম “দুই সংস্কৃতির সমাপ্তি (দি এন্ড অব টু কালচার)।

তিনি প্রস্তাব করেন, মহামারীর ফলস্বরূপ “বিজ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতা আর টিকবে না। দুই সংস্কৃতি (কলা আর বিজ্ঞান) একই সংস্কৃতিতে পরিণত হবে। আর এই সমন্বয়ের কাজটা করতে হবে আমাদের মধ্যে যারা মানবিক বিষয়ের আছেন, তাদেরকেই।

তিনি আরো বলেন, “সাম্প্রতিক সপ্তাহসমূহে শুধুমাত্র মেডিসিন আর রোগতত্ত্বই আমাদের চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়নি, বরং কোয়ান্টিটিভ সায়েন্সও চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই ইস্যুটি অবশ্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়াবলীর বিভক্তির পিছনের কার্যকারণগুলোর শিকড় মার্কিন ও ইউরোপীয় সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত।


আমাদের সময়ের জন্য একজন ইবন সিনা?
কোভিড-১৯ মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে ইবন সিনার (৯৮০-১০৩৭) প্রতি নতুন করে আগ্রহ জন্মাতে দেখা যাচ্ছে। ইবন সিনা (বর্তমান) ইরানের একজন মুসলিম বিজ্ঞানী, চিকিৎসাক্ষেত্রে যার গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ছিল। তাঁর প্রধান কাজ, আল-কানুন ছিল মেডিক্যাল লিটারেচাল ও মেডিক্যাল শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অবলম্বন, এবং চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাসে এক অন্যতম ভিত্তি। ঐতিহাসিক জামাল মুসাভির মতে, তাঁর মৃত্যুর ৬০০ বছর পর্যন্ত তার রচনা মুসলিম ও ইউরোপীয় দুনিয়ার চিকিৎসার উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল।

বর্তমানে মুসলমানরা গর্বভরে বিশ্বকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, ইবন সিনার উত্তরাধিকার মহামারী প্রতিরোধের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করছে। এক মুসলিম লেখক লিখেন, “মাইক্রস্কপিক ভাইরাসের সাথে লড়তে বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক মুসলিম বহুশাস্ত্রজ্ঞ ইবন সিনার  প্রায় সহস্রাব্দ প্রাচীন নির্দেশনাসমূহের দিকে ফিরে যাচ্ছে।”

কীভাবে কোয়ারেন্টাইনের ধারণার মূল ইবন সিনার বৈজ্ঞানিক গবেষণাকর্ম থেকে উৎসারিত, তা তারা তুলে ধরছেন। ইবন সিনা “তাঁর পাঁচ খণ্ডে রচিত চিকিৎসা বিশ্বকোষ আল-কানুনে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন, আল কানুন মূলত ১০২৫ সালে প্রকাশিত হয়।”

বোধগম্যভাবেই এসবের বেশির ভাগই গর্বিত স্মৃতিচারণ, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ অনুল্লেখিত থেকে যাচ্ছে, তা হলো ইবন সিনা কেবলই একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচু মাপের দার্শনিক। এক মুহূর্তের জন্য গভীরভাবে চিন্তা করুন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের পর্বতসম গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব একজন মহাগুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক চিন্তকও ছিলেন।

এই বিষয়টিই এখন চিন্তা করা জরুরি। ডক্টর ফসির কথা চিন্তা করুন। এবার চিন্তা করুন জার্মান দার্শনিক মার্টিন হেইডেগারের কথা। এবং, এবার এই দুই চিত্রকে একত্রিত করার চেষ্টা করুন তাহলে আমরা ইবন সিনার কাছাকাছি একটা ধারণা পেতে পারি।


একজন দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক
ইবন সিনার জীবনকালের অর্জনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন সব্যসাচী বিজ্ঞানী-দার্শনিকই ছিলেন না, যেমনটা আজকাল মনে করা হয়। তাঁর অবস্থান আরো অনেক উপরে। তাঁর কাজগুলো এমন এক জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থা থেকে উৎপন্ন হয়েছে, যা ইউরোপীয় আধুনিকতার যুগেও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ইউরোপীয় আধুনিকতায় মানবীয় বিজ্ঞানকে যুক্তি বনাম অনুভূতি, কিংবা ধর্ম বনাম বিজ্ঞান, কিংবা মানববিদ্যা বনাম সমাজবিদ্যা এরকম নানা ভাগে টুকরো টুকরো করে ফেলার কাজটি এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।

ইবন সিনা লিখেছেন যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা, আধ্যাত্মবাদ নিয়ে, লিখেছেন মনোবিজ্ঞান, সঙ্গীত, গণিত আর চিকিৎসা বিষয়ে তিনি এসব লিখেছেন গভীরভাবে শিক্ষিত সংস্কৃতিবান এবং দার্শনিক মন দিয়ে।

একটা বিষয় নিশ্চিত থাকা দরকার, ইবন সিনা মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী/দার্শনিক ছিলেন, তবে তিনি তাঁর গ্রিক পূর্বসূরীদের সরাসরি উত্তরাধিকারী ছিলেন। ইসলামি দর্শনের প্রখ্যাত ইরাকি ঐতিহাসিক মুহসিন মাহদির ভাষায়:

মধ্যযুগীয় চিন্তাচর্চায় গ্যালেন ও অ্যারিস্টেটলের মধ্যে এতোটা তর্ক আর কোথাও বাধেনি, যতটা ইবন সিনার কাজে বেধেছে। ইবন সিনার লেখালেখিতে এই দুই মহান ধারা মুখোমুখি হয়েছে। ইবন সিনা গ্যালেনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের মধ্যযুগীয় পাঠ্যপুস্তক আল কানুন লিখেছেন, আবার সে যুগে অ্যারিস্টটলীয় জীববিজ্ঞানের আকর গ্রন্থ আল হাইয়াওয়ানও তিনি লিখেছেন। এ দুটি কাজেই ইবন সিনা অ্যারিস্টটরীয়-গ্যালেনিক বিভক্তির মুখোমুখি হয়েছেন, এবং এই দুই অতিকায় ধারার মধ্যে সমন্বয় সাধনই চিকিৎসা ও জীববিদ্যা নিয়ে তাঁর কাজের মূল আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়।

কিন্তু শুধু বিজ্ঞান আর দর্শনই ইবন সিনার কাজের ক্ষেত্র নয়। আমরা যদি তাঁর বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক সাহিত্যসম্ভারকে এক পাশে রেখে তাঁর মিস্টিকাল মাস্টারপিস “আল ইশারাত ওয়াত তানবিহাত” (ইঙ্গিতাবলি ও হুশিয়ারিনামা) গ্রন্থের দিকে নজর দিই, তবে আমরা ইবন সিনার মনোজগতের পূর্ণচিত্র দেখতে পাবো।

ইবন সিনা কোন ভাবেই ইসলামি বিদ্যাচর্চার ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি নন, যিনি বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছেন। নাসির উদ্দিন তুসি (১২০১-১২৭১) একই রকম গুরুত্বপূর্ণ আরেক ব্যক্তিত্ব, যিনিও বিজ্ঞান (তাঁর ক্ষেত্রে জ্যোতির্বিজ্ঞান) ও দর্শন চর্চা করেছেন সমান্তরালে। ইবন সিনার মিস্টিকাল লেখালেখিতে তার টিকা-ভাষ্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।

বিষয়টা এমন নয় যে ইবন সিনা একজন স্রষ্টাপ্রদত্ত ব্যতিক্রমী প্রতিভা ছিলেন বলে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান ও দর্শন শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। বরং বাস্তবতা হলো, তিনি এমন এক সমাজের সন্তান, যে সমাজে তখনো বিজ্ঞান আর দর্শনের মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে পার্থক্য করা হতো না, আলাদা পেশাদারিত্ব আর পারদর্শিতা অর্জনের প্রথা তখনো চালু হয়নি।

ইবন সিনা কোন পেশাদার চিকিৎসকও ছিলেন না, আবার দর্শনের অধ্যাপকও ছিলেন না। তিনি তার অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ জানাশোনা থেকে লিখেছিলেন, যেখানে গ্রিক ঐতিহ্য একেবারে ভিন্নরূপে উপস্থাপিত হয়েছিলো, কয়েক শতাব্দি পর ইউরোপে যেভাবে গ্রিক ঐতিহ্যকে উপস্থাপন করা হয়েছে, সে তুলনায়।

বর্তমানে ব্রুনো ল্যাটোরের মতো দার্শনিকের প্রস্তাব করছেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হবে, এমন নতুন এক স্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করা দরকার। রাজনীতিবিদস আর বিজ্ঞানীরা মিলে এমন দার্শনিক সত্তাকে খারিজ করে দেওয়ার পূর্বে আমাদের মনে রাখা উচিত, এক কালে দার্শনিক আর বিজ্ঞানী ছিলেন একই ব্যক্তি, অন্তত একই ধরনের ব্যক্তিত্ব তো ছিলেনই।

দুনিয়া জুড়ে বিজ্ঞানের আকর্ষণীয় সব অর্জনকে খারিজ করে দেওয়া এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্য নয়, অতীত নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগাও এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং এ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য হলো, বর্তমান মহামারী থেকে উত্তরণের পর পরিবর্তিত বিশ্বে আমাদের নিজেদের আত্মসচেতনতা থাকা দরকার যে, কোন ধরনের জ্ঞান এবং আত্মসচেতনতা মানবজাতিকে এ রকম মহামারী থেকে বাঁচাতে পারে?

এক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অনেক বিষয়-আশয় যেমন আছে, তেমনি আছে দার্শনিক বহু বিষয়-আশয়ও। নতুন কোন ইবন সিনার আবির্ভাব হবে কি দৃশ্যপটে? (যিনি বিজ্ঞান আর দর্শনের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম হবেন?)

––––––––––––––––––––––––––––––––––––––––
আল জাজিরা ইংরেজিতে What can Avicenna teach us in time of Coronavirus শিরোনামে প্রকাশিত হামিদ দাবাশির প্রবন্ধের তরজমা। হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানিয়ান স্টাডিজ অ্যান্ড কম্পারেটিভ লিটারেচারের অধ্যাপক। এই পাতায় ব্যবহৃদ ছবিটি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত।



ভাষান্তর ডেস্ক:
কোভিড-১৯’র প্রাদুর্ভাব থেকে বাঁচার জন্য মাস্ক পরতে হবে, এমন রব উঠেছে সারা দুনিয়া জুড়ে। আসলেই কি তাই? মাস্ক কার জন্য পরা আবশ্যক? কীভাবে পরতে হবে? পরার ক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক? এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রাপ্ত নির্দেশনার ভাষান্তর

  • আপনি যদি সুস্থ থাকেন, তাহলে কেবল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন রোগীর দেখাশুনার ক্ষেত্রে মাস্ক পরবেন।
  • আপনার যদি হাঁচি কিংবা কাশি থাকে, তাহলে মাস্ক পরুন।
  • মাস্ক পরিধানকে কার্যকর করতে হলে অবশ্যই অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে বারবার ভালো করে হাত পরিষ্কার করতে হবে। অন্যথায় মাস্ক কোন কাজে আসবে না।
  • মাস্ক ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই আপনাকে মাস্কের ব্যবহার পদ্ধতি এবং ব্যবহার শেষে যথাযথ উপায়ে বর্জ্যব্যবস্থাপনা (ডিসপোজ) সম্পর্কে জানতে হবে।

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কখন এবং কীভাবে মাস্ক পরতে হবে:
  • মাস্ক পরার আগে অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে হাত পরিষ্কার করুন।
  • মাস্ক দিয়ে  মুখ এবং নাক ডাকুন, মুখ এবং মাস্কের মধ্যে যেন কোন  ফাঁক না থাকে।
  • মাস্ক ব্যবহারকালে হাত দিয়ে সেটি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন। কোন কারণে স্পর্শ করলে সাথে সাথে অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে হাত পরিষ্কার করুন।
  • একই মাস্ক একাধিক বার ব্যবহার করবেন না; ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ার সাথে সাথে পুরনো মাস্ক বদলে নতুন মাস্ক পরুন।
  • মাস্ক খোলার ক্ষেত্রে পিছনের দিক থেকে খুলুন (মাস্কের সামনের দিকে হাত দিবেন না); খোলার সাথে সাথে সেটি ডাকনা দিয়ে বন্ধ বিনে ফেলে দিন; তাৎক্ষণিক অ্যালকোহলভিত্তিক হ্যান্ড রাব কিংবা সাবান-পানি দিয়ে বারবার ভালো করে হাত পরিষ্কার করুন।








লেখা ও তথ্যচিত্রসমূহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট থেকে অনূদিত। 



বিশারা মারওয়ান, আল জাজিরা:
আফগানিস্তানে আক্রমণ করার দুই দশক পর যুক্তরাষ্ট্র  এখন অনিবার্য পরিণতির দিকে এগুচ্ছে, সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেযুদ্ধে তালিবানদের সাথে না পেরে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত এক সময় যাদেরকে আমেরিকানদের রক্তে রঞ্জিত সন্ত্রাসী মৌলবাদী খুনী বলে আখ্যায়িত করতো, তাদের সাথে সামরিক সমাধানের আশা বাদ দিয়ে সংলাপ মেনে নিয়েছে
গত বছর ফাঁস হওয়াআফগান পেপার্সশীর্ষক গোপন  নথি থেকে জানা যায়, দীর্ঘ দিন ধরে মার্কিন  জনগণকে বুঝানো হচ্ছিল যে সবকিছুই ঠিকটাক আছে, যদিও বাস্তবে কিছুই ঠিকটাক চলছিল না ১৯৭১ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্পর্কে প্রকাশিতপ্যান্টাগন পেপার্সের মতোই”, এবারের নথি থেকেও বুঝা যায় যে যুদ্ধে আফগানরা অজেয়, তাদের সাথে জেতা সম্ভব না, যুক্তরাষ্ট্রের কোন মতে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা সময়ের ব্যাপার মাত্র
এই পরিপ্রেক্ষিতে দোহায় তালিবানদের সাথে সাক্ষরিত চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষত কিছুটা প্রশমিত করেছে বটে, তবে এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক ছাড় দিতে হয়েছে, তাই এই চুক্তি আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় মিত্রদের জন্য প্রচণ্ড হতাশাজনক
সফলভাবে ব্যর্থ হওয়ার কাহিনি
যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের জন্য তালিবানদের হাতের মুঠো থেকে কাবুল স্বাধীনকরতে মাত্র দুই মাস লেগেছিল, তার দুই বছরেরও কম সময়ে ২০০৩ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যেগুরুতর সামরিক কার্যক্রমসমাপ্ত হয়েছে একই দিনে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন ইরাক যুদ্ধমিশন সম্পন্নহয়েছে
অন্তত সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে আল-কায়েদাকে চূর্-বিচূর্ণ করতে পেরেছিল, এবং ২০১১ সালে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যাও করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে মার্কিন সামরিক কৌশল তালিবানকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়
আল-কায়েদাকে ধ্বংস করার পর বিজয় উদযাপনের পরিবর্তে নিউ ইয়র্ক এবং ওয়াশিংটন তালিবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল কিন্তু এরপর আফগানিস্তানের মাটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে চুরাবালিতে পরিণত হয় দেশটির শক্ত পাথুরে ভূমি, গোত্রপ্রথা আর কঠোর তালিবান যোদ্ধাদের কারণে আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের নিকট অজেয় হয়ে ওঠে
সংঘাতের দ্বিতীয় দশকে তালিবান আরো বেশি শক্তিশালী মারমুখীহয়ে ওঠে, এবং মার্কিন বাহিনি, তাদের জোট আফগান মিত্রদেরকে চওড়া মূল্য দিতে হয় ১৮ বছরের যুদ্ধ শেষে ,৪০০ মার্কিন সৈন্য ১৫০,০০০রও বেশি আফগান নিহত হওয়ার পর, ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নেয় এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র অন্ততপক্ষে এক ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এই যুদ্ধে কারো কারো মতে এই পরিমাণ দুই ট্রিলিয়ন ডলার অংকটি আফগানিস্তানের মোট জিডিপির চেয়ে হাজার গুণ বেশি
এই সময়ের মহাপরাক্রমশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি স্থানীয় আফগান যোদ্ধাদের নিকট হেরে আরো একবার প্রমাণ করলো যে বিশাল সাম্রাজ্য যখন তুলনামূলক দূর্বল কোন প্রতিপক্ষের সাথে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করে, তখন তারাও দূর্বল হয়ে পড়ে ভিয়েতনাম ইরাকের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে পরাজিত হলো, যে যুদ্ধ কিনা আগের সবগুলোর চেয়ে দীর্ঘতর ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সামনে এখন একটাই প্রশ্ন কীভাবে সম্ভাব্য অবমাননা এড়িয়ে সবচেয়ে ভালো উপায়ে সর্বশেষ হেলিকেপ্টারটি নিয়ে পালিয়ে আসা যায়
মুখরক্ষা
চলমান জান-মাল-সম্মান হারানো বন্ধ করার জন্য দুই বছর আগে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তালিবানের সাথে অনেকটা তাদের শর্তানুসারেই সংলাপ মেনে নেয়যুক্তরাষ্ট্র চাচ্ছিল তালিবান প্রথমে আফগান সরকারের সাথে আলোচনায় বসে দেশ সরকার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌছাক, কিন্তু তালিবান নেতারা কাবুলেমার্কিন পুতুলসরকারের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হয়নি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে কোন ধরনের আলোচনার পূর্বে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে তারা সরাসরি ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনায় বসার উপর জোর দেয়
যুক্তরাষ্ট্র তালিবানদের কথা মেনে নেয়, কিংবা আফগানিস্তানে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রিয়ান ক্রোকারের ভাষায় বলা চলে, আত্মসমর্পণ করে এরপর দেড় বছর ধরে দোহায় তালিবানদের সাথে আলোচনা চালিয়ে যায় গত সেপ্টেম্বরে এক আত্মঘাতী হামলায় এক মার্কিন সৈন্য নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প সাহেব আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত করার পরও শেষ পর্যন্ত আলোচনা এগিয়ে যায়। ফলস্বরূপ, গত সপ্তাহে একটা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, অন্ততনীতিগত পর্যায়েহলেও
সাক্ষর করার পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত এক সপ্তাহের জন্য তালিবানকে সহিংসতা হ্রাস করার জন্য বলে, যাতে সকল সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপর তালিবানের কর্তৃত্ব প্রমাণিত হয় তালিবান সে প্রস্তাবে রাজি হয় সেই সাথে আফগানিস্তানের আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় না দেওয়ার অঙ্গীকারও করে
কিন্তু  সশস্ত্র গোষ্ঠী আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ডেমক্র্যাটিক কিংবা লিবারেল, এরকম বিশেষ মার্কিন গোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং কাবুলের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনার পূর্বে তাদের দলের সকল কারান্তরীণ সদস্যদের মুক্তি দাবি  করে
কোন দলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের প্রাধান্য নয়, বরং মাঠের শক্তির ভারসাম্যই আরেকবার প্রতিফলিত হয় কূটনীতিতে আসলে এটি সকল বিদেশি শক্তির হাত থেকে মুক্ত আফগানিস্তানের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, এখানে কোন যদি, কিন্তু, সম্ভবত নেই
নির্বাচনী হিসাব
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার শাসনামল শুরু করেছিলেন কড়া কথা বলে, হুমকি-ধামকি দিয়ে, এমনকি আফগানিস্তানে কোটি কোটি মানুষ হত্যার হুমকি দিয়ে কিন্তু তালিবান নেতারা এসব কথায় কাবু হননি তারা তখন বলেছিলেন ট্রাম্পের এসব ধাপ্পাবাজির ফলে উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পাবে, বলেছিলেন যে তারা বিশ্বাস করেন সময় এখন তাদের পক্ষে আছে
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন এখন কড়া নাড়ছে, তাই ট্রাম্প সাহেব এখন চুক্তি সাক্ষরের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি এমনকি ক্যাম্প ড্যাভিড সামিটের মতো কিছু একটা করার চিন্তা-ভাবনাও করছিলেন, কিন্তু তালিবান তার সে ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মধ্যে বহু গুণের অভাব থাকতে পারে, কিন্তু জেদের কোন ঘাটতি নেই তিনি ইতিমধ্যে তার ওয়াদা পালনে দৃঢ়তা প্রমাণ করেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে এসে, মেক্সিকোর সীমান্তের দেওয়াল নির্মাণ করে, ইসরায়েলে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নিয়ে এখন তিনি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য (অবশ্যই এর মধ্যে আফগানিস্তানও আছে) থেকে মার্কিন সামরিক পদচারণা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিশেষত উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানকে ভয় দেখানোর জন্য অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করার পর এটি জরুরি হয়ে পড়েছে
এই চুক্তি যদি কার্যকর হয়, তবে এটি হবে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন, কারণ মার্কিন জনগণ যথাশিগগিরই আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধের সমাপ্তি চায় ওবামা প্রশাসন এর আগে সৈন্য প্রত্যাহারের চেষ্টা করেছিল, কাছাকাছিও চলে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি কাজেই ট্রাম্পের জন্য এটা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের নির্বাচনী সম্বল হতে পারে
––––––––––––––––––––––––––––––
নিবন্ধটি আল জাজিরা ইংরেজিতেHas Trump surrendered Afghanistan to the Taliban?শিরোনামে প্রকাশিত ভাষান্তর কর্তৃক সংক্ষেপে অনূদিত ছবি আল জাজিরার সংশ্লিষ্ট পাতা থেকে সংগৃহীত

Author Name

ভাষান্তর

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.